ত্রিনিদাদ-টোবাগোতে ইসলাম ও মুসলমান


দেশটিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আলেম রয়েছেন। ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে মুফতি সাবিল আলী এখানে একটি দারুল উলুম প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে তার ইন্তেকালের পর থেকে মুফতি ওয়াসিম এর মুহতামিম। তাতে দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত দ্বীনি ইলমের সঙ্গে সঙ্গে এসএসসি ও ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত প্রচলিত সব জ্ঞানবিজ্ঞান শিক্ষাদানের মানসম্মত ব্যবস্থা রয়েছে
 

৫১৩১ স্কয়ার কিলোমিটার আয়তনের দুটি দ্বীপ নিয়ে গঠিত ত্রিনিদাদ-টোবাগো। ভেনিজুয়েলার সিবিচ থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত এই দেশ। মজার ব্যাপার হলো, ভেনিজুয়েলার প্রতিবেশী দেশ এই ত্রিনিদাদ-টোবাগো এবং এ দ্বীপরাষ্ট্র দক্ষিণ আমেরিকার টেকটনিক প্লেটের ওপরে রয়েছে। তবুও এই দ্বীপরাষ্ট্র উত্তর আমেরিকার অংশ বলে ধরা হয়। এছাড়া যেহেতু ত্রিনিদাদ-টোবাগোর সরকারি ভাষা ইংরাজি, এর সংস্কৃতি আফ্রো-ব্রিটিশ সংস্কৃতির সন্তান, তাই ত্রিনিদাদ-টোবাগোকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অন্তর্গত বলে ধরা হয়।
ত্রিনিদাদ-টোবাগো ক্রিস্টোফার কলম্বাসের পা দেওয়া থেকে (মে, ১৪৯৮) ১৮০০ সাল অবধি ছিল স্প্যানিশ জলদস্যুদের দখলে। ১৭৯৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি এখানে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একটি জাহাজ পা দেয়। ১৮০২-০৩ সালে আমিয়েন্সের সন্ধি অনুযায়ী ত্রিনিদাদ-টোবাগো ব্রিটিশদের হাতে অর্পণ করা হয়েছিল। তখন ব্রিটিশ সরকার এখানে ভারত থেকে অনেক লোক নিয়ে আসে; যারা এখানে পরিশ্রম করবে। এভাবে এখানে ভারতের হিন্দু ও মুসলমানদের বসবাস আরম্ভ হয়। সেই থেকে ১৫০ বছরের বেশিদিন ধরে ত্রিনিদাদ-টোবাগো ছিল গ্রেট ব্রিটেনের অধীনে। ১৯৬২ সালের ১ আগস্ট ত্রিনিদাদ-টোবাগো স্বাধীনতা পায়। আর ১৯৭৬ সালে ত্রিনিদাদ-টোবাগো একটা প্রজাতন্ত্রী দেশে পরিণত হয়। এ সময়ে এখানে পৃথিবীর অন্যান্য ভূখ- থেকেও মানুষ এসে বসবাস আরম্ভ করে। মাশাআল্লাহ ছোট এ দেশটিতে ১৩২টি মসজিদ রয়েছে। মসজিদগুলো আবাদ রয়েছে বলে মুফতি তাকি উসমানী তার ভ্রমণবৃত্তান্তে উল্লেখ করেছেন।
ত্রিনিদাদে ইসলাম গ্রহণ করার গড়ও উল্লেখযোগ্য। এ দেশের একজন মন্ত্রী মাদাম ফতিমাও নওমুসলিম ছিলেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি তার ইসলাম গ্রহণের বিস্ময়কর ঘটনা বলেছেন। সাক্ষাৎকারটি কায়রোর ‘মিম্বারুল ইসলাম’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। তার আসল নাম মিক ড্যাভিডসন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি ফাতিমা নাম ধারণ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি একটি খ্রিস্টান পরিবারের জন্মগ্রহণ করি। ৯ মার্চ ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে আমার পরিবারের লোকেরা আমাকে গির্জার সেবিকা হিসেবে দেওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নেয়। সেদিন ভোরে আমি যখন ঘুম থেকে জাগি, তখন আমার কানের মধ্যে ‘আল্লাহু আকবর’ ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি গুঞ্জরিত হতে শুনি। এ শব্দ আমার পুরো অস্তিত্বকে প্রকম্পিত করে। তখন আমি এর অর্থ জানতাম না। কিন্তু আমি এ ঘটনার পর গির্জায় যেতে অস্বীকার করি। এরপর আল্লাহ তায়ালার তরফ থেকে আমি কয়েক বছর পর্যন্ত হেদায়েতের খোঁজে অতিবাহিত করি। অবশেষে আমি কোরআনুল কারিমের অনুবাদের একটি কপি পেয়ে যাই। 
আমার অন্তর সাক্ষ্য দেয় যে, এটিই সত্য। এরই মধ্যে পাকিস্তানের এক আলেম মাওলানা সিদ্দীক এবং ভারতের আলেম শায়েখ আনসারীর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ঘটে। তাদের সঙ্গে আমি আমার বর্তমান আকিদার কথা আলোচনা করি। তারা বলেন, এসব আকিদার কারণে আল্লাহর মেহেরবানিতে তুমি একজন মুসলমান। আমি ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ইসলাম কবুল করার ঘোষণা দিই। কিন্তু বাস্তবে আমি আন্তরিকভাবে তখনই মুসলমান হয়ে গিয়েছিলাম, যখন ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি আমার কানে গুঞ্জরিত হয়েছিল। কোরআনের অনুবাদ পড়ার পর আমার অন্তর ঈমানের নেয়ামত দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। রাসুল (সা.) এর মর্যাদা ও ভালোবাসা অন্তরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। আগে মানুষ মনে করত যে, ত্রিনিদাদে ইসলাম শুধু ভারতীয়দের ধর্ম। কিন্তু আমার ইসলাম গ্রহণের পর ত্রিনিদাদের অন্যান্য জাতি বিশেষ করে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত লোকেরাও ইসলাম কবুল করেন। প্রতিটি ইসলামিক সেন্টার ও মসজিদে কিছুদিন পরপর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হচ্ছেন।’ (সফর দর সফর)। 
দেশটিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আলেমও রয়েছেন। ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে মুফতি সাবিল আলী এখানে একটি দারুল উলুম প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে তার ইন্তেকালের পর থেকে মুফতি ওয়াসিম এর মুহতামিম। তাতে দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত দ্বীনি ইলমের সঙ্গে সঙ্গে এসএসসি ও ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত প্রচলিত সব জ্ঞানবিজ্ঞান শিক্ষাদানের মানসম্মত ব্যবস্থা রয়েছে। দারুল উলুম সাবিলুর রাশাদ ব্যাঙ্গালুরুর পরামর্শ ও দিকনির্দেশনায় এর পুরো ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয়। এর সঙ্গে একটি দারুল ইফতাও রয়েছে। সেখানে ফতোয়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি শুধু ওয়েস্ট ইন্ডিজেই নয়, বরং পুরো ল্যাটিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান। এতে বর্তমানে প্রায় ৫০০ ছাত্র ও ১৫০ ছাত্রী শিক্ষা লাভ করছে। 
দারুল উলুমের ব্যবস্থাধীনে বিয়ে পড়ানো, হালাল গোশতের তত্ত্বাবধান, চাঁদ দেখা বিষয়গুলোতেও মুসলমানদের দিকনির্দেশনার দায়িত্ব পালন করা হয়ে থাকে। মুফতি ওয়াসিম তার নিজস্ব একটি টিভি চ্যানেল চালু করেছেন, যা মানুষদের শুধু ধর্মীয় তথ্য জোগান দিয়ে থাকে। লোকেরা বলল, এ চ্যানেল শুধু মুসলমানদের মধ্যেই সমাদৃত নয়, বরং আগে যেমন উল্লেখ করা হয়েছে যে, অমুসলিম ব্যক্তিরা এই চ্যানেলের মাধ্যমে ইসলাম সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জেনে মুসলমান হওয়ার জন্য আসেন এবং আল্লাহ মেহেরবানিতে তারা মুসলমান হন। আমরা এবার দেশটির সামগ্রিক চিত্রের দিকে একনজর চোখ বুলাতে পারি। ১৯৫০ সালের পর থেকে যে ত্রিনিদাদ-টোবাগোর আর্থিক আর সামাজিক চেহারা বদলে যায় তার পেছনে পুরো দায় ছিল পেট্রোলিয়ামের। ত্রিনিদাদে ন্যাচারাল গ্যাস আর পেট্রোল-ডিজেলের সন্ধান ত্রিনিদাদ-টোবাগোর ইতিহাসকে নতুন করে লিখতে বাধ্য করে। এই দ্বীপরাষ্ট্রের অতীতে যারা গরিব ছিল তারা এই পেট্রোলিয়ামের আবিষ্কারের ফলে আঙুল ফুলে কলাগাছে পরিণত হয়। অর্থাৎ মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে বদলে যায়। তাদের জীবনযাত্রায় অনেক পরিবর্তন আসতে শুরু করে। এখন তো ত্রিনিদাদ-টোবাগো বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশের মধ্যে একটা। এসবই পেট্রোলিয়ামের অবদান।
এ দেশের মানুষ মূলত ভারতীয় ও আফ্রিকান বংশোদ্ভূত। এ দুই জাতের মানুষের মধ্যে ঠান্ডা লড়াই আছে। যদিও এখানে ধর্মীয় সম্প্রীতি অসাধারণ। এরা ক্রিসমাসে যেমন আনন্দ করে, তেমনি দেওয়ালি বা অন্যান্য প্রধান পূজাগুলোও আড়ম্বরের সঙ্গে পালন করে। আর ঈদে এদের সরকারি ছুটি থাকে। 
এ দেশের খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পুরোটাই আমদানিনির্ভর। তাই জিনিসপত্রের দাম অস্বাভাবিক বেশি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ৯ কেজি চালের (ভালো মানের) এক প্যাকেটের দাম বাংলাদেশের টাকায় প্রায় ১১শ’ টাকা। বাংলাদেশি এক পর্যটক বলেন, ‘আমি রাস্তার পাশে ফুটপাত থেকে ৪টি কলা ও ৩টি আপেল কিনে বাংলাদেশের টাকায় প্রায় ২৫০ টাকা দাম পরিশোধ করেছি। ল্যাপটপ কানেকশনের জন্য একটি প্লাগ কিনেছি প্রায় ৭০০ টাকায়, বাংলাদেশে এর দাম কোনোভাবেই ১০০ টাকার বেশি হবে না। তিন বেডরুমের ফার্নিশ একটি বাড়ির ভাড়া মাসে ১ হাজার ২০০ মার্কিন ডলার।’ তিনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত আমি যতগুলে দেশ ভ্রমণ করেছি (জাপান, হংকং, চায়না, সুইডেন, নফনল্যান্ড, ইউকে, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, ইউএসএ উল্লেখযোগ্য) এর মধ্যে ত্রিনিদাদকেই সবচেয়ে বেশি ব্যয়বহুল দেশ বলে আমার মনে হয়েছে।’ 
অপরাধের ঘটনা অত্যন্ত বেশি। সংঘবদ্ধ খুন ও হত্যাকা- ১৯৯৯ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর দেশিটিতে বেড়ে চলেছে। আনুমানিক ৫৫৮ ব্যক্তিকে ২০০৮ সালে খুন করা হয়। বার্ষিক খুনের এ পর্যন্ত এটিই হচ্ছে সর্বোচ্চ সংখ্যা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের অফিসারদের কাজের পরিবেশ উন্নত করে তুলতে পুলিশ প্রশাসন উদ্যোগী হয়েছে। তারা ডাক্তারি সাক্ষ্য সংগ্রহের ও সিসিটিভি ব্যবহারের আয়োজন বৃদ্ধি করেছে এবং একই সঙ্গে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ভাড়া করেছে। অপরাধ দমনে পুলিশকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানোর মধ্য দিয়ে নিজেদের পদযাত্রাকে ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর মুসলিমরা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর সামনে একটি নজিরস্বরূপ তুলে ধরেন। ‘আসজা’ চেয়ারম্যান ইমাম মোহাম্মদ বলেন, বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের সব নেতাকে সংঘবদ্ধ পদক্ষেপে লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি আরও বলেন, আমাদের মধ্যে ঐকমত্য কায়েম হতে হবে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে অপরাধ তৎপরতার ক্রমবৃদ্ধি মানবসমাজের সামনে হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, অপরাধ বৃদ্ধির এই মাত্রা মানুষের সমাজের কাম্য হতে পারে না।
তিনি বলেন, ধর্মীয় নেতা হিসেবে আমাদের ওপর দায়িত্ব বর্তাচ্ছে। জনগণকে আমাদের বোঝাতে হবে যে, আমরা আল্লাহ তায়ালার সৃষ্ট জীব এবং আল্লাহর অভিপ্রেত পথেই আমরা জীবনযাপন করব। ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে ইসলাম কোনো অপরিচিত ধর্ম নয়। ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, সুরিনাম ও গায়ানার মতো দেশে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মুসলমানের বসবাস রয়েছে। ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর ১৩ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ৫ দশমিক ৮ শতাংশ হচ্ছেন মুসলিম।


যুদ্ধাহত শিশুদের কথা
৩ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস উপলক্ষে ‘নিউ এরাব’ আরব বিশ্বের
বিস্তারিত
সুদানে গ্রামীণ ছাত্রদের শহুরে জীবন
যেসব সুদানি ছাত্র পড়াশোনা করতে গ্রাম থেকে শহরে এসেছে তারা
বিস্তারিত
গ্রামের সবাই হিন্দু নেতা বানাল
ঘটনাটি ঘটেছে কাশ্মীরে। যেখানে সুদীর্ঘকাল ধরে চলছে স্বাধীনতা সংগ্রাম। বুরহানুদ্দিন
বিস্তারিত
আবদুল ফাত্তাহ সিসি এবং মিশর
৬ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে প্রকাশিত প্রভাবশালী আরবি-ইংরেজি সংবাদমাধ্যম নিউ-অ্যারাবে প্রকাশিত
বিস্তারিত
ইসলামে জবাবদিহিতা
জবাবদিহিতা ইসলামের একটি অন্যতম মৌলিক বিষয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা
বিস্তারিত
আলোর পরশ
কোরআনের বাণী তিনিই তো আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক; তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ
বিস্তারিত