বই পড়া হোক ধ্যানজ্ঞান

বই হচ্ছে মানুষের নিত্যসঙ্গী। বই মানুষের মনের কালিমা দূর করে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করে। বই একাকিত্ব দূর করে। তাই বই মানুষের পরম বন্ধু। আলোকিত মানুষ গড়তে এবং সমাজ থেকে কুসংস্কার ও অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর করতে বইয়ের বিকল্প নেই। 

পবিত্র কোরআনের সর্বপ্রথম যে বাণী হজরত মুহাম্মদ (সা.) শুনতে পেয়েছিলেন, তাতে আছে ‘আল্লামা বিল কলাম’ অর্থাৎ আল্লাহ মানুষকে জ্ঞান দান করেছেন, কলমের মাধ্যমে। আর কলমের আশ্রয় তো পুস্তকে। পবিত্র কোরআন মজিদে আরও বলা হয়েছে, ‘পড় তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। পড়, আর তোমার রব মহামহিম।’ (সূরা আলাক : ১-৩)।
নবী করিম (সা.) এক হাদিসে উল্লেখ করেছেন, ‘ঘণ্টাখানেকের জ্ঞান সাধনা সমগ্র রজনীর ইবাদতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।’ এখানে জ্ঞান সাধনা বলতে মূলত বই পড়ার ওপর সর্বাধিক তাগিদ দেওয়া হয়েছে। 
যে জ্ঞান মানুষের চরম লক্ষ্য। আর এই চরম লক্ষ্যে পৌঁছতে গেলে বিদ্যা শিক্ষা অর্থাৎ বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। অন্যদিকে বাইবেল শব্দের অর্থই হলো ‘বই’।
আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছেন, ‘মানুষ জন্মেছে প্রাণী হয়ে। সেটা একধরনের মানুষ। আরেক ধরনের মানুষ হচ্ছে বিকশিত মানুষ। মানুষের বিকাশের জন্য কেবল বই পড়লেই হবে। কারণ যে বই পড়ে, সে কবিতাও পড়ে, গান শোনে, চিত্রকলা বোঝে, পূর্ণিমার আলো, নীল আকাশ সবই বোঝে।’
বই আত্মাকে পরিপুষ্ট করে, জ্ঞানকে করে সমৃদ্ধ। বই হচ্ছে মানুষের সত্যিকার বন্ধু, যা মানুষের বুকের ভেতর সযত্নে লালন করা স্বপ্নের বাস্তব রূপ দিতে পারে। প্রিয় বন্ধু ভুলে যেতে পারে, কাছের মানুষ ছেড়ে দূরে চলে যেতে পারে; কিন্তু বই কখনও আপনাকে ছাড়বে না, যদি আপনি কখনও বই পড়া ছেড়ে না দেন। 
বই কেন পড়বেন
চেতনার বিপ্লব ঘটাতে, নৈতিক ও মানসিক বোধ জাগ্রত করতে বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। একজন সৃজনশীল মানুষ পৃথিবীতে বইয়ের বিকল্প কিছুই চিন্তা করতে পারেন না। সমাজ বদলাতে ও দেশের উন্নয়ন করতে চাইলে বই পড়ার বিকল্প নেই। বই হোক মানুষের নিত্যসঙ্গী, বই পড়া হোক ধ্যান। ভালো বই মানুষের উন্নত চরিত্র গঠনে সহায়তা করে। বই পড়া মানুষকে সত্য ও সুন্দর পথে চলতে, মানবকল্যাণে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করে। বই দুঃখের সময় মনোবল বাড়াতে সাহায্য করে। তাই সুসময়ে-অসময়ে বই হোক অবলম্বন, প্রিয় বন্ধু।
যে ব্যক্তি বইকে প্রতিদিনের সঙ্গী বানিয়েছেন, তিনি সমাজের অন্য আট-দশজন মানুষের চেয়ে আলাদা। তার ধ্যানধারণা, চিন্তাচেতনা, চলনবলন, মনমনন আলাদা। একজন নিয়মিত বইপড়ুয়া ব্যক্তির ধৈর্য আর বিশ্বাসের ধরনটাও ভিন্ন। তিনি কখনও নিজের বিবেকবুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে নষ্ট বা ভুল পথের দিকে ধাবিত হতে পারেন না। এক কথায়, একজন সুশিক্ষিত, জ্ঞানী ব্যক্তি কখনোই সমাজের জন্য ক্ষতিকর এমন বিপর্যয়ের কাজে অংশ নিতে পারেন না। 
একজন পাঠকমাত্রই জ্ঞানের সাধক, জ্ঞানের কাঙাল, জ্ঞানের উপাসক। তাই বই পড়ে একজন মানুষ জ্ঞানী হন, নীতিবান হন, গুণী হন, সজ্জন হন, বিবেকজাগ্রত অলোকিত মানুষ হন।
বর্তমানে আমাদের সমাজের কঠিন সময় যাচ্ছে, তরুণরা অস্থির সময় পার করছে। ভিন্ন সংস্কৃতির আগ্রাসনে দোলাচলে ভাসছে, বিভ্রান্ত হচ্ছে। ভালো-মন্দ বিচার করতে গিয়ে সংকটে পড়ছে। সঠিক পথ বেছে নিতে গিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় ভালো ভালো বই পড়া। নিয়মিত বই পড়ে তরুণসমাজ একদিন জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হবেই হবে। বই পড়ে মানুষ জ্ঞানী হয়। তার মধ্যে প্রকৃত মনুষ্যগুণ তৈরি হয়। তাই আবেগ নয়, প্রচলিত সামাজিক অবস্থান থেকে আপনি যতই বিমুখ হন না কেন, প্রতিদিন কিছু সময়ের জন্য হলেও বই পড়া উচিত। শত ব্যস্ততার মাঝেও বই পড়ার জন্য প্রতিদিন কিছু সময় বরাদ্দ করতে হবে। তরুণদের ভুলে গেলে চলবে না, আগামী দিনের সমৃদ্ধিশালী দেশ গড়ার দায়িত্ব তাদের ওপরই ন্যস্ত। আর একটি সৃষ্টিশীল সমাজ, উন্নয়নশীল দেশ, সুন্দর পৃথিবী বিনির্মাণে বইয়ের বিকল্প কিছুই নেই।

বই পড়ার দুইটি উদাহরণ দেওয়া যাক-
ড. মুহম্মদ শহীদল্লাহ্ একাধারে ছিলেন ভাষাবিদ, ভাষাবিজ্ঞানী, গবেষক ও শিক্ষাবিদ। তিনি ইংরেজি, আরবি, উর্দু, হিন্দি, ফরাসিসহ বেশ কয়েকটি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। এ কারণে তাকে বহুভাষাবিদ বলা হয়। বাংলা ভাষায় তাকে একজন পণ্ডিত মানা হয়। তিনি প্রতিদিন কমপক্ষে ১৮ ঘণ্টা পড়াশোনা করতেন। আর এটা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। তিনি বইয়ের ভেতর নিমগ্ন থাকতে পছন্দ করতেন। 
বহু ভাষাবিদ জ্ঞানতাপস ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ একদিন পাঠাগারের এক কোনায় বসে বই পড়ছেন। মনোযোগ দিয়ে তিনি পড়ছেন তো পড়ছেনই, বইয়ের মাঝে ডুবে একাকার হয়ে আছেন। তিনি এক কোনে বসে পড়তে থাকায় কর্তৃপক্ষ পাঠাগার বন্ধ করার সময় হলে তাকে লক্ষ না করে বন্ধ করে চলে যায়। কিন্তু শহীদুল্লাহ্ বিরামহীন পড়ছেন। কোন সময় যে লাইব্রেরিয়ান পাঠাগার বন্ধ করে চলে গেছেন, তা তিনি টেরই পেলেন না। যত বড় বই-ই হোক না কেন, শহীদুল্লাহ্ একবারে শেষ না করে কোনোভাবেই উঠতেন না। 
যা হোক, পরদিন রীতিমতো পাঠাগার খোলা হলো। খোলামাত্র লাইব্রেরিয়ানের দৃষ্টি গিয়ে পড়ল তার দিকে। লাইব্রেরিয়ান তো তাকে দেখে রীতিমতো হতবাক। শহীদুল্লাহ্্কে তিনি প্রশ্ন করলেন, আপনি পুরো রাত-দিন পাঠাগারে বন্দি ছিলেন? তখন শহীদুল্লাহ্ বই পড়ার ধ্যান ভেঙে গেল। কিছু না বুঝে তিনি মুখ তুলে বললেন, ‘কই সে রকম কিছু না তো। আমি তো কেবল বই পড়ছিলাম!’ 
কতটা বইপ্রেমী হলে এ রকম ঘটনা ঘটতে পারে, তরুণরা একবার ভেবে দেখুন! দিনের শেষে পুরো রাত পেরিয়ে গেল ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ তা টেরই পেলেন না! এমন বইপাগল ছিলেন বলেই তিনি এত পাণ্ডিত্য অর্জন করতে পেরেছিলেন। আমাদের চারপাশে এমন অসংখ্য বইপোকা আছেন, যারা পড়তে ভালোবাসেন। আসলেই তো বইয়ের শ্রেষ্ঠত্ব অনস্বীকার্য। 
আরেকটি উদাহরণ- ওয়ারেন বাফেট একজন মার্কিন ব্যবসায়ী। বিনিয়োগের কলাকৌশল তিনি খুব ভালো জানেন। সাত বছর বয়স থেকেই ব্যবসার প্রতি তার আগ্রহ ছিল। ছোটবেলায় চুইংগাম, কোকা-কোলার বোতল, এমনকি বাড়ি বাড়ি গিয়ে ম্যাগাজিনও বিক্রি করেছেন। আর আজ দেখা যাচ্ছে, তিনি সাফল্যের শীর্ষে। মার্কিন সাময়িকী ফোর্বস ২০১৭ সালে প্রকাশিত বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মানুষদের তালিকায় ওয়ারেন বাফেটের অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিজনেস স্কুলের এই সাবেক ছাত্র সবসময় শিক্ষার্থী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের নানা পরামর্শ দিয়েছেন। তার মধ্যে প্রথম পরামর্শ- অনেক পড়তে হবে।
পড়ুয়া হিসেবে এই ধনকুবের ব্যবসায়ীর বেশ সুনাম আছে। অবসরে শতকরা ৮০ ভাগ সময়ই তিনি বই পড়ার পেছনে ব্যয় করেন। এইচবিওকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এখনও দিনের পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা তিনি বই পড়ার পেছনে ব্যয় করেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন অন্তত ৫০০ পৃষ্ঠা পড়ো। জ্ঞান হলো ‘চক্রবৃদ্ধি সুদ’ এর মতো। যত পড়বে, তত বাড়বে।’
জ্ঞান হচ্ছে নিজস্ব অর্জন। এখানে কেউ ভাগ বসাতে পারে না; বরং জ্ঞান দান করলে তা বাড়ে। একটি ভালো বই মানুষকে অকৃত্রিম আনন্দ ও অসীম সুখ প্রদান করে। বই মানুষকে ভাবায়, স্বপ্ন দেখায়, কল্পনায় ডোবায়-ভাসায়, আবার বাস্তবতা উপলব্ধি করার শিক্ষাও দেয়। মানুষের উন্নততর বৃত্তিগুলো চায় সত্য, জ্ঞান ও আনন্দের আলো। তবে সব বই-ই যে ভালো তা কিন্তু নয়; কোন বইগুলো সঠিক পথের সন্ধান দেবে, উন্নত মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়তে সাহায্য করবে, সে বই তরুণদেরই খুঁজে বা বেছে নিতে হবে।
একজন আরব পণ্ডিতের উদ্ধৃতি দিয়ে সৈয়দ মুজতবা আলী (বই কেনা) বোঝাতে চেয়েছেন, ‘ধনীরা বলে, পয়সা কামানো দুনিয়াতে সবচেয়ে কঠিন কর্ম। কিন্তু জ্ঞানীরা বলেন, না জ্ঞানার্জন সবচেয়ে শক্ত কাজ। এখন প্রশ্ন কার দাবিটা ঠিক, ধনীর না জ্ঞানীর? আমি নিজে জ্ঞানের সন্ধানে ফিরি, কাজেই আমার পক্ষে নিরপেক্ষ হওয়া কঠিন। তবে একটা জিনিস আমি লক্ষ করেছি, সেইটে আমি বিচক্ষণ জনের চক্ষুগোচর করতে চাই। ধনীর মেহনতের ফল হলো টাকা। সে ফল যদি কেউ জ্ঞানীর হাতে তুলে দেয়, তবে তিনি সেটা পরমানন্দে কাজে লাগান 
এবং শুধু তাই নয়, অধিকাংশ সময়ে দেখা যায়, জ্ঞানীরা পয়সা পেলে খরচ করতে পারেন ধনীদের চেয়ে অনেক ভালো পথে, উত্তম পদ্ধতিতে। পক্ষান্তরে, জ্ঞানচর্চার ফল সঞ্চিত থাকে পুস্তকরাজিতে এবং সে ফল ধনীদের হাতে গায়ে পড়ে তুলে ধরলেও তারা তার ব্যবহার করতে জানে না। বই পড়তে পারে না।’ অতএব প্রমাণ হলো, জ্ঞানার্জন ধনার্জনের চেয়ে মহত্তর। আসলে ধন সাময়িক মাত্র। নশ্বর এই পৃথিবীতে প্রকৃত জ্ঞানী-গুণীরা চিরদিন অমর হয়ে থাকবেন এবং আছেন তাদের সৃজনশীল কাজের মধ্য দিয়ে।

বিখ্যাত সমাজতত্ত্ববিদ আলবেরুনি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে একদিন অসুস্থ অবস্থায় শুয়ে আছেন। পাশে অবস্থানরত তার এক বন্ধু। তিনি তাকে বললেন, ‘জ্যামিতির একটি সংজ্ঞা আমার জানা দরকার। বন্ধুটি বললেন, তুমি মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। এসব এখন জেনে কী লাভ হবে? আলবেরুনি প্রত্যুত্তরে বলেছিলেন, মৃত্যুর আগে এটি আমি জেনে যেতে পারলে হয়তো আমার জীবনটা আরও ধন্য হবে।’ জ্ঞানের শেষ নেই। জ্ঞান অর্জনে বইয়ের বিকল্প কিছুই নেই।

আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের কথা দিয়েই শেষ করছি- ‘একেকটা বই একেকটা জানালার মতো। ঘরের জানালা দিয়ে যেমন বাইরে সব কিছু দেখা যায়, তেমনি বই পড়লেও আগমীটা দেখা যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘বই পড়া মানুষ তাদের প্রসারিত দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে সমাজকে আলোকিত করতে পারে।’


ক্যারিয়ার গঠনে পরামর্শ
প্রতি বছর কলেজ এবং ইউনিভার্সিটির নতুন ডিগ্রিধারীরা বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক চাকরির
বিস্তারিত
‘তথ্যে তারুণ্যে নিত্য সত্যে’ প্রতিপাদ্য
‘তথ্যে তারুণ্যে নিত্য সত্যে’ প্রতিপাদ্য নিয়ে বর্ণাঢ্য আয়োজনে ১৯ সেপ্টেম্বর
বিস্তারিত
জাবির ২৫ শিক্ষার্থী জাপানে চাকরি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২৫ শিক্ষার্থীকে
বিস্তারিত
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ‘টিআইবি-ডিআইইউ ইয়েস
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ
বিস্তারিত
চট্টগ্রামে ১০ দিনব্যাপী রবি-দৃষ্টির বিতর্ক
চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমি অডিটরিয়ামে রবি-দৃষ্টির আয়োজনে ১০ দিনব্যাপী বিতর্ক প্রতিযোগিতা
বিস্তারিত
ইস্টওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে শীতকালীন সেমিস্টারের নবীনবরণ
নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশের অন্যতম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্টওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়
বিস্তারিত