চিকিৎসাবজ্ঞিানে মুসলমি অবদান

স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে মুসলিম মনীষীদের আবিষ্কার এবং অবদান অনস্বীকার্য। এক্ষেত্রে তাদের আবিষ্কারগুলো এতটাই প্রভাব বিস্তার করে আছে যে, কোনো কোনো বিষয়ে তারা ‘জনক’ হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছেন। দুঃখজনক হলো, আমরা অনেকে তা জানি না। অথচ ইতিহাসজ্ঞান মানুষকে এগিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করে, উৎসাহিত করে। 

স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে মুসলিম বিজ্ঞানীদের যেসব আবিষ্কার ও কর্ম ইতিহাসে স্মরণীয় ছিল, তাকে আমরা দু-ভাগে উপস্থাপন করতে পারিÑ ১. গ্রন্থ প্রণয়ন এবং ২. রোগের প্রকৃতি, কারণ নির্ণয় ও ওষুধ আবিষ্কার। 
১. গ্রন্থ রচনা
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিজ্ঞান বিষয়ক এমনসব গ্রন্থ মুসলিম মনীষীরা প্রণয়ন করেছেন, যার কাছে আজকের আধুনিক বিজ্ঞান শুধু কৃতজ্ঞ হয়ে আছে তা নয়, বরং চিরঋণী হয়ে থাকবে ভবিষ্যতেও। যেমন চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রথম বিশ্বকোষ রচনা করেছিলেন মুসলিম বিজ্ঞানী আলী ইবনে রুব্বান। আর আল রাযি (৮৬৫-৯২৫ খ্রি.) তার সময়কাল পর্যন্ত আবিষ্কৃত সব রোগ সম্পর্কে বর্ণনা করেন তাঁর অমর গ্রন্থ ‘আল-হাবিতে’। তিনি শিশুরোগ সম্পর্কেও প্রথম গ্রন্থ রচনা করেন। মিশরের বিজ্ঞানী আল বালাদি সর্বপ্রথম গর্ভবতী নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্য রক্ষাসম্পর্কিত গ্রন্থ ‘তাদবিরুল হাবালা ওয়াল আতফাল ওয়াস সিবিয়ান’ রচনা করেন। অন্যদিকে শল্যচিকিৎসা বিষয়ক প্রথম সচিত্র গ্রন্থ ‘আত-তাসরিফ’ রচনা করেন স্পেনের মুসলিম বিজ্ঞানী আল যাহরাবি। দৃষ্টিবিজ্ঞান সম্পর্কিত ইবনে হাইসাম (৯৬৫-১০৩৯ খ্রি.) তার ‘আল মানাযির’ গ্রন্থের জন্য অমর হয়ে আছেন আজও। বিজ্ঞানের এ শাখায় বিজ্ঞানী আবু ইবনে ঈসা তার ‘তাজকিরাতুল কাহহালিন’ গ্রন্থটি প্রথম ও প্রাচীন পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত। স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে সবকিছুকে ছাড়িয়ে ইবনে সিনার (৯৮০-১০৩৭ খ্রি.) রচিত গ্রন্থ ‘কানুন ফিত তিব্ব’ অমর করে রেখেছে এ বিজ্ঞানীকে। 
রোগের প্রকৃতি, কারণ নির্ণয় ও ওষুধ
শুধু গ্রন্থ রচনা নয়, বরং রোগের প্রকৃতি, কারণ নির্ণয় ও তার প্রতিষেধক হিসেবে ওষুধ আবিষ্কারেও মুসলিম বিজ্ঞানীরা কৃতিত্ব দেখিয়েছেন বিশ্বকে। যেমনÑ আজকের যুগে বহুল ব্যবহৃত মলম, আতর, তেল ইত্যাদি তৈরির প্রথম কৌশল আবিষ্কার করেন মুসলিম বিজ্ঞানী আল কিন্দি (৮০০-৮৫০ খ্রি.)। মুসলিম চিকিৎসাবিজ্ঞানী যাকারিয়া আল রাযি (৮৬৫-৯২৫ খ্রি.) সর্বপ্রথম মানবদেহে পিত্ত, লিভার ও অন্যান্য অন্ত্রে পাথর হওয়ার কারণ এবং তার প্রতিকার সম্পর্কে গ্রন্থ রচনা করেন। বসন্ত ও হামের কারণ এবং তার চিকিৎসারও প্রথম আবিষ্কারক ছিলেন আল রাযি। শুধু তা-ই নয়, তিনি অ্যালার্জিজনিত হাঁপানি রোগ চিহ্নিত করে অ্যালার্জি ও ইমিউনোলজির ওপরও গ্রন্থ রচনা করেন। আল রাযিই প্রথম উল্লেখ করেছিলেন, জ্বর কোনো রোগ নয়, বরং একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা কৌশল। অর্থাৎ রোগের বিরুদ্ধে শরীরের লড়াই। এই মহান বিজ্ঞানী সর্বপ্রথম নিউরোসাইকিয়াটিক চিকিৎসা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনিই প্রথম মাথাব্যথার জন্য গোলাপপানি ও চন্দনের ব্যবহার, মাতাল ও পাগলের জন্য ভিনেগার মিশিয়ে পানি পান করানো এবং এর সঙ্গে গোলাপপানি পান, নাকে কর্পূর ও রোগীর হাত-পা ঠান্ডা পানির মধ্যে রাখার পরামর্শ দেন। 
চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে রসায়নের ব্যবহার প্রথম শুরু করেন বিজ্ঞানী আবু মনসুর মুয়াফাক। বিজ্ঞানী হাসান ইবনে হাইসাম (৯৬৫-১০৩৯খ্রি.) আবিষ্কার করেন, দৃষ্টির জন্ম চোখে নয় বরং মস্তিষ্কে। এই বিজ্ঞানী সর্বপ্রথম দৃষ্টিশক্তি এবং এর প্রতিফলন ও প্রতিসরণ সম্পর্কিত গ্রিকদের ভুল ধারণা নিরসন করেন। আজকের আধুনিক যুগে আমরা চোখের যে লেন্স ব্যবহার করি, তার সূচনা করেছিলেন ইবনে হাইসাম। শুধু তা-ই নয়, তার আবিষ্কারের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে বহুল ব্যবহৃত চশমা আবিষ্কৃত হয়। চোখের ছানি অপারেশনের জন্য সর্বপ্রথম ফাঁপা সুঁইয়ের ব্যবহার করেছিলেন ইরাকের চিকিৎসক আল-মওসুলি (৯৯১-১০৩১ খ্রি.)। 
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাক্ষেত্রে আধুনিকতার ধ্যানধারণার প্রবর্তক হলেন ইবনে সিনা (৯৮০-১০৩৭ খ্রি.)। তিনি সর্বপ্রথম ওষুধ তৈরির পরে তা সংরক্ষণ ও প্রয়োগের সর্বাধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন। সে কারণে তাকে ‘গধংঃবৎ ড়ভ গবফরপরহব’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। পানি ও মাটির মাধ্যমে যেসব রোগ ছড়ায় এবং মহামারির আকার ধারণ করে, তিনি সেগুলোও আবিষ্কার করেন। তিনিই প্রথম স্মৃতিভ্রষ্টতা, অনিদ্রা, মানসিক বিকার, দুঃস্বপ্ন, অবসাদ, মৃগীরোগ, পক্ষাঘাত, স্ট্রোক ও ঘূর্ণিরোগসহ অন্যান্য স্নায়বিক দুর্বলতার বর্ণনা দেন। পাকস্থলী ও কণ্ঠনালির ক্যান্সার এবং তাতে অস্ত্রোপচারে আধুনিক বিজ্ঞান আল জুহরের কাছে চিরঋণী। হৃদরোগ আজকের দিনে অত্যন্ত পরিচিত। অথচ ইতিহাসে প্রথম হৃদযন্ত্রে রক্তপ্রবাহ আবিষ্কার করেন মুসলিম বিজ্ঞানী ইবনুন নাফিস (১২০৮-১২৮৮ খ্রি.)। এছাড়াও শৈল্য চিকিৎসায় বা অস্ত্রোপচারে যেসব যন্ত্রপাতি আধুনিক যুগে ব্যবহার করা হয়, সেগুলো মুসলিম বিজ্ঞানী আল যাহরাবির উদ্ভাবিত যন্ত্রপাতির সংস্করণমাত্র। 
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের অবদানের যুগকে চারটি ভাগে ভাগ করা হয়। যথাÑ ১. অনুবাদের যুগ (৭৫০-৯০০খ্রি.), ২. মুসলিম চিকিৎসাবিজ্ঞানের যুগ (৯০০-১২৫৮ খ্রি.), ৩. মুসলিমদের পতনের যুগ (১২৫৮-১৬৫০ খ্রি.) এবং ৪. পাশ্চাত্যনির্ভর যুগ (১৬৫০-অদ্যাবধি)। প্রকৃতপক্ষে মুসলিমরা তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞানবিজ্ঞানে তাদের অবদানের ধারাবাহিকতাটাও হারিয়েছে। বর্তমান সময়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাশাস্ত্রে অবদান রাখলেও তা উল্লেখযোগ্য নয়। এ অবস্থায় মুসলিমরা পাশ্চাত্যনির্ভর হয়ে পড়েছে জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রায় সব শাখার ক্ষেত্রে। এসবের পেছনের উল্লেখযোগ্য কারণ হলো মুসলিম দেশের শিক্ষাব্যবস্থা। সেখানে উপেক্ষিত হয়েছে কোরআন ও হাদিসের মূল শিক্ষা। অথচ এ দুটিতে রয়েছে জ্ঞানবিজ্ঞানের সব শাখার জন্য নতুনত্বের সন্ধান। ফিকহি মাসআলাগুলোয় যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়, ততটাই উপেক্ষিত জ্ঞানবিজ্ঞানের অন্যান্য প্রায়োগিক বিষয়গুলো। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সময়ের দাবি। আর তার জন্য একক কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা জাতি নয়, বরং প্রত্যেক মুসলিমকে সতর্ক হতে হবে। আমরা যত তাড়াতাড়ি বিষয়টি অনুধাবন করতে পারব, তত তাড়াতাড়ি ফেরত পাব আমাদের সোনালি ইতিহাস।

লেখক : বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক


হজ আমাদের ধৈর্যের শিক্ষা দেয়
  চলছে হজ মৌসুম। শুরু হয়েছে হজ ফ্লাইট। আল্লাহর ঘরের
বিস্তারিত
হজ তথ্য কর্নার
      ষ বাংলাদেশ হজ মিশন : মক্কা শরিফ ও মদিনা শরিফে
বিস্তারিত
রাজত্বের চেয়ে প্রিয়তম যে সিজদা
হজরত সোলাইমান (আ.) এর রাজত্ব ছিল মানব-দানব, পশুপক্ষীর ওপর। একদা
বিস্তারিত
আবরার
‘আবরার’ আরবি শব্দ, পুংলিঙ্গ। আবরার শব্দটি বাররুন থেকে
বিস্তারিত
গোনাহ থেকে মুক্তি চাইলে
তওবা-ইস্তেগফার একজন মোমিনের এক বড় গুণ। গোনাহের অভিশাপ থেকে নিজেকে
বিস্তারিত
হজ তথ্য কর্নার
জেদ্দা এয়ারপোর্ট  - জেদ্দা শব্দের অর্থ মাতামহী। হজরত আদম (আ.) কে
বিস্তারিত