অনন্য পাঁচ উপন্যাস

ঘানার শিশুতোষ কথাসাহিত্যিক মিশাখ আছারেকে (১৯৪৫, ঘানা) বিশ্বসাহিত্যে পরিচিতি এনে দিয়েছে তার উপন্যাস ‘সসু’ (১৯৯৭)। বইটি ১৯৯৯ সালে জিতে নেয় ইউনেস্কোর সেরা শিশুসাহিত্যের পুরস্কার এবং স্থান করে নেয় আফ্রিকার সেরা একশ বইয়ের তালিকায়। সসু নামক এক পঙ্গু বালক এই উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্র। পরিবারের বাইরের জগতের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ নেই। সসুর বেঁচে থাকার অবলম্বন 
হয়ে দাঁড়ায় অতীত জীবনের কিছু খ-িত স্মৃতিÑ যখন 
সে তার মায়ের পিঠে ভর করে রোদ্রে ঘুরে বেড়াত

 

কানাডা-আফগানিস্তান : দ্য ব্রেডউইনার
অস্কার দৌড়ে ২০১৭ সালে অ্যানিমেটেড মুভি বিভাগে এগিয়ে ছিল ব্রেডউইনার মুভিটি। শেষ পর্যন্ত অস্কার জিতে নেয় কোকো। সিনেমাটি বানানো হয়েছে কানাডিয়ান ঔপন্যাসিক ডেবোরাহ ইলিচের দ্য ব্রেডউইনার উপন্যাস অবলম্বনে। উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ২০০০ সালে। ২০১৩ সালের মাঝামাঝি এসে বইটির ৩৯টি সংস্করণ শেষ হয়ে যায়। বইটির পিডিএফ ভার্সনও পেয়ে যায়। কলেবরে খুব বেশি বড় না হওয়ার কারণে শেষ করতে সময়ও লাগেনি। উপন্যাসটি প্রেক্ষাপট তালেবান নিয়ন্ত্রিত কাবুল শহর। একটি দরিদ্র পরিবারের গল্প যে পরিবারের একমাত্র রোজগেরে পুরুষটি বৃদ্ধ এবং খোঁড়া। বাড়িতে চার মেয়ে ও স্ত্রী। ছেলেটা এক বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয়েছে। তালেবানের নির্দেশে শহরে মেয়েদের ঘরের বাইরে বের হওয়ার সুযোগ নেই। বৃদ্ধের সঙ্গে বাড়ির সবচেয়ে আট বা নয় বছরের মেয়ে পারভানা বোরকা পরে বাজারে বসে। ওরা বাড়ির অপ্রয়োজনীয় বা অল্প প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো বিক্রি করে দেয়। আর কিছু আয় হয় চিঠি পড়ে।
তালেবানরা একদিন বৃদ্ধ বাবাকে ধরে নিয়ে জেলে বন্দি করে রাখে। শিশু ও কন্যাদের নিয়ে বিপদে পড়ে যায় মা। বাড়ির বাইরে খাবার ও পানি আনার জন্য কাউকে না কাউকে বের হতে হবে। যেহেতু কোনো নারী পুরুষসঙ্গী ছাড়া বের হতে পারে না, তাই পারভানার চুল ছোট করে ছেলের বেশে বাজারে পাঠানো হয়। পারভানা আবিষ্কার করে তার মতো আরও মেয়ে ছেলের বেশে চা বিক্রি করে বা অন্যান্য টুকিটাকি কাজ করে সংসারের হাল ধরেছে। বেশিরভাগ সংসার পুরুষশূন্য হতে চলেছে। পারভানার মতোই আরেক মেয়ে সাজিয়ার সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়। তারা আয় বাড়ানোর জন্য পুরানো কবরস্থান খননের কাজ করে। একদিন পারভানা জানতে পারে তার পরিবার পাকিস্তানে চলে যাচ্ছে। তার বড় বোন নুরি সেখানে বিয়ে করে চাকরি করবে। পারভানা কাবুল ছেড়ে যায় না, বাবার জেল থেকে মুক্তির জন্য অপেক্ষা করে। বাবা মুক্তি পেলে সে তার পরিবারকে খুঁজে পেতে বাবাকে নিয়ে পাকিস্তানের পথে পা বাড়ায়। 
উপন্যাসে তালেবান শাসিত কাবুল শহরের বীভৎস চিত্র ফুটে উঠেছে। নারীদের শিক্ষা ও বাইরের আলোবাতাসবঞ্চিত বন্দিজীবন এবং পরিস্থিতির মোকাবিলায় সাহসী হওয়ার গল্প এই উপন্যাসে ফুটে উঠেছে। ঔপন্যাসিক ডেবোরাহ ইলিচ পিস মুভমেন্ট এবং অ্যান্টি-ওয়ার মুভমেন্টের অংশ নিয়ে ১৯৯৭ সালে পাকিস্তানে আসেন। সেখানে আফগান শরণার্থী ক্যাম্পে অনেক নারী-পুরুষের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। সেই সাক্ষাৎকার থেকে তিনি পরপর তিন বছরে সিরিজ আকারে তিনটি উপন্যাস লেখেনÑ দ্য ব্রেডউইনার (২০০১), পারভানাস জার্নি (২০০২) এবং মাড সিটি (২০০৩)। এ সময় তিনি তালেবানদের কাছ থেকে মৃত্যুর হুমকিও পেয়েছেন।     

আমেরিকা-নেপাল : সোল্ড
সোল্ড উপন্যাসটি আমি হাতে পাই নীলক্ষেতে, বছর তিনেক আগে। লেখক প্যাট্রিসিয়া ম্যাককরমিককে আমি কিছুটা জানতাম কিশোর উপন্যাস ‘কাট’ এবং মার্কিন সাংবাদিক হিসেবে। উপন্যাসটি ভারতীয় উপমহাদেশের সেক্সুয়াল সেøভারি নিয়ে লেখা। পড়তে শুরু করে বুঝতে পারি এটি ডকুফিকশন। লেখক প্রচুর গবেষণা ও সাক্ষাৎকার নিয়ে লিখেছেন। উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ২০০৬ সালে। উপন্যাসের গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র লক্ষ¥ী নামের এক নেপালি মেয়ে। তাকে অপহরণ করে ভারতের যৌনপল্লীতে পাচার করে দেওয়া হয়। উপন্যাসটি লক্ষ্মীর বয়ানে ছোট ছোট অনুচ্ছেদ ভাগ করে লেখা। প্যাট্রিসিয়া এই উপন্যাসটি লেখার জন্য ভারতের সীমান্তঘেঁষা যৌনপল্লীতে যান। তিনি নেপালে পাচার হয়ে যাওয়া নারীদের ভেতর থেকে যাদের উদ্ধার করা গেছে তাদের ভেতর থেকে কয়েকজনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। উপন্যাসের গল্পে লক্ষ্মী নামের তেরো বছর বয়সী নেপালি কিশোরীকে তার সৎবাবা একজন অপরিচিত মানুষের হাতে তুলে দেন শহরে কাজ করতে পাঠাচ্ছেন বলে। দরিদ্র সংসারের বোঝা কমাতে লক্ষ্মী একবুক আশা নিয়ে হিমালয়ের পাদদেশের বাড়ি ছেড়ে অচেনা শহরের উদ্দেশে পাড়ি দেয়। একটা সময় সে জানতে পারে সে যেখানে এসেছে এটা কোনো ভদ্রলোকের বাড়ি নয়, বেশ্যাপল্লী। তার সৎবাবা তাকে বিক্রি করে দিয়েছে। লক্ষ্মীর বর্ণনা থেকে তার সেই ভয়ংকর জীবনের গল্প এখানে উঠে এসেছে। 
উপন্যাসটি অবলম্বনে ২০১৬ সালে নির্মিত হয় চলচ্চিত্র। নির্মাতা মলিস পিলগ্রিম শর্টফিল্মের জন্য অস্কারজয়ী জেফরে ডি ব্রাউন। ছবিতে আসামি অভিনেত্রী নিয়ার সাইকিয়া লক্ষ্মীর চরিত্রে অভিনয় করেন। আমেরিকান অভিনেতাদের পাশাপাশি ভারতীয় অভিনেতাদের ভেতর আরও উল্লেখযোগ্য হলেন কলকাতার পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়।    

চীন : ওয়াইভস অ্যান্ড কনকুবাইনস
বর্তমান চীনা কথাসাহিত্যে জনপ্রিয় লেখক সু টং। তিনি বেশকিছু উপন্যাস এবং দুই শতাধিক ছোটগল্পের রচয়িতা। তার সবচেয়ে আলোচিত উপন্যাস ‘ওয়াইভস অ্যান্ড কনকুবাইনস’ প্রকাশিত হয় ১৯৯০ সালে। এর পরের দেশটির খ্যাতনামা পরিচালক ঝাঙ উইমউ উপন্যাসটি অবলম্বনে নির্মাণ করেন ‘রেইজ দ্য রেড ল্যানটার্ন’ সিনেমাটি। সিনেমাটি দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করলে এই নামেই উপন্যাসটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। উপন্যাসে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে চীনে নারীদের ওপর সামাজিক নিপীড়নের এক বাস্তবধর্মী চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে। একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবেও দেখার সুযোগ আছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাংস্কৃতিক পার্থক্য থাকলেও নারীদের ওপর বঞ্চনার রূপ যে প্রায় সবখানে একই, উপন্যাসটি পড়লে বোঝা যায়। একবিংশ শতকের উল্লেখযোগ্য নারীবাদী উপন্যাস হিসেবে তাই এর পাঠ চলছে।
উপন্যাসের গল্প গড়ে উঠেছে সঙলিয়ান নামের উনিশ বছরের এক তারুণীকে কেন্দ্র করে। সঙলিয়ানের বাবা তার পরিবারকে চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে রেখে হঠাৎই মারা যায়। বাধ্য হয়েই সঙলিয়ানকে বিয়ে করতে হয় চেন যুয়োকিয়ান নামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের বয়স্ক পুরুষের সঙ্গে। সঙলিয়ান ছাড়াও চেনের আরও তিনজন স্ত্রী (উপপতœী) ছিল। সঙলিয়ন বিয়ের পর বুঝতে পারে, প্রত্যেক স্ত্রী সমভাবে ভোগ-বিলাসী জীবনযাপন করতে পারে না। চেন প্রতিদিন সিদ্ধান্ত নেয় সে কোন স্ত্রীর সঙ্গে রাত্রিযাপন করবে এবং শুধু সেই স্ত্রী সেদিনের জন্য বিশেষ সম্মান পায়। যে স্ত্রীর সঙ্গে চেন রাত্রিযাপন করবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন, তার ঘরের সামনে হারিকেন জ্বালিয়ে রাখা হয়। স্বামীর আনুকূল্য পাওয়ার জন্য স্ত্রীদের ভেতর চলে তীব্র প্রতিযোগিতা।
রেড লণ্ঠন বা জ্বলন্ত হারিকেন এখানে চার স্ত্রীর ওপর তাদের স্বামী বা তৎকালীন পুরুষতান্ত্রিক চীনা সমাজ কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া বঞ্চনার প্রতীক হয়ে উঠেছে। 

জাপান : ওম্যান অন দি আদার সোর
ওম্যান অন দি আদার সোর নামের উপন্যাসটি লেখিক মিটসুয়ো কাকুটাকে (১৯৬৭, ইয়োকোহামা, জাপান) বিশেষভাবে পরিচিত করিয়ে দিয়েছে। জাপানের মধ্যবিত্ত, স্বামী-পরিত্যক্তা নারীদের মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক টানাপড়নের এক সার্থক ও শৈল্পিক উপস্থাপন ঘটেছে এই উপন্যাসে। উপন্যাসটি ২০০৫ সালে জিতে নিয়েছে জাপানের সম্মানীয় ‘নাওকি পুরস্কার’। এছাড়াও বইটি উঠে এসেছে জাপানের সর্বাধিক পঠিত আধুনিক উপন্যাসগুলোর তালিকায়।
উপন্যাসটির কাহিনি গড়ে উঠেছে মাঝবয়স্ক সায়োকো এবং অই নামক স্বাধীনচেতা আত্মবিশ্বাসী দুজন নারীকে ঘিরে। সায়োকো অই-এর ‘হাউজিং অ্যান্ড ট্রাভেলিং এজেন্সি’তে কাজ করে। অয়-এর সংস্পর্শে এসে জীবন সম্পর্কে হতাশাগ্রস্ত সায়োকো বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে পেতে শুরু করে। আপাতদৃষ্টিতে, অয়কে আশাবাদী ও আত্মাবিশ্বাসী মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে সে জীবন থেকে পালিয়ে বেড়াতে চায় প্রতিনিয়ত। স্কুলে পড়াকালীন সময়ে ক্লাসমেটদের হাতে বিভিন্নভাবে নির্যাতনের স্বীকার হয় অয়, যে কারণে এক ধরনের ভয় তাকে তাড়া করে বেড়ায় এখনও। 
বর্তমান সময়ে অয় এবং সায়োকোর মধ্যেকার নিবিড়-বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং অয়-এর অতীত জীবনের ভীতিকর অধ্যায় আমাদের আধুনিক জীবনের বৈপরীত্য (ভবধৎ ধহফ লড়ু)  সম্পর্কে সজাগ করে তোলে।

ঘানা : ‘সসু’ কল
ঘানার শিশুতোষ কথাসাহিত্যিক মিশাখ আছারেকে (১৯৪৫, ঘানা) বিশ্বসাহিত্যে পরিচিতি এনে দিয়েছে তার উপন্যাস ‘সসু’ (১৯৯৭)। বইটি ১৯৯৯ সালে জিতে নেয় ইউনেস্কোর সেরা শিশুসাহিত্যের পুরস্কার এবং স্থান করে নেয় আফ্রিকার সেরা একশ বইয়ের তালিকায়।
সসু নামক এক পঙ্গু বালক এই উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্র। পরিবারের বাইরের জগতের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ নেই। সসুর বেঁচে থাকার অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায় অতীত জীবনের কিছু খ-িত স্মৃতিÑ যখন সে তার মায়ের পিঠে ভর করে রোদ্রে ঘুরে বেড়াত। আশপাশের মানুষ তার জন্য প্রার্থনা করত যাতে সে হাঁটতে পারে। পরিবারে বাবা ও ভাই-বোনের কাছ থেকে লেখাপড়া থেকে শুরু করে অনেক কিছুই শিখে সসু। শুধু শিখতে পারে না ‘হাঁটতে’। প্রকৃতির এই চরম অভিশাপকে বয়ে বেড়াতে বেড়াতে একসময় নিজেই অভিশপ্ত হয়ে ওঠে প্রতিবেশীদের কাছে। তারা পরামর্শ দেয়, পরিবারের কল্যাণের জন্য সসুকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া উচিত।
সসুর সঙ্গী বলতে বাড়ির ওই একমাত্র কুকুরটাই। কখনও কখনও কুকুরটাকে খুব হিংসে হয় সসুরÑ কেমন সুন্দর হেঁটে বেড়ায় সে! প্রশ্ন করে নিজেকেÑ একজোড়া মজবুত, শক্ত পা ছাড়া একটা বালকের গুরুত্ব কোথায়?
উপন্যাসটির শেষের দিকে দৃশ্যপটের পরিবর্তন হয়। সসুর উপস্থিত বুদ্ধির জন্য বেঁচে যায় বেশ কয়েকজনের জীবন। ফলে সসু শেষ পর্যন্ত হাঁটতে পারে না ঠিকই; কিন্তু সমাজের সবাই তার গুরুত্ব টের পেতে শুরু করে। 


পাঠক কমছে; কিন্তু সেটা কোনো
দুই বাংলার জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। অন্যদিকে বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক
বিস্তারিত
মনীষা কৈরালা আমি ক্যান্সারের প্রতি কৃতজ্ঞ,
ঢাকা লিট ফেস্টের দ্বিতীয় দিন ৯ নভেম্বরের বিশেষ চমক ছিল
বিস্তারিত
এনহেদুয়ান্নার কবিতা ভাষান্তর :
  যিশুখ্রিষ্টের জন্মের ২২৮৫ বছর আগে অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৪ হাজার
বিস্তারিত
উপহার
  হেমন্তের আওলা বাতাস করেছে উতলা। জোয়ার এসেছে বাউলা নদীতে, সোনালি
বিস্তারিত
সাহিত্যের বর্ণিল উৎসব
প্রথম দিন দুপুরে বাংলা একাডেমির লনে অনুষ্ঠিত হয় মিতালি বোসের
বিস্তারিত
নিদারুণ বাস্তবতার চিত্র মান্টোর মতো সাবলীলভাবে
এ উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ভারতের প্রখ্যাত পরিচালক নন্দিতা দাস
বিস্তারিত