সুকান্তের প্রাসঙ্গিকতা

কবিতার বক্তব্য ও শাণিত উচ্চারণের মাধ্যমে সুকান্ত যেমন একালেও প্রাসঙ্গিক, একইভাবে তার কবিতার ভাষা ও উপস্থাপনরীতি থেকেও আমাদের প্রেরণা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। আমরা দেখেছি, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিককালে ইংরেজ ভাবাদর্শে আচ্ছন্ন শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত যে-সাহিত্যিক গোষ্ঠী বাংলা কবিতার ‘মূলধারা’য় পরিণত হলেন, তাদের অধিকাংশই বাংলা কাব্যের পরিবেশনগত ঐতিহ্যকে একরকম অবজ্ঞা 
ও অস্বীকার করে আত্মস্থ করলেন ইউরোপীয় নন্দন-ভাবনা

 

বাংলা কবিতার সুদীর্ঘ ইতিহাসে সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৬ আগস্ট ১৯২৬-১৩ মে ১৯৪৭) বিস্ময়কর প্রতিভা। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় যাকে অভিষিক্ত করেছেন ‘বাংলা সাহিত্যের একটি প্রিয়তম নাম’ শিরোপায়। মাত্র ২১ বছর তিনি বেঁচেছিলেন, এর মধ্যে লেখালেখির জন্য পেয়েছিলেন ৫ কি ৬ বছর! এই স্বল্পায়ু জীবনে তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তা পরিমাণে ও শিল্পমানে আমাদের বিস্ময় উদ্রেক করে। ১২০টি কবিতা, ২৫টি গান, ১৫টি ছড়া, ১০টি গল্প, একটি নাটিকা ও একটি প্রবন্ধÑ নিঃসন্দেহে ৫ থেকে ৬ বছরের হিসাবে সুপ্রচুর এবং কবির নিবেদিত ও নিরলস সৃষ্টিযজ্ঞের সাক্ষ্যবাহী।

সমকালে সুকান্তের অগ্রজ কবিরাও তার সুদৃঢ় চৈতন্যে, সৃষ্টিশীলতায় এবং অভিনব প্রকাশে বিস্মিত হয়েছিলেন। বুদ্ধদেব বসু, সমর সেন, জগদীশ ভট্টাচার্য, সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখের অকুণ্ঠ প্রশংসাও তিনি লাভ করেছিলেন। কিন্তু যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে অকস্মাৎ তার জীবনাবসান স্তব্ধ করে দিল তাকে ঘিরে বিপুল প্রত্যাশার। অবশ্য সুকান্ত তার স্বল্পায়ু জীবনেই জয় করে নিলেন ঈর্ষণীয় পাঠকপ্রিয়তা। সারা জীবন ধরে লিখেও বহু কবি-লেখক যে কাক্সিক্ষত নৈকট্য ও মনোযোগ পান না পাঠকের, সুকান্ত সহজেই সেই দুর্লভকে অর্জন করলেন। প্রশ্ন উঠতে পারেÑ তবে কি অকালপ্রয়াণই সুকান্তের জনপ্রিয়তার প্রধান উৎস? নিশ্চয়ই নয়। অকালপ্রয়াণের শোক কবির সমকালকে যতটা আর্দ্র ও প্লাবিত করেছে, পরবর্তী কালের পাঠকদের কাছে নিশ্চয়ই সে আবেগ ফিকে হয়ে যাওয়ার কথা। তাহলে এখনও কেন সুকান্ত সমান জনপ্রিয়, আরও বেশি আদৃত? এখনও কেন বাঙালি পাঠক সুকান্তকে কণ্ঠে-বুকে ধারণ করে আছেন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে সুকান্তের কবিতার দিকে। দেখতে হবে, কী আছে সেখানে। কী তিনি রেখে গেছেনÑ যা তার মৃত্যুর ৭১ বছর পরও আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক! 

 

সুকান্ত জন্মেছিলেন এক বিক্ষুব্ধ সময়ে। প্রায় ২০০ বছরের ইংরেজ শাসনে-শোষণে পীড়িত-ক্ষিপ্ত জনতার উত্থানলগ্নে সুকান্তের আবির্ভাব। তিনি নিজেই লিখেছেন : 

অবাক পৃথিবী! অবাক করলে তুমি

জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি।

অবাক পৃথিবী! আমরা যে পরাধীন

অবাক, কী দ্রুত জমে ক্রোধ দিন দিন;

অবাক পৃথিবী! অবাক করলে আরোÑ

দেখি এই দেশে অন্ন নেইকো কারো। (অনুভব/১৯৪০)

বস্তুত, সুকান্তের জীবৎকালে অর্থাৎ ১৯২৬ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিস্থিতির খতিয়ান নিলে আমরা দেখতে পাব, এ সময় সংঘটিত হয়েছে ব্রিটিশবিরোধী নানা সংগ্রাম ও বিদ্রোহ। একদিকে অসহযোগ আন্দোলন, অন্যদিকে সুভাষ বসুর সশস্ত্র সংগ্রাম। কারখানায়-কারখানায় শ্রমিক-মজুরদের বিদ্রোহ। ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এই আন্দোলন আরও বেগবান হয়ে ওঠে। পাশাপাশি, সুকান্তকে প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে তেতাল্লিশের ভয়াবহ মন্বন্তর।

এই উত্তাল সময়ে মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে ১৪-১৫ বছরের কিশোর সুকান্ত বেছে নিয়েছিলেন দুটি মন্ত্রÑ সাম্যবাদ ও কবিতা। রাজনীতি এবং শিল্পকে তিনি এক পাত্রে পান করেছেন। তার কাব্যাদর্শ ও জীবনাদর্শের এই ঐক্য লক্ষ করা যায় তার স্বীকারোক্তিতেইÑ ‘কবি বলে নির্জনতাপ্রিয় হব, আমি কি সেই ধরনের কবি? আমি যে জনতার কবি হতে চাই, জনতা বাদ দিলে আমার চলবে কি করে? তাছাড়া কবির চেয়ে বড় কথা আমি কমিউনিস্ট, কমিউনিস্টদের কাজ-কারবার সব জনতা নিয়েই।’ সেকালের পরাধীন ও বৈষম্যপীড়িত সমাজ-ব্যবস্থায় তিনি শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন পুঁজিবাদ, ফ্যাসিবাদ, ঔপনিবেশিকতা ও সামন্ততন্ত্রকে। আর এ কারণে তার কবিতায় বারবার ঝলসে উঠেছে এসবের বিরুদ্ধে শানিত বিক্ষোভÑ

ক. নিয়ত অন্যায় হানে জরাগ্রস্ত বিদেশী শাসন,

ক্ষীণায়ু কোষ্ঠীতে নেই ধ্বংস-গর্ভ সংকটনাশন। (বিবৃতি)

 

খ. বণিকের চোখে আজ কী দুরন্ত লোভ ঝ’রে পড়ে (মৃত্যুঞ্জয়ী গান)

 

 গ. শোন্ রে মালিক, শোন্ রে মজুতদার!

 তোদের প্রাসাদে জমা হল কত মৃত মানুষের হাড়Ñ (বোধন)

 

সুকান্তের কাব্যাদর্শের আরেকটি প্রবণতা বিশেষভাবে মনোযোগের দাবি রাখে। শৈশব থেকেই সুকান্ত অভাব-অনটনে বেড়ে ওঠা মানুষের দারিদ্র্যের কষ্টকে প্রত্যক্ষ করেছেন। দেখেছেন কৃষক-শ্রমিকের বঞ্চনা-নির্যাতন ও তাদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া। এসবই তাকে মধ্যবিত্তীয় খোলস ভেঙে কৃষক-শ্রমিকের কাতারে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে। তাদের একজন হয়েই তিনি কবিতায় উচ্চারণ করেছেন অসামান্য পঙ্ক্তিস্রোতÑ

প্রত্যহ যারা ঘৃণিত ও পদানত

দেখ আজ তারা সবেগে সমুদ্যত;

তাদেরই দলের পেছনে আমিও আছি

তাদেরই মধ্যে আমিও যে মরি-বাঁচি।

তাইতো চলেছি দিন-পঞ্জিকা লিখেÑ

বিদ্রোহ আজ। বিপ্লব চারিদিকে। (অনুভব/১৯৪৬)

 

ভারতবর্ষে তো বটেই, বিশ্বের তাবৎ শোষিত-নিপীড়িত মানুষের মুক্তির চেতনা সুকান্ত লাভ করেছিলেন মার্কসবাদের মাধ্যমে। ফলে রুশ-চীন-কিউবা-চেকোসøাভিয়াÑ যেখানেই সংগ্রামী মানুষ পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়েছে, তাদের সঙ্গে তিনি একাত্মতা ঘোষণা করেছেনÑ ‘আমার ঠিকানা খোঁজ করো শুধু/সূর্যোদয়ের পথে/ইন্দোনেশিয়া, যুগোশ্লাভিয়া,/রুশ ও চীনের কাছে,/ আমার ঠিকানা বহুকাল ধ’রে/জেনো গচ্ছিত আছে।’ (ঠিকানা) এ কারণেই বদরুদ্দীন উমর সুকান্তকে বাংলা কবিতায় ‘শ্রমিকশ্রেণীর প্রথম সার্থক কবি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্যেÑ ‘সুকান্তর সমগ্র কাব্য-প্রচেষ্টাই কিন্তু শ্রেণীচেতনার দ্বারা উদ্বুদ্ধ। তিনি শ্রেণীসংগ্রামেরই কবি। এ জন্য বাঙলাদেশের, ভারতবর্ষের এবং সারা পৃথিবীর বিস্তীর্ণ পরিসরে নানা সমস্যাকে কেন্দ্র করে এবং নানাভাবে তিনি শ্রেণীশোষণ ও শ্রেণীসংগ্রামের কথাই নিজের কবিতায় চিত্রিত ও প্রতিফলিত করেন।’ 

 

তৎকালীন বিশ্ব ও ভারতবর্ষকে এভাবেই কবিতায় তুলে এনেছেন সুকান্ত। এখন বিবেচনার বিষয়, ইংরেজ ঔপনিবেশিক শক্তি ভারতবর্ষ থেকে বিতাড়িত হয়েছে ১৯৪৭ সালে (দুর্ভাগ্য, সুকান্ত সেই প্রার্থিত লগ্ন দেখে যেতে পারেননি), সামন্ততন্ত্রও প্রায় বিতাড়িত। ভারতবর্ষ ভেঙে ভারত, পাকিস্তান ও কালক্রমে বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়েছে। আমরা প্রবেশ করেছি গণতন্ত্রের যুগে। এই যে পরিবর্তিত সময় ও প্রেক্ষাপটÑ এখানে তবে কতটুকু আর প্রয়োজন সুকান্তের? কোন প্রাসঙ্গিকতায় তিনি আমাদের সহায় হবেন? এই অনিবার্য প্রশ্নের উত্তর আমরা পেয়ে যাব, যদি এই পরিবর্তিত বিশ্ব ও আমাদের সমাজ-ব্যবস্থার প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচন করি। আদতে ঔপনিবেশিক শক্তির কোনো বিনাশ ঘটেনি, পুঁজিবাদ আরও সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্রের জালে ঘিরে রেখেছে আমাদের। এখন অস্ত্র, সৈন্য, লোকবল নিয়ে আরেক দেশ দখল ও বাজার তৈরির স্থূল আয়োজনের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো তাদের সাবেক উপনিবেশিত অঞ্চলসহ অনুন্নত দেশগুলোতে প্রবর্তন করেছে নয়া ঔপনিবেশিকতা। তাদের মুনাফা অর্জনের অনুকূল বাজার তারা সৃষ্টি করে নিয়েছে পৃথিবীজুড়ে। ঘরে বসেই তারা পাচ্ছে অঢেল মুনাফা। ‘তৃতীয় বিশ্ব’ নামে দরিদ্র, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে (বস্তুত ঔপনিবেশিক শাসনই এসব দেশের এই দুরবস্থার কারণ) রাজনৈতিক স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে নামে মাত্র, অন্তরালে থেকে এসব দেশের রাজনীতি-অর্থনীতির কলকাঠি নাড়ছে ওই শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোই। বিশ্বায়নের নামে তারা ঢুকে পড়েছে আমাদের প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত। তাদের পণ্য-রুচির চাহিদা সৃষ্টির মাধ্যমে একদিকে তারা গ্রাস করছে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য, অন্যদিকে বাজার দখল করে লুটে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা।

আবার আমাদের দেশে সামরিক শাসন পেরিয়ে যে গণতন্ত্র পর্বের উত্থানÑ তার চেহারাও আজ অস্পষ্ট নয়। এদেশের সম্মানিত সংসদ সদস্যদের সিংহভাগের পেশা ব্যবসা। সংসদ সদস্যদের অর্ধেক সংখ্যক কোটিপতি। বুঝতে অসুবিধা হয় না, এরা কাদের প্রতিনিধিত্ব করেন। কৃষক-শ্রমিকের জীবনমান তাই আজও অপরিবর্তিত। পার্থ চট্টোপাধ্যায় ‘গণপ্রজাতন্ত্র’কে উল্লেখ করেছেন ‘গণকে প্রজা করে রাখার তন্ত্র’ হিসেবে। এদেশের অবস্থাও অনুরূপ। আরেক অকালপ্রয়াত কবি লিখেছিলেনÑ ‘শোষক বদলে যায়, টিকে থাকে শোষণের ফাঁদ,/টিকে থাকে শ্রেণীভেদ, ঘুণে জীর্ণ সমাজ কাঠামো।/পতাকা বদলে যায়, বদলায় মানচিত্র-সীমা,/টিকে থাকে গৃহহীন, বস্ত্রহীন, ক্ষুধার্ত জীবন।’ (মিছিল/রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ)। বস্তুত আমরা বাস করছি এই অপরিবর্তিত শোষণ ও পীড়নের সময়ে। বৈশ্বিক ও দেশীয় বহুমাত্রিক শোষণের সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্রের ভেতর। ফলে সুকান্ত আমাদের জন্য অনিবার্য। সুকান্তের কবিতা সমগ্র শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রামের দীপ্র প্রেরণা। তার কবিতা এখনও আমাদের বিদ্রোহে প্রাণিত করেÑ 

ক. দিগি¦দিকে উঠেছে আওয়াজ :

রক্তে আনো লাল,

রাত্রির গভীর বৃন্ত থেকে ছিঁড়ে আনো ফুটন্ত সকাল। (বিবৃতি)

 

খ. বিপ্লব স্পন্দিত বুকে, মনে হয় আমিই লেনিন। (লেনিন)

 

কবিতার বক্তব্য ও শাণিত উচ্চারণের মাধ্যমে সুকান্ত যেমন একালেও প্রাসঙ্গিক, একইভাবে তার কবিতার ভাষা ও উপস্থাপনরীতি থেকেও আমাদের প্রেরণা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। আমরা দেখেছি, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কালে ইংরেজ ভাবাদর্শে আচ্ছন্ন শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত যে-সাহিত্যিক গোষ্ঠী বাংলা কবিতার ‘মূলধারা’য় পরিণত হলেন, তাদের অধিকাংশই বাংলা কাব্যের পরিবেশনগত ঐতিহ্যকে একরকম অবজ্ঞা ও অস্বীকার করে আত্মস্থ করলেন ইউরোপীয় নন্দন-ভাবনা। এই শিকড়-ছিন্নতা সবচেয়ে প্রকট হয়ে উঠেছিল ত্রিশের কবিদের হাতে। কবিতা জনজীবন থেকে পালিয়ে আশ্রয় নিল জনরিক্ত প্রান্তরে। সাধারণের সঙ্গে সাঁকো তৈরিতে ব্যর্থ হলো এই ‘আধুনিকতাবাদী’ কাব্যধারা। চল্লিশের কবিরাও মেলাতে পারেননি এই দ্বন্দ্ব। সমর সেন লেখা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায় কবিতা ছেড়ে মগ্ন হলেন পার্টির কাজে। কিন্তু সুকান্ত, সদ্য তরুণ সুকান্তই পারলেন জনমানুষকে কবিতার সঙ্গে গেঁথে  দিতে, কবিতাকে সাধারণের আপন কথায় পরিণত করতে। তার কবিতার মাধ্যমে তৈরি হলো অগণন শ্রোতা ও পাঠক। কী কৌশল ছিল সুকান্তের? সরল, নিরাভরণ ও স্পষ্ট স্বরে রবীন্দ্রনাথ যেমন শেষ-জীবনে লিখেছিলেন : ‘রূপ-নারানের কূলে/জেগে উঠিলাম;/জানিলাম এ জগৎ/স্বপ্ন নয়।/রক্তের অক্ষরে দেখিলাম/আপনার রূপÑ/চিনিলাম আপনারে/আঘাতে আঘাতে/বেদনায় বেদনায়।/সত্য যে কঠিন,/কঠিনেরে ভালোবাসিলামÑ/সে কখনো করে না বঞ্চনা।’ (রূপ-নারানের কূলে)। সুকান্তের কণ্ঠেও বেজেছে এই সরলোক্তি। সরল অথচ মর্মভেদীÑ

প্রয়োজন নেই কবিতার স্নিগ্ধতাÑ

কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি,

ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় :

পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝল্সানো রুটি ॥ (হে মহাজীবন)

কাব্যভাষাকে সহজ-সরল সৌন্দর্যে উপস্থাপনের এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই সুকান্তের কবিতা সর্বশ্রেণির পাঠকের গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে নিতে পেরেছে। সুভাষ মুখোপাধ্যায় স্বীকার করেছেনÑ ‘সমসাময়িকদের মধ্যে যে কাজ আর কেউ পারেনি, সুকান্ত একা তা করেছেÑ আধুনিক বাংলা কবিতার দ্বার বহু জনের জন্য সে খুলে দিয়ে গেছে। কবিতাবিমুখ পাঠকদের কবিতার রাজ্যে জয় ক’রে আনার কৃতিত্ব সুকান্তর। তারই সুফল আজ আমরা ভোগ করছি।’ 

এক্ষেত্রে, সুকান্তের আরেকটি কৌশলÑ প্রতীকের অসামান্য প্রয়োগ। আমাদের ব্যবহারিক জীবনের এমন সব বিষয় ও অনুষঙ্গকে অবলম্বন করে তিনি কবিতা লিখেছেন এবং সেসবের আড়ালে তিনি যে-চেতনা সংক্রামিত করেছেন, তা সত্যি অভাবিত ও চমকপ্রদ। স্মরণ করছিÑ চারাগাছ, সিঁড়ি, কলম, সিগারেট, দেশলাই কাঠি, চিল, রানার, প্রার্থী নামের কবিতাগুলো। যেখানে এসব প্রতীকের ভেতর দিয়ে তিনি শোষক-শোষিতের সম্পর্ক তুলে ধরেছেন, প্রকাশ করেছেন শোষকের অনিবার্য ধ্বংস এবং শোষিত শ্রেণির সম্মিলিত উত্থানের প্রতি প্রগাঢ় আস্থা। ‘একটি মোরগের কাহিনী’ কবিতায় দেখি, একটি মোরগ সমগ্র ক্ষুধার্ত মানবগোষ্ঠীর প্রতীক হয়ে উঠেছে; খাদ্য অন্বেষায় এসে শেষ পর্যন্ত সে নিজেই খাদ্যে পরিণত হয়েছে। যেভাবে দরিদ্র মানুষ পরিণত হয় পুঁজিবাদের খাদ্যে। এভাবে চেনা অনুষঙ্গের মাধ্যমে সুকান্ত চিত্রিত করেছেন চিরন্তন বিষয়াদিÑ যা সহজেই পাঠক-শ্রোতাকে স্পর্শ করতে সক্ষম। 

আমি এখানে সুকান্তের কবিতার গঠনগত দুটি দিকের প্রতি আলোকপাত করলাম। এরকম আরও কৌশল রয়েছে, যা সুকান্তের কবিতাকে পাঠকের হৃদয়ের কাছে নিয়ে গেছে। আজকের দিনের কোনো কবি নিশ্চয়ই সুকান্তের মতো করে কবিতা লিখবেন না। কিন্তু সুকান্তের চেতনার নির্যাস তাকে পথ দেখাতে পারে অর্থাৎ কবিতাকে পাঠকের বোধগম্যতায় আনার তাগিদ তৈরি করতে পারে। আর এই তাগিদটাই মূল। এই তাগিদ যিনি বোধ করবেন, তিনি নিজের মতো করেই খুঁজে নেবেন নতুন-নতুন কৌশল, নতুন উপস্থাপনা।

‘ছাড়পত্র’ কবিতায় সুকান্ত লিখেছিলেনÑ ‘এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমিÑ/নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।/অবশেষে সব কাজ সেরে,/আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে/করে যাব আশীর্বাদ,/তারপর হব ইতিহাস ॥’Ñ হ্যাঁ, সুকান্ত ইতিহাস হতে পেরেছেন। তার ২১ বছরের স্বল্পায়ু জীবনকে তিনি সমর্পণ করেছিলেন মানবমুক্তির অঙ্গীকারে। সাহিত্যে-সংগঠনে-রাজনৈতিক কর্মে পরিব্যাপ্ত তার জীবনের ধ্রুব লক্ষ্যই ছিলÑ শোষণের রাহু ছিন্ন করে সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার। সেই অমল স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই তিনি লোকান্তরিত হয়েছেন। তিনি চলে গেছেন; কিন্তু তার স্বপ্ন কবিতার অক্ষরে গেঁথে দিয়ে গেছেন আমাদের আত্মায়, আমাদের কাঁধে। আজকের বিশ্বে যখন সমুদ্র-পাড়ে উপুড় হয়ে থাকে শিশু আসলানের মৃতদেহ; ক্ষুধার্ত-উদ্বাস্তু-বোমায় রক্তাক্ত শত-শত শিশুর করুণ মুখ যখন আমাদের সামনেÑ তখন সুকান্তই তার অঙ্গীকার নিয়ে আমাদের জংধরা চৈতন্যে করাঘাত করেন। আমাদের কণ্ঠে তুলে দেন তার অমোঘ প্রতিজ্ঞাÑ

দেখব, ওপরে আজো আছে কারা

খসাব আঘাতে আকাশের তারা,

সারা দুনিয়াকে দেব শেষ নাড়া, (বিদ্রোহের গান)

এভাবেই সুকান্ত এখনও আমাদের রক্তে চেতনার অনিঃশেষ আগুন জ্বালিয়ে রাখেন। হ


পাঠক কমছে; কিন্তু সেটা কোনো
দুই বাংলার জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। অন্যদিকে বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক
বিস্তারিত
মনীষা কৈরালা আমি ক্যান্সারের প্রতি কৃতজ্ঞ,
ঢাকা লিট ফেস্টের দ্বিতীয় দিন ৯ নভেম্বরের বিশেষ চমক ছিল
বিস্তারিত
এনহেদুয়ান্নার কবিতা ভাষান্তর :
  যিশুখ্রিষ্টের জন্মের ২২৮৫ বছর আগে অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৪ হাজার
বিস্তারিত
উপহার
  হেমন্তের আওলা বাতাস করেছে উতলা। জোয়ার এসেছে বাউলা নদীতে, সোনালি
বিস্তারিত
সাহিত্যের বর্ণিল উৎসব
প্রথম দিন দুপুরে বাংলা একাডেমির লনে অনুষ্ঠিত হয় মিতালি বোসের
বিস্তারিত
নিদারুণ বাস্তবতার চিত্র মান্টোর মতো সাবলীলভাবে
এ উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ভারতের প্রখ্যাত পরিচালক নন্দিতা দাস
বিস্তারিত