অনিন্দ্য সুন্দর কাশ্মীর জামে মসজিদ


প্রাচীন আমলে এত বিশাল পিলার কীভাবে দাঁড় করিয়ে স্থাপন করা হয়েছে, সেটাই বিস্ময়ের। কথিত আছে, মসজিদের নির্মাণ কাজ যখন শেষের দিকে তখন একটি পিলার কম পড়ে গেল। সুলতান সিকান্দর শাহ বললেন, ‘কাল ইনশাআল্লাহ একটা পিলার বানিয়ে লাগানো হবে।’ পরদিন সকালে দেখা গেল কে বা কারা যথাস্থানে একটা পিলার বসিয়ে দিয়ে গেছে। কিন্তু কোন জায়গার পিলার কম পড়েছিল সেটা মনে নেই কারও
 

গ্রীষ্মকালীন কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরে যখন ট্রেন এসে থামল তখন মধ্যদুপুর। আকাশে গনগনে রোদ। তবুও বেশ ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছিল গায়ে। ট্রেন থামতেই সবাই একরকম দৌড়ে বের হচ্ছিল স্টেশন থেকে। বেশ অবাক হলাম। নতুন জায়গায় বুঝে উঠতে পারছিলাম না তাদের দৌড়ানোর কারণ। পরে জানতে পারলাম, নিরাপত্তার খাতিরে কাউকে স্টেশনে দাঁড়াতে দেওয়া হয় না। বাইরে বেরোতেই নজরে পড়ল আর্মিদের কয়েকটি সাঁজোয়া যান দাঁড়িয়ে। ভেতরে রাইফেল তাক করে পজিশন নিয়ে বসে আছেন তারা। নিচে টহল দিচ্ছে আরও কয়েক দল। 
কাশ্মীর যুদ্ধকবলিত এলাকা। কাশ্মীরকে নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে এ পর্যন্ত বড় বড় তিনটি যুদ্ধ হয়েছে। ১৯৪৭, ১৯৬৫ ও ১৯৯৯ সালে। এখনও খ- খ- যুদ্ধ হয় হঠাৎ হঠাৎ। জনসাধারণকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য এত সতর্ক থাকতে হয় আর্মিদের। ভয়ে ভয়ে এগোলাম সামনে। রাস্তার পাশে সারি সারি ফাস্টফুডের দোকান। মুখরোচক খাবার দেখে ক্ষুধার্ত পেট আরও যেন চোঁ চোঁ করে উঠল। বসে খেয়ে নিলাম ভেড়ার গোশত দিয়ে তৈরি কাশ্মীরের বিশেষ খাবার ‘চিশতা’। 
স্থানীয় ছেলে এজাজ ভাই আমাদের স্টেশন থেকে রিসিভ করার কথা। কিন্তু তার দেখা নেই। তিনি আমাদের সঙ্গে দারুল উলুম দেওবন্দে পড়েছেন। সেখান থেকেই পরিচয় আমাদের। খুব ভালো মানুষ। তাকে না পেয়ে ফোন দিলাম। রিসিভ করে বললেন, একটা ট্যাক্সি নিয়ে একটু সামনে এগিয়ে যেতে। তার কথামতো ট্যাক্সি নিয়ে এগোলাম সামনে। ঝিলাম নদীর তীরে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো। ঝিলাম নদীর আশপাশটা ঘুরিয়ে দেখালেন আমাদের। নদীটা একসময় দুকূল ছাপিয়ে প্রবাহিত হলেও এখন মৃতপ্রায়। পানির রং ঘন কালো। অধিকাংশ সৌন্দর্য এখন বিলীন। শীতকাল বলে হয়তো সৌন্দর্যের অভাব পড়েছে নদীর গায়ে। নদীর ওপর মাঝারি আকৃতির একটা ঝুলন্ত সেতু। সেটায় চড়ে দেখে নিলাম দূরে বয়ে চলা নদীর শেষ মোহনা। দিগন্তে গিয়ে মিশেছে যেন। ব্রিজ পার হয়ে এজাজ ভাই একটা ট্যাক্সি ভাড়া করলেন। ড্রাইভারকে বললেন জামে মসজিদে নিয়ে যেতে। 
ঝিলাম নদীর পার ধরে চলতে শুরু করল আমাদের মাইক্রো। দুপাশের অপরূপ সৌন্দর্য দেখে বার বার হারিয়ে যাচ্ছিলাম নন্দন মুগ্ধতায়। আধঘণ্টার মধ্যে পৌঁছলাম জামে মসজিদের গেটে। একতলা বিশিষ্ট এশিয়ার সর্ববৃহৎ জামে মসজিদটি দেখতে অনেকটা রাশিয়ার সেইন্ট পিটারসবুরগের মতো। বাইরে থেকে এর নির্মাণশৈলী দেখে ভেতরে প্রবেশ করার আগ্রহ তীব্র থেকে তীব্রতর হলো। প্রধান গেটের সামনেও রাইফেল নিয়ে বসে আছে কয়েকজন সেনা সদস্য। এ মসজিদ নিয়েও ক্ষণে ক্ষণে চলে সংঘর্ষ। এ জন্য অধিকাংশ সময় বন্ধ করে দেওয়া হয় মসজিদটি। এজাজ ভাই বললেন, দীর্ঘ ১২ সপ্তাহ পর নাকি গত জুমার নামাজ আদায় হয়েছে মসজিদে। আমাদের ভাগ্য ভালো যে সেদিন মসজিদ খোলা ছিল। সংরক্ষিত জায়গায় জুতা রেখে প্রবেশ করলাম ভেতরে। মসজিদের ভেতরের আশ্চর্য নির্মাণশৈলী দেখে মুগ্ধ হচ্ছিলাম বারবার। 
১৩৯৪ সালে সুলতান শিকান্দার শাহ সাইয়াদুল আউলিয়া সাইয়্যেদ আলী হামাদানির ছেলে মীর মোহাম্মাদ হামাদানির নির্দেশে মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদে স্বাভাবিক অবস্থায় মুসল্লি ধারণ ক্ষমতা একসঙ্গে ১ লাখ লোকের। তবে লাইলাতুল কদর, ঈদের জামাত, জুমাতুল বিদাসহ অন্যান্য বিশেষ দিনে এ মসজিদের অভ্যন্তর চত্বর ও পাশ্ববর্তী স্থানে একসঙ্গে দুই লক্ষাধিক মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদের মোট পরিধি ১ লাখ ৪৬ হাজার বর্গফুট। মসজিদের ভেতর রয়েছে ৩৭৮টি সম্পূর্ণ গাছের পিলার, যার মধ্যে ২১ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট পিলার ৩৪৬টি ও ৪৮ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট পিলার রয়েছে ৩২টি। কথায় কথায় তথ্যগুলো জানালেন এজাজ ভাই। 
প্রাচীন আমলে এত বিশাল পিলার কীভাবে দাঁড় করিয়ে স্থাপন করা হয়েছে, সেটাই বিস্ময়ের। কথিত আছে, মসজিদের নির্মাণ কাজ যখন শেষের দিকে তখন একটি পিলার কম পড়ে গেল। সুলতান সিকান্দর শাহ বললেন, ‘কাল ইনশাআল্লাহ একটা পিলার বানিয়ে লাগানো হবে।’ পরদিন সকালে দেখা গেলে কে বা কারা যথাস্থানে একটা পিলার বসিয়ে দিয়ে গেছে। কিন্তু কোন জায়গার পিলার কম পড়েছিল সেটা মনে নেই কারও। হয়তো একে ঘিরে নানা রকমের বিদাত শুরু হবে, তাই আল্লাহ তায়ালা সবাইকে পিলার ও তার স্থানটি ভুলিয়ে দিয়েছেন।
মসজিদের অভ্যন্তর বিশাল হলরুমের মতো চারপাশে তৈরি হয়েছে। নিচে বিছানো হয়েছে নরম গালিচা। মাঝখানটায় খোলা আকাশের নিচে খালি প্রান্তর। সেখানে রয়েছে ওজু করার স্বচ্ছ পানির ফোয়ারা, নানা রংয়ের ফুলের বাগান ও সবুজ প্রান্তর। পাখিদের কিচিরমিচির ডাকে মিশে যাচ্ছিলাম যেন প্রকৃতির মাঝে। আমাদের তখনও জোহরের নামাজ পড়া হয়নি। ওজু করে নামাজ আদায় করে নিলাম তাড়াতাড়ি। এত সুন্দর স্থাপত্য দেখানোর জন্য আল্লাহ দরবারে শুকরিয়া আদায় করতে করতে বের হয়ে এলাম মসজিদ থেকে।


মহানবী (সা.) এর প্রতি আদব
মহানবী (সা.) এর প্রতি এ আদব প্রদর্শন যেভাবে তাঁর বরকতপূর্ণ
বিস্তারিত
রমজানরে আলোয় কাটুক সারা বছর
জুহদ ও তাকওয়া র্অজনরে, সওয়াব ও নকেি কামানোর বসন্তকাল রমজানুল
বিস্তারিত
চিকিৎসাবজ্ঞিানে মুসলমি অবদান
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে মুসলিম মনীষীদের আবিষ্কার এবং অবদান অনস্বীকার্য। এক্ষেত্রে
বিস্তারিত
পশুপাখির অধিকার রক্ষায় ইসলাম
আমরা যদি পবিত্র কোরআন ও হাদিসে দৃষ্টিপাত করি তাহলে দেখতে
বিস্তারিত
শাওয়ালের ছয় রোজা ও ‘অশুভ’ প্রসঙ্গ
মাহে রমজান ইবাদতের মাস। এ সময় মুসলমানরা দীর্ঘ এক মাস
বিস্তারিত
রমজানপরবর্তী মুসলিমের কাম্য জীবন
মুসলমান রমজানকে বিদায় জানায়, যার রজনীগুলোতে ছিল মধুরতা, দিবসগুলোতে ছিল
বিস্তারিত