মদিনা শরিফের জুমার খুতবা

আল্লাহর সুন্দরতম নাম ও গুণাবলির ঈমান

এক ব্যক্তি নামাজে এ বলে দোয়া করছিলÑ ‘হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করে এ কথার সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, আপনি অদ্বিতীয় চির অমুখাপেক্ষী, যিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কারও থেকে জন্মও নেননি, কেউ তাঁর সমকক্ষ নয়।’ তখন নবী করিম (সা.) বলেন, ‘যার হাতে আমার জীবন, তাঁর শপথ করে বলছি, লোকটি আল্লাহর মহানতম নাম নিয়ে প্রার্থনা করেছে, এ নামে প্রার্থনা করলে তিনি দান করেন এবং এ নামে তাঁকে ডাকা হলে তিনি সাড়া দেন।’

আল্লাহর সুন্দরতম নামগুলো ও শ্রেষ্ঠতম গুণগুলোর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা তাওহিদের একটি অংশ। এটা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের অবধারিত চাহিদা। এগুলো জেনে ও বুঝে এর মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করতে হয়। এ বিশ্বাসের মর্যাদা ও স্তর অনেক বিশাল।
আল্লাহর যেসব সুন্দরতম নাম ও শ্রেষ্ঠতম গুণগুলোর কথা স্বয়ং তিনি জানিয়েছেন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) সংবাদ দিয়েছেন মোমিন ব্যক্তি আল্লাহর জন্য সেগুলো প্রতিষ্ঠিত করবে। সেসবের প্রতি ঈমান আনবে। সেখানে সৃষ্টির কোনো বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সাদৃশ্য থাকবে না। এগুলো সাদৃশ্যপূর্ণ কোনো রূপের সঙ্গে মিলবে না। শব্দগুলোকে স্বস্থান থেকে সরিয়ে কোনো বিকৃতি করবে না। তদ্রƒপ মোমিন আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে বলবে, তিনি সবধরনের দোষত্রুটি থেকে মুক্ত, কিন্তু নিষ্ক্রিয় নন; বরং ততটুকুই নাকচ করতে হবে যতটুকু তিনি নিজে নিজের জন্য নাকচ করেছেন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) নাকচ করেছেন। এ নাকচ করাটা তাঁর গুণের পূর্ণতাকে ধারণ করে। নাকচকৃত বৈশিষ্ট্যের বিপরীতে এটা পূর্ণতা ধারণকারী ব্যাখ্যাসাপেক্ষ নাকচকরণ। সূরা সাবার ৩নং আয়াতে আছেÑ ‘অণু পরিমাণ কিছুও তাঁর অগোচর নয়।’ এতে আমরা আল্লাহর জ্ঞানের পূর্ণতার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করি। সূরা কাফের ৩৮নং আয়াতে আছেÑ ‘আমাকে কোনো ক্লান্তি স্পর্শ করেনি।’ এ রকম আয়াতে আমরা আল্লাহর ক্ষমতার পূর্ণাঙ্গতা সাব্যস্ত করি এবং তা বিশ্বাস করি। এ বিশ্বাস শরিয়তের বর্ণিত ভাষ্য অনুযায়ী হবে, তাতে কোনোরূপ বিকৃতি, বাহ্যিক রূপদান, নিষ্ক্রিয় থাকার ধারণা, সাদৃশ্য বর্ণনা, উপমা বর্ণনা থাকবে না। তাঁর সত্তা, গুণাবলি কিংবা কাজে কোনো কিছুই নেই তাঁর মতো, বরং তিনি তাঁর গুণাবলি, নাম ও কাজে নিরঙ্কুশ পূর্ণতার অধিকারী। ‘তাঁর মতো কিছু নেই। তিনি সব শোনেন সব দেখেন।’ (সূরা শূরা : ১১)। ইবনে আবদুল বার (রা.) বলেন, ‘আহলুস সুন্নাহ এ বিষয়ে একমত পোষণ করে যে, পবিত্র কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত আল্লাহর গুণাবলি স্বীকার করে সেগুলোর প্রতি ঈমান আনতে হবে। সেগুলোর রূপক অর্থ নয়, বরং প্রকৃত অর্থই বুঝতে হবে। তবে তারা সেগুলোর রূপ বর্ণনা করেন না এবং তাঁর মধ্যে কোনো সীমিত গুণের সীমারেখা টানেন না।’ ইমাম মালেক (রা.) কে নিচের আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলোÑ ‘দয়াময় আল্লাহ আরশে সমাসীন হয়েছেন।’ তিনি কীভাবে সমাসীন হয়েছেন? তখন তিনি বলেন, সমাসীন হওয়াটা জ্ঞাত, তবে তার রূপটা অজ্ঞাত। এটা বিশ্বাস করা আবশ্যক। এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলা বেদাত।’
আল্লাহর সুন্দরতম নামগুলো এবং শ্রেষ্ঠতম গুণগুলো উপযুক্ত পন্থায় তাঁর ইবাদত, প্রশংসা ও পবিত্রতা ঘোষণা করার মূলভিত্তি। আমাদের রব বলেন, ‘আর আল্লাহর আছে সুন্দরতম অনেক নাম, তোমরা সেগুলো দিয়ে তাঁকে ডাক।’ (সূরা আরাফ : ১৮০)।
আল্লাহর অন্যতম একটি নাম হলো সামাদ বা চির অমুখাপেক্ষী ও সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী। ‘বলুন, তিনি আল্লাহ, এক। আল্লাহ চির অমুখাপেক্ষী। তিনি জন্ম দেননি কাউকে, তিনি কারও থেকে জন্মও নেননি। কেউ তাঁর সমকক্ষ নয়।’ (সূরা ইখলাস : ১-৪)।
তাই হে মুসলিম, নানা প্রয়োজন আপনাকে ঘিরে ধরলে, আপনার পাশে বিপদের ঘনঘটা ছেয়ে গেলে এবং চারদিক থেকে দুশ্চিন্তা জট পাকালে আপনি চির অমুখাপেক্ষী এক আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করুন। সুসময়ে ও দুঃসময়ে তিনিই গন্তব্য। সংকট ও কাক্সিক্ষত বিষয়ে একমাত্র তাকেই লক্ষ্য বানানো হয় এবং তাঁর দিকেই আশ্রয় নেওয়া হয়। বিপদে তিনিই সহায়। সংকটে তিনিই ঠিকানা।
হে মুসলিম উম্মাহ, প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের অদ্বিতীয় মহান চির অমুখাপেক্ষী পালনকর্তার সাহায্য প্রয়োজন। ইবাদতে, আনুগত্যে, মিনতিতে, প্রার্থনায়, ভালোবাসায়, ভয়ে, আশায় সবসময় তাঁর কাছে আমাদের সাহায্য নিতে হয়। সুখে-দুঃখে তাঁকে ডাকা আমাদের বড়ই প্রয়োজন, বিশেষ করে এ সময়টিতে যখন আমাদের জাতির ওপর চারদিক থেকে নানা সংকট প্রবল আকার ধারণ করেছে। তাহলে আমরা দুনিয়া ও আখেরাতে সর্বোচ্চ লক্ষ্য ও বিরাট উদ্দেশ্য সাধন করে সুখী হতে পারব।
মানুষ বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বড় বড় ঝুঁকি অনুভব করবে। তখন মহান আল্লাহর আশ্রয় ছাড়া সেসব বিপদ থেকে রক্ষার কোনে উপায় নেই। একমাত্র তিনিই আমাদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারেন। মুসলিম ব্যক্তি কীভাবে দুর্ভাগা হতে পারে? মুসলিম উম্মাহ কীভাবে হতভাগা হতে পারে? অথচ তার পালনকর্তা হলেন সব পরিপূর্ণ গুণের অধিকারী একক অদ্বিতীয় চির অমুখাপেক্ষী আল্লাহ। যিনি জ্ঞানে, শক্তিতে, প্রজ্ঞায়, বড়ত্বে, মহত্ত্বে, দয়ায়, প্রতাপে চূড়ান্ত শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী।
তাই হে আল্লাহর বান্দা, তোমার পালনকর্তার প্রতি আকৃষ্ট হও। হে উম্মত, তোমার রবের দিকে ঝুঁঁকে যাও। তাঁর কাছে প্রার্থনাকে আন্তরিক করো। তাঁর ইবাদত, তাঁর ওপর ভরসা, আশা, ভয়, ভালোবাসা, তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন, আনুগত্য, সমর্পণ ও নমনীয়তাÑ এ সবকিছুকে খাঁটি করো। ‘যখন অবসর হবে তাঁর প্রতি মনোযোগ দাও, তোমার রবের দিকে আকৃষ্ট হও।’ (সূরা ইনশিরাহ : ৩-৮)। আর তখনই আমরা আমাদের কাক্সিক্ষত ও কাম্য সব বিষয়ে মর্যাদা ও বিজয় লাভ করতে পারব।
যার সব পথ সংকীর্ণ হয়ে গেছে, যার কাছে সব কৌশল কঠিন হয়ে পড়েছে, তাকে বলি, তুমি তোমার রবের দ্বারে অগ্রসর হও, তাঁর সামনে গিয়ে নত হও। কখনও তোমার অবস্থা সংকীর্ণ হয়ে পড়লে তুমি ক্ষমাশীল এক অদ্বিতীয় আল্লাহর ওপর আস্থা রাখ। তিনি তাঁর বান্দার প্রতি দয়াশীল, যার জ্ঞান সবধরনের রহস্য ও গোপন বিষয়কে বেষ্টন করে আছে। যিনি অভ্যন্তরীণ ও সুপ্ত বিষয় জানেন। ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ দয়াশীল সর্বজ্ঞ।’ (সূরা হজ : ৬৩)। ‘নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক যাকে চান তার প্রতি দয়াশীল।’ (সূরা ইউসুফ : ১০০)। তিনি এমন দয়ালু, যিনি কিছু ইচ্ছা করলে একেবারে অজান্তেই তার উপকরণ প্রস্তুত করে দেন। এমনকি এমন কিছুও ঘটে যায়, যা ঘটা অসম্ভব ছিল। তিনি অসীম দয়াবান।
যখনই আপনার বিরুদ্ধে বিপদাপদ ধেয়ে আসবে এবং নানা সংকট আপনার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে তখনই আপনি পরাক্রমশালী আল্লাহর কাছে আশ্রয় নিন, যিনি আহত-হৃদয়ের নিরাময় করেন, বিপদগ্রস্তকে উদ্ধার করেন এবং দুঃখ-কষ্ট দূর করেন। সব দুঃখের তিনিই অবসানকারী, সব ব্যাধির তিনিই আরোগ্য দানকারী, সব বিপদের তিনিই উদ্ধারকর্তা। তিনি পরিপূর্ণ ক্ষমতা ও চূড়ান্ত ইচ্ছার অধিকারী। তিনি দুঃখ-দুর্দশার অবসান ঘটান এবং সংকট দূর করেন। ‘বরং তিনি, যিনি আর্তের আহ্বানে সাড়া দেন, যখন সে তাঁকে ডাকে এবং বিপদাপদ দূরীভূত করেন এবং তোমাদের পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেন।’ (সূরা নামল : ৬২)। ‘বলে দিন, আল্লাহ, তিনি তোমাদের সেখান থেকে এবং সব বিপদ থেকে মুক্তি দেন।’ (সূরা আনআম : ৬৪)।
তাই হে মুসলিম, আপনার পালনকর্তার আশ্রয় গ্রহণ করুন, যার কাছে আপনি পাবেন স্বস্তি ও আনন্দ, সঠিক দিশা, পবিত্রতা ও সফলতা। পাবেন প্রশান্তি ও স্থিতি। ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সঙ্গে আছেন, যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে এবং যারা সদাচরণকারী।’ (সূরা নাহল : ১২৮)।
আবদুুল্লাহ ইবনে বারিদাহ (রা.) তার বাবার সূত্রে বর্ণনা করেন, তার বাবা রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সঙ্গে মসজিদে প্রবেশ করেন, তখন এক ব্যক্তি নামাজে এ বলে দোয়া করছিলÑ ‘হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করে এ কথার সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, আপনি অদ্বিতীয় চির অমুখাপেক্ষী, যিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কারও থেকে জন্মও নেননি, কেউ তাঁর সমকক্ষ নয়।’ তখন নবী করিম (সা.) বলেন, ‘যার হাতে আমার জীবন, তাঁর শপথ করে বলছি, লোকটি আল্লাহর মহানতম নাম নিয়ে প্রার্থনা করেছে, এ নামে প্রার্থনা করলে তিনি দান করেন এবং এ নামে তাঁকে ডাকা হলে তিনি সাড়া দেন।’


২৫ শাবান ১৪৩৯ হিজরি মসজিদে নববির জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর করেছেন মাহমুদুল হাসান জুনাইদ


ইবরাহিম আদহামের জীবন কথা
ইবরাহিম আদহাম ছিলেন বলখের বাদশাহ। বলখের ভৌগলিক অবস্থান ছিল বৃহত্তর
বিস্তারিত
সুফিকোষ
আবদাল আরবি শব্দ। এটি বদল শব্দমূল থেকে গঠিত। আবদাল শব্দটি
বিস্তারিত
কোরবানির বিধিবিধান
‘কোরবানি’ অর্থÑ নৈকট্য, সান্নিধ্য, উৎসর্গ। ঈদুল আজহার দিনগুলোতে আল্লাহর সন্তুষ্টি
বিস্তারিত
পশু কোরবানিতে দুনিয়া ও আখেরাতে
ইসলামি জীবনবিধানের প্রত্যেক দিকনির্দেশনা পালনে দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ লাভ
বিস্তারিত
কোরবানির পরিচয় ও প্রকারভেদ
  কোরবানির আভিধানিক অর্থ হলো, কাছে যাওয়া বা নৈকট্য অর্জন করা।
বিস্তারিত
হজ তথ্য কর্নার
হজের সফরে নারীদের জরুরি জ্ঞাতব্য   - বাইতুল্লাহর হজ। আল্লাহর ডাকে সাড়া
বিস্তারিত