ইকারাস কাহিনি


ইকারাস উপাখ্যানটি আসলে প্রাচীন রোমের পৌরাণিক কাহিনি। অমন কাহিনিতে কল্পনার ছাপ যত থাকে, সত্যের তত নয়। কৃত্রিম ডানা নিয়ে কোনো কিশোর কি উড়ে আকাশে উঠতে পারে! আমরা জানি, নকল ডানা নিয়ে বাতাসে ভাসা যায়। যেমন, প্যারাসুট নিয়ে মানুষ বিমান থেকে নেমে আসে। হ্যাং-গ্লাইডার নিয়ে অনেকে হাওয়ায় ভেসে চলে। কিন্তু ঝরা পালকের ডানা নিয়ে কি উড়ে আকাশে ওঠা সম্ভব 
নকল ডানায় ভর করে একবার এক কিশোর আকাশে উড়েছিল। শৈশবে আমরা সে কাহিনি পড়েছি! ‘ইকারাস’ তার নাম। তার পিতার নাম ‘ডেডালাস’। পিতাই বানিয়েছিলেন নকল ডানা। কুড়িয়ে আনা পাখির পালক তিনি মোম দিয়ে হাতে ও পিঠে লাগিয়ে উড়ে যাওয়ার ফন্দি এঁটেছিলেন। 
রাজরোষে ডেডালাস বন্দি ছিলেন জনহীন দ্বীপে। সঙ্গে ছিল নিষ্পাপ পুত্র ইকারাস। দ্বীপের সৈকতে প্রহরী ছিল। ভেলা বানিয়ে ভেগে যাওয়া যায় না। ডেডালাস ভাবলেন, আকাশে তো প্রহরা নেই, উড়াল দিয়ে সাগর পেরোলে আমাদের আর পায় কে! 
যে কথা সেই কাজ। নকল ডানা নেড়ে পিতা-পুত্র একদিন উড়ে গেল সাঁই-সাঁই করে। দেখতে না দেখতে পিতা সাগর পেরিয়ে গেলেন। তারপর মেলা সময় পার হলো, পুত্রের দেখা নেই! আনন্দে উচ্ছ্বসিত ইকারাস তখন উড়ে উড়ে অনেক উপরে উঠেছে। কিন্তু ওই উচ্ছ্বাসটাই তার কাল হলো। রোদে মোম গলে গিয়ে তার ডানা খসে পড়ল। সাগরে পড়ে মারা গেল ইকারাস। 


ইকারাস উপাখ্যানটি আসলে প্রাচীন রোমের পৌরাণিক কাহিনি। অমন কাহিনিতে কল্পনার ছাপ যত থাকে, সত্যের তত নয়। কৃত্রিম ডানা নিয়ে কোনো কিশোর কি উড়ে আকাশে উঠতে পারে! আমরা জানি, নকল ডানা নিয়ে বাতাসে ভাসা যায়। যেমন, প্যারাসুট নিয়ে মানুষ বিমান থেকে নেমে আসে। হ্যাং-গ্লাইডার নিয়ে অনেকে হাওয়ায় ভেসে চলে। কিন্তু ঝরা পালকের ডানা নিয়ে কি উড়ে আকাশে ওঠা সম্ভব! 
ঝরা পালক হাতে লাগিয়ে কোনো মানুষ উড়ে আকাশে উঠতে পারে না। পালকের সঙ্গে দেহের পেশি যুক্ত না থাকলে ‘ওড়া’ যায় না। একটা উড়ন্ত পাখিকে ভালো করে দেখলেই তা বোঝা যাবে। ওড়ার সময় পাখিরা ডানার পালক এদিক-ওদিক ঘোরাতে থাকে। ডানা দুটো নিচে নামানোর সময় বাতাস আটকানোর জন্য পালক সব সমান্তরাল হয়। পরমুহূর্তে যখনই ডানা উপরে উঠতে শুরু করে, পালকগুলো নব্বই ডিগ্রি ঘুরে যায়। ডানায় তখন আর বাতাস আটকায় না। এভাবে ঘন ঘন পালক ঘোরাতে না পারলে ‘মৃত’ ডানা নেড়ে ওড়া সম্ভব নয়। 
ওড়াটা পাখির জন্যও কঠিন কাজ। খুব দরকার না হলে পাখি আকাশে উড়ে ওঠে না। সুযোগ পেলে উপর দিকে ঠেলে ওঠা বাতাসে পাখিরা ভেসে থাকে। ভেসে থাকা সোজা; কিন্তু উড়তে গেলে অনেক পেশি-বল ও বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন পড়ে। এ দুই শক্তির ঘাটতি হলেই বিপদ। 
বাতাসের দিক ও গতি মুহূর্তে মুহূর্তে বদলায়। পাখিকে সারাক্ষণ ওই পরিবর্তনগুলো মাপতে হয়। পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর উপায় কী, তা ভাবতে হয়। তারপর পালকের পেশিতে পেশিতে ত্বরিত নির্দেশ পাঠাতে হয়। আকাশে উড়তে হলে সূক্ষ্ম বায়ুমান যন্ত্র, তীক্ষè বুদ্ধি, উন্নত স্নায়ুসংযোগ ও প্রচুর পেশি-বল লাগে। এসব না থাকলে পতঙ্গের মতো কেবল গাছের আড়ালে, ভূমির কাছাকাছি ওড়া যায়; আকাশ অধিকার করা যায় না। 
পাখি ছাড়া পৃথিবীতে আর মাত্র একধরনের প্রাণী ভালো করে আকাশে উড়তে পারে। এদের আমরা বাদুড় ও চামচিকা নামে চিনি। পালকে মোড়া ডানার বদলে এরা প্রশস্ত চামড়ার চাদর নেড়ে ওড়াউড়ি করে। পাখির মতো এদের দেহেও উন্নত পেশি ও স্নায়ু সৃষ্টি হয়েছে। তবে ওড়ার ব্যাপারে এরা পাখির সমকক্ষ হতে পারেনি। 
উড়াল দিয়ে মহাসাগর পাড়ি দেয়, এমন অনেক পাখি আছে পৃথিবীতে। অনেক পাখি গ্রীষ্মে এ মহাদেশ, শীতে সে মহাদেশ ঘুরে বেড়ায়। ওয়ান্ডারিং-অ্যালবাট্রস প্রতি বছর উত্তর মেরু থেকে উড়ে দক্ষিণ মেরু গিয়ে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে ফিরে আসে। জৌরালির মতো ছোট পাখি কোথাও না থেমে দশ হাজার কিলোমিটার উড়ে যায়। এক চামচ চিনির চেয়ে কম ওজনের হামিংবার্ড বছরে দু-বার ক্যারিবিয়ান সাগর পাড়ি দেয়। 
ওড়াউড়িতে পাখিরা এ জটিল ওস্তাদি পেল কোথা থেকে! পেয়েছে নিজেরই উদ্ভাবনী শক্তি থেকে, সুদীর্ঘ সাধনায়। কোটি বছরের বিবর্তনের পরই পাখি প্রভুত্ব পেয়েছে আকাশের। দেহের ভার কমানোর জন্য পাখির হাড় ফাঁপা হয়েছে, চোয়াল ও দাঁত সংক্ষিপ্ত হয়ে চঞ্চু বনে গেছে। পালক-মোড়া শরীর এমন ‘স্ট্রিম লাইন’ হয়েছে, যেন বায়ুপ্রবাহে বাধা না পায়। হাত হয়েছে ডানা। ডানা নাড়ানোর বিশাল পেশি বসানোর জন্য বুকের পাঁজর হয়েছে পিরামিডের মতো। পেশিতে শক্তি জোগান দিতে হৃৎপি- আর ফুসফুসের কুঠুরি বেড়েছে; বেড়েছে পাম্প করার হার। এসব জরুরি অঙ্গের কর্মক্ষমতা বাঘ, সিংহ অথবা মানুষের তুলনায় পাখির কয়েক গুণ বেশি।
আকাশে পাখির আধিপত্য চলছে বহু কাল ধরে। পাখির কাছেই আছে ওড়াউড়ির সব বিশ্বরেকর্ড। আমাদের চেনাজানার গ-ির মধ্যেও কয়েকটি রেকর্ডধারী পাখি আছে। সবচেয়ে উঁচুতে ওঠার রেকর্ড রয়েছে দাগি রাজহাঁসের। এ পাখি শীতে বাংলাদেশের জলাশয়ে থাকে। গ্রীষ্মে এদেশ ছেড়ে ‘এভারেস্ট’ শিখরের ওপর দিয়ে এরা উড়ে যায়। তিব্বতে গিয়ে এরা বাসা বাঁধে। পৃথিবীর আর কোনো প্রাণী আপন শক্তিতে এত উপরে উঠতে পারেনি। 
সর্বোচ্চ গতির রেকর্ড করেছে যে পাখি, তার নাম পেরেগ্রিন-শাহিন। শীতকালে বাংলাদেশে পাখিটি চোখে পড়ে। শিকারের দিকে ছোটার সময় এর গতি ঘণ্টায় ৩৬০ কিলোমিটারের বেশি হয়ে থাকে। পৃথিবীর কোনো প্রাণীর গতি এর ধারেকাছেও আসতে পারে না। 
সবচেয়ে ভারী শরীর নিয়ে উড়ে চলার রেকর্ড করেছে যে পাখি, তার নাম দৈত্য-ডাহর, অথবা গ্রেট-বাস্টার্ড। এর ওজন ২১ কিলোগ্রাম অর্থাৎ আধা মণ পর্যন্ত হতে পারে। পাকিস্তানে ঘাসের প্রান্তরে কালেভদ্রে এ পাখি দেখা যায়। অনেকখানি দৌড়ে চলার পর এরা মাটি ছেড়ে উঠতে পারে। তবে একবার উঠলে যোজন পাড়ি দিতে এদের অসুবিধা হয় না। এ কাজে এদের রয়েছে কোটি কোটি বছরের অভিজ্ঞতা। 
কৃশকায় কিশোর ইকারাসের ওজন হয়তো দৈত্য-ডাহর পাখির কাছাকাছিই ছিল। তার হাতে যদি কেউ মজবুত করে ডাহরের একজোড়া ডানা লাগিয়ে দেয়! পারবে কি সে মুক্ত আকাশে উড়ে যেতে! বেচারা ইকারাস। ওড়াউড়ির কাজে তার শত বছরেরও অভিজ্ঞতা নেই। বাতাসের গতিবিধি আঁচ করার কোনো ক্ষমতাই তার নেই। পাখির মতো স্ট্রিম লাইন নয় বলে তার দেহ বাতাসের ধাক্কায় নাস্তানাবুদ। পাখির তুলনায় ইকারাসের চ্যাপ্টা বুকের পেশি খুব ছোট, ফুসফুস অপরিসর এবং হৃৎপি- দুর্বল। ডানা দুটো দ্রুত নাড়ালে অল্প সময়েই তার শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে পড়বে। মোম দিয়ে লাগানো পালক নিয়ন্ত্রণে অক্ষম বলে ভূমি ছেড়ে ওঠাই হবে না তার। 
ইকারাস তো সত্যিকারের কিশোর নয়; পৌরাণিক কাহিনির একটি চরিত্র। আকাশে ওড়ার জন্য দুনিয়ার সব কিশোরের মনের ইচ্ছের নাম ইকারাস। কল্পকাহিনির ইকারাসের মৃত্যু হলেও তার আকাক্সক্ষা তো মৃত্যুহীন। ইকারাসের প্রথম প্রয়াসের দু-হাজার বছরের মধ্যেই আমরা আকাশে উড়তে পেরেছি। শরীরে ঈপ্সিত বিবর্তনের আশায় কোটি বছর আমরা বসে থাকিনি। যন্ত্র বানিয়ে আমরা আকাশ জয় করেছি। তারপর চলে গেছি মহাকাশে, পাখির নাগালের অনেক অনেক উপরে।

ছবি : লেখক


আরব ছোটগল্পের রাজকুমারী
সামিরা আজ্জম ১৯২৬ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ফিলিস্তিনের আর্কে একটি গোঁড়া
বিস্তারিত
অমায়ার আনবেশে
সাদা মুখোশে থাকতে গেলে ছুড়ে দেওয়া কালি  হয়ে যায় সার্কাসের রংমুখ, 
বিস্তারিত
শারদীয় বিকেল
ঝিরিঝিরি বাতাসের অবিরাম দোলায় মননের মুকুরে ফুটে ওঠে মুঠো মুঠো শেফালিকা
বিস্তারিত
গল্পের পটভূমি ইতিহাস ও বর্তমানের
গল্পের বই ‘দশজন দিগম্বর একজন সাধক’। লেখক শাহাব আহমেদ। বইয়ে
বিস্তারিত
ধোঁয়াশার তামাটে রঙ
দীর্ঘ অবহেলায় যদি ক্লান্ত হয়ে উঠি বিষণœ সন্ধ্যায়Ñ মনে রেখো
বিস্তারিত
নজরুলকে দেখা
আমাদের পরম সৌভাগ্য, এই উন্নত-মস্তকটি অনেক দেরিতে হলেও পৃথিবীর নজরে
বিস্তারিত