নবীদের জীবনে তাকওয়া

ইউসুফ (আ.) এর প্রসঙ্গও কোরআনে বর্ণিত হয়েছে। তৎকালীন ফার্স্ট লেডি জুলেখা ইউসুফ (আ.) কে ঘরে তুলে বাইরে থেকে ঘরের দরজা বন্ধ করে নিজের দিকে আকৃষ্ট করার সব প্রচেষ্টা সম্পন্ন করে। ইউসুফ (আ.) তাকওয়ার শক্তিতে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করেন। আল্লাহ তাকে হেফাজত করেন

সব ইবাদতেরই উদ্দেশ্য তাকওয়া অর্জন করা। আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ! তোমরা তোমাদের সেই প্রতিপালকের ইবাদত করো, যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্ববর্তীদের সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পার।’ (সূরা বাকারা : ২১)।  

নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, কোরবানিসহ সব ইবাদতের মাধ্যমে বান্দা তাকওয়া অর্জন করবে, এমনটিই কাম্য বিষয়। রোজা তাকওয়া অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। রমজান সে তাকওয়া অর্জনের অনুশীলন ও প্রশিক্ষণের মাস। আল্লাহ বলেন, ‘হে মোমিনরা! তোমাদের জন্য রোজার বিধান দেওয়া হলো যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীদের দেওয়া হয়েছিল, যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পার।’ (সূরা বাকারা : ১৮৩)। 
তাকওয়া পাপ থেকে বাঁচায় 
তাকওয়া মানুষকে পাপ থেকে বাঁচায় ও ঈমানের ওপর অবিচল রাখে। কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। যেমন আদম (আ.) এর দুই সন্তানের প্রসঙ্গ কোরআনে বর্ণিত হয়েছে। আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) যখন পৃথিবীতে আগমন করেন এবং সন্তান প্রজনন ও বংশবিস্তার আরম্ভ হয়, তখন প্রতি গর্ভ থেকে একটি পুত্র ও একটি কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করত। তখন ভাই-বোন ছাড়া আর কোনো সন্তান ছিল না। অথচ ভাই-বোন পরস্পরে বিয়ে হয় না। তাই আল্লাহ তায়ালা উপস্থিত প্রয়োজনে আদম (আ.) এর শরিয়তে এই বিধান জারি করেন যে, একই গর্ভ থেকে যে যমজ পুত্র ও কন্যা জন্মগ্রহণ করবে, তারা পরস্পরে সহদর ভাই-বোন হিসেবে গণ্য হবে। তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম বলে বিবেচিত হবে। কিন্তু এক গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণকারী পুত্রের জন্য অন্য গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণকারী কন্যা সহোদরা বোন গণ্য হবে না। তাদের পরস্পর বিয়ে বৈধ হবে। কিন্তু ঘটনাক্রমে কাবিলের সহজাত সহোদরা বোন ছিল পরমা সুন্দরী আর হাবিলের সহজাত সহোদরা বোন ছিল কুশ্রী। বিয়ের সময় হলে নিয়মানুযায়ী হাবিলের সহজাত কুশ্রী বোন কাবিলের ভাগে পড়ে। এতে কাবিল অসন্তুষ্ট হয়ে হাবিলের শত্রু হয়ে যায়। সে জেদ ধরে যে, আমার সহজাত বোনকেই আমার সঙ্গে বিয়ে দিতে হবে। সে হাবিলকে হত্যার হুমকি দেয় এবং এক পর্যায়ে তাকে হত্যা করেই ফেলে। পক্ষান্তরে মুত্তাকি হাবিল বলে, ‘আমাকে হত্যা করার জন্য তুমি হাত তুললেও তোমাকে হত্যা করার জন্য আমি হাত তুলব না। আমি তো জগতের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি।’ (সূরা মায়িদা : ২৮)। 
আল্লাহর এই ভয় বা তাকওয়া তাকে অপরাধ থেকে বাঁচিয়ে রাখে। ইউসুফ (আ.) এর প্রসঙ্গও কোরআনে বর্ণিত হয়েছে। তৎকালীন ফার্স্ট লেডি জুলেখা ইউসুফ (আ.) কে ঘরে তুলে বাইরে থেকে ঘরের দরজা বন্ধ করে নিজের দিকে আকৃষ্ট করার সব প্রচেষ্টা সম্পন্ন করে। ইউসুফ (আ.) তাকওয়ার শক্তিতে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করেন। আল্লাহ তাকে হেফাজত করেন। আল্লাহ বলেন, ‘সে যে স্ত্রীলোকের গৃহে ছিল সে তা থেকে অসৎকর্ম কামনা করল এবং দরজাগুলো বন্ধ করে দিল ও বলল এসো। সে (ইউসুফ) বলল, আমি আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করছি, তিনি আমার প্রভু; তিনি আমার থাকার ব্যবস্থা করেছেন। নিশ্চয়ই সীমা লঙ্ঘনকারীরা সফলকাম হয় না।’ (সূরা ইউসুফ : ২৩)।  

তাকওয়া ঈমানের ওপর অবিচল রাখে
তাকওয়া মানুষকে ঈমানের ওপর অবিচল রাখতে সাহায্য করে। এর একটি উদাহরণ কোরআনে এভাবে বর্ণিত হয়েছে। ফেরাউন মুসা (আ.) কে প্রতিহত করার জন্য সমকালীন শ্রেষ্ঠ জাদুকরদের জমা করে। জাদুকররা মুসা (আ.) এর কাছে পরাস্ত হয়ে বুঝতে পারে যে, মুসা (আ.) আল্লাহর নবী। তখন তারা মুসা (আ.) এর ওপর ঈমান আনে। ফেরাউন রাগান্বিত হয়ে তাদের হাত-পা কেটে দিতে চায়। কিন্তু জাদুকরদের অন্তর তাকওয়ায় ভরপুর ছিল। তারা এই পার্থিব জীবনের ওপর আখেরাতকে প্রাধান্য দিয়ে ঈমানের ওপর অবিচল থাকে। আল্লাহ বলেন, ‘তারা (জাদুকররা) বলল, আমাদের কাছে যে স্পষ্ট নিদর্শন এসেছে তার ওপর এবং যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন তাঁর ওপর তোমাকে আমরা কিছুতেই প্রাধান্য দেব না। সুতরাং তুমি করো যা তুমি করতে চাও। তুমি তো শুধু এই পার্থিব জীবনের ওপর কর্তৃত্ব করতে পার।’ (সূরা ত্বহা : ৭২)।  

রোজার মাধ্যমে তাকওয়ার অনুশীলন
বিভিন্নভাবে রোজা পালনে তাকওয়ার অনুশীলন ও প্রশিক্ষণ হয়ে থাকে। প্রয়োজন শুধু সে তাকওয়াকে ধরে রাখা বছরজুড়ে, জীবনজুড়ে সে তাকওয়ার আলোকে জীবন পরিচালনা করা। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজসহ জীবনের সব শাখা-প্রশাখায় তাকওয়ার আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা। তাহলেই আল্লাহ ঘোষিত মুত্তাকির ফলাফল অর্জন করা যাবে। রোজা বিভিন্নভাবে বান্দাকে সে তাকওয়ার প্রশিক্ষণ প্রদান করে। 
এক. রোজাদার সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পানাহার ও যৌনাচার থেকে বিরত থাকে। দিনভর মনোলোভা খাবার ও স্ত্রীর মনোরম আকর্ষণ তাকে পরাস্ত করতে পারে না। পৃথিবীর কোনো শক্তি ও ভয় নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভয় তাকে জাগ্রত করে রাখে। আল্লাহর স্মরণ তাকে সর্বদা সংযত করে রাখে। আল্লাহকে সর্বদা স্মরণ করার এই সক্ষমতা রোজাই তাকে দান করে।
দুই. রোজাদার সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হালাল পানাহার ও বৈধ যৌনাচার থেকে বিরত থাকে। যে পানাহার ও যৌনাচার তার জন্য হালাল ছিল, তা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই ছেড়ে দেওয়ায় অনুশীলনের মাধ্যমে জীবনজুড়ে হারাম ও পাপকে ছাড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। আল্লাহর অবাধ্য পথে আর কখনও পা বাড়াবে না।
তিন. রমজান মাসে ইবাদতের অনুকূল পরিবেশ বিরাজ করে। রহমত ও জান্নাতের দরজা খোলা, জাহান্নামের দরজা বন্ধ আর শয়তান বন্দি থাকে। আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত ঘোষণা আসতে থাকেÑ ‘হে কল্যাণ অন্বেষী! অগ্রসর হও, হে অকল্যাণের পথিক! থেমে যাও।’ অন্যদিকে আল্লাহ তায়ালা ইবাদতের সওয়াব বাড়িয়ে দেন। নফলের সওয়াব ফরজের মতো আর ফরজের সওয়াব সত্তরটি ফরজের সমান হয়ে যায়। এখানেই শেষ নয়। এ মাসে আল্লাহ তায়ালা তাঁর ক্ষমা ও অনুগ্রহের মাত্রা বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ তায়ালা প্রতিদিন ইফতারের সময় অসংখ্য ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। এসবের প্রভাবে মানুষের মধ্যে ভালো কাজের প্রতি আগ্রহ জন্মায়। খোদাভীতি সৃষ্টি হয়। এই খোদাভীতি টিকিয়ে রাখাই বান্দার মূল চ্যালেঞ্জ।
 
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


ব্যক্তি ও সমাজ সংশোধনে লোকমান
প্রজ্ঞাময় কোরআনের উপদেশগুলোতে রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য শিক্ষা। রয়েছে মহান আল্লাহর
বিস্তারিত
ইসলামে খাদ্য গ্রহণে পরিমিতিবোধ
প্রয়োজনের অতিরিক্ত সামান্য বেশি খাদ্য গ্রহণও ইসলামে কাম্য নয়। এতে 
বিস্তারিত
বাউল গানের নামে অপব্যাখ্যা কাম্য
যে কোনো বিষয়ে মন্তব্য করতে হলে প্রথমে ওই বিষয়ে পরিপূর্ণ
বিস্তারিত
শীত মৌসুমের দান ও উপহার
প্রচণ্ড গরমের পর কষ্টদায়ক শীতের আগমন ঘটেছে। তাপদাহের পর শীতের
বিস্তারিত
যে দশ আমলে জান্নাতে ঘর
পৃথিবীতে একটি ঘর তৈরি করতে মানুষ জীবনে কত চেষ্টা ও
বিস্তারিত
নবী ঈসা (আ.) এর প্রতি
‘তারা বলে, ‘পরম দয়াময় সন্তান গ্রহণ করেছেন!’ তোমরা তো এক
বিস্তারিত