দুঃখের কোলে সুখের স্বর্গ

মওলানা রুমির মসনবি শরিফ



 

একজন খতিবের কথা। মসজিদে মিম্বরে ধর্মের নানা তত্ত্বকথা ব্যক্ত করেন খতিবরা। কিন্তু এই খতিব যখন বয়ান দেন, শুধু দোয়া করেন চোর-ডাকাতের জন্য, এই দোয়া তাদের হেদায়তের জন্য বা সৎপথে ফিরে আসার জন্য নয়; বরং আল্লাহর দরবারে দু-হাত তুলে তিনি শুধু দোয়া মাগেনÑ প্রভু হে! যত মন্দ নষ্ট অবাধ্য নাফরমান তাদের প্রতি রহম কর। প্রভু হে! যারা ভালো লোকদের জ্বালাতন করে, হাসিঠাট্টা করে, যাদের দিল শক্ত কাফের, যারা গির্জায় ডেরায় বসে তপজপ করে, তাদের প্রতি দয়া করো। আশ্চর্য যে, নেককার লোকদের জন্য তিনি দোয়া করেন না। খবিশ লোকরা তার দোয়া পায়, নেককাররা মাহরুম থেকে যায়। 
এমন দোয়া শুনে কিছু লোকের ধৈর্যের আর তর সয় না। তারা প্রতিবাদ জানায়Ñ হুজুর! এ কেমন দোয়া। দোয়ারও তো একটা নিয়মকায়দা আছে। আপনি খালি গোমরাহ লোকদের জন্য রহমত কামনা করেন। তা কি আপনার জন্য সাজে? খতিব সাহেব জবাব দেনÑ এসব খবিশের কাছ থেকে আমি উপকৃত হয়েছি, তাই তাদের জন্য দোয়া মাগি। এসব দুষ্ট, খবিশ, জালেম আমার ওপর জুলুম-অবিচার করেছে, তাদের কাছ থেকে বাঁচার জন্য আমি আল্লাহর আশ্রয় নিয়েছি। তাতে আমি আল্লাহর সান্নিধ্যের সাধ পেয়েছি। তাদের অন্যায়-অনাচার দেখেছি। এসবকে ঘৃণা করেছি। পরিণামে ভালোর দিকে ধাবিত হয়েছি। মন্দকে বর্জন করার পথ খুঁজে নিয়েছি। 
খতিব আরও বলেন, আমি যখনই দুনিয়ামুখী হয়েছি, দুনিয়ার ঝামেলায় জড়ানোর চিন্তা করেছি, তাদের অনাচার আমাকে জর্জরিত করেছে। বড় ধরনের আঘাত খেয়েছি। তাদের অন্যায়, জোরজুলুমের কারণে আমি আল্লাহর শরণ নিতে বাধ্য হয়েছি। এসব নেকড়ে স্বভাবের লোকরাই আমাকে সৎপথে চলতে বাধ্য করেছে। হজরত লোকমান হাকিমের ভাষায়Ñ ‘বেয়াদবদের কাছ থেকে আমি আদব শিখেছি।’ 
চোন সববসা’য়ে সালা’হে মন শুদান্দ 
পস দোয়াশা’ন বর মনাস্ত আই হুশমন্দ 
যেহেতু তারা হয়েছে আমার শুদ্ধ হওয়ার কারণ
তাদের জন্য দোয়া আমার কর্তব্য, ওহে গুণিজন!
মওলানা রুমি এর তাৎপর্য বিশ্লেষণ করে বলেন,
বন্দা মী না’লদ বে হক আয দর্দো নীশ 
সদ শেকা’য়ত মী কুনাদ আয রঞ্জে খীশ
আঘাতের খোঁচায় বান্দা কাঁদে আল্লাহর কাছে
দুঃখ যাতনার শত নালিশ জানায় তার আরশে।
হক হামী গূয়াদ কে আখের রাঞ্জ ও দরদ
মর তোরা লা’বে কুনা’ন ও রাস্ত কর্দ
আল্লাহ বলেন, দুঃখ যাতনা এনেছে তোমায় শেষে
কাঁদিয়েছে অসহায় অনুতাপে আর শুদ্ধ সঠিক করেছে।
জীবনযাত্রার ঘেরাটোপে খারাপ লোকদের পাল্লায় পড়ে বান্দা কেঁদে জার জার হয়। আল্লাহর কাছে নালিশ জানায়। তার কান্নায় আরশে মাতম ওঠে। বান্দার এই অসহায়ত্ব দেখে আল্লাহ হাসেন আর বলেনÑ বান্দা! শেষ পর্যন্ত দুঃখদুর্দশা তোমাকে কাঁদিয়ে কাঁদিয়ে আমার কাছে নিয়ে এসেছে। সঠিক পথের সন্ধানী করেছে। তোমার উচিত যত অভিযোগ নালিশ আছে, সেসব নেয়ামতের বিরুদ্ধে দায়ের করা, যেসব নেয়ামত তোমাকে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। সত্যিই যদি চিন্তা কর, তোমার প্রতিটি দুশমন তোমার রোগের জন্য চিকিৎসা। কেননা শত্রু-তাড়িত হয়ে তুমি যখন আমার কাছে আশ্রয় নাও, দুশমন তখন তোমার জন্য পরশপাথর হয়ে দেখা দেয়। পরশ পাথরের ছোঁয়ায় যেমন তামা স্বর্ণে পরিণত হয়, আল্লাহর শরণ নেওয়ার ফলে তোমার অস্তিত্বও খোদায়ি কামালিয়াতের স্বর্ণে রূপান্তরিত হয়ে যায়। 
হাদিস শরিফে আছে, যে কোনো দুঃখযাতনা গোনাহের কাফফারাস্বরূপ। এ কথার গভীরতায় যাও, হেকমত নিহেত পাবে। দুঃখযাতনার সম্মুখীন হলে বান্দা আল্লাহকে শরণ করে, তার সাহায্য চায়, তখন আল্লাহর রহমত এসে তাকে বেষ্টন করে। তা না হলে সবার সব দুঃখযাতনায় তো গোনাহ মাফ হয় না। মওলানা রুমি বলেন, দুশমনের শত্রুতার কারণে তুমি যখন নির্জনতায় আল্লাহর কাছে আশ্রয় নাও, তখন তুমি আল্লাহর সাহায্য পেয়ে ধন্য হও। হাদিসে কুদসিতে বর্ণিতÑ বান্দা তুমি আমাকে স্মরণ করো নিরালায়-নির্জনে, আমি তোমাকে স্মরণ করব ঊর্ধ্বলোকের মাহফিলে। মওলানা রুমি আরও বলেনÑ
দর হাকিকত দূস্তা’নত দুশমনান্দ 
কে যে হযরত দূর ও মশগূলাত কুনান্দ
প্রকৃত প্রস্তাবে তোমার বন্ধুরাই হলো তোমার শত্রু
আল্লাহকে ভুলিয়ে তোমার নিজকে নিয়ে রাখে ব্যস্ত। (চতুর্থ খ-, বয়েত-৯৬)।
এই বয়েতের ভাবধারাটি চয়ন করা হয়েছে সূরা যুখরুফের এই আয়াত থেকেÑ ‘বন্ধুরা সেদিন (পরকালে) পরস্পরের শত্রু হয়ে যাবে, তবে যারা মুত্তাকি, তারা নয়।’ (সূরা যুখরুফ, আয়াত : ৬৭)।
মওলানা রুমি বলতে চান, এই জগৎসংসারে সুখ আছে, দুঃখও আছে। আনন্দ আছে, বেদনাও আছে। কিন্তু সব দুঃখবেদনা মন্দ নয়, আবার সব আনন্দও ভালো নয়। কোনো কোনো দুঃখদুর্দশা ও নানা পরীক্ষা মানুষকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলার বেত্রাঘাতের মতোÑ মানুষকে কর্তব্যসচেতন করে, দৃঢ় পদক্ষেপে জীবন সংগ্রামে অবিচল থাকার শক্তি সঞ্চার করে। এজন্যই তো দেখা যায়Ñ
যিন সবব বর আম্বিয়া’ রঞ্জ ও শেকাস্ত 
আয হামে খলকে জাহান আফযুন তরাস্ত 
এ কারণে নবী রাসুলদের ওপর দুঃখ ও পরাজয়
জগতের সব মানুষের চেয়ে অধিকতর ছিল নিশ্চয়।
হাদিসে বর্ণিতÑ ‘সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা ও দুঃখদুর্দশার সম্মুখীন হয়েছেন নবী-রাসুলরা। তারপরে সালেহিন বান্দারা। এরপর পরম্পরায় উত্তম লোকরা ধর্মের ওপর অবিচলতার অনুপাতে দুঃখদুর্দশা ভোগ করেন।’ (তিরমিজি, ইবনে মাজা, আহমদ)। আম্বিয়া আউলিয়ারা যেসব বিপদাপদ, দুঃখযাতনার সম্মুখীন হয়েছেন, আর আল্লাহর দিকে চেয়ে হাসিমুখে বরণ করেছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে সেরূপ পরিস্থিতিতে অন্য কোনা মানুষ পড়েনি। মওলানা রুমি উপমা দিয়ে বোঝানÑ চামড়া যখন ধোলাই করতে দলিতমথিত করা হয়, তখন সুন্দর মসৃণ মূল্যবান পণ্যে পরিণত হয়। কঠিন ধোলাই না করলে কদিন পর চামড়া পচে দুর্গন্ধ ছাড়ায়। কাজেই তোমার নফসের দাবিকে অস্বীকার করে তার ওপর দলনপীড়ন চালাও, যাতে তা পরিচ্ছন্ন, পবিত্র, সূক্ষ্ম, দামি ও উজ্জ্বল হয়। 
ওয়ার নমী তা’নী রেযা’ দেহ আই আয়ার 
গর খোদা’ রঞ্জত দাহাদ বী এখতেয়ার
যদি না পার সন্তুষ্ট থাকো ওহে সুপুরুষ!
যদি আল্লাহ তোমার অনিচ্ছায় দেন দুঃখ।
তুমি যদি স্বেচ্ছায় নিজের নফসকে দলনপীড়নের ভাতিতে জ্বালাতে না পার, তাহলে কমপক্ষে সেসব দুঃখ মুসিবতে সন্তুষ্টচিত্ত থাক, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার ওপর আপতিত হয়। 
মওলানা নানা উপমা উৎপ্রেক্ষায় এই জীবনদর্শনটি পেশ করেছেন যে, জীবনকে সার্থক করতে হলে নফসের গলায় রেয়াজত বা কৃচ্ছ্র সাধনার লাগাম পরাতে হবে। রেয়াজত দুই প্রকারÑ এক প্রকার রেয়াজত এজবারি বা আবশ্যিক। আরেক প্রকার এখতেয়ারি বা ঐচ্ছিক। এখতেয়ারি বলতে বোঝায় বুজুর্গানে দ্বীন ও তরিকতের সাধকদের নফসের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের নানা কসরত। তারা এর মাধ্যমে স্বেচ্ছায় নফসে আম্মারার গলায় সাধনার শিকল পরিয়ে থাকেন। আর এজবারি বা আবশ্যিক রেয়াজত বলতে বোঝায়, জীবনযাত্রায় যেসব দুঃখযাতনা, কঠিন পরিস্থিতি মানুষের সামনে উপস্থিত হয়, তাতে ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া। সূরা বাকারায় (আয়াাত : ১৫৫) মোমিনদের কাছ থেকে ভয়, ক্ষুধা জানমালের ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা নেওয়ার যে কথা বলা হয়েছে, তা এই আবশ্যিক কৃচ্ছ্রের অন্তর্ভুক্ত। এহেন পরিস্থিতিতে আলোকিত মনের মানুষরা ঘটনাপ্রবাহ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে, নিজের জীবনপ্রণালি শুধরে নেয়। ধৈর্যের সঙ্গে দ্বীনের ওপর পথচলা অব্যাহত রাখে। আর মুখে ও আচরণে বলে, আমরা আল্লাহর কাছ থেকে এসেছি, আমাদের জীবন আল্লাহর পথে নিবেদিত এবং তার কাছেই আমরা ফিরে যাব। মওলানা বলেন, মোমিনের মনটা ঠিক সজারুর মতো। লাঠি দিয়ে পেটালে সজারু আরও ফুলে ওঠে। দুঃখদুর্দশার বেলায় মোমিন বান্দাও আরও বলীয়ান হয়। তিনি আরও বলেন, ওষুধ খেতে বেশ তিতা। কিন্তু যে বিশ্বাস করে, তিতা ওষুধের মধ্যে তার স্বাস্থ্যের সুরক্ষা আছে, তার কাছে সেই তিতা সুস্বাদু, মিষ্টান্ন। 
ইন আওয়া’ন দর হক্কে গাইরী সূদ শুদ 
লে কে আন্দর হক্কে খোদ মরদূদ শুদ
দুষ্ট দুরাচারীরা অন্যের মঙ্গলের কারণ হলো
অথচ নিজের বেলায় অভিশপ্ত বঞ্চিত রয়ে গেল।
মওলানা আফসোস করে বলেন, দুষ্ট দুরাচারীরা অনেক ক্ষেত্রে অন্যদের বেলায় উপকারের কারণ হয়; অথচ তারা নিজেরা গোমরাহি ও আল্লাহর অভিশাপে নিমজ্জিত থাকে। 

 (মওলানা রুমির মসনবি শরিফের গল্প, চতুর্থ খ- বয়েত : ৮১-১১২)।


হাসি ও গম্ভীর মুখের পার্থক্য
আমরা কথায় কথায় কাউকে না কাউকে ছাগল বলে ফেলি। ছাগল
বিস্তারিত
স্কুলে শিক্ষক একজন, শিক্ষার্থীও এক!
ভারতের কলকাতার ঝাঁ চকচকে গুরুগ্রাম (গুরগাঁও) থেকে মাত্র ৬০ কিমি
বিস্তারিত
হাতে হেঁটে ১০ কিমি. পাড়ি!
প্রবল ইচ্ছাশক্তির কঠিন পরীক্ষা দিয়েছেন সোলায়মান মাগোমেদয়। রাশিয়ার দাগেনস্টানের ৫৩
বিস্তারিত
৬৬ বছর পর নখ কাটলেন
হাতের নখ কাটাতে ভারতের পুনে থেকে নিউ ইয়র্কে উড়ে গেলেন
বিস্তারিত
দুই মাথাওয়ালা বাছুর দুধ পান
দুই মাথাওয়ালা এই বাছুরের জন্ম হয়েছে ব্রাজিলের গোইয়া প্রদেশের কাইয়াপোনিয়া
বিস্তারিত
১৮৫ কেজি ওজনের উড়ন্ত মাছ!
গল্পের মতো মনে হলেও সত্যি। মাছও উড়তে পারে। এতদিন নাম
বিস্তারিত