উম্মাহর মতভেদে নিহিত কল্যাণ

শরিয়তের কোনো ব্যাপারে বা ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের মাঝে কোনোরকম মতপার্থক্য, মতভেদ বা বিরোধের কথা শুনলে সাধারণত আমরা উদ্বিগ্ন হই। কিন্তু সব মতভেদ নিয়ে কি উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত বা এর মধ্যেও কি কোনো কল্যাণ নেই? অন্য কথায় শত শত বছর ধরে মুসলিম উম্মাহ যেসব মাজহাব মেনে চলছে বা চিন্তার যে আলাদা জগৎ তৈরি হয়েছে, তার কি কোনো গুরুত্ব নেই? এ প্রশ্নের জবাব পাওয়ার জন্য আমরা বিষয়টি নিয়ে পর্যায়ক্রমে আলোচনা করতে চাই। 
মতভেদ, মতপার্থক্য ও বিরোধ-সম্পর্কিত একটি পরিভাষার নাম ‘ইখতিলাফ’। আরবি ইখতিলাফের শাব্দিক অর্থ অমিল, ভিন্নতা, মতভেদ, মতানৈক্য ও বিতর্ক ইত্যাদি। পবিত্র কোরআনের ৩নং সূরা ‘আলে ইমরান’ এর ১৯০নং আয়াতে শব্দটির অর্থ হচ্ছে ‘পরিবর্তন’-বিবর্তন (আরবি-বাংলা অভিধান : ইফা)।  
সচরাচর বাংলা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমরা ‘বিরোধ’ বলতে বুঝে থাকি, শত্রুতা, ভ্রাতৃ-বিরোধ, অনৈক্য, পরস্পর বৈপরীত্য বা মতবিরোধ (সংসদ বাঙ্গালা অভিধান)। ‘মত’ মনোগত ভাব, অভিমত, ধারণা; ‘মতোবিরোধ’ বা ‘মতভেদ’ মানে মতানৈক্য বা মতের অমিল (প্রাগুক্ত)। আর ‘গবেষণা বিরোধ’ বলতে বুঝি, গবেষণা করতে গিয়ে বা গবেষণার প্রয়োজনে, অনুসন্ধানকেন্দ্রিক অনিবার্য বিরোধ। এছাড়া, ‘বিবাদ’ বলতে ‘বিরোধ’ হলেও তা এমন বিরোধ যাতে ‘কলহ’ ‘ঝগড়া’, তর্কাতর্কি ও মকদ্দমা-লড়াইও বোঝায় বা অন্তর্ভুক্ত (প্রাগুক্ত)। 
সাধারণ জ্ঞানে আমরা বুঝতে পারি যে, ‘বিরোধ’ মানে যদি শত্রুতা, কলহ, ঝগড়া, অশালীন বিতর্ক বা মামলা-লড়াই ইত্যাদি হয়, তাহলে সেটা অবশ্যই ভালো নয়, মন্দ। আর যদি মতের অমিল বা ভেদ-রহস্য বা অনিবার্য কারণে ঐকমত্যে পৌঁছতে না পেরে মতানৈক্য বা মতবিরোধ হয় এবং বাস্তবে সবাই মিলেমিশে, প্রেম-ভালোবাসা ও আদব-শ্রদ্ধা রক্ষা করেন তাহলে সেটাকে তেমন মন্দ ভাবার সুযোগ নেই। আবার এমন ধর্মীয় প্রয়োজনে বিরোধ বা গবেষণা বিরোধে জড়িয়ে পড়ায় কোনো দোষ হবে না মর্মে, এমনকি তাতে উভয় পক্ষ বা কোনো একপক্ষ বাস্তবে ভুল করলেও ন্যূনতম একগুণ সওয়াব এবং শুদ্ধ করলে দ্বিগুণ সওয়াবের কথা যেহেতু খোদ মহানবী (সা.) এর পবিত্র মুখে শোনানো হয়েছে (বোখারি মূল আরবি, খ-২, পৃ-১০৯২, মাকতাবা মোস্তাফাঈ, দেওবন্দ, ভারত)। তাই তেমন ধর্মীয় গবেষণা বা বিধি-বিধান নির্ণয়ের প্রয়োজনে যে দলিল-প্রমাণগত মতবিরোধ অনিবার্য হয়ে ওঠে, সেটাকে একজন মুসলমান মন্দ ভাবতে পারে না। তবে হ্যাঁ, এটা সত্য কথা যে, বিরোধকারীদের যথাযোগ্য কোরআন-হাদিস বিশেষজ্ঞ হওয়া চাই এবং সংশ্লিষ্ট অপরাপর নিয়ম-বিধি পালনে অভ্যস্ত হওয়া চাই। 
এবার এতদসংক্রান্ত আরবি ভাষায় ব্যবহৃত শব্দগুলোকে একটু ব্যাখ্যাসহ লক্ষ করি। ‘কারও অবস্থা-পরিস্থিতি, উক্তি-বক্তব্য, চিন্তা-গবেষণা ও দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করাকে ‘ইখতিলাফ’ বা ‘মতভেদ’ বা ‘মতবিরোধ’ বলে।’ যখন কোনো বিষয়ে বিরোধ বৃদ্ধি পেতে পেতে  বিবাদ পর্যায়ে পৌঁছে যায় তখন সেটাকে ‘মুজাদালা’ বলা হয়। আর যে ক্ষেত্রে বিরোধে জড়ানো পক্ষদ্বয় বা পক্ষগুলোর পরস্পর বিরোধের প্রশস্ততা অনেক বৃদ্ধি পায় এবং পর্যালোচনা ও সমালোচনার লড়াই এত তীক্ষè পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, প্রকৃত সত্য ও সঠিক বিষয়টি প্রকাশ বা উদ্ঘাটনের পরিবর্তে একপক্ষ অপরপক্ষের ওপর শুধু বিজয়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখে এবং বোঝা-বোঝানোর মানসিকতা চাপা পড়ে যায়, সে ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতিকে আরবিতে ‘শিকাক’ বলে। 
ইসলাম ধর্মে দুজন মুসলমান ভাইয়ের মধ্যে প্রয়োজনে বিরোধ/‘মতানৈক্যে’র অবকাশ স্বীকৃত; কিন্তু ‘মুজাদালা’(পরস্পর বিবাদ-ঝগড়া) ও ‘শিকাক’ (শত্রুতা পর্যায়ে উপনীত বিবাদ-বিরোধ) কে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মানুষের মতের পার্থক্য একটি সৃষ্টিগত বিষয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহর কুদরতের নিদর্শনগুলোর অন্যতম নিদর্শন এটিকে বলা হয়েছে। যেমন ‘তোমাদের ভাষা ও রঙের বৈচিত্র্য-ভিন্নতা।’ (সূরা রুম : ২২)। 
যেভাবে ভাষা ও বর্ণের ভিন্নতা মহান আল্লাহর ইচ্ছার ফল, সেভাবে মানুষের ‘বিবেক-বুদ্ধি’ ও ‘অনুভূতি’র পার্থক্যও সৃষ্টিগত কর্মের ফলাফল। ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য যদি স্রষ্টার অসীম ক্ষমতার নিদর্শন হয়ে থাকে তাহলে মানবজাতির জ্ঞান-বুদ্ধির পার্থক্য/তারতম্যও তাঁরই অসীম ক্ষমতার পরিচায়ক। সব মানুষের বর্ণ-আকৃতি যদি এক সমান হয়ে যেত তাহলে জীবন-মান বেখাপ্পা হয়ে যেত, অনুরূপ সব মানুষের বুদ্ধি-বিবেক যদি এক সমান হয়ে যেত তাহলে জীবনের ভালো-মন্দ মূল্যায়নের কোনো মাপকাঠিই থাকত না। মানবজাতি সব বিষয়ের ক্ষেত্রে সমান হয়ে গেলে জীবনের সৌন্দর্য ও সজীবতার মূল্যায়ন হতো কীভাবে? 
মহান আল্লাহ এরশাদ করেন, ‘আপনার প্রতিপালক ইচ্ছে করলে সব মানুষকে এক জাতি করতে পারতেন; কিন্তু তারা মতভেদ করতেই থাকবে, তবে তারা নয়, যাদের আপনার প্রতিপালক দয়া করেন এবং তিনি তাদের এজন্যই সৃষ্টি  করেছেন।’ (সূরা হুদ : ১১৮-১১৯)। 
উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসির গ্রন্থাদিতে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ তায়ালা যদি ইচ্ছে করেন, তবে সব মানুষকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করতে পারেন। তাহলে সবাই মুসলমান হয়ে যেত, কোনো মতভেদ থাকত না। মানুষের মনমানসিকতা বিভিন্ন হওয়ার কারণে তাদের মত ও পথ ভিন্ন ভিন্ন হয়েছে। পক্ষান্তরে ওলামায়ে-দ্বীন ও মুজতাহিদ ইমামদের মধ্যে যে মতভেদ সাহাবা কেরামের যুগ থেকে চলে আসছে তা আদৌ নিন্দনীয় নয় এবং আল্লাহর রহমতের পরিপন্থি নয়। বরং সেটি একান্ত অবশ্যম্ভাবী, সাধারণ মুসলমানের জন্য কল্যাণকর এবং আল্লাহর রহমতস্বরূপ। এ আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে, যারা মুজতাহিদ ইমাম ও ফকিহদের মতভেদকে বিভ্রান্তিকর ও ক্ষতিকারক বলতে চান তারা এই আয়াতের আবেদন ও সাহাবা-তাবেয়িদের বাস্তব কর্মপন্থার বিরুদ্ধে অবস্থান করছেন।’ (তাফসির মাআরেফুল কোরআন, সৌদি ছাপা : পৃ-৬৫০)।  
মোটকথা, যেহেতু মানুষের বুদ্ধি-বিবেক ও যোগ্যতা-অভিজ্ঞতার পার্থক্য বিদ্যমান, তাই কোনো একটি ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট লোকজনের ঐকমত্য হতেও পারে, আবার ভিন্নমতও হতে পারে। এই মতের ভিন্নতা বা বিরোধ যদি সীমালঙ্ঘন পর্যায়ে না পৌঁছে এবং বিরোধ-মতভেদসংক্রান্ত গবেষণার নীতি-মূলনীতি ও আদব-শিষ্টাচার আবশ্যিকভাবে মেনে চলা হয়, তাহলে তা আল্লাহর রহমত ও কল্যাণের নামান্তর। 


লেখক : মুফতি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ


হৃদয়ে নুরের প্রদীপ জ্বালো
  দুষ্ট সাপ যখন ছোবল হানে, তখন দংশিত বিষক্রিয়ায় প্রাণ হারায়।
বিস্তারিত
হেদায়েত লাভে মুর্শিদের সোহবত
শুধু পুঁজি থাকলেই যেমন ব্যবসায়ী হওয়া যায় না, তেমনি ব্যবসা
বিস্তারিত
গোপন কোনো কিছুই রয় না
আমরা অনেক সময় লোকদেখানোর জন্য অনেক মন্তব্য করে থাকি। কিংবা
বিস্তারিত
মজলুমের সাহায্য ও জালিমের প্রতিরোধ
হজরত নোমান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘সব
বিস্তারিত
অর্থসম্পদের ভালো-মন্দ
সম্পদে বিপদ ও পরীক্ষাও আছে, কোরআন যা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বুঝিয়ে
বিস্তারিত
প্রকাশিত হলো বাংলাদেশি লেখকের আরবি উপন্যাস
প্রকাশিত হলো বাংলাদেশি লেখকের আরবি ভাষায় লেখা উপন্যাস ‘আল ইসার’।
বিস্তারিত