আমাদের বৈশাখ

ছোটবেলায় পুণ্যাহের সময় লাঠিখেলায় যে বীরত্ব দেখতাম, 
তা নয়, বরং রমণীয়-লাবণ্যময় নৃত্য লাঠিখেলাকে ঘিরেই আসর মাতায়, জব্বারের বলী খেলায় আসে নতুন তরঙ্গ। কৌটার দুধ  খেলেও গরু-মোষের শিঙে তেল-সিঁদুরও জুটে যায়। বাতাসা-কদমা, চিড়ে-মুড়ি, নাড়–-আর নকুলদানা, 
মোয়া-কদমা আইসক্রিম আর নুডলসের ভ্যানের 
পাশে বেশি ডাট মেরেই হাজির হয়
নববর্ষের প্রথম দিনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহ কী। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই বছরের পহেলা তারিখটিকে ঘিরে নানা আয়োজন, নানা আচার-অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। এর মধ্যে অবশ্যই অঞ্চল বিশেষে ধর্মীয় প্রভাব যে পড়ে না, এমন নয়। ইরানের নওরোজের সঙ্গে পশ্চিমের নববর্ষের ফারাক অনেক, এমনকি আমাদের মতো দেশেও ইংরেজি নববর্ষের আগের রাতে হৈ-হুল্লোড় থামানোর জন্য অতিরিক্ত সতর্ক ব্যবস্থা নিতে হয়, তারপরও যে অঘটন ঘটে না এমন নয়। এদিক থেকে আমাদের নববর্ষ সম্পূর্ণ ভিন্ন মেজাজের। রূপান্তর ঘটছে শাপলাদোয়েলের দেশেও, অনুসন্ধানী দৃষ্টি দিয়ে এ রূপান্তরের চোখে পড়ার মতো দিকগুলো নিয়ে তেমন ভাবনা-চিন্তা হয়েছে এমনটি জোর গলায় বলতে পারছি কই? বছর চল্লিশ আগেও দেখেছি, কোনো কোনো মুসলিম পরিবারে পহেলা বৈশাখ নিয়ে কোনো কিছুর আয়োজন করাকে সরাসরি হিন্দুয়ানি প্রবণতা হিসেবে শনাক্ত করার জেদ। বিত্তবান শিক্ষিত পরিবারগুলো এর মধ্যে গ্রাম্যতার মেলা উপাদান পেতেন বলেই হয়তো এ ব্যাপারে উদাসীনতাকেই প্রশ্রয় দিয়েছেন। মজার ব্যাপার যেটা লক্ষ করেছি, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই প্রতি বছরই নতুন প্রজন্ম, সৃজনশীলতার সঙ্গে যুক্ত শিল্পীবৃন্দ নতুন কিছু একটা যোগ করেছেন। পত্রপত্রিকায়, রেডিও-টেলিভিশনে, অর্থাৎ প্রচার মাধ্যমে এসব দিককে হাইলাইট করা হচ্ছে।
আমার মনে হয়, একটু গোড়া থেকেই শুরু করলে যেসব ইশারা বিবেচনার জন্য হাজির করেছি, একটু হয়তো খোলাসা হবে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেওয়ানি পেয়ে প্রশাসনে, শিক্ষায়-সংস্কৃতিতে অনেক পরিবর্তন আনলেও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কল্যাণে সামন্তবাদী শেকলটি ঘোড়ার দড়ির মতোই দেশবাসীর গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছিল। সম্রাট আকবরের আমলে ভূমি-জরিপের মাধ্যমে ভূমি ব্যবস্থাপনা ও ভূমি-প্রশাসনের ক্ষেত্রে যেটুকু অগ্রগতি হচ্ছিল তা আর বাড়েনি। আকবর প্রবর্তিত বাংলা সনের সঙ্গে যুক্ত হলো ইংরেজি সাল। দুইবার পতাকা বদলালেও আমাদের কৃষককুল, আড়তদার-ব্যবসায়ীরা এই বাংলা সনকেই মান্য করে আসছিল, এমনকি এই ইন্টারনেট-কম্পিউটার যুগেও। তা চলছে খাজনাপাতির সুবিধার জন্য। বাংলা সন চালু হয়েছিল দেনা-পাওনার জন্য হালখাতার কাজেও লেগে গেল। বাংলা সনের আধুনিক প্রয়োগের দিকটি গুরুত্ব পাওয়ায় সিরাজি প্রবর্তিত রীতিকে আরও খানিকটা উন্নত করে দুই প-িতপ্রবর ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বাংলা একাডেমির প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তায় একটা আধুনিক ক্যালেন্ডার দেশবাসীকে উপহার দিয়েছিলেন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার সরকারি কাজেকর্মে বাংলা সন ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে এই নতুন ক্যালেন্ডার সামনে রেখেই। বোঝাই যাচ্ছে, সুবাতাস বয়ে যাচ্ছে।
আসলে তা নয়। পাকিস্তানি আমলে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি জিম্মি করার যে ষড়যন্ত্র ছিল, বাঙালির আত্মপরিচয়ের চিহ্নগুলো মুছে ফেলার যে চক্রান্ত চলছিল, তা কখনও নীরবে-নিভৃতে ঘটেছিল, আবার কখনও অস্ত্রের ভাষায়। সেই নীলনকশার মোহন মায়ায় কেউ কেউ এখনও বুঁদ হয়ে আছেন সন্দেহ নেই। আমি আমাদের অগ্রজ ভাষাসৈনিকদের কাছে  যেমন তেমনি অগ্রজ সংস্কৃতি কর্মীদের কাছেও প্রবলভাবে ঋণ স্বীকার করি। তাদের দৃঢ়তা এ ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আমাদের সৌভাগ্য, জনগণের কণ্ঠসংলগ্ন নেতৃবৃন্দ এই সংস্কৃতিকর্মীদের অকুণ্ঠ সমর্থন সব সময় পেয়েছেন, উল্টোটাও ঘটেছে, তারাও সমর্থন দিয়েছেন সংস্কৃতিকর্মীদের। নইলে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কী দায় পড়েছিল ঢাকা  থেকে সংস্কৃতি প্রতিনিধি দলকে করাচি নিয়ে যাওয়ার? ফল একটা হয়েছিল, শেরেবাংলা, মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এদের প্রত্যেকের কপালেই ভারতের দালাল, রাশিয়ার দালাল এসব তকমা জুটেছে আর শেখ মুজিবুর রহমান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি হয়ে আলো ছড়িয়ে দিয়ে হলেন সবার বঙ্গবন্ধু। জনগণের কণ্ঠসংলগ্ন রাজনৈতিক পদক্ষেপকে শিল্পসাহিত্য উৎসাহ দেবেই। ষাটের দশকেই বাঙালি সংস্কৃতির জন্য শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে আগ্রহ প্রবল হতে থাকে। একেবারেই গোড়ায় ১৯৬১-তেই রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীতে এ বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ’৬৫-এর সীমান্ত সংকটের পরপরই ছয় দফা, ’৬৯-এ ১১ দফা এবং সেই জয় বাংলা, সেই আনন্দÑ জেগেছে জেগেছে বাঙালি জেগেছে ইত্যাদি।
আইয়ুবের বৈদেশিক ঋণের কল্যাণে ভুল-প্রাচুর্যের সমাজেও তরঙ্গটি চলেছে, নতুন করে কলার মোচা কীভাবে রাঁধতে হয়, কচি কাঁঠালের তরকারি যে মাংসের মতো রান্না করা যায়, বিরিয়ানি খাবারের পাশে, নুডলস স্যুপের পাশে এ-ও ছিল অবলোকনের ব্যাপার। সে-সব উত্তাল সময়ে, মহান একুশে ফেব্রুয়ারির মতোই অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল দেশপ্রেমিকদের জন্য অবশ্যপালনীয় বিষয় হয়ে উঠেছিল বাংলা নববর্ষ পালন।
’৭৫-এর পরপরই নয়, একটু পরে, বাঙালি যখন বুঝতে পেরেছিল কোথাও একটা গোঁজামিল চলছে, সে-সময় সংস্কৃতিকর্মী, শিল্পী-সংগঠক এরা আরও সচেতন হয়ে উঠলেন। 
যারা  রোজ পান্তা খায়, আমানি খায় অথবা তাও প্রতিদিন যাদের জোটে না তাদের সঙ্গেই একান্ত হতে চাইল তরুণসমাজ। গ্রাম্যতার দোহাই দিয়ে ঠেকানো গেল না, আর্ট কলেজ থেকে বেরোল বর্ণিল সমারোহ, সমাবেশ-শোভাযাত্রা, সোনা-রুপা ভেজানো জল না ছড়ালেও সোনার  চেয়ে দামি এই মাটিতে বসেই রমনা বটমূলে ছায়ানটের পরিবেশনায় গান শোনে তৃপ্তির সঙ্গে। ছোটবেলায় পুণ্যাহের সময় লাঠিখেলায় যে বীরত্ব  দেখতাম, তা নয়, বরং রমণীয়-লাবণ্যময় নৃত্য লাঠিখেলাকে ঘিরেই আসর মাতায়, জব্বারের বলী খেলায় আসে নতুন তরঙ্গ। কৌটার দুধ  খেলেও গরু-মোষের শিঙে তেল-সিঁদুরও জুটে যায়। বাতাসা-কদমা, চিড়ে-মুড়ি, নাড়–-আর নকুলদানা, মোয়া-কদমা আইসক্রিম আর নুডলসের ভ্যানের পাশে বেশি ডাট মেরেই হাজির হয়।
এই চৈত্রে যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের মহাসমাবেশ দেখে বুক জুড়িয়ে গিয়েছিল,  তেমনি দিনের পর দিন হরতাল, বোমাবাজি, অগ্নিসংযোগ আর এই সংস্কৃতিতে নতুন যোগ রেলগাড়ির পাত তুলে নেওয়া। টান-টান উত্তেজনা, টেনশন, সন্দেহ-অবিশ্বাস সর্বত্রই বিশ্বাস ও আস্থার অভাব প্রতিপক্ষের বক্তব্য শোনারও ফুরসত নেই কারওÑ রাজনীতির এই হাল বিস্মিত বিমূঢ় জনগণ অবলোকন করতেও বাধ্য হচ্ছে। মরছে তো রিকশা-শ্রমিক আর হরতালের আওতামুক্ত চা-খানার খেটে খাওয়া ছেলেটিই। মরার ফাঁদ পাতা হয়েছিল রেলযাত্রীদের জন্যই। এতে কারা লাভবান হবেন? সমাজ-বিরোধীদের এই সুযোগটাই নিচ্ছে বিশ্বায়নের এই প্রহরে আকাশ-সংস্কৃতির প্রবল দাপটের মধ্যে আমাদের সামনে এসেছে পহেলা বৈশাখ। শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সবাইকেই নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাই। এই বছরটি  যেন ভালোয়-ভালোয় কাটে আমাদের। যারা অসুস্থ, রোগ-শোকে কাতরÑ তারা যেন আরোগ্য লাভ করেন, যাদের কপালে দুশ্চিন্তার গাঢ় প্রলেপ, তা মুছে গিয়ে প্রসার ঘটুক, মনে-প্রাণে তা কামনা করি। পহেলা বৈশাখ আমাদের জাতীয় উৎসব। নববর্ষের শুভেচ্ছা।

ছবি : গাজী মুনছুর আজিজ


পাঠক কমছে; কিন্তু সেটা কোনো
দুই বাংলার জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। অন্যদিকে বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক
বিস্তারিত
মনীষা কৈরালা আমি ক্যান্সারের প্রতি কৃতজ্ঞ,
ঢাকা লিট ফেস্টের দ্বিতীয় দিন ৯ নভেম্বরের বিশেষ চমক ছিল
বিস্তারিত
এনহেদুয়ান্নার কবিতা ভাষান্তর :
  যিশুখ্রিষ্টের জন্মের ২২৮৫ বছর আগে অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৪ হাজার
বিস্তারিত
উপহার
  হেমন্তের আওলা বাতাস করেছে উতলা। জোয়ার এসেছে বাউলা নদীতে, সোনালি
বিস্তারিত
সাহিত্যের বর্ণিল উৎসব
প্রথম দিন দুপুরে বাংলা একাডেমির লনে অনুষ্ঠিত হয় মিতালি বোসের
বিস্তারিত
নিদারুণ বাস্তবতার চিত্র মান্টোর মতো সাবলীলভাবে
এ উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ভারতের প্রখ্যাত পরিচালক নন্দিতা দাস
বিস্তারিত