ভক্তপুরের ভক্ত হলাম গাজী মুনছুর আজিজ

ভক্তপুর নেপালের সাংস্কৃতিক শহর। নেপালের প্রাচীন রাজধানীও। ১২ শতকে যাত্রা করা এ শহরে যখন পা রাখি তখন ঘড়ির কাঁটা সকাল ১০টার ঘরে। ১ বছরের মাথায় দ্বিতীয়বারের মতো প্রবেশ এ শহরে। এবারের ভ্রমণসঙ্গী সাইক্লিস্ট আবুল হোসেন আসাদ। নেপালের মানচিত্র অনুযায়ী কাঠমান্ডু থেকে এ শহরের দূরত্ব প্রায় ১৩ কিলোমিটার। এ শহর ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতিও পেয়েছে। শহরে প্রবেশের টিকিটের সঙ্গে এখানকার পরিচিতিমূলক একটি মানচিত্র দিয়েছে। সে মানচিত্র হাতেই ঘুরতে শুরু করি।
প্রাচীন অনেক স্থাপনায় সমৃদ্ধ এ শহর। মূলত এসব স্থাপনা মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয় ও নেপালের প্রাচীন রাজাদের প্রাসাদ। আর রাজারা বসবাস করতেন বলেই মন্দির বা উপাসনালয়গুলো নির্মাণ করা হয়েছে। পরিচিতিমূলক মানচিত্রে কোথায় কোন মন্দির বা স্থাপনা আছে তার নির্দেশনা রয়েছে। সে নির্দেশনা অনুযায়ী প্রথমেই আসি এখানকার জাতীয় চিত্রকলা জাদুঘরে। এ জাদুঘর ভবনও প্রাচীন স্থাপনাগুলোর একটি। শহরে ঢুকেলে হাতের বাঁ পাশেই এ জাদুঘর। নেপালের ঐতিহ্যবাহী চিত্রকলা স্থান পেয়েছে এ জাদুঘরের ছোট-বড় ক্যানভাসে। সঙ্গে আরও আছে অন্য শিল্পকর্ম ও নানা ঐতিহ্যের নিদর্শন।  কিছুক্ষণ ঘুরে বের হয়ে আসি আরেকটি প্রাচীন ভবনে। এটি জাদুঘরের পাাশেই। এখানে স্থান পেয়েছে নেপালের প্রাচীন রাজাদের ছবি। এখান থেকে বের হয়ে ঘুরতে শুরু করি শহরের অলিগলি।
শহরের স্থাপনাগুলো কোনোটা দোতলা, কোনোটা তিনতলা, কোনোটা চারতলা আবার কোনোটা ১০ বা ১২ তলার সমান উঁচুও হবে। কিছু স্থাপনা দোচালা, কিছু চৌচালা। আবার কিছু স্থাপনা পিরামিডের মতো বেশ কয়েকটি ধাপে ধাপে উপরের দিকে উঠে গেছে। প্যাগোডা আকৃতির কিছু স্থাপনাও আছে। তবে এখানকার সব স্থাপনাতেই ইট বা ক্রংক্রিটের সঙ্গে কাঠের নান্দনিক কারুকার্য রয়েছে। বিশেষ করে এখানকার সব স্থাপনার জানালা, দরজা বা বারান্দার রেলিংই কাঠের। কাঠের এ জানালা, দরজা বা রেলিংয়ের গ্রিল নিখুঁতভাবে খোদাই করে নকশা করা। আর এসব নকশায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ফুল, পাখি, বিভিন্ন মূর্তি বা জ্যামিতিক অবয়ব। শুধু জানালা দরজা নয়, স্থাপনার বিভিন্ন অংশেই রয়েছে কাঠের কারুকার্যের সংমিশ্রণ, যা স্থাপনার সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। সূক্ষ্ম এসব নকশা দেখে সত্যিই বিস্ময় জাগে সে সময়ের দক্ষ কারিগরদের শৈল্পিক মনোভাবের কথা ভেবে। এছাড়া কাঠের কারুকার্যের পাশাপাশি এখানকার প্রায় সব স্থাপনার প্রবেশদ্বারে রয়েছে পাথরসহ বিভিন্ন মাধ্যমের নির্মাণ করা ছোট-বড় আকৃতির হাতি, ঘোড়াসহ বিভিন্ন মূর্তি বা ভাস্কর্য। কিছু মূর্তি বা ভাস্কর্য আবার কাঁসা-পিতলের তৈরি। এসব মূর্তি বা ভাস্কর্যও প্রমাণ করে সে সময়কার কারিগরদের শৈল্পিক দক্ষতার কথা। বলা যায়, কাঠের নান্দনিক কারুকার্য আর এসব মূর্তি বা ভাস্কর্যই এখানকার স্থাপনার প্রধান বৈশিষ্ট্য। 
শহরের অলিগলিগুলো নানা দেশের পর্যটকের ভিড়ে মুখরিত। এছাড়া শহরের অলিগলিতে বেশকিছু রেস্টুরেন্ট, আবাসিক হোটেল, নেপালের ঐতিহ্যবাহী পণ্য, পর্যটন স্মারক ও আর্ট গ্যালারি বা চিত্রকলার দোকান আছে। নেপালের ঐতিহ্যবাহী পণ্যগুলোর মধ্যে আছে নানা রঙের পুঁথি বা পাথরের গহনা, কাঁসা-পিতল বা বিভিন্ন ধাতুর তৈরি গহনা, কাঁসা-পিতলের বিভিন্ন মূর্তি, বাটি-গ্লাস, মুখোশ, খুরকি (এক ধরনের খাপওয়ালা ছুরি) ইত্যাদি। এখানকার মানুষ এক ধরনের লম্বা টুপি পরে। সে টুপিও আছে দোকানগুলোতে। পর্যটন স্মারকের মধ্যে আছে নেপালের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা বা দর্শনীয় স্থানের ছবিসংবলিত টি-শার্ট, মগ, রেপ্লিকা, চাবির রিং, পোস্টার, ভিউকার্ড ইত্যাদি। এছাড়া চিত্রকলার দোকানগুলোতে নেপালের ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন চিত্রকর্ম বা নেপালের দর্শনীয় স্থানের চিত্রকর্ম রয়েছে। কিছু চিত্রকলার দোকানে দেখি শিল্পী ক্যানভাসে ছবি আঁকছেন। এছাড়া কৃষি ও বয়নশিল্পের জন্য এখানকার সুনাম রয়েছে। সে জন্য অনেক দোকানে নানা ধরনের বয়নশিল্প রয়েছে। এসব দোকান বা রেস্টুরেন্টেও আছে পর্যটকের ভিড়। কিছু দোকানে আমরাও ঘুরি। শহরের কিছু মন্দিরে এখনও পূজা-পার্বণের আয়োজন হয়। দেখি একটি মন্দিরের সামনে পূজার আয়োজন চলছে। গাছের পাতার পাত্রে সাজানো কলা, ফুলসহ বিভিন্ন উপকরণ। কয়েকটি ইট দিয়ে তার মধ্যে আগুন জ্বালানো হয়েছে। সেই আগুনের চারপাশে রাখা হয়েছে গাছের পাতার পাত্রে সাজানো বিভিন্ন উপকরণ। পাশেই চলছে পূজার অন্য কার্যক্রম।
শহরের বেশকিছু স্থাপনা ২০১৫ সালের ভূমিকম্পে পুরোপুরি ভেঙে গেছে। কিছু স্থাপনার আংশিক ক্ষতি হয়েছে। এসব স্থাপনার সংস্কারের কাজও চলছে। মানচিত্রের নির্দেশনা অনুযায়ী ঘুরে ঘুরে দেখি এখানকার তামুধি তোল গেট, তাপলা মন্দির, ভৈরবনাথ মন্দির, তিন মহাদেব নারায়ণ মন্দির, ভাতশলা দুর্গা মন্দির, রাজভবন, গোল্ডেন গেট, সিদ্ধিলক্ষ্মী মন্দির, ফাসিদেগা মন্দির, ভীমসেন মন্দির, তাচুপাল জাদুঘর, হনুমানধোকা, পশুপতি মন্দির, কমলপোখারি, জগন্নাথ মন্দির, বিগবেল, পঞ্চান্ন জানালা, এলিফ্যান্টস মন্দির, উগরাচান্দি, ভৈরব মূর্তি, রাজা ভূপতিন্দ্র মাল্লার কলাম, তেলেজু ঘণ্টা, রাজভবন, চায়াসিলিন ম-পসহ শহরের অন্য স্থাপনাগুলো।
বেশ কিছুক্ষণ ঘুরে একটু বিশ্রামে বসি ছোট্ট একটি রেস্টুরেন্টে। গরম গরম জিলাপি খাই। আমাদের জিলাপির মতোই। তারপর চোখ বুলাই হাতে থাকা পরিচিতিমূলক মানচিত্রে। ভক্তপুরের ইতিহাস অনুযায়ী ১২ শতকের দিকে রাজা আনন্দ মাল্লা প্রতিষ্ঠা করেন এ শহর। মাল্লা রাজবংশের রাজা ইয়াকশা মাল্লার (১৪২৮-১৪৮২) শাসনকালে গড়ে ওঠে এ শহরের অধিকাংশ স্থাপনা। সতেরো শতকের রাজা ভূপতিন্দ্র মাল্লা ছিলেন ধর্মপ্রাণ। তার সময়ে স্থাপিত হয় এ শহরের ধর্মীয় স্থাপনাগুলো। ভূপতিন্দ্র মাল্লার শাসনকালে এখানে ছিল প্রায় ১৭২টি মন্দির। অবশ্য ১৯৩৪ সালের এক ভূমিকম্পে এ শহরের অনেক ক্ষতি হয়। 
প্রাচীন শহর, নান্দনিক স্থাপনা, কাঠের কারুকার্যÑ সব মিলিয়ে বিস্ময়ের শহর এ ভক্তপুর। সত্যিই ভক্ত হলাম এ ভক্তপুরের। হ

ছবি : লেখক


আরব ছোটগল্পের রাজকুমারী
সামিরা আজ্জম ১৯২৬ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ফিলিস্তিনের আর্কে একটি গোঁড়া
বিস্তারিত
অমায়ার আনবেশে
সাদা মুখোশে থাকতে গেলে ছুড়ে দেওয়া কালি  হয়ে যায় সার্কাসের রংমুখ, 
বিস্তারিত
শারদীয় বিকেল
ঝিরিঝিরি বাতাসের অবিরাম দোলায় মননের মুকুরে ফুটে ওঠে মুঠো মুঠো শেফালিকা
বিস্তারিত
গল্পের পটভূমি ইতিহাস ও বর্তমানের
গল্পের বই ‘দশজন দিগম্বর একজন সাধক’। লেখক শাহাব আহমেদ। বইয়ে
বিস্তারিত
ধোঁয়াশার তামাটে রঙ
দীর্ঘ অবহেলায় যদি ক্লান্ত হয়ে উঠি বিষণœ সন্ধ্যায়Ñ মনে রেখো
বিস্তারিত
নজরুলকে দেখা
আমাদের পরম সৌভাগ্য, এই উন্নত-মস্তকটি অনেক দেরিতে হলেও পৃথিবীর নজরে
বিস্তারিত