মওলানা রুমির মসনবি শরিফ

জীবনের সঞ্চয় মৃত্যুর ওপারে

মসনবি শরিফের এই গল্প বীরকেশরি হজরত হামজা (রা.) কে নিয়ে। তার নাম হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশেম। তার উপাধি সাইয়িদুশ শোহাদা। তিনি হজরত নবী করিম (সা.) এর চাচা। নবুয়তের দ্বিতীয় সালে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তার ইসলাম গ্রহণের ফলে সেই ভয়ানক দিনগুলোতে মুসলমানদের মাঝে নতুন প্রাণচাঞ্চল্যের সঞ্চার হয়েছিল। কারণ, তিনি ছিলেন আরব বীর, বিচক্ষণ এবং অত্যন্ত প্রভাবশালী কোরাইশ নেতা। তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সর্বপ্রথম পতাকাধারী। যুদ্ধের মাঠে তার চিহ্ন ছিল বুকে ঝোলানো উটপাখির পালক। বদরের যুদ্ধে তিনি দুটি তরবারি নিয়ে লড়াই করেন। হিজরি দ্বিতীয় সালে ওহুদের যুদ্ধে ৫৮ বছর বয়সে এই বীরকেশরি শাহাদতবরণ করেন। ওহুদ যুদ্ধের মাঠেই তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত। (উসুদুল গাবা, ২খ. পৃ. ৪৬ ও সীরাতে ইবনে হিশাম, পৃ. ২৬২ এর বরাতে শরহে জামে মসনবি মানবী, ৩খ. পৃ. ৮৭৪)।
মওলানা রুমি উপস্থাপিত এই গল্পের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে, হজরত হামজা (রা.) শেষ জীবনে যুদ্ধের সময় বর্ম পরিধান করতেন না। আল্লাহর সঙ্গে মিলনের প্রেমে পাগলপারা হয়ে শাহাদতের তামান্না নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। আসল ব্যাপার হচ্ছে, মওলানা রুমি তার সৃষ্টিশীল মননের সৌন্দর্য মেখে নানা ঘটনার সূত্রপাত ঘটান। নানা ব্যক্তিত্ব ও চরিত্রকে কেন্দ্র করে নিজের চিন্তা দর্শন উপস্থাপন করেন। পুরো মসনবি শরিফে এই নিয়মের ভূরি ভূরি কাহিনী এর সাক্ষী। মনে রাখতে হবে, মওলানার উদ্দেশ্য ঘটনার বিবরণ দেওয়া বা ইতিহাসের তথ্য বিশ্লেষণ নয়, তিনি নানা চরিত্র সৃষ্টি করে বা কাহিনীর নানা পট সাজিয়ে তার নিজস্ব দর্শন ব্যাখ্যা করেন। এই কাহিনিতেও মওলানা তার দর্শন উপস্থাপন করেছেন অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী আবেদন নিয়ে। সেই দর্শন হচ্ছে মহান আল্লাহর সঙ্গে মিলনের আকাক্সক্ষায় জাহেরি মৃত্যুকে তুচ্ছ জ্ঞান করা, মৃত্যুর পারাপারের ওপারে আসল জীবনের সন্ধান দেওয়া। 
মওলানা বলেন, হজরত হামজা (রা.) শেষ জীবনে খোলা বক্ষে, বর্ম না পরে আগে আগে তরবারি হাতে ঝাঁপিয়ে পড়তেন রণাঙ্গনে। লোকেরা প্রশ্ন করল, ওহে নবীজির চাচা! আপনি এভাবে যুদ্ধের মাঠে যাচ্ছেন, এ তো ‘তাহলাকা’ আত্মাহুতি দেওয়ার শামিল। কোরআন মজিদে তো আল্লাহ পাক বলেছেন, ‘তোমরা নিজেদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না।’ আপনি কেন নিজেকে এভাবে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন? আপনি যখন তরুণ ছিলেন, বর্ম পরিধান না করে যুদ্ধের মাঠে অবতীর্ণ হতেন না। আর এখন বার্ধক্যে এভাবে উন্মুক্ত বক্ষে তরবারি নিয়ে খেলছেন। শত্রুর তরবারি আর তির তো আঘাত করতে যুবক বৃদ্ধ পরখ করে না।   
শুভাকাক্সক্ষীদের এ জাতীয় সহমর্মিতার জবাবে তিনি বলেন, আমি যখন যুবক ছিলাম তখন মনে করতাম মৃত্যু মানে এই জগৎ থেকে চিরবিদায়। মৃত্যুই জীবনের শেষ পরিণতি। ঢাল-তলোয়ার ছাড়া মৃত্যুর আজদাহার মুখে ঝাঁপিয়ে পড়তে কে আগ্রহী হবে? কিন্তু মুহাম্মদ (সা.) এর সাহচর্যের বরকতে আমার চিন্তাধারা সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। আমার ইন্দ্রিয় অনুভূতির ওপ্রান্তে আমি আল্লাহর নূরের সিপাহিদের দেখতে পাচ্ছি, তারা আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। কাজেই মৃত্যু আমার কাছে জীবনের পরিসমাপ্তি নয়। যে মনে করে যে, মৃত্যু মানে ধ্বংস হয়ে যাওয়া সে ‘তোমরা নিজেদের ধ্বংসের কবলে নিক্ষেপ করো না’ এর দোহাই দেয়। কিন্তু মৃত্যুর অর্থ যার কাছে প্রকৃত জীবনের দুয়ার খুলে যাওয়া সে ‘সারেউ.’ এর আহ্বান শুনতে পায়। আল্লাহ পাক এরশাদ করেন, ‘তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও, তোমাদের প্রতিপালকের অবারিত মাগফেরাত ও জান্নাতের দিকে, যার প্রশস্ততা আসমানসমূহ ও জমিনের সমান, যা তৈরি করা হয়েছে মুত্তাকিনদের জন্য।’ (সূরা আলে ইমরান : ১৩৩)। 
আস-সালা আই লুতফ বীনান এফরাহু
আল-বালা আই কাহর বীনান ইতরাহু
ওহে যারা  মৃত্যুতে আল্লাহর  দয়া দেখো, এসে যাও
যারা  মৃত্যুকে মুসিবত জানো, দুঃখে জড়োসড়ো হও।
জেয়াফত সম্মুখে, যারা দৈহিক মৃত্যুতে আল্লাহর দয়ামিশ্রিত বলে মনে করো, আনন্দিত মনে জেয়াফতে হাজির হও, সবাই এসে যাও। আর যারা মনে করো যে, দৈহিক মৃত্যু মানে আল্লাহর কহর ও গজব, তারা দূর হও, দুঃখভারাক্রান্ত থাক। 
যে কেউ মৃত্যুকে ইউসুফ (আ.) এর মতো মনে করে, সে তার জন্য জান কোরবান করতে দ্বিধা করে না। আর যাদের  কাছে মৃত্যু মানে নেকড়ের পাঞ্জা তারা হেদায়েতের পথ থেকে বিচ্যুত হয়। 
মওলানা মৃত্যুকে নিয়ে এই ভিন্ন উপলব্ধির কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, 
মর্গে হার কাস আই পেসার হামরঙ্গে উস্ত
পীশে দুশমন দুশমন ও  বর দূস্ত দূস্ত 
প্রত্যেকের মৃত্যু তার নিজ ব্যক্তিত্বের একই রূপ
হাকিকতের দুশমনের দৃষ্টিতে দুশমন, বন্ধুর বন্ধু।
তুমি যে মৃত্যুকে ভয় পাও, ভালোভাবে চিন্তা করলে বুঝতে পারবে যে, তুমি আসলে নিজেকেই ভয় পাও। কেননা, মৃত্যুর উদাহরণ আয়নার মতো। মৃত্যুর মুখোমুখি হলে প্রত্যেকের স্বরূপ প্রকাশিত হয়ে যায়। কাজেই মৃত্যুর আয়নার সামনে সাদা চামড়ার মানুষের চেহারা খুবই  সুন্দর আর কুৎসিত কাফ্রির সামনে আয়না মলিন কদাকার দেখায়। মৃত্যু আসলে তোমাকেই তোমার সামনে প্রকাশ করে দেয়। তুমি যদি মৃত্যুকে খারাপ মনে করো তার কারণ তোমার আত্মিক অবস্থা ও প্রকৃত ব্যক্তিত্ব কুৎসিত কদাকার। তাই তুমি নিজের কাছ থেকেই পালিয়ে যেতে চাও, মৃত্যু থেকে নয়। কেননা, মৃত্যু অস্তিত্ব জগতে একটি পূর্ণতার বিবর্তন ছাড়া অন্যকিছু নয়। তোমার আত্মিক অবস্থা যদি কদাকার ও ভয়ানক থাকে তুমি মৃত্যুকে কদাকার ও ভয়ংকররূপে দেখবে। ভালো হোক বা মন্দ তা তোমার ভেতর থেকেই জন্ম নিয়েছে।
প্রশ্ন আসতে পারে মানুষের কর্মই যদি তার ফলাফল নির্ণয় করে, তাহলে কর্ম ও ফলাফল এক রকম হয় না কেন। মওলানা জবাব দেন, শ্রমিক পরিশ্রমের বদলে মজুরি পায়। কিন্তু শ্রম আর মজুরি কি এক রকম হয়? তিনি ব্যভিচারের শাস্তি ১০০ ঘা চাবুকের উদাহরণ টেনে বলেন, শুক্রবিন্দু ও শাস্তির চাবুকের মধ্যে কীসের সাদৃশ্য আছে? তিনি বলেন, মুসা (আ.) এর হাতের লাঠির অলৌকিকত্বের কথা শুনে আমরা অবাক হয়ে যাই; কিন্তু নিজের মধ্যে যে এর চেয়ে বড় অলৌকিকত্ব লুকায়িত তার কথা ভুলে যাই। মানুষের শুক্রবিন্দুর কথাই ধরা যাক, তা নাপাক, হীন, তুচ্ছ। কিন্তু এই নাপাক পানি থেকেই তো আমাদের সন্তান জন্ম নেয়, সে তো আমার কাছে মুসা (আ.) এর লাঠির চেয়েও দামি ও মূল্যবান হতে পারে। এখন সিদ্ধান্ত আমাকেই নিতে হবে যে, এ ধরনের নেয়ামত থেকে আমার ভবষ্যিৎ জীবনের জন্য কী লাভ করতে চাই।
কর্ম ও ফল দেখতে এক রকম হয় নাÑ এ কথা বোঝানোর জন্য মওলানা উপমার পর উপমা দিয়ে বলেন, এই জগতে আমরা যে সিজদা ও রুকুর বীজ বপন করি, তাতে ওই জগতে জান্নাত কাননের চারাগাছ জন্মায়। হাদিস শরীফে বর্ণিত, নবীজি বলেন, তোমরা বেশি বেশি বেহেশতের চারাগাছ লাগাও। লোকেরা জিজ্ঞাসা করল, ইয়া রাসুলুল্লাহ! বেহেশতের চারাগাছ কী? তিনি বললেন, আত তাসবিহ ওয়াত তাহলিল। (সুবহানাল্লাহ ও লাইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা)। তোমার মুখ দিয়ে যদি আল্লাহর হামদ ও প্রশংসা নির্গত হয় সেগুলোকে আল্লাহ বেহেশতের একেকটি পাখিতে পরিবর্তিত করেন। তোমার হাত দিয়ে যদি দান-দক্ষিণা ও জাকাত সম্পন্ন হয় ওই জগতে আল্লাহ সেগুলোকে খেজুরবৃক্ষে রূপান্তরিত করেন।  ইবাদত-বন্দেগি ও আল্লাহর পথে অবিচলতায় তুমি যে ধৈর্য ধারণ করো তা বেহেশতে ঝরনায় পরিবর্তিত হয়। বেহেশতে যে মধু ও দুধের নহরের কথা বলা হয়েছে, তা মূলত আল্লাহ ও আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি তোমার ভালোবাসার পাস্তুরিত রূপ। ইবাদত-বন্দেগির জন্য তোমার মনের প্রবল বাসনা প্রেরণা ওপারে তোমার জন্য মধুর ঝরনাধারায় পরিণত হয়। লক্ষ্য করো, পরকালে ফলাফল লাভের যে কারণগুলো তুমি ইহকালে আঞ্জাম দিয়েছ, সেই কারণগুলোর নিয়ন্ত্রণ তোমার হাতেই ছিল। ইবাদত-বন্দেগি করা না করা, আল্লাহর হুকুম মানা না মানার স্বাধীনতা তোমাকে দেয়া হয়েছিল। ঠিক এসব কারণের ফলাফলের নিয়ন্ত্রণও আখেরাতে তোমার হাতে দেওয়া হবে। চারটি ঝরনা তোমাকে দেওয়া হবে যেদিকে ইচ্ছা প্রবাহিত করতে পারবে। উদাহরণস্বরূপ তোমার শুক্রবিন্দুর নিয়ন্ত্রণ তোমার হাতে দেওয়া হয়েছে। তার ফলাফল অর্থাৎ তোমার সন্তানও বড় হয়ে তোমার অনুগত হবে। তোমার ভবিষ্যৎ জীবনকে আলোকিত করবে। বস্তুত এই দুনিয়ায় সৎগুণাবলি তোমার নিয়ন্ত্রণে ছিল। পরকালে সেসবের প্রতিক্রিয়া ও কর্মফলের নিয়ন্ত্রণও তোমার এখতিয়ারে প্রদান করা হবে। (অসমাপ্ত) 
(মওলানা রুমির মসনবি শরিফের গল্প, 
৩খ. বয়েত-৩৪১৯-৩৪৭০)


বায়তুল মুকাদ্দাসজয়ী সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি
এ বিজয়ের ফলে প্রায় ৯০ বছর পর ক্রুসেডারদের অত্যাচার থেকে
বিস্তারিত
জামাতে নামাজ আদায়ের ৩০টি বিশেষ
হাফেজ আসকালানি (রহ.) এককভাবে নামাজ আদায় করার চেয়ে জামাতে  নামাজ আদায়
বিস্তারিত
মাজহাব বিষয়ে ইবনে তাইমিয়া (রহ.) এর
শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) ছিলেন হিজরি সপ্তম শতাব্দীর
বিস্তারিত
আপনিও লিখুন
প্রিয় পাঠক আপনি নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন, আলোকিত বাংলাদেশই একমাত্র দৈনিকÑ যা
বিস্তারিত
শাবান মাসের মর্যাদা সম্পর্কে সজাগ
শাবান যেহেতু রমজানের প্রস্তুতিমূলক মাস, তাই মুসলিম ব্যক্তির উচিত রমজানের চেষ্টা-সাধনার
বিস্তারিত
ধরিত্রী সংরক্ষণে ইসলাম
ধরিত্রী তথা আমাদের বিশ্ব পরিবেশ রক্ষা করতে কোরআন যথেষ্ট গুরুত্ব
বিস্তারিত