মওলানা রুমির মসনবি শরিফ

সোলায়মান (আ.) এর কাছে রানি বিলকিসের উপহার

তোমার হৃদয়ের চোখ যখন ঊর্মিলিত হবে আর আল্লাহর অবিনাশী নূরে আলোকিত হবে, তখন দেদীপ্যমান আকাশের সূর্য অতি তুচ্ছ মনে হবে। কথায় বলে, দৃষ্টিভঙ্গি বদলাও জীবন বদলে যাবে। আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের চেতনা ও দৃষ্টিকে নিয়ে যায় উন্নতির শিখরে। ফলে দুনিয়ার চাকচিক্য ধনসম্পদ যা মানুষকে উন্মাতাল করে, অন্তরদৃষ্টিওয়ালাদের কাছে মাছির পালকের মতোও মূল্য নেই তার

 

হাদিয়েয়ে বিলকিস চেল্ উস্তুর বুদাস্ত

বা’রে আ’নহা’ জুমলা খেশতে যর বুদাস্ত
রানি বিলকিসের উপহার ছিল চল্লিশ খচ্চর বোঝাই
সব মালামাল ছিল উপহার স্বর্ণের ইট নিখাদ। 
হজরত সোলায়মান (আ.) এর কাছে ‘সাবা’র রানি বিলকিসের উপহারসামগ্রীর আলোচনা হচ্ছে। মওলানা রুমি (রহ.) বলেন, এই উপহারসামগ্রীর পরিমাণ ছিল চল্লিশটি বলবান খচ্চরের বোঝাই, আর সব মালামাল ছিল নিখাদ স্বর্ণের ইট। 
সোলায়মান (আ.) ছিলেন বনি ইসরাইল বংশে আল্লাহর নবী এবং তখনকার দুনিয়ার একচ্ছত্র অধিপতি বাদশা। মানুষ ছাড়াও জিন-দানবদের ওপর তার রাজত্ব ছিল। পশুপাখি ও কীটপতঙ্গের ভাষা তিনি বুঝতেন। হজরত সোলায়মান (আ.) ও ‘সাবা’র রানি বিলকিসের কাহিনি কোরআন মজিদে সূরা নামল, আয়াত ২০-৪৫-এ বিবৃত হয়েছে। মসনবি দ্বিতীয় খ-ে ৩৭৫১নং বয়েত সূত্রে এর বিস্তারিত বিবরণ বিধৃত হয়েছে। সূরা নামল ৩৫নং আয়াতে এক কথায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিলকিস সোলায়মানের কাছে উপঢৌকন পাঠিয়েছিল। মওলানা রুমি সে উপঢৌকনের বিবরণ দিয়েছেন এখানে। কোরআন মজিদে অবশ্য এই উপঢৌকন কী জিনিসের ছিল এবং তার পরিমাণ কত ছিল, সে সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। কারণ কোরআন মজিদের শিক্ষা পদ্ধতি হলো ঘটনার খুঁটিনাটি বর্ণনায় প্রবেশ না করা। তাতে মানুষের মন হেদায়েত গ্রহণের পরিবর্তে খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। 
তবে মুফাসসিরদের অনেকে এই হাদিয়া কী পরিমাণ ছিল এবং কোন কোন আইটেম ছিল, তা নির্ণয় করার প্রয়াস পেয়েছেন। এ বিষয়ে জড়িয়ে তারা ঘটনার আসল উদ্দেশ্য ও সেখান থেকে উপদেশ ও শিক্ষাগ্রহণের দিকটি একেবারে ভুলে গেছেন। ফলে কোরআনের উদ্দেশ্য বর্ণনা বা তাফসিরের চেয়ে রূপকথার চর্চা হয়েছে বেশি। 
কোনো কোনো মুফাসসির বলেছেন, রানি ‘বিলকিস’ এর সেই হাদিয়া ছিল স্বর্ণ ও রৌপ্যের দুটি ইট, সঙ্গে অভিন্ন ইউনিফরম পরিহিত ১০০ গোলাম ও বাঁদী। কোনো কোনো মুফাসসির আরও এগিয়ে বলেছেন যে, এই ইটের পরিমাণ ছিল ৫০০, যা ৫০০ দাসদাসী সমেত পাঠিয়েছিলেন। 
সোলায়মান (আ.) বিলকিসের প্রেরিত কাফেলার সংবাদ শুনেই অধীন জিনদের হুকুম করলেন, অতিসত্বর তোমরা বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও রৌপ্যের ইট জোগাড় করো, যা দিয়ে কয়েক মাইল রাস্তা সোনা ও রুপায় মুড়িয়ে দাও। শহরের প্রাচীর মোড় সর্বত্র স্বর্ণ ও রৌপ্যের আলোকসজ্জায় অপরূপ সৌন্দর্যের সমাবেশ ঘটাও। 
রানি বিলকিসের প্রতিনিধিরা সোনা-রুপার কয়েকটি ইট হাদিয়া নিয়ে বড় মনে সোলায়মান (আ.) এর দেশে প্রবেশ করে। তারা তো হতবাক। তারা যে এখন সোনা ও রুপায় মোড়ানো এক রূপকথার শহরে। তাই তাদের উপঢৌকন লুকিয়ে ফেলল লজ্জার কারণে। 
কাহিনির এই অংশ অবলম্বনে মওলানা রুমি বলেন, মানুষ দুনিয়ার সহায়-সম্পদ, জ্ঞান-বুদ্ধি, ইবাদত-বন্দেগি ও নিজের অস্তিত্বের সঞ্চয় যা কিছু আল্লাহর দরবারে নিয়ে যায়, তা অতি তুচ্ছ ও নগণ্য। এ গল্পে ‘বিলকিস’ এমন সাধকের চরিত্র, যিনি আল্লাহকে পাওয়ার সাধনায় নিজেকে বিলিয়ে দিতে চান। কিন্তু দুনিয়াবি সম্পর্ক ও আকর্ষণ তার এই যাত্রায় প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহর অনুগ্রহে দুনিয়াবি আকর্ষণ থেকে মনকে মুক্ত করতে সক্ষম হয় আর আল্লাহর সন্ধানী সাধকদের কাতারে শামিল হয়ে যায়। 
হ্যাঁ, সোলায়মান (আ.) এর কাছে বিলকিসের পাঠানো উপঢৌকনের পরিমাণ ছিল চল্লিশটি বলবান খচ্চরের বোঝাই সোনা ও রুপার ইট। রানি বিলকিসের দূতরা সোলায়মানের দেশে প্রবেশ করে দেখল রাস্তাঘাট, বাড়িঘর সব সোনায় মোড়ানো, সর্বত্র সোনালি ফরাশ বিছানো। স্বর্ণের ওপর দিয়ে চল্লিশ মনজিল পর্যন্ত তারা পথ চলল। মনে হলো, স্বর্ণ বুঝি মূল্যবান কিছুই নয়। তারা পরস্পরকে একাধিকবার বলল, ভালো হয়, আমাদের মান-ইজ্জত যাওয়ার আগে স্বর্ণের ইটগুলো রানির কোষাগারে ফিরিয়ে দিই। 
যেখানে স্বর্ণ ও রৌপ্যের জৌলুস জ্বলজ্বল করছে, সেখানে স্বর্ণের কয়েকটি ইট হাদিয়া নিয়ে যাওয়া চরম বোকামি হবে। এই চিন্তা, উপলব্ধি ও লজ্জার চেতনায় এক পর্যায়ে তারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে গেল। 
জড়ো হয়ে বলল, আমাদের সঙ্গে যে উপঢৌকন নিয়ে এসেছি মূল্যবান হোক বা মূল্যহীন, তা নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা কেন, আমরা তো হুকুমের গোলাম। এই উপহার স্বর্ণ হোক বা মাটি হোক, আমাদের নিয়ে যেতেই হবে। তিনি রানি, আমাদের নেত্রী, তার আদেশ পালন করতেই হবে। যদি নির্দেশ আসে যে তোমাদের উপঢৌকন ফিরিয়ে নাও, যে পাঠিয়েছে তাকে দিয়ে এসো, তাহলে সেই হুকুম তামিল করতে আমরা প্রস্তুত আছি। 
রানি বিলকিসের দূতরা সোলায়মান (আ.) এর দরবারে উপঢৌকন নিয়ে উপস্থিত হলো। উপহারসামগ্রী দেখেই সোলায়মানের হাসি পেল। তিনি বললেন, আমি কি তোমাদের কাছে এইটুকুন হাদিয়া চেয়েছি। অর্থাৎ চাইনি। 
মন নমী গূয়াম মোরা হাদিয়া দহীদ
বলকে গুফতাম লায়েকে হাদিয়া শওয়ীদ
আমি তোমাদের বলিনি আমাকে হাদিয়া দাও
বরং বলেছি, হাদিয়ার যোগ্য তোমরা নিজেরা হও।
কারণ আমার কাছে আছে বিরল দুর্লভ হাদিয়া। কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় এমন হাদিয়া অর্জন। সেই হাদিয়া ইলমে লাদুন্নি। খোদায়ি হাকিকতের জ্ঞান। তোমরা যে সূর্যের পূজা করো, যা কি না পৃথিবীতে কিরণ বিলায়, খনিতে স্বর্ণরতেœ পাথরের রূপান্তর ঘটায়। এসব বাদ দিয়ে যাও এমন খোদার কাছে, যিনি সৃষ্টি করেছেন সূর্য, চন্দ্র অগণন গ্রহ-নক্ষত্র। 
তোমরা তো পূজা করো আকাশের চাঁদনিকে। তাতে নিজের অমূল্য রুহ ও সত্তাকে অপমান করো। কোরআনে বর্ণিত হয়েছেÑ ‘আমি তাকে ও তার সম্প্রদায়কে দেখলাম তারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সিজদা করছে। শয়তান তাদের কার্যাবলি তাদের কাছে শোভন করে দেখিয়েছে এবং তাদের সৎপথ থেকে নিবৃত্ত করেছে, ফলে তারা সৎপথ পায় না।’ (সূরা নামল : ২৪)।
প্রাচীন জাতিগোষ্ঠীর মাঝে সূর্য পূজার প্রচলন ছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল পৃথিবীতে আগুন, উত্তাপ ও আলোর উৎস সূর্য, জীবনজগৎ সূর্যের প্রভাবে পরিচালিত। আরবের দক্ষিণাঞ্চলে রানি বিলকিস শাসিত ‘সাবা’বাসীও সেই আকিদায় সূর্যের পূজারি ছিল। মওলানা বলেনÑ
আফতাব আয আমরে হক তব্বাখে মাস্ত
আবলাহী বাশদ কে গূয়াম উ খোদাস্ত
সূর্য আল্লাহর আদেশে হয়েছে আমাদের রাঁধুনি
আহম্মকি হবে যদি বলি আমাদের খোদা ইনি। 
মওলানা ব্যাখ্যা করেন, সূর্যগ্রহণ হলে কি করো? সূর্যের গায়ের কালো রেখা দূর করার জন্য কাঁসা পিটিয়ে কতভাবে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করো যে, প্রভু হে! সূর্যকে রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত করো। সূর্য তো দিনে থাকে, রাতে কেউ তোমাকে হত্যা করলে তার কাছে কি নিরাপত্তা চাইতে পার। বিপদ-অঘটন তো অধিকাংশ রাতেই ঘটে। তোমাদের উপাস্য তো তখন অদৃশ্য। 
সূয়ে হক গর রাস্তা’নে খুম শওয়ী
ওয়ারহী আয আখতরা’ন মাহরাম শওয়ী
যদি নিষ্ঠায় নত হও আল্লাহর সম্মুখে
মুক্তি পাবে গ্রহ-নক্ষত্র থেকে সম্মানীয় হবে।
যদি আল্লাহর হয়ে যাও কথা বলব তোমার সনে মনের আলাপনে। তখন নিশিরাতে দেখবে সূর্য ঊর্ধ্ব গগনে। স্বচ্ছ পবিত্র রুহ ছাড়া অন্য কোনো দিগন্তে উদিত হয় না হাকিকতের সেই সূর্য। তার উদয়ে ফারাক নেই সকাল-সন্ধ্যার দিবস রজনির। 
তোমার হৃদয়ের চোখ যখন ঊর্মিলিত হবে আর আল্লাহর অবিনাশী নূরে আলোকিত হবে, তখন দেদীপ্যমান আকাশের সূর্য অতি তুচ্ছ মনে হবে। কথায় বলে, দৃষ্টিভঙ্গি বদলাও জীবন বদলে যাবে। আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের চেতনা ও দৃষ্টিকে নিয়ে যায় উন্নতির শিখরে। ফলে দুনিয়ার চাকচিক্য ধনসম্পদ যা মানুষকে উন্মাতাল করে, অন্তরদৃষ্টিওয়ালাদের কাছে মাছির পালকের মতোও মূল্য নেই তার। 
দীদায়ে হিসসি যবূনে আফতাব
দীদায়ে রব্বানী জু ও বিয়া’ব
ইন্দ্রিয় দৃষ্টি সূর্যের সম্মুখে অক্ষম বিনীত
খোদায়ি দৃষ্টি চাও, হও আলোকিত
জাহেরি চোখ দিয়ে দেদীপ্যমান সূর্যের দিকে তাকানো যায় না। তুমি দিব্যদৃষ্টি সন্ধান করো ও অর্জন করো। তখন দুনিয়ার জৌলুস, ভোগবিলাস সূর্য-চন্দ্রের মতো বড় মনে হবে না। সবই তোমার চোখে তুচ্ছ নগণ্যরূপে ধরা দেবে। 
কা’ন নযর নূরী ওয়া ইন নারী বুয়াদ
না’র পীশে নূর পস বুযাদ
কারণ সে দৃষ্টি নূর জ্যোতির, এটি নার আগ্নেয়
জ্যোতির সম্মুখে আগুন আঁধার, তুচ্ছ নগণ্য।

(সূত্র : মওলানা রুমির মসনবি শরিফ, 
৪খ. বয়েত-৫৭৮-৫৯৭)।


পবিত্র শবে মেরাজ কবে, জানা
১৪৪১ হিজরি সনের পবিত্র শবে মেরাজের তারিখ নির্ধারণ এবং রজব
বিস্তারিত
মাতৃভাষার নেয়ামত ছড়িয়ে পড়ুক
ভাষা আল্লাহ তায়ালার বিরাট একটি দান। ভাষার রয়েছে প্রচ- শক্তি;
বিস্তারিত
ন তু ন প্র
বই : আল-কুরআনে শিল্পায়নের ধারণা লেখক : ইসমাঈল হোসাইন মুফিজী প্রচ্ছদ :
বিস্তারিত
উম্মতে মুহাম্মদির মর্যাদা
আল্লাহ তায়ালা যে বিষয়কে আমাদের জন্য পূর্ণতা দিয়েছেন, যে বিষয়টিকে
বিস্তারিত
যেভাবে সন্তানকে নামাজি বানাবেন
হাদিসে এরশাদ হয়েছে ‘তোমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ অধীনদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। আর
বিস্তারিত
আবু বাকরা (রা.)
নোফায় বিন হারেস বিন কালাদা সাকাফি (রা.)। তার উপনাম আবু
বিস্তারিত