ইসলামে সালামের ব্যবহার

ইসলামে সালামের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। মুসলিম জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সালামের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্প্রীতি বৃদ্ধিতে সালামের ভূমিকা অপরিসীম। কোরআন ও হাদিসের আলোকে এ বিষয়ে আলোচনা করা হলো।

অভিবাদন জানানোর জন্য : অভিবাদন হিসেবে সালামের প্রচলন হজরত আদম (আ.) এর সৃষ্টির পর থেকেই শুরু হয়েছে। তিনি আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে একদল ফেরেশতার কাছে গিয়ে সালাম দিয়েছিলেন। আর ফেরেশতারা তার সালামের জবাব দিয়েছিলেন। এভাবে সালামের প্রচলন শুরু হয়। এ সম্পর্কে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, আল্লাহ তায়ালা হজরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করলেন। তার দেহের দৈর্ঘ্য ছিল ষাট হাত। অতঃপর তিনি (আল্লাহ) তাকে (আদমকে) বললেন, যাও। ওই ফেরেশতা দলের প্রতি সালাম করো এবং তারা তোমার সালামের জবাব কীভাবে দেয় তা মনোযোগ দিয়ে শোন। কারণ সেটাই হবে তোমার এবং তোমার সন্তানদের সালামের রীতি। অতঃপর আদম (আ.) ফেরেশতাদের বললেন, ‘আসসালামু আলাইকুম’। ফেরেশতাম-লী তার উত্তরে ‘আসসালামু আলাইকা ওয়া রাহমাতুল্লাহ’ বললেন। ফেরেশতারা সালামের জওয়াবে ‘ওয়া রাহমাতুল্লাহ’ শব্দটি বাড়িয়ে বললেন। যারা জান্নাতে প্রবেশ করবেন তারা আদম (আ.) এর আকৃতি বিশিষ্ট হবেন। তবে আদম সন্তানের দেহের দৈর্ঘ্য সর্বদা কমতে কমতে বর্তমান পরিমাপে এসেছে। (বোখারি : ৩৩২৬)।
মুসলমানদের পারস্পরিক দেখা-সাক্ষাতের সময় সালাম প্রদানের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর যখন তারা আপনার কাছে আসবে, যারা আমার নিদর্শনগুলোতে বিশ্বাস করে, তখন আপনি বলুন, তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।’ (সূরা আনআম : ৫৪)।
আর কেউ সালাম প্রদান করলে তার সালামের জবাব দেওয়া ওয়াজিব। আল্লাহ তায়ালা এ ব্যাপারে বলেন, ‘আর তোমাদের যদি কেউ অভিবাদন হিসেবে সালাম প্রদান করে, তাহলে তোমরাও তার চেয়ে উত্তমভাবে অথবা তারই মতো সালামের জবাব দাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ববিষয়ে হিসাব-নিকাশ গ্রহণকারী।’ (সূরা নিসা : ৮৬)।
গৃহে প্রবেশের আগে অনুমতি গ্রহণের জন্য : গৃহে প্রবেশের আগে অনুমতি গ্রহণের জন্য সালাম দিতে হয়। আল্লাহ তায়ালা এ ব্যাপারে বলেন, ‘হে মোমিনরা, তোমরা নিজেদের গৃহ ব্যতীত অন্য গৃহে প্রবেশ করো না, যে পর্যন্ত আলাপ-পরিচয় না করো এবং গৃহবাসীদের সালাম না করো। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যাতে তোমরা স্মরণ রাখ।’ (সূরা নূর : ২৭)।
কারও গৃহের দরজায় গিয়ে সালাম দিয়ে তিনবার অনুমতি নেওয়ার পরও যদি অনুমতি না পাওয়া যায়, তাহলে ফিরে আসতে হবে। বিনা অনুমতিতে কারও গৃহে প্রবেশ করা যাবে না। এ ব্যাপারে হজরত বুসর ইবনে সাঈদ (রহ.) বলেন, আমি আবু সাঈদ খুদরি (রা.) কে বলতে শুনেছি, আমরা মাদিনার আনসারীদের একটি বৈঠকে বসা ছিলাম। সে সময় আবু মুসা (রা.) অস্থির হয়ে, অথবা (বর্ণনাকারী বলেছেন) ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে আমাদের কাছে এলেন। আমরা বললাম, আপনার সমস্যা কী? তিনি বললেন, ওমর (রা.) আমার কাছে লোক প্রেরণ করলেন, যেন আমি তার কাছে যাই। আমি তার বাড়ির দরজায় গিয়ে তিনবার সালাম করলাম। তিনি আমাকে উত্তর দিলেন না। তাই আমি ফিরে এলাম। পরে আমাকে (ডেকে নিয়ে) তিনি বললেন, আমাদের কাছে আসতে কোন বিষয় তোমাকে নিষেধ করল। অতঃপর আমি বললাম, আমি আপনার কাছে এসেছিলাম এবং আপনার গৃহের দরজায় (দাঁড়িয়ে) তিনবার সালাম করেছি। তবে তারা (গৃহের কেউ) আমাকে সালামের উত্তর দেননি। তাই আমি ফিরে গেলাম। আর রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের মাঝে যদি কেউ তিনবার অনুমতি চায়, আর তাকে অনুমতি দেওয়া না হয়, তাহলে সে যেন ফিরে আসে। (মুসলিম : ৫৫১৯)।
মনোমালিন্য দূরীভূত করার উপায় হিসেবে : কোনো দুনিয়াবি বিষয়ে মুসলমানদের পারস্পরিক মনোমালিন্য হলে তিন দিনের বেশি সেই মনোমালিন্য বজায় রাখা উচিত নয়। সালামের মাধ্যমেই সে মনোমালিন্য দূরীভূত করার চেষ্টা করতে হবে। এ ব্যাপারে আবু আইউব আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো লোকের জন্য বৈধ নয় যে, সে তার মুসলমান ভাইয়ের সঙ্গে তিন দিনের অধিক এমনভাবে সম্পর্ক ছিন্ন রাখবে যে, দুজনে দেখা হলেও একজন একদিকে আরেকজন অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখবে। তাদের মধ্যে যে আগে সালাম দেবে, সে-ই উত্তম লোক।’ (বোখারি : ৬০৭৭)।
একজন সালাম দেওয়ার পর যদি অন্যজন সালামের উত্তর না দেয় তাহলে যে সালামের উত্তর দেবে না তার গোনাহ হবে। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলিমের জন্য অপর মুসলিমের সঙ্গে তিন দিনের অধিক সম্পর্ক ছিন্ন করে থাকা উচিত নয়। অতঃপর সে তার দেখা পেয়ে তাকে তিনবার সালাম দিলে সে যদি একবারও উত্তর না দেয় তবে সে তার গোনাহসহ প্রত্যাবর্তন করবে।’ (সুনানে আবু দাউদ : ৪৯১৩)।
পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি করার জন্য : সালাম পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধির একটি প্রধান উপায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলমানদের পারস্পারিক ভালোবাসা বৃদ্ধির জন্য সালামের ব্যাপক প্রসারের নির্দেশ দিয়েছেন।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ঈমানদার ছাড়া কেউই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। আর তোমরা ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ না একে অন্যকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদের তা বলে দেব না, কি করলে তোমাদের মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসার সৃষ্টি হবে? তা হলো, তোমরা পরস্পর বেশি সালাম বিনিময় করবে।’ (মুসলিম : ৯৮)।
চিঠির মূল বক্তব্য শুরু করতে : রাসুলুল্লাহ (সা.) সালামের মাধ্যমে চিঠির মূল বক্তব্য লেখা শুরু করতেন। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, আবু সুফিয়ান ইবনে হারব (রা.) তাকে বলেছেন, তিনি কোরাইশদের একটি ব্যবসায়ী দলে সিরিয়া গিয়েছিলেন। হিরাকল (রোমসম্রাট হিরাক্লিয়াস) তাকে ডেকে পাঠালেন। তিনি তার কাছে গেলেন। তারপর বর্ণনাকারী তার বর্ণিত হাদিসটি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এর একটি চিঠি নিয়ে আসা হলো এবং তা পড়ানো হলো। তাতে লেখা ছিলÑ বিসমিল্লহির রাহমানির রাহিম, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসুল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে রোমের রাষ্ট্রপ্রধান হিরাক্লিয়াসের প্রতি। হেদায়তের অনুসারীদের প্রতি সালাম। তারপর এই...। (জামে তিরমিজি : ২৭১৭)।
সাহাবিরাও সালামের মাধ্যমে চিঠির মূল বক্তব্য শুরু করতেন। জায়েদ ইবনে সাবিত মুআবিয়া (রা.) এর কাছে এই চিঠি লেখেন, জায়েদ ইবনে সাবিতের তরফ থেকে আল্লাহর বান্দা আমিরুল মোমিনিন মুআবিয়াকে। আমিরুল মোমিনিন! আপনার প্রতি সালাম ও আল্লাহর রহমত কামনা করি। আমি আপনার সমীপে আল্লাহর প্রশংসা করি, যিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। অতঃপর... (আল-আদাবুল মুফরাদ : ১১৩৭)।
জনৈক মদিনাবাসী বলেন, কোনো একসময় উম্মুল মোমিনিন আয়েশা (রা.) কে মুআবিয়া (রা.) লিখে পাঠান : আমাকে লিখিতভাবে কিছু উপদেশ দিন, তবে তা যেন দীর্ঘ না হয়। তিনি (বর্ণনাকারী) বলেন, আয়েশা (রা.) মুআবিয়াকে লিখলেন : আপনাকে সালাম। তারপর এই যে, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি : যে ব্যক্তি মানুষকে অসন্তুষ্ট করে হলেও আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি আকাক্সক্ষা করে তা, মানুষের দুঃখকষ্ট থেকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ তায়ালাই তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালাকে অসন্তুষ্ট করে হলেও মানুষের সন্তুষ্টি আশা করে, আল্লাহ? তায়ালা তাকে মানুষের দায়িত্বে ছেড়ে দেন। আপনাকে আবারও সালাম। (জামে তিরমিজি : ২৪১৪)।
সওয়াব লাভ করার জন্য : সালামের মাধ্যমে অনেক সওয়াব লাভ করা যায়। যে বেশি শব্দ বৃদ্ধি করে সালাম দেবে তার সওয়াব বেশি হবে। ইমরান ইবনু হুসাইন থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কাছে একজন লোক এসে বলল, আসসালামু আলাইকুম। নবী (সা.) বললেন, দশ (নেকি)। তারপর অন্য এক লোক এসে বলল, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। নবী (সা.) বললেন, বিশ। আরেক লোক এসে বলল, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহ। নবী (সা.) বললেন, ত্রিশ। (তিরমিজি : ২৬৮৯)।
পরিশেষে বলা যায়, ইসলামের দৃষ্টিতে মুসলমানদের জীবনে সালামের গুরুত্ব ও ফজিলত অপরিসীম। আল্লাহ তায়ালা উল্লেখিত সব ক্ষেত্রে সবাইকে সালামের ব্যাপক ব্যবহার চালু করার তৌফিক দান করুন।


পবিত্র শবে মেরাজ ২২ মার্চ
বাংলাদেশের আকাশে সোমবার রজব মাসের চাঁদ দেখা যায়নি। বুধবার থেকে
বিস্তারিত
পবিত্র শবে মেরাজ কবে, জানা
১৪৪১ হিজরি সনের পবিত্র শবে মেরাজের তারিখ নির্ধারণ এবং রজব
বিস্তারিত
মাতৃভাষার নেয়ামত ছড়িয়ে পড়ুক
ভাষা আল্লাহ তায়ালার বিরাট একটি দান। ভাষার রয়েছে প্রচ- শক্তি;
বিস্তারিত
ন তু ন প্র
বই : আল-কুরআনে শিল্পায়নের ধারণা লেখক : ইসমাঈল হোসাইন মুফিজী প্রচ্ছদ :
বিস্তারিত
উম্মতে মুহাম্মদির মর্যাদা
আল্লাহ তায়ালা যে বিষয়কে আমাদের জন্য পূর্ণতা দিয়েছেন, যে বিষয়টিকে
বিস্তারিত
যেভাবে সন্তানকে নামাজি বানাবেন
হাদিসে এরশাদ হয়েছে ‘তোমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ অধীনদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। আর
বিস্তারিত