একজন হায়াৎ মামুদ

হায়াৎ মামুদের ‘শব্দকল্পদ্রুম’ বইটি সে রকম কিছু নয়। এ বইটিতে তিনি বাংলা ভাষাকে কীভাবে ব্যাকরণ অনুযায়ী যথার্থরূপে লেখা যায় সেসব বিষয়কে দৈনন্দিন জীবনের গল্পের ছলে বলেছেনÑ যেখানে বোন টুপিন মামাতো ভাইকে চিঠির মাধ্যমে বাংলার সঠিক বানান শেখানোর চেষ্টা যেমন শুরু করে তেমনি নিজেও বাংলাকে বিভিন্নভাবে ভুল বানানে লিখে সাময়িক সংশয়ী মনকে সঠিক বানানের প্রতি আরও আস্থাশীল করে তোলে; যা সবাইকে নতুন ব্যঞ্জনায় আকৃষ্ট করে। বাংলা ব্যাকরণে যাদের ভয়-ভীতি আছে মূলত তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বইও বটে

ষাটের দশকে শিশু-কিশোরদের জন্য রচিত ‘রবীন্দ্রনাথ : কিশোর জীবনী’ অত্যন্ত সরলভাবে উপস্থাপন করে সবার প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন হায়াৎ মামুদ। এ বইটির বর্ণনাভঙ্গি এমন, যেন একজন দাদু কয়েকজন গল্পপিপাসু নাতি-নাতনির সঙ্গে রসবোধ মিশিয়ে তাদের বয়সি বন্ধু হয়ে গল্প করছেন। এ গল্প বলার ধরন একদম সরলীকরণ করে তাদের মগজে গেঁথে দেওয়ার মতো। একমাত্র শিশুপ্রিয় লেখকের পক্ষে মনের মাধুরী মিশিয়ে গল্পের ছলে কিশোর উপযোগী রবি ঠাকুরের জীবনী বলা সম্ভব। তার এ কাজটি গুরুত্বপূর্ণ এজন্য যে, এ সময় পূর্ব বাংলা শোষণ-শাসনের কারণে বেহাল অবস্থায় পতিত রাষ্ট্রে রবীন্দ্রনাথের মতো একজন মহান প্রতিভাধর গুণীকে নিয়ে লেখা একটা দুঃসাহসিক ব্যাপার বটে। কেননা রবীন্দ্রনাথের সব সাহিত্যকর্মকে সে সময় নিষিদ্ধ করার পাঁয়তারা চলছিল। 
পশ্চিম পাকিস্তান তো চেয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের সামাজিক, অর্থনৈতিক পরিবেশ-পরিস্থিতি ধ্বংসের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অবস্থার সম্পূর্ণরূপে বিলীন। ঠিক এ রকম পরিস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথের জয়গান করে তা ছড়িয়ে দেওয়া যে অন্যায় ব্যাপার ছাড়া কিছু ছিল না, তা বেশ ভালোভাবেই বোঝা যায়। আর সেই অন্যায়টুকু করে বাঙালি পাঠকমনে শ্রদ্ধার আসনে ঠাঁই পেয়েছেন বাংলাদেশের গদ্যসাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী লেখক হায়াৎ মামুদ।
তার জন্ম ১৯৩৯ সালের ২ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার মৌড়া গ্রামে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরও তিনি সেখানেই তার পরিবারসহ অবস্থান করেন। ১৯৫০ সালের হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার ফলে অবশেষে ঢাকায় চলে আসেন। এখানে এসে তিনি সেন্ট গ্রেগরিজে ভর্তি হন। পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছেন তুলনামূলক সাহিত্যে ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কর্মজীবনে বাংলা একাডেমিতে চাকরির পর পড়িয়েছেন চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার বিচরণ কবিতা, প্রবন্ধ, শিশুসাহিত্য, অনুবাদ প্রভৃতিতে। তিনি কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, গবেষক, শিশুসাহিত্যিক, অধ্যাপকÑ সবকিছুরই সমন্বয়ের একজন। তার পিতৃপ্রদত্ত নাম মনিরুজ্জামান। বন্ধুরা জানে মণি বলে। ষাটের দশকের প্রথমেই লেখালেখিতে তিনি হায়াৎ মামুদ নামটি বেছে নেন। এ নাম গ্রহণেও রয়েছে বন্ধুদের ভূমিকা। 
‘৭১-এর যুদ্ধের পর তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নে যান প্রগতি প্রকাশনীতে চাকরি নিয়ে। তার উদ্দেশ্য ছিল শুধু চাকরি নয়, এর সঙ্গে রুশ ভাষা শিখে সেখান থেকে নানা ধরনের লেখা বাংলায় অনুবাদ করা, যা পরবর্তী সময়ে তার গবেষণার কাজে বিশেষ সহায়তাও করেছিল। কলকাতায় এসে তিনি লেবেদেফকে নিয়ে বিশ^বিদ্যালয়ে গবেষণায় মনোনিবেশ করেনÑ যেখানে লেবেদেফের অনেক সময় অতিবাহিত হয়। 
‘মৃত্যুচিন্তা, রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য জটিলতা’ নামক গ্রন্থটি ষাটের দশকে বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথকে তিনি বহুভাবে তার বিভিন্ন লেখায় উপস্থাপন করেছেন। যেভাবে করলে সহজেই একজন মানুষ প্রেমে পড়তে পারে, তাকে নিয়ে ভাবনায় মাতাল হতে পারেÑ এ উদ্যমের কমতি ছিল না তার। 
তিনি খুব বিনয়ী স্বভাবের একজন মানুষ, সরলমনা, অসাম্প্রদায়িকও বটে। বিপদের দিনে পাশে দাঁড়িছেন বন্ধুদের। ভীষণ আড্ডাবাজ এবং অলসতাও তার প্রিয় বিষয়ের একটি। তবে লেখালেখিতে অলসতাকে কখনও ঠাঁই দেননি। আড্ডায় মেতে থাকতে সবসময় ভালোবাসেন তিনি। একবার কবি তুষার প্রসূনকে দুষ্টুমি করে বলছিলেন, স্যারের তো আজ কোনো কাজ নেই। কী করবেন? উল্টো তিনি আড্ডা দেবেন বলে হা হা করে হেসে পড়লেন। 
‘শব্দকল্পদ্রুম’ নামে অনেক আগে একটি সংস্কৃত অভিধান বেরিয়েছিল, যার সংকলক ছিলেন রাধাকান্ত দেব। হায়াৎ মামুদের ‘শব্দকল্পদ্রুম’ বইটি সে রকম কিছু নয়। এ বইটিতে তিনি বাংলা ভাষাকে কীভাবে ব্যাকরণ অনুযায়ী যথার্থরূপে লেখা যায় সেসব বিষয়কে দৈনন্দিন জীবনের গল্পের ছলে বলেছেনÑ যেখানে বোন টুপিন মামাতো ভাইকে চিঠির মাধ্যমে বাংলার সঠিক বানান শেখানোর চেষ্টা যেমন শুরু করে তেমনি নিজেও বাংলাকে বিভিন্নভাবে ভুল বানানে লিখে সাময়িক সংশয়ী মনকে সঠিক বানানের প্রতি আরও আস্থাশীল করে তোলে; যা সবাইকে নতুন ব্যঞ্জনায় আকৃষ্ট করে। বাংলা ব্যাকরণে যাদের ভয়-ভীতি আছে মূলত তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বইও বটে।
ম্যাক্সিম গোর্কির বই থেকে অনূদিত ‘চড়–ইছানা’ সবাই উচ্ছ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করেছিল। তিনি শিশুসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৮৩ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং ২০১৩ সালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান। তাছাড়া ২০১৬ সালে একুশে পদক এবং ২০১৭ সালে রবীন্দ্র পুরস্কার লাভ করেন।
তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হচ্ছেÑ বাংলাদেশ : সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়, সময়ের জবানবন্দি, বাঙালি বলিয়া লজ্জা নাই, নজরুল ইসলাম : কিশোর জীবনী, বাঙালির বাংলাভাষা ইদানীং, অমর একুশে, বাংলাদেশে মাতৃভাষার অধিকার, তুলুপুন্তি প্রভৃতি। এছাড়া সম্পাদিত গ্রন্থও রয়েছে একাধিকÑ এর মধ্যে ‘যুদ্ধাপরাধীর শাস্তি চাই’ অন্যতম। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ থেকে। এ গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি উল্লেখ করতে চেয়েছেনÑ এ দেশ লাখো মানুষের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছে; কিন্তু দেশদ্রোহী যুদ্ধাপরাধী রাজাকার, আলশামস, আলবদরদের বিচার হয়নি। সেই বিচারের দাবির অন্য একটি নাম এ গ্রন্থটি। এছাড়া তিনি মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক শিক্ষার্থীদের জন্য পুঁথিনিলয় থেকে প্রকাশিত ‘প্রমিত বাংলা ব্যাকরণ ও নির্মিতি’ নামে বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন।
২ জুলাই গুণী এ লেখকের ৮০তম জন্মদিন। তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা। 


পাঠক কমছে; কিন্তু সেটা কোনো
দুই বাংলার জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। অন্যদিকে বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক
বিস্তারিত
মনীষা কৈরালা আমি ক্যান্সারের প্রতি কৃতজ্ঞ,
ঢাকা লিট ফেস্টের দ্বিতীয় দিন ৯ নভেম্বরের বিশেষ চমক ছিল
বিস্তারিত
এনহেদুয়ান্নার কবিতা ভাষান্তর :
  যিশুখ্রিষ্টের জন্মের ২২৮৫ বছর আগে অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৪ হাজার
বিস্তারিত
উপহার
  হেমন্তের আওলা বাতাস করেছে উতলা। জোয়ার এসেছে বাউলা নদীতে, সোনালি
বিস্তারিত
সাহিত্যের বর্ণিল উৎসব
প্রথম দিন দুপুরে বাংলা একাডেমির লনে অনুষ্ঠিত হয় মিতালি বোসের
বিস্তারিত
নিদারুণ বাস্তবতার চিত্র মান্টোর মতো সাবলীলভাবে
এ উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ভারতের প্রখ্যাত পরিচালক নন্দিতা দাস
বিস্তারিত