সাগরের বিশালতায় খুঁজি স্রষ্টাকে

বিশাল জলরাশির উত্তাল তরঙ্গমালায় প্রবাহিত সমুদ্র আল্লাহর এক অপূর্ব সৃষ্টি। সৈকতের বিশাল বালুরাশির ওপর বসে যখন সমুদ্রের সৌন্দর্য অবলোকন করি, তখন মনে এ চিন্তার উদয় হয় যে, কত অগাধ পানি এ সমুদ্রে থাকতে পারে। আমার মনে হয়, সমুদ্রের এ প্রতিটি জলকণাই যেন আল্লাহর বড়ত্ব, মহত্ত্ব ও প্রশংসামালা উচ্চারণ করে যাচ্ছে। আল্লাহ বলেন, ‘এমন কিছু নেই, যা তাঁর প্রশংসাসহ তাসবিহ পাঠ করে না; কিন্তু তাদের তাসবিহ তোমরা বোঝ না।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ৪৪)। 
কিন্তু আমার অন্তর খুবই মর্মাহত হয়, যখন দেখি আল্লাহর এ সুবিশাল নেয়ামতের পাড়েই হাজারো মানব তাঁরই অসন্তুষ্টিমূলক কাজে লিপ্ত। তবে মনে আশার আলোও জ্বলে ওঠে, যখন ভাবি এ সুবিশাল সমুদ্র দেখে হয়তো তারা এর স্রষ্টার কথা স্মরণ করবে। অবিশ্বাসীরা খুঁজে পাবে বিশ্বাসের শক্তিশালী যুক্তি। আল্লাহর অস্তিত্বকে না দেখার অজুহাতে অস্বীকার করতে উদ্যত এ লোকরা যদি প্রকৃতপক্ষেই চিন্তার অধিকারী হয়, তবে বিশাল সমুদ্রই তার চেতনার উন্মেষ ঘটাতে যথেষ্ট। সমুদ্রের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে যে দৃষ্টিশক্তি তার অপর প্রান্তকে আয়ত্তে আনতে পারে না, তা দিয়ে হাজারো জলনিধির স্রষ্টা আল্লাহকে দেখার ইচ্ছা ব্যক্ত করা নিতান্তই অজ্ঞতা। তাই তো বিশ্বস্রষ্টার অমোঘ ঘোষণাÑ ‘দৃষ্টিশক্তিগুলো তাকে আয়ত্ত করতে পারে না, তিনি দৃষ্টিশক্তিগুলোকে আয়ত্ত করেন। তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত।’ (সূরা আনয়াম : ১০৩)। 
সমুদ্রমাঝে সাঁতার কাটার সময় হঠাৎ যখন সামান্য পানি মুখে প্রবেশ করে, তখন জিহ্বা সামুদ্রিক জলের লবণাক্ততা আস্বাদন করে। তখনই মনে পড়ে সমুদ্রের লোনা ও মিষ্টি পানির মাঝে অবস্থিত প্রাচীরের কথা। বিস্ময়ে চিন্তাশক্তি তখন স্থবির হয়ে পড়ে, যখন চিন্তা করি বিশ্বপ্রভু সমুদ্রের লোনা ও মিষ্টি পানির মাঝে কীভাবে অদৃশ্য প্রাচীর সৃষ্টি করেছেন যে কখনও জলাধারদ্বয় একত্র হতে পারে না। তখন চিন্তাশক্তি সততই বিবেকের কাছে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, এরপরও কি আল্লাহর সামনে নিজ সত্তাকে তুমি সমর্পিত করবে না? আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই দুই সমুদ্রকে প্রবাহিত করেন, যারা পরস্পর মিলিত হয়। উভয়ের মধ্যে রয়েছে এক আড়াল, যা তারা অতিক্রম করতে পারে না। সুতরাং তোমাদের রবের কোন কোন নেয়ামতকে তোমরা অস্বীকার করবে?’ (সূরা রাহমান : ১৯-২১)। 
যখন সমুদ্রের ঢেউ অবলোকন করি, তখন মনে পড়ে যায় সামুদ্রিক দুর্যোগের ভয়ানক অবস্থার কথা। বিশাল অর্ণবের সামান্য ঢেউ যখন পাহাড়সম উচ্চতা নিয়ে আমাদের ওপর আছড়ে পড়ে, তখন আমরা দিশেহারা হয়ে যাই। এরূপ পরিস্থিতিতে স্বভাবতই মানবসত্তা বিশ্বপ্রভুর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে। কিন্তু মানবসত্তা বড়ই কৃতঘœ। বিপদমুক্ত হলেই সে বিশ্বপ্রভুকে ভুলে যায়। আল্লাহ বলেন, ‘আর যখন (সমুদ্রে) একটি তরঙ্গ তাদের ছেয়ে ফেলে ছাউনির মতো, তখন তারা নিজেদের আনুগত্যকে একান্ত আল্লাহর জন্য করে নিয়ে তাঁকে ডাকে। তারপর তিনি যখন তাদের উদ্ধার করে স্থলপথে পৌঁছে দেন, তখন তাদের কেউ কেউ মাঝপথ বেছে নেয়। আর প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতক আর অকৃতজ্ঞ ছাড়া আমার নিদর্শন কেউ অস্বীকার করে না।’ (সূরা লুকমান : ৩২)। কৃতঘœ মানবসত্তা ক্ষণিকের জন্যও এ চিন্তা করে না যে, ক্ষুদ্র ঢেউ মোকাবিলা কারার সামর্থ্য যার নেই, সে কি বিশ্বপ্রভুর শাস্তি মোকাবিলা করতে পারবে? যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে সে কেন তাঁর অবাধ্যতায় লিপ্ত আছে? তাই বিশ্বাসীরা নিজ মস্তক আল্লাহর কাছে নত করে ঘোষণা করেÑ ‘হে আমাদের প্রভু! এসব আপনি অনর্থক ও উদ্দেশ্যবিহীন সৃষ্টি করেননি। আপনি মহাপবিত্র, অতএব আমাদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।’ (সূরা আলে ইমরান : ১৯১)। 
যখন সমুদ্রের জোয়ারভাটার অপরূপ দৃশ্য দেখি, তখন আল্লাহ যে মহান স্রষ্টা, এ দৃঢ়বিশ্বাস আরও সুদৃঢ় হয়। জোয়ারের তরঙ্গে যে জায়গা জলধারায় পরিপূর্ণ, সামান্য সময়ের ব্যবধানে সে জায়গা যখন শুষ্ক বালুরাশিতে পরিণত হয়, তখন সততই মন বলে ওঠেÑ হে বিশ্বপ্রভু! তুমি বড়ই সুমহান। 
সমুদ্রের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্য সূর্যাস্ত। সূর্য যখন সারা দিনের ক্লান্ত সফর শেষে পশ্চিম দিগন্তে অস্ত যায়, সমুদ্রতীরে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের এ দৃশ্য অবলোকন করা প্রতিটি মানব হৃদয়েই এক অজানা পুলকের সৃষ্টি করে। আমার মনে হয়, আলোকিত জগৎ আস্তে আস্তে যখন সূর্যাস্তের মাধ্যমে অন্ধকারের দিকে ধাবিত হয়, তখন আমাদের এ বার্তা দিয়ে যায় যে, তোমার জীবনতরীও এভাবে নিভে যাবে। যে সমুদ্রের বিশাল ঢেউ একটি সভ্যতাকে মৃত্যুপুরী বানাতে পারে, সে সমুদ্রের দ্বারাই মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ যোগাযোগ প্রক্রিয়া সাধিত হচ্ছে। এর মধ্য দিয়েই চলে গেছে বর্তমান সভ্যতার অন্যতম যোগাযোগ প্রযুক্তি স্যাটেলাইট। এর উত্তাল তরঙ্গের ওপর দিয়েই চলছে বড় বড় জাহাজ, যা দিয়ে মানুষ এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। আবার এ সমুদ্রেই আল্লাহ মানুষের জন্য সুস্বাদু ও পুষ্টিকর মাছ তৈরি করেছেন, যা মানুষের দৈহিক বৃদ্ধিতে রাখে অসামান্য ভূমিকা। আল্লাহ বলেন, ‘আর তিনিই সে সত্তা, যিনি সমুদ্রকে নিয়োজিত করেছেন, যাতে তোমরা তা থেকে তাজা (মাছের) গোশত খেতে পার এবং তা থেকে বের করতে পার অলংকারাদি, যা তোমরা পরিধান করো। আর তাতে তুমি নৌযান দেখবে, যা পানি চিরে চলে এবং যাতে তোমরা তাঁর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করো এবং যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো।’ (সূরা নাহল : ১৪)। 
এ মহাসমুদ্রের তলদেশেই রয়েছে বৈচিত্র্যময় হাজারো সৃষ্টি, যার প্রজাতির সংখ্যাও বর্তমান বিজ্ঞান আবিষ্কার করতে পারেনি। এ বিশাল অপরূপ সৃষ্টির দিকে তাকালে জ্ঞানী মাত্রই তার আনুগত্যের মস্তক বিশ্বপ্রভু আল্লাহর কাছে অবনত করবে। পক্ষান্তরে হতভাগ্যরাই এ আনুগত্য থেকে দূরে থাকবে।


আবদুল ফাত্তাহ সিসি এবং মিশর
৬ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে প্রকাশিত প্রভাবশালী আরবি-ইংরেজি সংবাদমাধ্যম নিউ-অ্যারাবে প্রকাশিত
বিস্তারিত
ইসলামে জবাবদিহিতা
জবাবদিহিতা ইসলামের একটি অন্যতম মৌলিক বিষয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা
বিস্তারিত
আলোর পরশ
কোরআনের বাণী তিনিই তো আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক; তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ
বিস্তারিত
ভালো নাম মন্দ নাম
নাম একজন ব্যক্তির পরিচয় বহন করে। চাই সে পুরুষ হোক
বিস্তারিত
র‌্যাগিং : শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিকৃষ্ট
মফস্বল থেকে ছেলেটি এসেছে। চোখমুখ ভরা তার মায়া। জড়তা এখনও
বিস্তারিত
উপার্জনের কিছু অংশ সঞ্চয় করুন
কাজেই আজকের দিনের জীবনমানের বিবেচনায় উপার্জন ও সঞ্চয় করা দোষণীয়
বিস্তারিত