শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচার উপায়

শয়তান মানুষের চরম দুশমন। মানুষকে বিভিন্ন উপায়ে কুমন্ত্রণা দিয়ে পথভ্রষ্ট করাই তার একমাত্র কাজ। আদম (আ.) কে সেজদা করার হুকুম অমান্য করার অপরাধে আল্লাহ তায়ালা যখন শয়তানকে তাঁর মহান দরবার থেকে বিতাড়িত ঘোষণা করলেন, তখন থেকেই মানুষের প্রতি তার চরম বিদ্বেষ ও শত্রুতা সৃষ্টি হয়। তখনই সে মানুষকে বিপথগামী করার দৃঢ়সংকল্প গ্রহণ করেছিল। সে আল্লাহর উদ্দেশে বলেছিল, ‘আপনার ইজ্জতের কসম, আমি অবশ্যই তাদের সবাইকে বিপথগামী করে দেব। তবে আপনার মুখলেস বান্দাদের ব্যতীত।’ (সূরা সোয়াদ : ৮২-৮৩)।
উল্লেখিত আয়াতে বর্ণিত শয়তানের ঘোষণা অনুযায়ী সে আল্লাহ তায়ালার মুখলেস বান্দাদের কুমন্ত্রণা দিয়ে পথভ্রষ্ট করতে পারবে না। আল্লাহর মুখলেস বান্দা হলো তারা, যাদের মধ্যে ইখলাস রয়েছে। আর ইখলাস হলো একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই তাঁর আনুগত্য করা এবং একমাত্র তাঁর শাস্তির ভয়েই পাপকাজ থেকে বেঁচে থাকা। তাই শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচতে প্রত্যেকের মধ্যে ইখলাস থাকা জরুরি।
শয়তান কীভাবে মানুষকে পথভ্রষ্ট করবে তা-ও সে সেদিন সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিল। সে বলেছিল, ‘আপনি আমাকে যেমন পথভ্রষ্ট করেছেন, আমিও অবশ্যই তাদের জন্য আপনার সরলপথে ওতপেতে বসে থাকব। এরপর তাদের কাছে আসব তাদের সামনের দিক থেকে, পেছন দিক থেকে, ডান দিক থেকে এবং বাম দিক থেকে। আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না।’ (সূরা আরাফ : ১৬-১৭)।
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে এ আয়াতের তফসিরে বর্ণিত হয়েছে, শয়তানের ‘সামনের দিক থেকে আসব’ কথাটির অর্থ আমি তাদের আখেরাতের ব্যাপারে সন্দেহ সৃষ্টি করব। ‘পেছন দিক থেকে আসব’ অর্থ আমি তাদের অন্তরে দুনিয়ার মোহ সৃষ্টি করব। ‘ডান দিক থেকে আসব’ অর্থ আমি তাদের ধর্মের বিধিনিষেধের প্রতি সন্দিহান করে তুলব। ‘বাম দিক থেকে আসব’ অর্থ আমি পাপ কাজকে তাদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলে ধরব। (তাফসিরে মাজহারী)।
শয়তান তার প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী সর্বপ্রথম মানবজাতির আদি পিতা ও আদি মাতা আদম (আ.) এবং হাওয়া (আ.) কে কুমন্ত্রণা দিয়ে অত্যন্ত কৌশলে আল্লাহর নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করিয়েছিল। সে মিথ্যা বলে তাদের ধোঁকা দিয়েছিল। সে বলেছিল, ‘তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের এ বৃক্ষ থেকে নিষেধ করেননি; তবে তা এ কারণে যে, তোমরা না আবার ফেরেশতা কিংবা চিরজীবী হয়ে যাও।’ (সূরা আরাফ : ২০)।
শয়তানের কুমন্ত্রণায় পড়ে যখন তারা আল্লাহর নিষিদ্ধ গাছের ফল ভক্ষণ করল, তখন তাদের জান্নাতি পোশাক শরীর থেকে খসে পড়ে এবং জান্নাত থেকে তাদের বের করে দেওয়া হলো। মানুষ যেন এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে শয়তানের কুমন্ত্রণায় পড়ে পথভ্রষ্ট না হয় এজন্য আল্লাহ তায়ালা সবাইকে সতর্ক করে বলেন, ‘হে বনি আদম, শয়তান যেন তোমাদের বিভ্রান্ত না করে, যেমন সে তোমাদের পিতা-মাতাকে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছে এ অবস্থায় যে, তাদের পোশাক তাদের থেকে খুলিয়ে দিয়েছে, যাতে তাদের লজ্জাস্থান দেখিয়ে দেয়। সে এবং তার দলবল তোমাদের দেখে, যেখান থেকে তোমরা তাদের দেখ না। আমি শয়তানদের তাদের বন্ধু করে দিয়েছি, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে না।’ (সূরা আরাফ : ২৭)।
শয়তান মানুষের মাঝে রক্তের মতো চলাচল করে। সে সবসময় মানুষের অন্তরে বিভিন্ন কুমন্ত্রণা সৃষ্টি করে। কিন্তু মানুষ শয়তানকে দেখতে পায় না। তাই শয়তানকে এ থেকে বাধা দিতে পারে না। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ মানুষকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচাতে পারে না। এ ব্যাপারে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা জরুরি। আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘আর যদি শয়তান তোমাকে কুমন্ত্রণা দেয়, তাহলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করো। তিনিই শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী।’ (সূরা আরাফ : ২০০)।
শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচার একটি প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে আল্লাহর জিকির। যারা সর্বদা আল্লাহর জিকির করে তারা শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে মুক্তি পায়। পক্ষান্তরে যারা আল্লাহর জিকির থেকে গাফেল হয় শয়তান তাদের বিভিন্ন কুমন্ত্রণা দিয়ে বিভ্রান্ত করে। এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘শয়তান বনি আদমের কলবের মধ্যে সর্বদা লেগে থাকে। যখন সে আল্লাহর জিকির করে শয়তান চলে যায়। পক্ষান্তরে যখন আল্লাহ জিকির থেকে গাফেল হয়, তখন শয়তান তাকে কুমন্ত্রণা দেয়।’ (মেশকাত : ২২৮১)।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে এ ব্যাপারে বলেন, ‘যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর জিকির থেকে বিমুখ হয় আমি তার জন্য এক শয়তান নিয়োজিত করে দিই, অতঃপর সে-ই হয় তার সঙ্গী। শয়তানরাই মানুষকে সৎপথে বাধা দান করে, আর মানুষ মনে করে যে, তারা সৎপথে রয়েছে। অবশেষে যখন সে আমার কাছে আসবে, তখন সে শয়তানকে বলবে, হায়, আমার ও তোমার মধ্যে যদি পূর্ব-পশ্চিমের দূরত্ব থাকত। কত হীন সঙ্গী সে।’ (সূরা জুখরুফ : ৩৬-৩৮)।
উল্লেখিত আয়াতগুলো থেকে প্রমাণিত হয়, যারা আল্লাহর জিকির থেকে বিমুখ হয় শয়তান তাদের সবসময়ের সঙ্গী হয়ে যায়। সে তাদের কুমন্ত্রণা দিয়ে সৎকর্ম থেকে বিরত রাখে এবং অসৎকর্ম তাদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলে ধরে। কিন্তু সে শয়তানের ধোঁকায় পড়ে নিজেকে সঠিক পথের অনুসারী বলে মনে করে। যখন সে আল্লাহর দরবারে বিচারের সম্মুখীন হবে, তখন শয়তান তার সঙ্গী হওয়ার কারণে আফসোস করতে থাকবে। তাই শয়তান যেন আমাদের সঙ্গী হয়ে পথভ্রষ্ট করতে না পারে এজন্য আল্লাহর কাছে শয়তানের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা এবং বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করা কর্তব্য। তাহলে আশা করা যায়, আল্লাহ তায়ালা আমাদের শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা করবেন ইনশাআল্লাহ।


সর্বদা আল্লাহর পর্যবেক্ষণের কথা মনে
পূর্বসূরি এক বুজুর্গকে বলা হয়েছিল, দৃষ্টি অবনত রাখতে আমি কীসের
বিস্তারিত
কোরআনে বর্ণিত নবী-রাসুলদের দোয়া
কোরআন ও হাদিসে অনেক নবির দোয়া বর্ণিত হয়েছে। দোয়াগুলো অত্যন্ত
বিস্তারিত
আশুরা ও কারবালা
মহরম মাসের দশ তারিখ আশুরা দিবস হিসেবে সুপরিচিত। এ দিনে
বিস্তারিত
আশুরার আমল কী ও কেন
আগামীকাল শুক্রবার আশুরা। শুক্রবার ও আজ বৃহস্পতিবার আশুরার সুন্নত রোজা।
বিস্তারিত
আশুরা ও কারবালার চেতনা
আশুরার দিন তিনি সেনাপতির মতো শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যূহ রচনা করেন।
বিস্তারিত
মেঘ নেমেছে কাশবনে
মুগ্ধ হয়ে দেখি শরতের মনকাড়া এসব রূপের বাহার। আশ্চর্য হয়ে
বিস্তারিত