মক্কা শরিফের জুমার খুতবা

হে কল্যাণপন্থি, অগ্রসর হও

রমজান মাস হলো 
নামাজ-রোজার মাধ্যমে ব্যক্তির আত্মাকে পবিত্র করার সবচেয়ে বড় সুযোগ, যাতে তা রাতের বেলা কোরআনের আয়াতগুলো নিয়ে চিন্তার জন্য প্রস্তুত হয়। কেননা রাতের মুহূর্তগুলোই তেলাওয়াতে মনোযোগের অধিক উপযুক্ত। দিনে রোজার মাধ্যমে চিন্তা খাদশূন্য হয়, আর রাতে কোরআন নিয়ে নামাজে দাঁড়ানোতে তা ঈমানে সুসজ্জিত হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই ইবাদতের জন্য রাতে ওঠা প্রবৃত্তি দলনে সহায়ক এবং স্পষ্ট উচ্চারণের অনুকূল।’ (সূরা মুজ্জাম্মিল : ৬)

 

প্রাকৃতিক নানা সামগ্রীর মতো মানবমনও বিভিন্নভাবে আক্রান্ত হয়। অন্তরেও মরিচা ধরে; লোহায় যেমন জং ধরে। হৃদয়ও বিশুষ্ক হয়, যেমন শুকিয়ে যায় পশুর ওলান। আত্মাও অনুর্বর হয়ে যায়, জমিন হয় যেমন নিষ্ফলা। তাই নফসের মানোন্নয়ন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। যা এর মরিচা পরিষ্কার করবে, ওলানকে দুধে ভরে দেবে এবং অনুর্বরবতা দূর করে অঙ্কুরোদ্গম ঘটাবে। কেননা সময়ের জটলা ও আঁচড়ে নফস কখনও উদাসীন হয়ে পড়ে। এর ওপর স্তূপ হয় বিবিধ ব্যস্ততা। যা এর সামনে তৈরি করে আল্লাহর জন্য মুক্ত ও স্বচ্ছ হওয়ার উপায় অবলম্বনে অন্তরায়। একে সুযোগ দেয় না এজন্য সজ্জিত ও আগ্রহী হতে। 
জেনে রাখুন, আপনাদের ওপর ছায়া বিস্তার করা মাসটি এক্ষেত্রে বড় সহায়ক। এটি ‘রমজান মাসÑ যাতে নাজিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথনির্দেশ, আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী।’ (সূরা বাকারা : ১৮৫)। 
এটি পুণ্য অর্জনের মাস, সালাত ও সিয়ামের মাস, দয়া ও সহমর্মিতার মাস, রিপুর লাগাম টানার মাস, আমিত্ব চূর্ণ করা এবং আত্মাকে পুণ্যের বেড়ার মধ্যে বাঁধার মাস। নিজেকে পূর্ণাঙ্গ ভাবার কাল্পনিক বৃত্ত থেকে নফসকে বের করার মাস। যে কল্পনা এমন সুযোগ লুফে নেওয়া এবং ইবাদত থেকে দূরে রাখা খামোখা ব্যস্ততায় ডুবে থাকা থেকে নফস মুক্ত হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ এতেই ডুবে থাকে, এমনকি ভারী হয়ে যায়। তাতে ভর করে শীতল হয়ে যায়। এতে সে ইবাদতের সুযোগ হারিয়ে ফেলে। শেষ অবধি সে আটকে পড়ে রিপু, আলস্য ও অকর্মণ্যতার কব্জায়। 
এই মোবারক মাসটি তাকওয়া বাড়ানোর মাস। কেউ তার পুণ্য বৃদ্ধির প্রয়োজন এবং এ মাসে এর জন্য নিজেকে মুক্ত করার ঊর্ধ্বে নয়। হ্যাঁ, আমাদের সম্পদ ও সন্তান আমাদের ব্যস্ত রেখেছে আমাদের অন্তর পরিশুদ্ধ করা এবং সুসজ্জিত হতে এর খালীকরণ থেকে। কিছু অন্তরে থাকে কাঠিন্য, সে অন্তর যেন রমজান থেকে খানিকটা দয়ার চরিত্র আহরণ করে; কিছু সম্পদে থাকে কঠিনতা, তা যেন রমজান থেকে খুঁজে নেয় স্বচ্ছতা ও পরিশুদ্ধি; কিছু ভাষায় থাকে কঠোরতা ও ধার, তা যেন রমজানে কিছু উত্তম বাক্য সন্ধান করে; কিছু দেহে আছে অলসতা, তা যেন রমজান থেকে উদ্যম ও শক্তি অনুসন্ধান করে। 
এটি একটি পূর্ণাঙ্গ মাস, যাতে রয়েছে অনুসন্ধানীর জন্য তাকওয়ার সমুহ উপাদানÑ ‘তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’ (সূরা বাকারা : ১৮৩)। অতএব হে কল্যাণপন্থি, অগ্রসর হও আর হে মন্দপন্থি, নিবৃত হও। 
নিশ্চয়ই ঈমানিবোধসম্পন্ন ব্যক্তি প্রচ- আফসোসে পোড়েন, যখন তিনি দেখতে পান এ পবিত্র মাসেও বহু মানুষ গতানুগতিক পথেই চলছে। যে পথ আনুগত্য ও ইবাদতমুখী নয়; প্রচলন ও অভ্যাসতাড়িত। তাদের কোনো অনুভূতি নেই যে, এই বরকতময় মাসটিতে উচিত ছিল আল্লাহর দ্বীনের নৈকট্যের স্তরে উত্তরণে প্রবৃত্তিকে আঘাত করা। অনুভূতিশীল ব্যক্তিদের এ মাস মনে করিয়ে দেয় তাদের ওপর আল্লাহ তায়ালার হক। এ মাসে অধিকাংশ বৈঠকেও অনুভূত হয় ঈমানি আবেগের সুবাস। পরিদৃষ্ট হয় এ মাসে ইবাদত, নেক আমল ও কোরআন তেলাওয়াতে মানুষের আগ্রহ। এমনকি এর মাধ্যমে তাদের উত্তরণ ঘটে অন্তর পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতিপর্যায়ে। অবশেষে আল্লাহ তার মধ্যে পরিবর্তন ঘটান। ‘আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যে পর্যন্ত না তারা তাদের নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।’ (সূরা রাদ : ১১)। 
অপরদিকে এ মোবারক মাসে বহুসংখ্যক মানুষ তাদের জন্য আল্লাহর কিতাবের প্রয়োজনকে মনে করে জল-বায়ুর প্রয়োজনের মতো, যাতে তাদের অবস্থা শোচনীয় না হয় এবং একে অপরের পেছনে ব্যস্ত হয়ে না পড়ে, যাতে রূপান্তরিত না হয় তাদের সম্প্রীতি হিংসায়, একতা বিচ্ছিন্নতায়, নিরাপত্তা আতঙ্কে, স্থিতিশীলতা অরাজকতায়।  
রমজানুল মোবারক মাসে মুসলিম ব্যক্তির শক্তির মান উঁচু হয়ে যায়। ফলে এতে উত্তমরূমে ইবাদতে নিযুক্ত হলে তাকে টলানো কঠিন হয়। সে অনুভব করে এ পবিত্র মাসের লুক্কায়িত ভেদগুলোর মধ্যে মহানতর কিছু। যা মূলত নবী (সা.) এর এই বাণীরই প্রতিফলনÑ ‘যখন রমজানের প্রথম রাত প্রবেশ করে, জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় জাহান্নামের দরজাগুলো। শৃঙ্খলিত করা হয় শয়তানকে।’ (বোখারি ও মুসলিম)। অতএব হে কল্যাণপন্থি, অগ্রসর হও আর হে মন্দপন্থি, নিবৃত হও।
রমজান মাসে কোরআন ছাড়া মুসলিম ব্যক্তির জীবন যেন পানি-বাতাসহীন সত্তা। নিজ রবের কিতাবের সঙ্গে কিছু রোজাদারের সম্পর্ক যেন বৈচিত্র্যহীন বন্ধন। কোরআনের আয়াতগুলো যেন তাদের কাছে দ্রুত আবৃত্তির কিছু। জানে না কী পড়ছে। অনুভব করে না কী তেলাওয়াত করছে। তাদের লক্ষ্য শুধু যেন সূরার শেষে গিয়ে উপনীত হওয়া। ফলে তারা পতিত হয় সে দুর্বলতায় আল্লাহ যার ভর্ৎসনা করেছেনÑ ‘আর তাদের মধ্যে এমন কিছু নিরক্ষর লোক আছে, যারা মিথ্যা আশা ছাড়া কিতাব সম্পর্কে কিছুই জানে না, তারা শুধু অমূলক ধারণা পোষণ করে।’ (সূরা বাকারা : ৭৮)। অর্থাৎ তারা কেবল এর তেলাওয়াতই জানে, যা তাদের গলা অতিক্রম করে না। কখনও তারা তাতে সুরের বৈচিত্র্য সৃষ্টি করে এবং চোয়াল বাঁকা করে উচ্চারণে করে, যা তাদের তেলাওয়াতের প্রাঞ্জলতা ও চিন্তার উৎকর্ষ থেকে উদাসীন রাখে।
চতুর্থ শতাব্দীর কেরাত ও তাফসিরশাস্ত্রের অন্যতম ইমাম আবু ওমর দানি (রহ.) বলেন, ‘তাজবিদ এটা নয় যে, জিহ্বা চিবানো, মুখ গোল করা, চোয়াল বাঁকা করা, বিকট শব্দ করা, মদ কেটে পড়া, গুন্নাহর ধ্বনি তোলা কিংবা রা পুর-বারিক নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়া। এমন পাঠ যা কৃত্রিম। কলব ও কর্ণ যা থেকে পলায়ন করে। বরং তাজবিদ হলো সহজ, সুমিষ্ট, মধুর ও কোমল পাঠ।’ 
মনে রাখবেন, রমজান মাস হলো নামাজ-রোজার মাধ্যমে ব্যক্তির আত্মাকে পবিত্র করার সবচেয়ে বড় সুযোগ, যাতে তা রাতের বেলা কোরআনের আয়াতগুলো নিয়ে চিন্তার জন্য প্রস্তুত হয়। কেননা রাতের মুহূর্তগুলোই তেলাওয়াতে মনোযোগের অধিক উপযুক্ত। দিনে রোজার মাধ্যমে চিন্তা খাদশূন্য হয়, আর রাতে কোরআন নিয়ে নামাজে দাঁড়ানোতে তা ঈমানে সুসজ্জিত হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই ইবাদতের জন্য রাতে ওঠা প্রবৃত্তি দলনে সহায়ক এবং স্পষ্ট উচ্চারণের অনুকূল।’ (সূরা মুজ্জাম্মিল : ৬)। 

২ রমজান ১৪৩৯ হিজরি মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর আলী হাসান তৈয়ব


কৃতজ্ঞ ও কৃতজ্ঞতার মাহাত্ম্য
আর আমাদের নবী (সা.) এর কথা তো বলাই বাহুল্য। নিজ
বিস্তারিত
মিতব্যয়িতা : ইসলামের মধ্যমপন্থার একটি
  দুনিয়ার এ সংক্ষিপ্ত জীবনে আল্লাহ মানুষকে সম্পদের মালিকানা দিয়ে
বিস্তারিত
শ্রমিকের অধিকার বাস্তবায়নে ইসলামের শ্রমনীতি
খতিব : হাজী জাহেদ আলী ফকির কেন্দ্রীয় শাহী মসজিদ, আমতলী,
বিস্তারিত
ন্যাড়া গ্যাংয়ের পাবলিসিটি
সারিবদ্ধভাবে একই রকম পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে এলাকায় ঘুরছে একদল কিশোর। যাদের
বিস্তারিত
সুফি সাহেবের বিশ্বাসঘাতক বউ
লোকটির পরিচয় সুফি। তার আধ্যাত্মিক সাধনার ঠিকানা খানকাহ। জীবন-জীবিকার জন্য
বিস্তারিত
সুফিকোষ
‘নাজিব’ আরবি শব্দ, বিশেষণ, একবচন, পুংলিঙ্গ; এর স্ত্রী-লিঙ্গ হলো ‘নাজিবাহ’।
বিস্তারিত