মদিনা শরিফের জুমার খুতবা

গোনাহ ও অবাধ্যতার ভয়াবহতা

প্রকাশ্যে অবাধে গোনাহ করা মানে হলো আল্লাহর হকের প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করা, আল্লাহর বিরুদ্ধে স্পর্ধা দেখানো, মোমিনদের প্রতি বৈরিতা করা, পাপীদের দল ভারী করা, পাপের প্রভাব অন্যের দিকে সংক্রমিত করা, অন্যকে গোনাহের দিকে ধাবিত করা ও পাপের উসকানি দেওয়া। তাই কেউ গোনাহ করলে সে যেন তা গোপন রাখে এবং দ্রুত 
আল্লাহর কাছে 
খাঁটি তওবা করে
আল্লাহ মানবজাতিকে সৃষ্টি করে তাকে বুদ্ধি ও ভাষা দান করেছেন। তাকে শরিয়তের বিধিবিধান মেনে চলতে আহ্বান করেছেন। তাকে বাগ্মিতা শিক্ষা দিয়েছেন। স্পষ্ট প্রমাণ দিয়ে নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন। তাদের সঙ্গে কিতাব ও মানদ- অবতীর্ণ করেছেন। জন্ম-মৃত্যু ধার্য করেছেন, তোমাদের মধ্যে কে সবচেয়ে ভালো কাজ করে, তা পরীক্ষা করতে। মানুষকে আল্লাহ তাঁর ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন, যা তাঁর সন্তুষ্টি এনে দেয়। তাঁর অবাধ্য হতে নিষেধ করেছেন, যা তাঁর অসন্তোষের কারণ হয়। ‘কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে সে তা দেখবে এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে সে তা-ও দেখবে।’ (সূরা জিলজাল : ৭-৮)। 
দুনিয়াকে আল্লাহ কর্ম ও পরীক্ষার স্থল বানিয়েছেন। একে তিনি ধ্বংস করবেন। আখেরাতকে তিনি বিচার ও প্রতিদানের জায়গা বানিয়েছেন। একে করেছেন চিরস্থায়ী ও অবিনশ্বর। তাই যে সৎকর্ম করবে, তা তার নিজের উপকারের জন্যই। যে মন্দ কাজ করবে, তা নিজের বিরুদ্ধে যাবে। আল্লাহ খোদাভীরুদের জন্য জান্নাত প্রস্তুত করে রেখেছেন, যার তলদেশ দিয়ে নহর প্রবাহিত হয়। তারা সেখানে চিরদিন থাকবে। সেখানে এমন জিনিস আছে, যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শুনেনি এবং মানুষের অন্তরে কখনও তা উদয় হয়নি। কাফেরদের জন্য তিনি জাহান্নামের আগুন তৈরি করে রেখেছেন। ‘তা তাদের জীবিতও রাখবে না এবং মৃতও ছেড়ে দেবে না। তা চামড়াকে দগ্ধ করবে।’ (সূরা মুদ্দাসসির : ২৮-২৯)। ‘সেখানে তারা যুগ যুগ অবস্থান করবে। সেখানে তারা শীতলতাও আস্বাদন করবে না, কোনো পানীয়ও পাবে না, ফুটন্ত পানি ও পুঁজ ব্যতীত। এটা তাদের উপযুক্ত প্রতিফল।’ (সূরা নাবা : ২৩-২৬)।
মানুষকে কাম-প্রবৃত্তি ও সন্দেহ-সংশয় দ্বারা পরীক্ষা করা হয়। সে আমোদ-প্রমোদ ও বিলাসিতায় ধাবিত হয়। পাপ ও অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। কখনও শত্রু ও প্রতিপক্ষরা তার ওপর চড়াও হয়। শয়তান মানুষের পেছনে লেগেই থাকে। সে তার বড় শত্রু। অন্তর মন্দ কাজের প্ররোচনা দেয়। সে দেহের অভ্যন্তরে থেকেই এ কাজ করে। অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মানুষের প্রতিপক্ষ হয়ে সাক্ষ্য দেবে। শয়তান শপথ করে বলেছিল, ‘আপনার ক্ষমতার শপথ! আমি তাদের সবাইকেই পথভ্রষ্ট করব, তবে তাদের মধ্যে আপনার একনিষ্ঠ বান্দাদের নয়।’ (সূরা সোয়াদ : ৮২-৮৩)। 


মন বা অন্তর সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের মন অবশ্যই মন্দ কর্মপ্রবণ।’ (সূরা ইউসুফ : ৫৩)। অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘যেদিন তাদের বিরুদ্ধে তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে তাদের জিহ্বা, তাদের হাত ও তাদের পা।’ (সূরা নূর : ২৪)। 
শয়তান অবাধ্যতা, পাপ ও ধ্বংসাত্মক কাজ করতে প্ররোচিত করে। মন মন্দ ও গর্হিত কাজের আদেশ করে। অঙ্গপ্রত্যঙ্গ স্থায়ী সাক্ষী হয়। প্রকৃত বুদ্ধিমান সে-ই, যে নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করে। খারাপ কাজে জড়াতে মনকে বিরত রাখে। 
গোনাহ ও পাপে লিপ্ত হওয়া মানে ধ্বংস, ক্ষতি ও সংকট ডেকে আনা। এর ফলে আল্লাহর ক্রোধ, শাস্তি ও ঘৃণা সৃষ্টি হয়। তাঁর আজাব ও অভিশাপ নেমে আসে। ‘কত জনপদ তাদের প্রতিপালক ও তাঁর রাসুলদের নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করেছিল! ফলে আমি তাদের কঠোর হিসাব নিয়েছিলাম। তাদের কঠিন শাস্তি দিয়েছিলাম।’ (সূরা তালাক : ৮)।
মুসলমানদের মাঝে যেসব সংকট, বিপর্যয়, দুর্গতি, দুরবস্থা, শত্রুদের আধিপত্য, জমিনের অনুর্বরতা, আসমানের অনাবৃষ্টি নেমে আসছে সেগুলো তাদের গোনাহ, পাপ, অন্যায় ও অপকর্মেরই কুফল ও প্রভাব। যে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করে আল্লাহ তার জন্য বিভিন্ন দৃষ্টান্ত দিয়েছেন এবং নিদর্শনগুলো বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। আছে কেউ উপদেশ গ্রহণকারী? আল্লাহ বলে দিয়েছেন, পাপ ও অবাধ্যতা নেয়ামত ছিনিয়ে নেওয়া ও অভিশাপ নেমে আসার সবচেয়ে বড় কারণ। ‘অতঃপর গ্রামবাসী আল্লাহর নেয়ামত অস্বীকার করল, ফলে তাদের কৃতকর্মের জন্য আল্লাহ তাদের ক্ষুধা ও ভীতির আচ্ছাদনের স্বাদ গ্রহণ করিয়েছেন।’ (সূরা নাহল : ১১২)। মোটকথা, মানুষ আল্লাহর আনুগত্য না করলে তারা তাঁর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও তুচ্ছ সৃষ্টিতে পরিণত হয়।
গোনাহের ক্ষতি ও ভয়াবহতা মারাত্মক। তবে গোনাহ যখন অভ্যাসে পরিণত হয়, স্বাভাবিক হয়ে যায়, মানুষ প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে উন্মুক্তভাবে গোনাহ করে, সরাসরি আল্লাহর বিপক্ষে যুদ্ধে জড়ায়, তখন তার ভয়াবহতা, অনিষ্টতা ও বিপদ তীব্র আকার ধারণ করে। মুহাম্মদ (সা.) এর সব উম্মত ক্ষমা লাভ করবে, প্রকাশ্যে গোনাহে জড়িতরা ব্যতীত।
প্রকাশ্যে অবাধে গোনাহ করা মানে হলো আল্লাহর হকের প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করা, আল্লাহর বিরুদ্ধে স্পর্ধা দেখানো, মোমিনদের প্রতি বৈরিতা করা, পাপীদের দল ভারী করা, পাপের প্রভাব অন্যের দিকে সংক্রমিত করা, অন্যকে গোনাহের দিকে ধাবিত করা ও পাপের উসকানি দেওয়া। তাই কেউ গোনাহ করলে সে যেন তা গোপন রাখে এবং দ্রুত আল্লাহর কাছে খাঁটি তওবা করে। 
লাগামহীনভাবে পাপ করতে থাকলে, মন্দ কাজে নিমজ্জিত হয়ে উল্লাস করলে, অপরাধকে তুচ্ছজ্ঞান করলে, তা ধ্বংস, দুর্ভাগ্য ও আল্লাহর ক্রোধ ডেকে আনে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা ছোট ছোট গোনাহ থেকে সতর্ক থাকবে, কেননা সেগুলো একত্র হয়ে ব্যক্তিকে ধ্বংস করে ছাড়ে।’ এ বিষয়ে দৃষ্টান্ত দিতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি উদাহরণ দেন, একটি দল এক মরু প্রান্তরে এসে থামল। তাদের পাচক এসে এখান থেকে গাছের ডাল, ওখান থেকে ছোট্ট কাঠি সংগ্রহ করতে থাকে। এভাবে একটি স্তূপ বানিয়ে ফেলল। তারপর তারা আগুন ধরিয়ে সেখানে তাদের রান্নার জিনিস পাকিয়ে নিল।’ (আহমাদ)। 
কেয়ামতের দিন অন্যায়কারী ব্যক্তি তার ছোট ছোট ও তুচ্ছ তুচ্ছ পাপ এবং গোনাহগুলোকে যখন দেখবে, সেগুলো সব সংরক্ষিত হয়েছে, বৃদ্ধি পেয়ে বড় আকার ধারণ করছে, তখন তার বিপদের মাত্রা মারাত্মক হবে, সে ভয় পেয়ে বলতে থাকবে, ‘হায় হায়! এ কেমন আমলনামা? এ তো ছোট-বড় কোনো কিছুই সংরক্ষণ করতে বাদ রাখেনি! তারা যেসব কর্ম করেছে, সব সামনে দেখতে পাবে। আপনার প্রতিপালক কারও প্রতি অবিচার করবেন না।’ (সূরা কাহফ : ৪৯)। 
সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি পাপ ক্ষমা করেন, দোষ ঢেকে রাখেন, বিপদ দূর করেন। যিনি রাতে-দিবসে অন্যায়কারী ব্যক্তির জন্য তাঁর হাত বাড়িয়ে দেন, যেন সে তওবা করে। যিনি দিনে ও রাতের বেলা অন্যায়কারী ব্যক্তির জন্য আপন হাত বাড়িয়ে দেন, যেন সে ফিরে আসে তাঁর দিকে। হে আল্লাহর বান্দারা, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। গোনাহে লিপ্ত হয়ো না। পাপকে তুচ্ছ মনে করো না। পাপ কমিয়ে দাও। পাপ হ্রাস করাটা আখেরাতে তোমাদের সবচেয়ে সেরা প্রাপ্তি হবে আল্লাহর কাছে।
পাপ করা যখন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়, তখন তার ভয়াবহতা এত মারাত্মক আকার ধারণ করে যে, তখন আর ভালো কাজের আদেশ করা হয় না, অন্যায় কাজে বাধা দেওয়া হয় না। আবু বকর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘মানুষ যখন অন্যায় দেখে তা বন্ধ করে না, তখন আল্লাহ তাদের মধ্যে শাস্তি বিস্তার করে দিতে উদ্যত হন।’
তাই আপনারা ভালো কাজের আদেশ দিন। নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যায় কাজ প্রতিহত করুন। নিজের পরিবার ও সন্তানকে শরিয়তের হালাল ও হারাম শিক্ষা দিন। তাদের পাপ ও অন্যায় থেকে বিরত রাখুন। 
পাশ্চাত্যের গড্ডালিকা প্রবাহ ঘরে ঘরে আক্রমণ করেছে। মিডিয়া ও যোগাযোগ মাধ্যম সব নৈতিকতা, চরিত্র ও মূল্যবোধ ধ্বংস করে দিয়েছে। আগে যা মন্দ ছিল, তা এখন ভালোয় পরিণত হয়েছে, পূর্বে যা ভালো ছিল, তা এখন পশ্চাৎপদতা, প্রতিক্রিয়াশীলতা ও অস্বাভাবিক অভিধায় ভূষিত হয়েছে। তাই আপনারা সাবধান হোন। এসব ভ্রান্তি ছেড়ে রাসুলের সুন্নাহ আঁকড়ে ধরুন।

২১ জমাদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরি মসজিদে নববির জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর করেছেন মাহমুদুল হাসান জুনাইদ


যুদ্ধাহত শিশুদের কথা
৩ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস উপলক্ষে ‘নিউ এরাব’ আরব বিশ্বের
বিস্তারিত
সুদানে গ্রামীণ ছাত্রদের শহুরে জীবন
যেসব সুদানি ছাত্র পড়াশোনা করতে গ্রাম থেকে শহরে এসেছে তারা
বিস্তারিত
গ্রামের সবাই হিন্দু নেতা বানাল
ঘটনাটি ঘটেছে কাশ্মীরে। যেখানে সুদীর্ঘকাল ধরে চলছে স্বাধীনতা সংগ্রাম। বুরহানুদ্দিন
বিস্তারিত
আবদুল ফাত্তাহ সিসি এবং মিশর
৬ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে প্রকাশিত প্রভাবশালী আরবি-ইংরেজি সংবাদমাধ্যম নিউ-অ্যারাবে প্রকাশিত
বিস্তারিত
ইসলামে জবাবদিহিতা
জবাবদিহিতা ইসলামের একটি অন্যতম মৌলিক বিষয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা
বিস্তারিত
আলোর পরশ
কোরআনের বাণী তিনিই তো আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক; তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ
বিস্তারিত