কবিতার শব্দ

শব্দের ব্যাপক দখল, শিল্প ও শব্দ-ব্যঞ্জনা সম্পর্কে বোধগম্যতা এবং বিন্যাস-সামর্থ্যরে মধ্যেই মূলত কবির দক্ষতা ও পরিচয় ফুটে ওঠে। কবিতার সব শব্দ যে অভিধানে পাওয়া যাবে তা কিন্তু নয়। কবি তার ভাব, বক্তব্য বা চেতনাকে প্রকাশ করতে গিয়ে কোথা থেকে শব্দ নেবেন তার কোনো নির্দিষ্ট বেড়ি-বন্ধন নেই

ইংরেজি রোমান্টিক কাব্যধারার অন্যতম স্থপতি এসটি কোলরিজ কবিতার ভাষা নির্মাণ ও প্রকাশ সম্পর্কে দুটি মন্তব্য করেছেন, ‘সুন্দর শব্দের সুনিপুণ পদবিন্যাস কবিতা’ ও ‘স্পর্শী অনুভূতির স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ কবিতা।’ যদিও কোনো নির্দিষ্ট বা একক সংজ্ঞা দিয়ে কবিতাকে ব্যাখ্যা করা যায় না অথবা একজন কবি-লেখকের মন্তব্যই এ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত হতে পারে না, তবু এ দুটি সংজ্ঞায় তাৎপর্যপূর্ণ দুটি অনুষঙ্গ পাওয়া যায়, যা কবিতা রচনার প্রধানতম না হলেও গুরুত্বপূর্ণ নিরূপক বা নির্দেশক। সে দুটি হচ্ছেÑ ‘স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ’ ও ‘নিপুণ পদবিন্যাস’। অবশ্য কবিতা লিখতে গিয়ে কবি যদি কোনো বিষয় বা ঘটনাকে সামনে রাখতে যান বা প্ররোচক হিসেবে তার মধ্যে কোনো কিছু কাজ করে অথবা কারও বিশেষ মনোরঞ্জনের বিষয় মাথার কাজ করে, তবে সেটা শিল্পবাচ্য না-ও হতে পারে। শিল্পরচনায় কবিকে ভাবনিষ্ঠ ও স্বাধীন থাকতে হয়, অন্যথায় তা মার্গচ্যুত হবে নিশ্চিত। এ বিষয়ে চলিত ভাষারীতির প্রবর্তক প্রমথ চৌধুরীও চমৎকার বিশ্লেষণ করেছেন, ‘কবিতা কোনো ভাব, ঘোর, চিন্তা, চেতন বা অবচেতন মুহূর্তের তাজা ফসল, যেখানে বল প্রয়োগ করার খুব বেশি অবকাশ থাকে না।’ আধুনিক শিল্প সম্পর্কে থিওফিল গত্যিয়ের মন্তব্য হচ্ছেÑ শিল্পকলা সব ধরনের উপযোগিতা বর্জিত। অর্থাৎ নির্দিষ্ট শিল্পকর্ম কোনো উপযোগ বা উপলক্ষকে পোষণ করবে না বরং উত্তম শিল্পই তার শিল্পগুণের মাধ্যমে উপযোগিতাকে নানা রকমে মহার্ঘ করে তুলবে। একজন কবির প্রথমতই প্রয়োজন শক্তিশালী শব্দভা-ার, শব্দের প্রয়োজনে এ জন্য প্রকৃত কবিরা শব্দ-সন্ধানী হয়ে থাকেন। শুধু হালকা ও তরল শব্দচালে উন্নত কবিতা রচনা সম্ভব নয়। কবিতার ভাব যখন অবোধ্য, অগম্য কিংবা ঝলকানির মতো অনুভূতি নিয়ে আসে সে ক্ষেত্রে উন্নত ও ব্যঞ্জনাময় শব্দই কবিতার ভাব প্রকাশে বড় ভূমিকা রাখে। শব্দভা-ারের সংকীর্ণতা থাকলে খুব মননশীল অন্তরিন অনুভূতিমালা প্রকাশ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিরল ও বিচিত্র শব্দের ব্যবহার, ভিন্নার্থে শব্দ প্রয়োগ ও কল্পিত শব্দ সৃষ্টিতে কোনো অস্বাভাবিকতা নেই।
এলিয়ট তার ঞযব ডধংঃব খধহফ কাব্যে নিজস্ব টীকা সংযোজনের মাধ্যমে কবিতা প্রকাশ করেছিলেন। অর্থঘনত্ব ও শিল্পসৌকর্য সৃষ্টির প্রয়োজনে যথার্থ শব্দ ব্যবহারপূর্বক কবিতার শেষে তেমন শব্দভাষ্য ব্যবহার করা যায়। নিজস্ব শব্দভঙ্গি সৃষ্টির প্রয়োজনে কবিকে হতে হয় শব্দ-শ্রমিক। সেক্সপিয়রের ভা-ারে ছিল প্রায় পঁচিশ হাজার শব্দ। তার রচনায় তিনি দুই হাজারের মতো নতুন শব্দ যোগ করেছিলেন। নষধহশবঃ, মড়ংংরঢ়, ধংংধংংরহধঃরড়হ, পযধসঢ়রড়হ ইত্যাদি শব্দ তিনিই প্রথম ব্যবহার করেছেন। এছাড়া কয়েকশ’ নতুন ও জনপ্রিয় শব্দবন্ধ বা চযৎধংব তিনি যোগ করেছেন ইংরেজি ভাষায়Ñ রহ সু সরহফ’ং বুব, বি যধাব ংববহ নবঃঃবৎ ফধুং, ধ ঢ়ড়ঁহফ ড়ভ ভষবংয, সঁৎফবৎ সড়ংঃ ভড়ঁষ যার মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
দীপ্তি ত্রিপাঠী আধুনিক বাংলা কবিতার ভাব ও প্রকরণগত অনেক লক্ষণ ও বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। যেমনÑ গদ্য ছন্দের বহুল ব্যবহার। প্রচলিত কাব্যিক শব্দÑ এনু, গেনু, হিয়া, হেরি, হেন, মোদের, মম, মোরা, তব, পানে, যবে প্রভৃতি শব্দ বর্জন। প্রাচীন উপমা বা শব্দের অভিনব অর্থে প্রয়োগ, প্রত্যক্ষের চেয়ে পরোক্ষ উপমা ব্যবহার ও নতুন চিত্রকল্প ও রূপক সৃষ্টি। শব্দ প্রয়োগে মিতব্যয়িতা ও অর্থঘনত্ব সৃষ্টি। চলতি ক্রিয়া পদের সঙ্গে তৎসম শব্দের ব্যবহার। রসের ক্ষেত্রে ব্যঙ্গ, অদ্ভুত, বীভৎস রসের বহুল ব্যবহার।
অনেকে মনে করে থাকেন, তৎসম শব্দ কিংবা পুরানো শব্দের ব্যবহার আধুনিক কবিতায় চলবে না; কিন্তু আধুনিক কবিতার উল্লিখিত বৈশিষ্ট্য পাঠে আমরা বলতে পারি যে, অর্থঘনত্ব সৃষ্টি ও ভাবকে স্বচ্ছন্দ রেখে শব্দের নিপুণ বিন্যাসের প্রয়োজনে শুধু তৎসম শব্দই নয়Ñ পুরানো, অপ্রচলিত শব্দ, লোকজ শব্দ, ধর্মীয় শব্দ, আদিবাসীদের ব্যবহৃত শব্দ, মিথ ও কিংবদন্তি অনায়াসে আধুনিক কবিতায় ব্যবহার চলে। তবে সতর্ক হতে হবে ক্রিয়াপত্র ও সর্বনাম পদের ব্যবহারের ক্ষেত্রেÑ যতটা সম্ভব চলিত ভাষায় বাক্য নির্মাণ করা যায়। যদিও একান্ত বাকপ্রবাহ রক্ষার প্রয়োজনে মিশ্রণ দোষণীয় হবে না। কবিতা বলতে তার ভাববস্তু ও রূপরীতি (ঋড়ৎস)Ñ এ দুয়ের সম্মিলন বোঝায়। ভাব ও রূপের একাঙ্গ লাভই কাব্যের প্রাণ। রূপগত বা নির্মাণ কৌশলগতভাবে কবিতার ভাষা নির্মাণে মোটামুটি তিন ধরনের কৌশলের প্রয়োগ দেখা যায়Ñ বাককৌশল বা কথকতা, ছন্দ কৌশল ও শব্দবিন্যাস কৌশল। একটি শিল্পসম্মত কবিতায় যে কোনো একটি কৌশলের সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে, তবে কিছু সার্থক কবিতায় একাধিক কৌশলের যথার্থ প্রয়োগও দৃশ্যমান হয়। 
আসলে, একরকমভাবে বলা যায়Ñ শব্দই কবিতা। যে শব্দসমষ্টিতে নিবিড় বিন্যাসের সঙ্গে সঙ্গে গভীর সম্পৃক্ততায় ভাব ও চেতনা সংযুক্ত থাকে, তা-ই কবিতা। আধুনিক কবিতার একটি বড় ধর্ম হলো, শব্দপরিক্রমার অন্তরালে প্রচ্ছন্নভাবে ভাব ও ছন্দের সঙ্গতি। ব্যাকরণগত বা আনুষ্ঠানিক ছন্দ ভাবের স্বাচ্ছন্দ্যকে আড়ষ্ট করে দিতে পারে বলে বাক্য নির্মাণের ক্ষেত্রে আধুনিক কবিরা গদ্যকে বেছে নিয়েছেন; তবু কবিতা এবং সাধারণ গদ্যের মধ্যে যে তফাৎ তা কিন্তু ভাব, চিন্তা ও নির্মাণ-কৌশলে কবিকেই স্পষ্ট করে দিতে হবে; অন্যথায় সেটা কবিতা হবে না। উত্তম কবিতা কখনও অযথার্থ-রকমে অবোধ্য হতে পারে না, ভাব ও চিন্তার ফলশ্রুতি কিছু ক্ষেত্রে কবিতাকে অনুধাবনাতীত করে তোলে; সে ক্ষেত্রে অনুভব করে পাঠক কবিতা রপ্ত করে, ‘তাকায় এবং স্তব্ধ হয় এটা একটা প্রেক্ষিত।’ কিন্তু অনর্থ, অযৌক্তিকভাবে শব্দের কঙ্কাল তৈরি করে কবিতায় মুনশিয়ানা দেখাতে গেলে সেই প্রচেষ্টা গচ্চা যায়, যা সাম্প্রতিক কালের কবিতায় বেশ দৃশ্যমান হচ্ছে।
শব্দের ব্যাপক দখল, শিল্প ও শব্দ-ব্যঞ্জনা সম্পর্কে বোধগম্যতা এবং বিন্যাস-সামর্থ্যরে মধ্যেই মূলত কবির দক্ষতা ও পরিচয় ফুটে ওঠে। কবিতার সব শব্দ যে অভিধানে পাওয়া যাবে তা কিন্তু নয়। কবি তার ভাব, বক্তব্য বা চেতনাকে প্রকাশ করতে গিয়ে কোথা থেকে শব্দ নেবেন তার কোনো নির্দিষ্ট বেড়ি-বন্ধন নেই। ইতিহাস, ধর্ম, দর্শন, ভূগোল, রাজনীতি, অর্থশাস্ত্র, বিজ্ঞান, বিভিন্ন মতবাদ, সংগীত, সংস্কৃতিসহ যে কোনো জ্ঞানপুঞ্জি থেকে কবি তার কাক্সিক্ষত শব্দ চয়ন করতে পারেন; এক্ষেত্রে কবি স্বাধীন। যেসব শব্দ স্বল্প-প্রচলিত, সৃষ্ট-শব্দ বা যেসব  শব্দের অর্থোদ্ধার পাঠকের পক্ষে দুরূহ; এমন ক্ষেত্রে কবি টীকা-ভাষ্য যুক্ত করবেন। একান্ত প্রয়োজন ব্যতিরেকে একই কবিতায় একই শব্দের একাধিক প্রয়োগ কবিতার শিল্পকে ক্ষুণœ করে, এমন ক্ষেত্রে সমার্থক শব্দের ব্যবহার করা যায়। ভাষাকে গতিশীল, প্রবহমান ও ধ্বনিময় করার প্রয়োজনে কবিতায় শৈল্পিক উপমা, অনুপ্রাস সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কবিতার বাক্যে অর্থঘনত্ব সৃষ্টি ও বাক-মাধুর্যের প্রয়োজনে সন্ধি, সমাস, উপসর্গসহ বিভিন্ন বৈয়াকরণিক পন্থায় ও যৌথবন্ধ প্রক্রিয়ায়ও নতুন নতুন শব্দ সৃষ্টি করা যায়; যার মাধ্যমে কাব্যভাষা সমৃদ্ধ হয়। কবি নিজস্ব প্রক্রিয়ায় একেবারে অচিন্ত্য, অশ্রুতপূর্ব এবং কল্পিত শব্দের ব্যবহারও করতে পারেন, তবে এ ক্ষেত্রে টীকা অথবা শব্দভাষ্য প্রদান জরুরি। 


পাঠক কমছে; কিন্তু সেটা কোনো
দুই বাংলার জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। অন্যদিকে বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক
বিস্তারিত
মনীষা কৈরালা আমি ক্যান্সারের প্রতি কৃতজ্ঞ,
ঢাকা লিট ফেস্টের দ্বিতীয় দিন ৯ নভেম্বরের বিশেষ চমক ছিল
বিস্তারিত
এনহেদুয়ান্নার কবিতা ভাষান্তর :
  যিশুখ্রিষ্টের জন্মের ২২৮৫ বছর আগে অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৪ হাজার
বিস্তারিত
উপহার
  হেমন্তের আওলা বাতাস করেছে উতলা। জোয়ার এসেছে বাউলা নদীতে, সোনালি
বিস্তারিত
সাহিত্যের বর্ণিল উৎসব
প্রথম দিন দুপুরে বাংলা একাডেমির লনে অনুষ্ঠিত হয় মিতালি বোসের
বিস্তারিত
নিদারুণ বাস্তবতার চিত্র মান্টোর মতো সাবলীলভাবে
এ উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ভারতের প্রখ্যাত পরিচালক নন্দিতা দাস
বিস্তারিত