স্মরণ

বাঙালি নান্দনিকতায় রবীন্দ্রনাথ

নীহাররঞ্জন রায় বাঙালির ‘ইতিহাসের অর্থ’ প্রবন্ধে বলেছেন, “... কাজেই, রাজা, রাষ্ট্র, রাজপাদোপজীবী, শিল্পী, বণিক, ব্যবসায়ী, শ্রেষ্ঠী, মানপ, ভূমিবান মহত্তর, ভূমিহীন কৃষক, বুদ্ধিজীবী, সমাজসেবক, সমাজশ্রমিক, ‘অকীর্তিতান্ আচ-ালান্’ প্রভৃতি সকলকে লইয়া প্রাচীন বাংলার সমাজ। ইহাদের সকলকে লইয়া তবে বাঙালির কথা, বাঙালির ইতিহাসের কথা।” তার মতে, ‘যদি বাঙালির কথা বলতে গিয়ে বাংলাদেশের কথা বলি, তবে বাঙলার রাষ্ট্র ও রাজবংশাবলীর ইতিহাস যতটুকু আমরা জানি তাহার বেশিরভাগ উপাদান জোগাইয়াছেন লেখমালা। এই লেখমালা শিলালিপিই হোউক আর তাম্রলিপিই হোউক, ইহারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হয় রাজসভা কবি রচিত রাজা অথবা রাজবংশের প্রশান্তি, কোনও বিশেষ ঘটনা উপলক্ষে রচিত বিবরণ বা কোনও ভূমি দান-বিক্রয় দলিল, অথবা কোন মূর্তি বা মন্দিরে উৎকীর্ণ উৎসর্গলিপি।’ এই লেখা থেকে জানা যায়, বাঙালির সাহিত্যচর্চার অনুষঙ্গ এসেছিল রাজসভার সভাকবি, সভাপণ্ডিত, সভাপুরোহিত, রাজগুরু কিংবা রাষ্ট্রের প্রধান কর্মচারীদের দিয়ে রচিত স্মৃতি, ব্যবহার ইত্যাদি জাতীয় গ্রন্থ তিব্বত ও নেপালে প্রাপ্ত নানা বৌদ্ধ ও অন্যান্য ধর্ম ও সম্প্রদায়গত বিভিন্ন বিষয়ক পুঁথিপত্র থেকেও অনেক উপাদান পাওয়া গেছে।

আমাদের বসবাসযোগ্য ভূমি, নিত্যদিনের আহার ও বসবাসের জন্য উৎপাদিত ফল ও ফসলের উৎপাদন, সময়, ঋতু, কেনা-বেচা, কর্ম-ধর্ম, ঘাট-অঘাটের হিসাবনিকাশে একসময় সংস্কৃতিতে চৈত্র পেরিয়ে যুক্ত হয়েছিল বাংলা বর্ষ এবং তা থেকে এসেছিল বৈশাখ মাস। ঋতুরাজের নিয়মতান্ত্রিকতায় পুরানোকে ঝরিয়ে নতুনের কেতন উড়ায়ে বাংলা নববর্ষ আমাদের স্বাগত জানিয়ে বৈশাখের অনুভবকে আপন করে নেয়। বৈশাখ মানেই আনন্দের মাতলামি; আমরা এক কাতারে সবাই সমান।

জোড়াসাঁকোর জমিদার পরিবারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্ম নিলেন। তার পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর প্রিন্স ছিলেন। বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহর্ষি ছিলেন। বাবা খোদ কলকাতার মানুষ। কয়েক পুরুষের যে আচার, ওঠা, বসা, তা বিলেতি মানুষের সাহচর্যের। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছয় কন্যা এবং নয় পুত্রের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ বুধেন্দ্রনাথ ঠাকুর মাত্র এক বছরেই মারা যান। সে সূত্রে তার অগ্রজ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ মানুষ হিসেবে জন্ম নিলেন। বাবা তার ছোট ছেলে রবীন্দ্রনাথের জন্ম হলে জন্মদিনে লিখে রাখলেন— পঁচিশে বৈশাখ-১২৬৮ বঙ্গাব্দ। অর্থাৎ ওই দিন ৭ মে-১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দ হলেও তিনি তা লেখেননি। 

বাঙালির সংস্কৃতিতে আরও একটি শুভদিনের সূচনা হলো। আরও একটি ক্ষণের আগমনে উদিত হলো আরেকটি জ্যোতিষ্ক। স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এর আগে বাঙালির জীবনে চৈত্রসংক্রান্তি অথবা বর্ষবরণে সব বাঙালি এককাতার বন্দি হলেও সময়ের পালাবদলে আজ আমরা সব বাঙালি কবিগুরুর জন্মজয়ন্তীতে আরও একবার সবাই আমরা সমান সম হয়ে পড়ি। বাংলা বর্ষবরণের গান, গীতিনাট্য, কবিতা, ঝরাপাতার গান কিংবা আগমনী সুরবারতার রচনা বৈশাখকে আলোকিত করলেও কবির মহাকালের গান, ‘ঐ মহা মানব আসে’ কিংবা ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’ এমন আরও গানে কবি আমাদের জাগ্রত করে গেছেন মনলোকের উত্তেজনা দিয়ে। বাংলা শব্দ, অর্থ, শাব্দিক মাত্রা, সুর এবং সংকটের উত্তরণ ঘটিয়ে তাকে উচ্চমার্গে পৌঁছে দিয়ে গেছেন কবি রবীন্দ্রনাথ। বাঙালি সংস্কৃতির যে মাদকতা, তা আসে লোকশিল্পের অনুষঙ্গ দিয়ে। কাঙাল হরিনাথ মজুমদার, মহামতি লালন, মীর মশাররফ হোসেন, গগন হরকরা, কবি জসীমউদ‌‌দীন, এসএম সুলতান, কামরুল হাসান, শাহ আবদুল করীম, বিজয় সরকার, চৈতন্য মহাপ্রভুসহ হাজারো বাঙালি সৃষ্টি করে গেছেন। ধারণার এসব বিষয়কে আরও আরোপিত এবং রূপায়িত করেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। 

রবীন্দ্রগবেষক আহসানুল কবির তার ‘রবীন্দ্রনাথের প্রথম আশ্রম শিলাইদহ’ কাব্যে ‘বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গ শিলাইদহে রবীন্দ্র ইনস্টিটিউট’ নিবন্ধে জানাচ্ছেন, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু স্বদেশে এসেছেন। তার সঙ্গে এ দেশের হিতৈষী এবং প্রখ্যাত সাহিত্যিক মৈত্রেয়ী দেবী সাক্ষাৎ করেন এবং কবির স্বাক্ষর করা একটি ফটোগ্রাফ জাতির জনককে উপহার দেন। বঙ্গবন্ধু ছবিটি মাথায় ঠেকিয়ে দেবীকে বললেন— দিদি, আপনি কি জানেন স্বাধীনতা যুদ্ধে আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। তার ছবি পাকিস্তানি হানাদাররা যে বাড়িতে কবির ছবি দেখেছে, ওই ছবিতে গুলি করেছে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমরা বাঙালি হয়ে তার জন্য কিছুই করতে পারি নাই।’ তিনি বললেন, ‘আমার ইচ্ছে আছে তার নামে একটা ইনস্টিটিউট করব।’ মৈত্রেয়ী দেবী বঙ্গবন্ধুর উদারতা দেখে এই ইনস্টিটিউটটি শিলাইদহে করতে বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ করেছিলেন। আমরা জানি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং আমাদের স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান যুগে যুগে বাঙালিকে বিষম বিত্ত থেকে উত্তরণের জন্য লড়াই করে গেছেন। তাই জনক ভেবেছিলেন, শিলাইদহের অহংকারকে পুনরারোপিত করে তাকে সমৃদ্ধির শিখরে নিতে এখানে পশ্চিম বাংলার শান্তিনিকেতনের আদলে একটি ‘রেপ্লিকা’ গড়বেন। আমরা এখন যে স্বপ্নকে বাস্তব রূপ পরিগ্রহের এখনও স্বপ্ন দেখি। হয়তো শিলাইদহ হবে শান্তিনিকেতনের শান্তির আশ্রম বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ধরে।

এজমালি জমিদারির সময়ে জমিদারি তদারকির জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯০ সালের ২০ জানুয়ারি সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুরে আসেন। তবে তারও আগে তিনি এসেছিলেন ১৮৮৮ সালে শিলাইদহে। তিনি শাহজাদপুরে গিয়েছিলেন শিলাইদহ থেকে। এখানে তিনি সাত বছর জমিদারি তদারকি করেছিলেন। তবে কবি সাহিত্য সৃষ্টির কোনো উপাদান নিতে কোনো কার্পণ্য করেননি। এখানকার নৈসর্গিক প্রিয়তাকে অনুধাবন করেছেন কবি নিবিষ্ট চিত্তের অন্তরকোণ থেকে। এখানে বসে কবির চিঠি লেখা, কাব্য রচনা করা, কবিতা লেখা, ছড়া, নাটক লেখা সম্ভব হয়েছিল। প্রকৃতির সুন্দর রূপকে প্রেয়সী করতে শিলাইদহ এবং শাহজাদপুর অভিন্ন মননের। শাহজাদপুরে বসে তিনি ইন্দিরা দেবীকে লিখলেন, ‘... ... আমাদের দেশে প্রকৃতিটা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে— আকাশ মেঘমুক্ত, মাঠের সীমা নেই, রৌদ্র ঝাঁ ঝাঁ করছে, এর মধ্যে মানুষকে অতি সামান্য মনে হয়— মানুষ আসছে এবং যাচ্ছে এই খেয়া নৌকার মত পারাপার হচ্ছে— তাদের অল্প অল্প কলরব শোনা যায়... ...।’ কবি রবীন্দ্রনাথ, শিলাইদহ-শাহজাদপুর, খেয়া নৌকা-যাত্রী, রূপ-প্রকৃতি কিংবা গীতাঞ্জলির জারক রসই কিন্তু এক সূত্রে গাঁথা। এখন নদী আছে, আছে জল। তবে শিলাইদহ এবং শাহজাদপুরের যোগসূত্রকে আরও আবদ্ধ করতে প্রয়োজন ‘রবীন্দ্রনাথ কিংবা গীতাঞ্জলি সেতু’, যা রবীন্দ্রপ্রেমীদের অন্তরাত্মাকে আরও উচ্ছ্বসিত করতে সহায়ক হবে।

পঁচিশ বৈশাখ আসে, আবার তা চলেও যায়। আমাদের বাঙালি হৃদয়ের অন্যতম রিদম। রবীন্দ্রনাথ পাকিস্তানে যতটা না উপেক্ষার ছিল, স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরেও কবি রবীন্দ্রনাথ হতে পারেননি তত উচ্চতার। আমাদের শরীরে শিরায় অস্থিমজ্জায় বাঙালির যে স্মারকধারা, তা এখনও উৎসারিত হয় শিলাইদহ এবং এখানে সৃষ্ট রবীন্দ্রনাথের মহিমা থেকে। সেজন্য প্রার্থনা বৈশাখে ঝরাপাতা ঝরে যাক। নতুন পাতার মৌলিকতায় ভ্রমর গুঞ্জনে সুরের মূর্ছনা নিয়ে পঁচিশে বৈশাখে শিলাইদহের আঙিনায় বারবার ফিরে আসুক রবীন্দ্রনাথ। কবির সপ্রতিভ সরল ভাব এবং তার সৃষ্টিকর্মে আমরা সবাই পুণ্যাহ ভালোবাসায় মেতে উঠি বারবার। 

—গৌতম কুমার রায় 

গবেষক, উদ্ভাবক ও পরিবেশ ব্যক্তিত্ব


ঢাকায় রবীন্দ্র উৎসব শুরু মঙ্গলবার
রাজধানীতে আগামী ২৭ ও ২৮ নভেম্বর দু’দিনব্যাপী রবীন্দ্র উৎসব অনুষ্ঠিত
বিস্তারিত
বাউল সম্রাটশাহ আব্দুল করিম স্মৃতি
একুশে পদকপ্রাপ্ত বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের স্মৃতি ও তার
বিস্তারিত
কথাশিল্পী হুমায়ুন আহমেদের জন্মদিন পালিত
বাংলা সাহিত্যের নন্দিত কথাশিল্পী ও চলচ্চিত্রকার হুমায়ুন আহমেদের ৭১তম জন্মদিন
বিস্তারিত
কথাশিল্পী হুমায়ুন আহমেদের ৭১তম জন্মদিন
বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির অন্যতম পথিকৃৎ ,খ্যাতিমান কথাশিল্পী, চলচ্চিত্র-নাটক নির্মাতা হুমায়ুন আহমেদের
বিস্তারিত
শিল্পকলা একাডেমিতে কবিতায় বঙ্গবন্ধু
দেশের বিশিষ্ট বাচিক শিল্পীরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে
বিস্তারিত
কবি শামসুর রাহমানের মৃত্যুবার্ষিকী পালিত
আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, লেখক ও সাংবাদিক শামসুর
বিস্তারিত