মদিনা শরিফের জুমার খুতবা

রমজানের শেষ মুহূর্তগুলো কাজে লাগান

কোরআন ও সুন্নাহ এ বরকতময় মাসে যাবতীয় ভালো ও সৎকর্ম করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। কোরআন ও ঈমান বান্দার ওপর আল্লাহর সবচেয়ে বড় নেয়ামত। এ নেয়ামতের কৃতজ্ঞতার জন্য এ মাসে রোজা রাখা, রাত জেগে নামাজ আদায় ও অন্যান্য আল্লাহ বলেন, ‘বরং আল্লাহরই ইবাদত করো এবং কৃতজ্ঞ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হও।’ (সূরা জুমার : ৬৬)

জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পরে প্রকৃত সফলতা ও শান্তি নিহিত আছে আত্মপর্যালোচনা বা মনের হিসাব নেওয়া, ইবাদত ও আনুগত্যের ক্ষেত্রে চেষ্টা-সাধনা করা, সৎকর্ম ও পুণ্যের কাজ বৃদ্ধি করা, আল্লাহ যেসব সৎকর্ম করার সুযোগ, সাহায্য ও তৌফিক দান করেছেন তার প্রতি যতœশীল থাকা এবং ইবাদত-বন্দেগি বরবাদ করে দেয়, এমন কাজকর্ম থেকে সতর্ক থাকার মাঝে। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদার লোকরা, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসুলের আনুগত্য করো। তোমাদের আমলগুলোকে বিনষ্ট করো না।’ (সূরা মুহাম্মদ : ৩৩)। 
সূরা হাশরের ১৮নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেকেই ভেবে দেখুক আগামীকালের জন্য সে কী অগ্রিম পাঠিয়েছে।’ এ আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ‘তোমরা নিজেদের জীবনের জবাবদিহিতা ও হিসাব নিয়ে নাও পরকালে তোমাদের থেকে হিসাব গ্রহণের আগেই। আর চিন্তা করে দেখ তোমাদের প্রতিপালকের দরবারে যেদিন উপস্থিত হবে ও প্রত্যাবর্তন করবে, সেদিনের জন্য তোমরা নিজেদের স্বার্থে কী কী পুণ্যকর্ম সঞ্চয় করেছ।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং মৃত্যুপরবর্তী জীবনের জন্য আমল করেছে সে বুদ্ধিমান। আর যে লোক নিজের মনকে তার প্রবৃত্তির অনুসরণকারী বানিয়েছে এবং আল্লাহর ওপর আশা করে বসে আছে সে ব্যর্থ।’
তদ্রƒপ দুর্ভাগ্য, লাঞ্ছনা ও ক্ষতিগ্রস্ততা নিহিত রয়েছে প্রবৃত্তির অনুসরণ করা, হারাম ও নিষিদ্ধ কাজকর্মে জড়িত হওয়া, ইবাদত-বন্দেগি বর্জন করা অথবা যেসব বিষয় সৎকর্ম বরবাদ করে দেয় সেগুলোর নিকটবর্তী হওয়ার মাঝে। মানুষের অনিষ্টের জন্য এমন কাজ করাই যথেষ্ট, যার দ্বারা ইবাদত-বন্দেগির সওয়াব হ্রাস পায়।
আপনারা দেখতে পাচ্ছেন কীভাবে দ্রুত জীবন থেকে দিনরাতের মুহূর্তগুলো নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে আর অতীতের বছরগুলো কীভাবে চলে গেছে। একটি দিনও চলে গেলে তার কোনো কিছুই কখনও ফিরে আসবে না। জীবন তো এসব দিনরাত ছাড়া আর কিছু নয়। তারপর নেমে আসবে মৃত্যুর বার্তা। সাঙ্গ হবে কর্মলীলা। কামনার আলেয়া হবে স্পষ্ট। 
এই তো কল্যাণ ও পুণ্যের মাস রমজানের অধিকাংশ দিন শেষ হয়ে গেল। আর কয়েকটি পবিত্র দিন ও রাত অবশিষ্ট আছে। বাকি আছে কিছু মোহনীয় মুহূর্ত। সুতরাং যে ব্যক্তি রমজান সুন্দরভাবে কাটিয়েছে তার উচিত হলো আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা, যিনি তাকে সুযোগ, সাহায্য ও তৌফিক দান করেছেন। সে যেন নিজের আমলগুলোকে বিনষ্টকারী বিষয় ও সওয়াব হ্রাস করে দেয় এবং শাস্তির কবলে পড়তে হয়, এমন কাজ থেকে রক্ষা করে। ভালো ও সুন্দর কাজের পরে যেন আরও বেশি ভালো ও সুন্দর কাজ করে। আল্লাহ বলেন, ‘উত্তম কাজের জন্য উত্তম পুরস্কার ব্যতীত কী হতে পারে?’ (সূরা রাহমান : ৬০)। আর যার মধ্যে কিছু ত্রুটি ও অবহেলা চলে এসেছে সে যেন এখন সর্বাত্মক চেষ্টা চালায় এবং ত্রুটিবিচ্যুতি শুধরাতে যেন ইবাদত-বন্দেগিতে কঠোর পরিশ্রম করে। কারণ আমলের পরিণতি নির্ভর করে শেষের অবস্থার ওপর। 
আর লাইলাতুল কদরের আশা এখনও বাকি আছে। আল্লাহর রহমত, ক্ষমা, দয়া, করুণা, সহনশীলতা ও মার্জনার বদৌলতে গোনাহ ও পাপ মুছে যেতে পারে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের আশায় কদরের রাতে জেগে ইবাদত করে তার পূর্ববর্তী গোনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ (বোখারি ও মুসলিম)। 
আল্লাহ বলেন, ‘লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়ে বেশি শ্রেষ্ঠ।’ (সূরা কদর : ৩)। মুফাসসিররা বলেন, ‘এ রাতের ইবাদত এমন হাজার মাসের ইবাদতের চেয়ে উত্তম, যেখানে লাইলাতুল কদর নেই।’
আবু মুসআব আহমাদ ইবনে আবু বকর জুহরি (রহ.) বলেন, মালেক (রহ.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) কে তাঁর পূর্ববর্তী মানুষের আমলগুলোকে দেখানো হয়েছিল, তখন তিনি নিজের উম্মতের জীবনের আয়ু স্বল্পতার কারণে মনে করেন, তাঁর উম্মত আগের লোকদের দীর্ঘায়ুর কারণে আমলের ক্ষেত্রে তাদের পর্যায়ে পৌঁছতে পারবে না। তখন আল্লাহ তাঁকে হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ লাইলাতুল কদর দান করলেন।’
আল্লাহর অসীম প্রজ্ঞা ও অশেষ দয়া হলো যে, তিনি মুসলিম উম্মাহর ওপর রমজানের রোজা ফরজ করেছেন, যে মাসে তিনি পবিত্র কোরআন নাজিল করেছেন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানের রাত জেগে ইবাদত করাকে তাঁর সুন্নত বানিয়েছেন। এ বিষয়ে উৎসাহ দিতে গিয়ে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানে ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের আশায় রাত জেগে ইবাদত করবে তার পূর্বের গোনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
কোরআন ও সুন্নাহ এ বরকতময় মাসে যাবতীয় ভালো ও সৎকর্ম করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। কোরআন ও ঈমান বান্দার ওপর আল্লাহর সবচেয়ে বড় নেয়ামত। এ নেয়ামতের কৃতজ্ঞতার জন্য এ মাসে রোজা রাখা, রাত জেগে নামাজ আদায় ও অন্যান্য ইবাদত করা কর্তব্য। আল্লাহ বলেন, ‘বরং আল্লাহরই ইবাদত করো এবং কৃতজ্ঞ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হও।’ (সূরা জুমার : ৬৬)।
আয়েশা (রা.) যখন রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বলেছিলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি এত নামাজ পড়েন কেন যে আপনার উভয় পা ফেটে যায়? অথচ আল্লাহ তো আপনার আগের ও পরের সবকিছু ক্ষমা করে দিয়েছেন! তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দা হব না?’ (বোখারি ও মুসলিম)।
নিজেই নিজের পরীক্ষা নিন। আপনি কি রমজান মাসে আল্লাহর দিকে ফিরে এসেছেন? তওবা করেছেন তাঁর কাছে? রমজানে মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য আমল করেছেন? অন্যায়ভাবে অর্জিত সম্পদ বা অধিকার তার উপযুক্ত ব্যক্তির কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন কি? এসব ক্ষেত্রে তাকওয়া অবলম্বন করেছেন কি? মানুষের অনিষ্ট করা থেকে বিরত থেকেছেন? সৃষ্টজীবের প্রতি সদাচরণ করেছেন? আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রেখেছেন? মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করেছেন? ভালো কাজের আদেশ করেছেন? অন্যায় কাজের নিষেধ করেছেন? সুদ ও হারাম উপার্জন থেকে নিজেকে বাঁচিয়েছেন? আত্মার পরিশুদ্ধি, চরিত্রের দৃঢ়তা, ঈমানের বৃদ্ধি, বিশ্বাসের শক্তি অর্জন ও উন্নত গুণ লাভের ক্ষেত্রে আপনি কি রাসুলুল্লাহ (সা.), তাঁর সাহাবায়ে কেরাম ও তাঁদের সঠিক অনুসারীদের অনুসরণ করেছেন? যেগুলো তাঁরা রমজান মাসে অর্জন করতেন।
দুনিয়াতেই আপনার আমলনামা পাঠ করে নিন, আখেরাতে আপনার আমলনামা আপনাকে পাঠ করতে বলার আগে। ‘তোমার আমলনামা পাঠ করো, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাবনিকাশের জন্য যথেষ্ট।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ১৪)। রমজান মাসে আল্লাহ এ মহান কোরআন নাজিল করেছেন। কোরআন ও সুন্নাহ ছাড়া মুসলমানদের অবস্থা কিছুতেই সংশোধন হবে না। বিশ্বের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জীবিত বা মৃত সব জ্ঞানী একত্র হয়েও যদি বিশ্বের সমস্যা সমাধানের জন্য মিলিত হয় মহান কোরআন ছাড়া তারা কোনো উপায় খুঁজে পাবে না। আল্লাহ ও তাঁর নাম, গুণ, কর্ম ও ইবাদতের ক্ষেত্রে তাঁর হক বিষয়ে পৃথিবীতে কত আকিদা রয়েছে, তা নিয়ে চিন্তা করে দেখুন। এর কোনো সীমা ও সংখ্যা নেই। এক্ষেত্রে কোরআন যা বলেছে, তা-ই সত্য। বিশ্বের অর্থনীতির জটিলতা ও সমস্যা জ্ঞানীদের অক্ষম বানিয়ে দিয়েছে। এক্ষেত্রে কোরআন ও সুন্নাহ যা বলেছে, সেটাই সত্য। এভাবেই কোরআন মুসলমানদের সব সমস্যার যথার্থ সমাধান বর্ণনা করেছে। 
ইসলামি শরিয়তের কিছু কিছু অধ্যায় থেকে অনেক অমুসলিমরাও উপকৃত হয়েছে। সব মানুষের মুসলিম হওয়া তো সম্ভব হবে না। কিন্তু মুসলমানের উচিত কোরআন ও সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা, মানুষ যখন প্রত্যেক মুসলিমের সুন্দর আদর্শ দেখবে, তখন তারাও উপকৃত হবে, সেটা পার্থিব বিষয়ে হলেও। প্রত্যেক আদম সন্তাই ভুল করে থাকে। তবে তাদের মধ্যে যারা তওবা করে তারাই উত্তম। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই এ কোরআন সবচেয়ে সঠিক পথের দিশা প্রদান করে এবং মোমিনদের বিরাট প্রতিদানের সুুসংবাদ দেয়, যারা সৎকর্ম করে।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ৯)।

২৩ রমজান ১৪৩৯ হিজরি মসজিদে নববির 
জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর করেছেন
মাহমুদুল হাসান জুনাইদ


নির্বাচনি ইশতেহারে ইসলামের প্রেরণা
ইশতেহারে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- বন্ধের ব্যাপারে স্পষ্ট বক্তব্য দেখতে পাওয়া যায়
বিস্তারিত
মানুষ মানুষের জন্য
শুক্রবার মানেই সাপ্তাহিক ছুটি। ছুটির দিন নানাজন নানাভাবে কাজে লাগিয়ে
বিস্তারিত
শীতের নেয়ামত বিচিত্র পিঠা
  প্রকৃতিতে বইছে শীতের সমীরণ। কুহেলিঘেরা সকাল মনে হয় শ্বেত হিমালয়।
বিস্তারিত
মহামানবের অমীয় বাণী
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এরশাদ করেন, ‘যে আমার উম্মতের স্বার্থে
বিস্তারিত
যুদ্ধাহত শিশুদের কথা
৩ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস উপলক্ষে ‘নিউ এরাব’ আরব বিশ্বের
বিস্তারিত
সুদানে গ্রামীণ ছাত্রদের শহুরে জীবন
যেসব সুদানি ছাত্র পড়াশোনা করতে গ্রাম থেকে শহরে এসেছে তারা
বিস্তারিত