ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর জীবন ও দর্শন

ইমাম আজম আবু হানিফা (রহ.) ইরাকের কুফায় ৫ সেপ্টেম্বর ৬৯৯ ইংরেজি মোতাবেক ৮০ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মূল নাম নুমান ইবনে সাবিত ইবনে যূতি। আবু হানিফা তার কুনিয়াত বা উপনাম। পরবর্তী যুগে তিনি ইমাম আজম আবু হানিফা নামেই প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন। বিশ্ববাসী তাকে আবু হানিফা নামেই বেশি চেনে। শৈশবে তিনি পবিত্র কোরআন হিফজ করার মাধ্যমে শিক্ষাজীবন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে ইলমে হাদিস, ইলমে ফিকহ, ইলমে শরিয়ত ও তরিকতের বিভিন্ন স্তরে তিনি ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। 

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর দাদা যূতি ছিলেন ফারসের অধিবাসী। ৩৬ হিজরিতে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং স্ত্রীকে নিয়ে হিজরত করে মক্কা চলে আসেন। পরে কুফায় পৌঁছে তিনি হজরত আলীর (রা.) এর সান্নিধ্য লাভ করেন এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি কাপড়ের ব্যবসায় জীবিকা নির্বাহ করতেন। ৪০ হিজরিতে যূতি (রহ.) এর এক ছেলে সন্তান জন্ম হয়। তার নাম রাখেন সাবিত। বরকতের জন্য তাকে হজরত আলীর (রা.) কাছে নিয়ে এলে তিনি শিশুর মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করেন। সাবিত (রহ.) এর ৪০ বছর বয়সে ৮০ হিজরিতে তার ঘরে এক ছেলে সন্তান জন্ম গ্রহণ করে। বাবা-মা আদর করে নাম রাখেন নুমান। তিনিই বিশ্ববিখ্যাত ইমাম আবু হানিফা (রহ.)।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বেশ কয়েকজন সাহাবির সাক্ষাৎ লাভে ধন্য হন। আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি (রহ.) লিখেন, ‘ইমাম আবু হানিফা (রহ.) নিঃসন্দেহে তাবিঈ ছিলেন। তিনি হজরত আনাস ইবনে মালিক (রহ.) কে দেখেছেন। এছাড়াও ইমাম আবু হানিফা (রহ.) জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে উনাইস (রা.), ওয়াসিলা ইবনে আসকা (রা.), আবুল হারিসা (রা.)সহ বেশ কয়েকজন সাহাবির সাক্ষাৎ লাভ করেন। 
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ কাপড় ব্যবসায়ী। এটা ছিল তার পৈতৃক পেশা। তার বাবা ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। ১৬ বছর বয়সে তিনি পিতৃহারা হন। তার ইন্তেকালের পর এই ব্যবসার দায়িত্ব নিতে হয় যুবক ইমাম আবু হানিফা (রহ.) কে। ব্যবসার কাজে তাকে বিভিন্ন বাজার ও বাণিজ্যকেন্দ্রে যাতায়াত করতে হতো। ঘটনাক্রমে একদিন ইমাম শাবির (রহ.) সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। প্রথম দর্শনেই ইমাম শাবি (রহ.) আবু হানিফার (রহ.) নিষ্পাপ চেহারার মধ্যে প্রতিভার স্ফুরণ লক্ষ করেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কোনো আলেমের শিক্ষায়তনে কি তোমার যাতায়াত আছে? আবু হানিফা (রহ.) সরলভাবেই জবাব দিলেন, সেরকম সুযোগ আমার খুব কমই হয়। কিছুক্ষণ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই ইমাম শাবি (রহ.) আবু হানিফা (রহ.) কে জ্ঞানার্জনে মনোযোগী হওয়ার প্রতি আগ্রহী করে তুললেন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন, ইমাম শাবির (রহ.) সেই আন্তরিকতাপূর্ণ উপদেশবাণীগুলো আমার অন্তরে গভীরভাবে রেখাপাত করল এবং এরপর থেকেই আমি বিপণিকেন্দ্রগুলোতে আসা-যাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাকেন্দ্রে যাতায়াত শুরু করলাম। এ সময় আবু হানিফার (রহ.) বয়স ছিল উনিশ বা কুড়ি বছর।
অল্প সময়েই ইমাম আবু হানিফা (রহ.) পবিত্র কোরআন-সুন্নাহর খেদমত তার মেধা ও চিন্তার ফলে মানুষের কাছে ইমাম হিসেবে প্রসিদ্ধ হয়ে পড়েন। তার শিক্ষক হাম্মাদ ইবনে আবি সোলাইমান (রহ.) এর ইন্তেকালের পর তিনি ওস্তাদের স্থলাভিষিক্ত হন। প্রায় তিরিশ বছর ধরে তিনি ইলম চর্চা করে তার চিন্তাধারাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। তিনি ৪০ হাজার হাদিস থেকে বাছাই করে কিতাবুল আসার, মুসনাদু ইমাম আজম আবু হানিফা, সুনাইয়াত রচনা করেন। এছাড়া আল ফিকহুল আকবার, আবসাতসহ বহু গ্রন্থ তিনি লিখেন এবং তার শাগরিদদের তারাও অনেক গ্রন্থ রচনা করান। জীবনীকাররা লিখেছেন, একমাত্র ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ছাড়া আর কোনো তাবিঈ জীবদ্দশায় এত খ্যাতি ও প্রসিদ্ধি পাননি।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ছিলেন খুবই ইবাদাতগুজার। তিনি জীবনভর নফল সালাত ও নফল সিয়ামে মশগুল থাকতেন। তিনি খুব নরম মনের মানুষ ছিলেন। সত্যের ব্যাপারে, দ্বীনের ব্যাপারে তিনি ছিলেন কঠোর এবং আপসহীন। তার প্রসিদ্ধ ছাত্র ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) বলেন, ‘দ্বীনবিরোধী সবকিছু তিনি কঠোরভাবে প্রতিরোধ করতেন। তিনি অত্যন্ত পরহেজগার এবং আল্লাহভীরু ছিলেন। দ্বীনের বিষয়ে না জেনে তিনি কিছুই বলতেন না। তিনি দুনিয়াপ্রিয় মানুষদের এড়িয়ে চলতেন। তাকে কোনো প্রশ্ন করা হলে, তিনি হাদিস কিংবা সাহাবিদের আমল থেকে ফতোয়া দিতেন। যখন হাদিসে অথবা সাহাবিদের আমলে দলিল পাওয়া না যেত, তখন তিনি কিয়াস করতেন। তিনি জ্ঞান ও সম্পদ মানুষের মাঝে অকাতরে বিলিয়ে দিতেন। (আখবারু আবু হানিফা : ৩১)। 
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর আপসহীনতার সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত হলো, শত চাপ সত্ত্বেও তিনি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেন। কারণ তিনি জানতেন, ওই সময় যদি ক্ষমতা নিতেন, তাহলে তিনি স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে বিচার ফয়সালা করতে পারতেন না। রাবি ইবনে আসিম (রহ.) বলেন, উমাইয়া সরকারের গভর্নর ইয়াজিদ ইবনে ওমর তাকে বায়তুল মালের দায়িত্ব নিতে বলেন। কিন্তু আবু হানিফা (রহ.) তাতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর তাকে বিচারপতির দায়িত্ব নিতে বলা হলে তিনি সরাসরি নাকচ করেন। 
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) যখন শেষ বয়সে পৌঁছান, তখন ক্ষমতায় ছিল আব্বাসীয় শাসক আল-মানসুর। খলিফা মানসুর ইমাম আবু হানিফা (রহ.) কে বাগদাদে নিজ প্রাসাদে ডেকে পাঠান। তিনি বললেন, আপনি আমার রাজ্যে প্রধান বিচারকের দায়িত্ব গ্রহণ করুণ। এবারও ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ন্যায়বিচার করতে না পারার ভয়ে দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেন। খলিফার মুখের ওপর তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের অপরাধে তাকে কারাভোগ করতে হয় এবং এ কারাগারেই তার জীবনাবসান ঘটে। 
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) প্রশস্ত হৃদয়ের মানুষ ছিলেন। তিনি ৫৫ বার হেঁটে পবিত্র হজ আদায় করেন। এ মহান ইমাম ৭০ বছর বয়সে ১৫০ হিজরি সনে শবেবরাতের রাতে বাগদাদের জেলখানায় ইন্তেকাল করেন। বাগদাদের খাইজুরান কবরস্তানে তাকে দাফন করা হয়।


লেখক : খতিব, মণিপুর বাইতুর রওশন জামে মসজিদ, মিরপুর, ঢাকা


হজ আমাদের ধৈর্যের শিক্ষা দেয়
  চলছে হজ মৌসুম। শুরু হয়েছে হজ ফ্লাইট। আল্লাহর ঘরের
বিস্তারিত
হজ তথ্য কর্নার
      ষ বাংলাদেশ হজ মিশন : মক্কা শরিফ ও মদিনা শরিফে
বিস্তারিত
রাজত্বের চেয়ে প্রিয়তম যে সিজদা
হজরত সোলাইমান (আ.) এর রাজত্ব ছিল মানব-দানব, পশুপক্ষীর ওপর। একদা
বিস্তারিত
আবরার
‘আবরার’ আরবি শব্দ, পুংলিঙ্গ। আবরার শব্দটি বাররুন থেকে
বিস্তারিত
গোনাহ থেকে মুক্তি চাইলে
তওবা-ইস্তেগফার একজন মোমিনের এক বড় গুণ। গোনাহের অভিশাপ থেকে নিজেকে
বিস্তারিত
হজ তথ্য কর্নার
জেদ্দা এয়ারপোর্ট  - জেদ্দা শব্দের অর্থ মাতামহী। হজরত আদম (আ.) কে
বিস্তারিত