বাঙলার রূপকার

‘আপনারা বই কিনলে আরও কী হবে জানেন? দেশের লেখকরা বই বিক্রি থেকে পয়সা পাবেন। দেশে একদল স্বাধীন-মত লেখক তৈরি হবে। তখন তারা যা ভাববেন তাই লিখতে পারবেন। দুর্বলের হয়ে, নিপীড়িতের হয়ে লড়াই করতে পারবেন। আপনাদের আশা-আকাক্সক্ষার আদর্শবাদের তারা রূপ দিতে পারবেন। দেশের অধিকাংশ লেখককে যদি জীবিকার জন্য সরকারের কোনো চাকরি করতে হয়, তবে সেই সরকার কোনো অবিচার করলেও লেখক দাঁড়াতে পারেন না। লেখক স্বাবলম্বী হলে সে তো আপনারই লাভ। সরকারের সমালোচনা করে আপনাকে তবে জেলে যেতে হবে না। লেখকের বইগুলি সেই কাজ করবে। রুশো, ভল্টেয়ারের লেখাগুলি তাদের দেশে মহাপরিবর্তন এনেছিল।’ Ñজসীমউদ্দীন
ষাটের দশকে জসীমউদ্দীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ঘুরতে যান, ঘুরে এসে লেখেন ‘যে দেশে মানুষ বড়’ ভ্রমণকাহিনিটি; প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ধনসাম্য কবি জসীমউদ্দীনকে মুগ্ধ করেছিল। উপরে উদ্ধৃত বাক্যাবলি তার গণচেতনার স্মারক। মৃত্যুর (১৯৭৬ সালের ১৩ মার্চ) কয়েক বছর আগে কবি জসীমউদ্দীনের চিন্তার এ বিবর্তন বেশ বিস্ময়কর।
সামগ্রিক বাঙলা কবিতার ইতিহাসে জসীমউদ্দীন পুরোপুরি স্বতন্ত্র প্রতিভা। জীবনানন্দ দাশ ও আল মাহমুদ বঙ্গীয় ভূখ-ের একই এলাকা নিয়ে কাজ করলেও ভাষিক প্রকাশে ও ভঙ্গিতে জসীমউদ্দীন একেবারেই আলাদা। মৌলিক কি না সেটি বিশেষ বিবেচনা ও বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে। তিনি জীবনের শুরুর একদশক বাদে প্রায় পুরোটাই শহরে কাটিয়েছেন; অর্থাৎ নাগরিক জীবনযাপন করে গেছেন। অথচ তার কবিতা তুলি বুলিয়েছে রুরাল ল্যান্ডস্কেপে। কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে বিএ পড়ার সময় তার যে কবিতাটি প্রকাশিত ও প্রবেশিকা পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত হয়, সেই বিখ্যাত ‘কবর’ কবিতাটিও অজপাড়াগাঁয়ের এক বৃদ্ধ কৃষকের জবানিতে তার স্বজন হারানোর হাহাকারকে উচ্চকিত করে; অর্থাৎ শুরু থেকেই জসীমউদ্দীন নিভৃত পল্লীর জনজীবনের দিকে দৃষ্টি  রেখেছিলেন। প্রথমে ফরিদপুর জেলা, তারপর কলকাতা ও কর্মজীবনের প্রায় পুরোটাই ঢাকায় বসবাসকারী কবি জসীমউদ্দীনের পক্ষে নাগরিক কবি হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল; অথচ তা না হয়ে তিনি হলেন আবহমান বাঙলার মহাকাব্যিক রূপকার; ‘পল্লীকবি’ অভিধাটি হয়ে থাকল তার চিরায়ত পরিচয়।
তিনি কাজ করেছেন সাহিত্যের নানা ক্ষেত্রে। কবিতা, নাটক, আত্মকথা, উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনি, সংগীত ও শিশুসাহিত্যÑ এ বিস্তৃত পটভূমিকায় জসীমউদ্দীনের কাজকে বিবেচনা ও মূল্যায়ন করা যায়। অবশ্য আজকের আলোচনা কাব্যচর্চা ও বাঙলা কবিতার ইতিহাসে তার অবস্থান নিয়ে।
তার গ্রন্থতালিকা দেখলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, তিনি শুধু কবিই ছিলেন না,  ছিলেন সামগ্রিক সাহিত্যকর্মী। কিন্তু অনুসন্ধানের বিষয় এই যে, নাগরিক জীবনযাপন করেও কাব্যচর্চার জন্য তিনি কেন বেছে নিলেন আবহমান গ্রামবাঙলা?
তিনি ১৯০৩ সালের ১ জানুয়ারি ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি যখন প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার প্রয়োজনে শহরে চলে আসেন, তখন তার পায়ের আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে এঁটেল মাটি লেগে আছে। জন্মভূমিকে তিনি ভালোবেসেছিলেন সেই শৈশবে। শৈশবের ভালোবাসা অনুভববেদ্য হয়ে ওঠে পরিণত যৌবনে। কলকাতা ইউনিভার্সিটি থেকে এমএ শেষ করে তিনি ড. দীনেশচন্দ্র সেনের সঙ্গে কাজ করেন লোকসাহিত্য সংগ্রাহক হিসেবে (১৯৩১ থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত)। পূর্ববঙ্গ গীতিকারেরও তিনি একজন সংগ্রাহক। দশ হাজারেরও বেশি লোকসংগীত সংগ্রহ করেছিলেন; তার কিয়দংশ স্বসম্পাদিত ‘জারি গান’ ও ‘মুর্শিদী গান’-এ স্থান পেয়েছে। আবহমান বাঙলাকে তিনি নিবিড় করে চিনেছিলেন সেই সংগ্রহ কর্মের সময়ই। পল্লীর অন্তঃসুর, সবুজ সতেজতা, অনাবিল আত্মীয়তা, মায়ার আবেশ কবির সংবেদনশীলতায় অনুভব করেছিলেন তিনি। হয়ে উঠেছিলেন গ্রামীণ জনজীবনের সবচেয়ে নিকট স্বজন, পল্লীর সুখ-দুঃখের অনুভবভাগী।
তার বিখ্যাত দুটি কাব্য ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ ও ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’; কাহিনিকাব্য। বাঙলা সাহিত্যে কাহিনিকাব্যের একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে। মধ্যযুগের কাব্যে বড়– চ-ীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’, মঙ্গলকাব্যের দীর্ঘায়ত ধারা, সুফি সাহিত্য, লাইলী-মজনু, শিরি-ফরহাদÑ সবই কাহিনিকাব্য এবং সেই কাহিনির প্রধান অনুষঙ্গÑ প্রেম। এ প্রেমকে মধ্যযুগের কবিরা পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার লীন হওয়ার আকাক্সক্ষা হিসেবে দেখালেও আধুনিক কবির কাব্যে এ প্রেম একেবারেই মানবিক, চিরায়ত নারীর জন্য চিরায়ত পুরুষের হাহাকার। ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’-এর নায়ক-নায়িকা রূপাই-সাজু ও ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’-এর নায়ক-নায়িকা সোজন-দুলি। ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ দুজন গ্রাম্য বালক-বালিকা রূপাই ও সাজুর প্রণয় ও বিরহের কাহিনিকাব্য, মোট ১৪টি ছোট ছোট দৃশ্যপট; আর ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ দুই ভিন্ন সমাজের কিশোর-কিশোরীর প্রণয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে ছোটবড় মোট ২২টি পরিচ্ছেদে। বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ও লেখক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ বইটির ভূমিকায় লিখেনÑ ‘এ লেখার মধ্য দিয়ে বাঙলার পল্লীজীবন আমার কাছে চমৎকার একটি মাধুর্যময় ছবির মতো দেখা দিয়েছে।’ অন্যদিকে কাব্য দুটি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূল্যায়ন অসাধারণ; ১. ‘জসীমউদ্দীনের কবিতার ভাব-ভাষা ও রস সম্পূর্ণ নতুন ধরনের। প্রকৃত কবির হৃদয় এ লেখকের আছে। অতি সহজে যাঁদের লিখবার ক্ষমতা নেই এমনতর খাঁটি জিনিস তাঁরা কখনোই লিখতে পারে না।’ ২. ‘তোমার সোজন বাদিয়ার ঘাট অতীব প্রশংসার যোগ্য। এই বই যে বাঙলার পাঠকসমাজে আদৃত হবে সে বিষয়ে আমার লেশমাত্র সন্দেহ নেই।’ বাঙলা সাহিত্যের মহামহিমের এহেন উৎসাহব্যঞ্জক মন্তব্য মাত্র সাতাশ বছরের একজন তরুণ কবির যে সাহস বাড়িয়ে দেয়Ñ সে বলাই বাহুল্য।
জসীমউদ্দীনের কবিতার সামগ্রিক পাঠে কাহিনি রচনার প্রতি তার দুর্বলতা টের পাওয়া যায়; এবং সেটি অবশ্যই প্রণয়ের গল্প। ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ ও ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ কাহিনিকাব্য দুইটি ছাড়াও অনেক খ- কবিতাতেই তিনি গল্প বলেছেন। চিরায়ত নর-নারীর হৃদয়ঘটিত সংশ্লেষ কাব্যিক মাধুর্যে প্রকাশ করেছেন অনবদ্য দক্ষতায়। গ্রামীণ মানুষের জীবনযাপন যতটা সরল, তার কবিতা ততটাই সহজাত প্রকাশভঙ্গিতে অনন্য হয়ে উঠেছে। আধুনিক কবিতার জটিলতা সেখানে প্রবেশ করেনি। হয়তো এ কারণেই আধুনিক কবিতা পাঠে অভ্যস্ত একজন পাঠক তার কবিতা পড়তে গিয়ে বিরক্ত হবেন, তার কবিতাকে মনে হবে অত্যন্ত জোলো, ক্লিশে আর একরৈখিক। কারণ আধুনিক কবিতা নাগরিক, অন্যদিকে তার কবিতা নিখাঁদ গ্রামজ। উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপক, প্রতীক, চিত্রকল্পও উঠে এসেছে একেবারে গ্রামীণ জীবনের চৌহদ্দি থেকে; এবং এইখানেই তার মৌলিকত্বের প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তার আগে ও পরে আর কোনো কবির সঙ্গে তার সামঞ্জস্য বিচার চলে না। সামগ্রিক বাঙলা কবিতার বিশাল ইতিহাসে তিনি একক, অনন্য ও তুলনারহিত।
বুদ্ধদেব বসু তার সম্পাদিত ‘আধুনিক বাঙলা কবিতা’ সংকলনে জসীমউদ্দীনের কবিতা গ্রহণ করেছিলেন; কিন্তু হুমায়ুন আজাদ যখন ‘আধুনিক বাঙলা কবিতা’ সম্পাদনা করতে আসেন, তখন জসীমউদ্দীনের কবিতা বর্জন করেন। দুই সম্পাদকেরই নিশ্চয় নিজস্ব যুক্তি ছিল। জসীমউদ্দীনের কবিতার মূল শক্তি তার সহজ অনাড়ম্বরতা। এত সাবলীল! সহজাত সাবলীলতা কোনো কবির দুর্বলতা নয়, বরং ক্ষমতা। তার কবিতা কোথাও ক্লান্ত করে না। অথচ একটা তীব্র সৌন্দর্যবোধ পাঠকের ভেতরটাকে আলোড়িত করে। এ সৌন্দর্যবোধ কোনো নাগরিক নান্দনিকতা নয়, বরং সবুজ ধানক্ষেত আর রাখালিয়া সুরের মোহাবেশ।
বাংলাদেশ মূলত গ্রামপ্রধান দেশ, নগর তার উপরিকাঠামো মাত্র। আটষট্টি হাজার গ্রামের বিস্তৃত বিন্যাসে গঠিত হয়েছে এদেশের মানচিত্র। যদিও গ্রামের সেই আবহমান রূপ এখন বিপন্নপ্রায়। নাগরিক সুবিধা এখন গ্রামকেও স্পর্শ করেছে। ইলেক্ট্রিকের আলো বাঁশবাগানের মাথায় উদিত হওয়া চাঁদকে ম্লান করেছে; মুঠোফোন গ্রামের ডাকঘরগুলোকে প্রায় অপ্রয়োজনীয় করে দিয়েছে; ক্যাবল নেটওয়ার্ক সন্ধ্যা-পরবর্তী পুঁথিপাঠের সান্ধ্য-আসরকে বিলুপ্ত করে ফেলেছে। গ্রামের এই যে পরিবর্তন, এটিকে হয়তো ‘উন্নয়ন’ বলে আখ্যায়িত করবেন রাজনীতিবিদরা; কিন্তু আবহমান গ্রামবাঙলার অন্ত্যজ জীবনের যে হার্দিক অনুরণন, হাজার হাহাকার করলেও আর ফিরে পাওয়া যাবে না। পুরো বাংলাদেশ ঘুরলেও হয়তো একটি জোনাকজ্বলা গ্রাম খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে। বিগত গ্রাম এখন বেঁচে আছে স্মৃতিতে, আর বেঁচে আছে জসীমউদ্দীনের কবিতায়।
তার কবিতার মূল শক্তি কাহিনি কথনে নয়Ñ গ্রামজ উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপক, প্রতীক, চিত্রকল্পের ব্যবহারে। কবিতার পর কবিতা উদ্ধৃত করে সেটি দেখানো যায়। তার কবিতা পড়লেই বোঝা যায়, তিনি বাংলাদেশের হৃদয়ের কাছাকাছি ছিলেন, দেশের হৃৎস্পন্দন অনুভব করতে পারতেন। কয়েকটি কবিতাংশ উদ্ধৃত করা হলোÑ

মুখখানি তার কাঁচা কাঁচা, না সে সোনার, না সে আবীর,
না সে ঈষৎ ঊষার ঠোঁটে আধ-আলো রঙিন রবির!
কেমন যেন গাল দুখানি মাঝে রাঙা ঠোঁটটি তাহার,
মাঠে-ফোটা কলমি ফুলে কতকটা তার খেলে বাহার!
(রাখালী)

কাজের কথা জানি নে ভাই, লাঙল দিয়ে খেলি
নিড়িয়ে দেই ধানের ক্ষেতের সবুজ রঙের চেলী।
সরষে বালা নুইয়ে গলা হলদে হাওয়ার সুখে
মটর বোনের ঘোমটা খুলে চুমু দিয়ে যায় মুখে!
ঝাউয়ের ঝাড়ে বাজায় বাঁশী পউষ-পাগল বুড়ী,
আমরা সেথা চষতে লাঙল মুর্শিদা-গান জুড়ি।
(রাখাল ছেলে)

আজিকার রোদ ঘুমায়ে পড়িয়া ঘোলাট-মেঘের আড়ে,
কেয়া-বন-পথে স্বপন বুনিছে ছল ছল জল-ধারে।
কাহার ঝিয়ারী কদম্ব-শাখে নিঝঝুম নিরালায়,
ছোট ছোট রেণু খুলিয়া দেখিছে অস্ফুট কলিকায়!
(পল্লী-বর্ষা)

ছোট গাঁওখানিÑ ছোট নদী চলে, তারি একপাশ দিয়া,
কালো জল তার মাজিয়াছে কেবা কাকের চক্ষু নিয়া।
ঘাটের কিনারে আছে বাঁধা তরী,
পারের খবর টানাটানি করি;
বিনাসূতী মালা গাঁথিছে নিতুই এপার ওপার দিয়া;
বাঁকা ফাঁদ পেতে টানিয়া আনিছে দুইটি তটের হিয়া।
(নিমন্ত্রণ)

এরকম অজস্র উদাহরণ উদ্ধৃত করা সম্ভব, যে পঙ্ক্তিগুলোতে একেবারে গ্রামীণ উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপক, প্রতীক, চিত্রকল্প অলৌকিক আলোর মতো বিচ্ছুরিত হয়েছে। 
মধ্যযুগের কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর মুখের সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেনÑ
কে বলে শারদশশী সে মুখের তুলা
পদনখে পড়ি তার আছে কতগুলা!
আর আধুনিক কবি জীবনানন্দ দাশ মুখের সৌন্দর্যকে উপমিত করলেন এভাবেÑ
চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য
অন্যদিকে কবি জসীমউদ্দীনের উপমা এমনÑ 
মুখ তার যেন নতুন চরের মতন
এই তুলনামূলক পাঠেই জসীমউদ্দীন অন্য কবিদের চেয়ে পৃথক ও স্বতন্ত্র হয়ে ওঠেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ও মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরে লিখিত তার (১৯৭২), মাগো জ্বালিয়ে রাখিস আলো (১৯৭৬) ও কাফনের মিছিল (১৯৮৮) কাব্যগ্রন্থত্রয়ের কবিতাগুলো। পাকিস্তানি হানাদেরদের নির্যাতন তার মতো সংবেদনশীল ও সৃজনশীল মানুষকে মানসিকভাবে রক্তাক্ত করবেÑ এটাই স্বাভাবিক; যদিও তিনি পাকিস্তান সরকারের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সুবিধাভোগী ছিলেন। ১৯৪৪ সালে ব্রিটিশ আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার চাকরি ছেড়ে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সরকারের পাবলিসিটি ডিপার্টমেন্টে ‘অফিসার’ হিসেবে যোগদান করেন তিনি। তিন বছর পর ১৯৪৭ সালে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান সরকারের প্রচার বিভাগের অফফরঃরড়হধষ ঝড়হম চঁনষরপরঃু ঙৎমধহরংবৎ পদে যোগ দেন। দেড় দশক সরকারি চাকরি করে উবঢ়ঁঃু উরৎবপঃড়ৎ পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন, ১৯৬২ সালে। কিন্তু প্রকৃত কবি সবসময়ই বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন। তিনি বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের আন্দোলনে ব্রতী ছিলেন। তিনি ছিলেন এ আন্দোলনের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার একজন দৃঢ় সমর্থক এবং প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা। ১৯৬৭ সাল, পাকিস্তান সরকার যখন রেডিও-টেলিভিশন থেকে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধের পদক্ষেপ নেয়, তিনি তীব্র ভাষায় সরকারের সে সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। তার কমলাপুরের বাসভবনে সাংবাদিক, শিক্ষক, শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীদের আহ্বান করে এর বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ জানান। এ বছরই ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়নের (ডাকসু) উদ্যোগে ছাত্র-শিক্ষক মিলনায়তনে ‘মহান একুশে স্মরণে’ সিম্পোজিয়ামে সভাপতিত্ব করেন। সভাপতির ভাষণে তিনি পরানুকরণ ত্যাগ করে আচারে, ব্যবহারে ও পোশাকে পুরোপুরি বাঙালি হওয়ার জন্য আবেদন জানান। মুক্তিযুদ্ধের পরে ১৯৭৪ সালে, বাঙলা একাডেমি আয়োজিত আন্তর্জাতিক বাঙলা সাহিত্য সম্মেলনে মূল সভাপতির অভিভাষণ দেন। সেই অভিভাষণের শেষাংশে তিনি বলেনÑ ‘কবি, জারি, মুর্শিদী, বাউল, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া প্রভৃতি গ্রাম্য গানের কথায় এবং সুরে নানারকমের প্রকাশভঙ্গিমা আমাদের পূর্বপুরুষেরা রাখিয়া গিয়াছেন। সেইসঙ্গে আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পাইয়াছি, ঊনবিংশতি ও বিংশতি শতাব্দীর সাহিত্য সাধকদের প্রকাশধারা। পশ্চিমের সাহিত্য হইতে মাত্রাজ্ঞান, বাহুল্যবর্জন, ভাবপ্রকাশে ইঙ্গিত প্রভৃতি শিখিয়া আমরা আমাদের পূর্বসূরিদের সৃষ্টির বুনিয়াদের নূতন করিয়া সাহিত্যকর্মে মনোনিবেশ করিব। এই দেশে আরও মাইকেল জন্মিবে, আরও রবীন্দ্রনাথ, আরও মীর মশাররফ হোসেন জন্মিয়া এদেশকে গৌরবের তোরণ-দুয়ারে লইয়া যাইবে।’ প্রাচ্যের প্রতি  প্রেম আর পাশ্চাত্যের প্রতি মুগ্ধতাÑ এই দুটোর সংশ্লেষই কবি জসীমউদ্দীন। বাংলাদেশ প্রাচ্য-ঐতিহ্য ও প্রাচ্য-সভ্যতার চিরকালীন লীলাভূমি। তার নান্দনিক প্রকাশ নাগরিক হলেও অন্তরাত্মা গ্রামীণ। গ্রামের মাঠ, গ্রামের ধানক্ষেত, গ্রামের আকাশ মায়া দিয়ে, মমতা দিয়ে, সহিষ্ণুতা দিয়ে গড়ে দিয়েছে বাংলাদেশের হৃদয়। তার কথিত ‘কবি, জারি, মুর্শিদী, বাউল, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া’ প্রভৃতি গ্রাম্যগানইÑ যা আমাদের পূর্বপুরুষরা রেখে গেছেন, আমাদের পল্লীগুলোকে সরস ও মায়াময় করে রেখেছিল। হয়তো সেই ঝিল্লীরবের পল্লী আজ আর নেই, হয়তো নষ্ট সময় আমাদের পল্লীগুলোকেও নষ্ট করেছে, তবু আবহমান বাঙলা যদি ধারণাতেও টিকে থাকে, সে তো অজস্র পল্লীর কলগুঞ্জনের উচ্চরোল। তিনি সেই আবহমান বাঙলারই মহাকাব্যিক রূপকার! 


পাঠক কমছে; কিন্তু সেটা কোনো
দুই বাংলার জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। অন্যদিকে বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক
বিস্তারিত
মনীষা কৈরালা আমি ক্যান্সারের প্রতি কৃতজ্ঞ,
ঢাকা লিট ফেস্টের দ্বিতীয় দিন ৯ নভেম্বরের বিশেষ চমক ছিল
বিস্তারিত
এনহেদুয়ান্নার কবিতা ভাষান্তর :
  যিশুখ্রিষ্টের জন্মের ২২৮৫ বছর আগে অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৪ হাজার
বিস্তারিত
উপহার
  হেমন্তের আওলা বাতাস করেছে উতলা। জোয়ার এসেছে বাউলা নদীতে, সোনালি
বিস্তারিত
সাহিত্যের বর্ণিল উৎসব
প্রথম দিন দুপুরে বাংলা একাডেমির লনে অনুষ্ঠিত হয় মিতালি বোসের
বিস্তারিত
নিদারুণ বাস্তবতার চিত্র মান্টোর মতো সাবলীলভাবে
এ উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ভারতের প্রখ্যাত পরিচালক নন্দিতা দাস
বিস্তারিত