মওলানা রুমির মসনবি শরিফ

হারাম দৃষ্টিপাত শয়তানের বিষাক্ত তির

এক লোক আক্রান্ত হয়েছিল মাটিখাওয়া রোগে। এঁটেল মাটি তার প্রিয় খাবার। সুযোগ পেলেই লোকচক্ষুর আড়ালে সে মাটি খায়। একদিন আতরের দোকানে গেল কান্দ কিনতে। তখনকার আতরের দোকান মানে গ্রোসারি। হরেকরকম হালকা খাদ্যজাত দ্রব্য বিক্রি হতো আতরের সঙ্গে আত্তারিতে। লোকটির কিছু কান্দ দরকার ছিল। কান্দ এখনও ইরানে চিনির পরিবর্তে পরিবেশিত হয় চায়ের সঙ্গে। শক্ত জমাট কান্দ লম্বাটে গোল্লার মতো। ভাঙতে সময় লাগে। গায়ে শক্তিরও দরকার। বিক্রি হয় দাঁড়িপাল্লায় ওজন দিয়ে। আত্তারি পাল্লায় যে সিল ব্যবহার করছিল তা ছিল মাটির। একেবারে এঁঁটেল মাটির দলা। তখনও সাবান আবিষ্কার হয়নি। সাবান হিসেবে ব্যবহৃত হতো এই মাটি। মাটিখাওয়া রোগী চোখের কোণায় দেখে নেয় মাটির দলার আকার-আকৃতি। সুযোগ খোঁজে কখন দোকানির চোখ ফাঁকি দেওয়া যায়। 

আত্তারি ছিল ভীষণ চালাক। ক্রেতার চোখ দেখে মেপে নিত কার ব্যক্তিত্বের কতটুকু ওজন। লোকটিকে বলল, কান্দ নিতে চাও, আমার কিন্তু পাল্লায় ওজন দেওয়ার পাথর নেই। আছে মাটির দলা। তবে ওজনে হেরফের হবে না। চাইলে এর মাপে নিতে পার। ক্রেতা বলল, আমার তো কান্দ এখনই দরকার। অসুবিধা নেই, মাটির দলার ওজনে দেন। মনে মনে দোকানির উদ্দেশে বলল, আমার মনের কথা তো খুলে বলব না। মাটিখাওয়া যার অভ্যাস তার কাছে এঁটেল মাটি তো পাথর কেন স্বর্ণের চেয়েও দামি। এ মুহূর্তে আমার মনের অবস্থা সেই যুবকের মতো, যাকে বলা হলো, তোমার হবু স্ত্রী এক মিষ্টান্ন বিক্রেতার মিষ্টিমেয়ে। মাটিখোর দোকানিকে বলল, আপনার মাপার পাথর নেই, অসুবিধা নেই। মাটির দলায় ওজন দেন। মাটি আমার পছন্দের জিনিস। 
দোকানি মাটির দলাটি পাল্লার এক পাশে রেখে দোকানের ভেতরে গেল কান্দের গোল্লা ভেঙে আনাতে। সেখানে একটু বেশি সময় লাগছিল। তবে তার এক চোখ ছিল ক্রেতার দিকে। আরেক চোখ ব্যস্ত কান্দ প্রস্তুতের কাজে। এই ফাঁকে ক্রেতা মাটি খাওয়ার সুযোগটা হাতছাড়া করল না। দুই-এক কামড়ে মাটির দলাটির ওজন অনেকখানি কমাল। ভয় পাচ্ছিল, না জানি দোকানদার তাকে সন্দেহ করে বসে। আত্তার কা-টি ঠিকই দেখেছে। তবে না দেখার ভান করে মনে মনে বলল, তুমি যে মাটিখোর চোর, তার সাক্ষী তো তোমার হলুদাভ ফ্যাঁকাশে মুখ। চোখগুলো কেমন রোগা রোগা।
গর বেদুযদী ওয়ায গেলে মন মী বারী 
রও কে হাম আয পাহলুয়ে খোদ মী খোরী
তুমি চুরি করছ বুঝলাম, আমার মাটি ক্ষয় করছ 
তুমি তো তোমার পাঁজরের গোশত নিজেই খাচ্ছ।
তুমি ভয় পাচ্ছ, আমি দেখে ফেলি কি না। আমার ভয় তো, তুমি ভয়ে কম খাও কি না। তুমি খেলে তো আমারই লাভ। কারণ খেয়ে মাটির দলা যে পরিমাণ কমিয়ে ফেলবে, ওজনে সেই পরিমাণ মাল তোমার কম পড়বে। তুমি মনে করছ আমার ক্ষতি করছ। আসলে তোমার নিজের ক্ষতিই নিজে করছ। কান্দ নিয়ে বাড়ি যাওয়ার পরই বুঝবে কাকে বলে চালাক আর আহাম্মক কত প্রকার। 
মাঠে ছড়ানো দানা দেখে পাখি মনে মনে বেজায় খুশি। দানা বলে, দেখো পাখি কীভাবে তোমাকে আটকাব ফাঁদে। চোখের নাপাক চাহনিতে তুমি ভোগের রাজ্যে হাবুডুবু খাও, তাতে তোমার পাঁজরের গোশত দিয়ে নিজেই কাবাব বানাও। 
ইন নযর আয দূর চোন তীর আস্ত ও সম
এশকাত আফযূন মী শাওয়াদ সবরে তো কম
কামনার দৃষ্টি দূর থেকে নিক্ষিপ্ত বিষাক্ত তির
প্রেমের অনলে জ্বলে, ভেঙে যায় ধৈর্যের বাঁধ।
কামনার দৃষ্টিপাত হলো দূর থেকে নিক্ষিপ্ত বিষাক্ত তির, যা তোমার অন্তর ছেদ করে। প্রতিক্রিয়া দেখলেই তুমি সত্যতা বুঝতে পারবে। কামনার দৃষ্টিপাতে মনে শান্তি-তৃপ্তি আসে না। মনের আগুন আরও বহ্নিশিখায় জ্বলে ওঠে, মন ধৈর্যহারা অস্থির হয়ে পড়ে। যার পরিণতি মনের অশান্তি আর নৈতিকতার মৃত্যু। 
হুজায়ফা ইবনে ইয়ামান (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে নবী করিম (সা.) এরশাদ করেন, ‘হারাম দৃষ্টিপাত ইবলিসের তিরগুলোর মধ্যকার একটি তির। যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে সেই দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়, আল্লাহ তায়ালা বিনিময়ে এমন ঈমান দান করেন, যার স্বাদ সে অন্তরে অনুভব করতে পারে।’ (মুস্তাদরাক হাকিম)। 
কামনার দৃষ্টির মতোই বিষাক্ত হলো দুনিয়ার ধনসম্পদের লোভ। 
মা’লে দুনিয়া দা’মে মোরগ’নে যয়ীফ
মুলকে ওকবা’ দা’মে মোরগা’নে শরীফ 
দুনিয়ার মাল দুর্বল পাখিদের জন্য পাতানো দানা 
পরকালের রাজত্ব শরিফ পাখিদের ফাঁদের খানা।
দুনিয়ার সম্পদ, পদবি, প্রতিপত্তি দুর্বল পাখিদের জন্য পাতানো জালের ফাঁদ। এরা নিজের দুর্বলতা, নির্বুদ্ধিতার কারণে জালে আটকা পড়ে। যারা বিচক্ষণ মর্যাদাবান দুনিয়ার তুচ্ছ-হীন বস্তু তাদের আকৃষ্ট করতে পারে না। তাদের দৃষ্টি অনেক উপরে। পরকালীন সাফল্যের সন্ধানে। উড্ডয়নরত বাজপাখির মতো আকাশ থেকেই শিকার ধরে খায়। 
মাটিখোর দুনিয়া পূজারি, কামনা আর ভোগের পেছনে জীবনপাত করে। সে নিজেকে ভাবে ভীষণ চালাক। মিথ্যায় প্রতারণায় দুনিয়াকে ভোগ করার প্রতিযোগিতায় আখেরাতে তার জন্য সংরক্ষিত কান্দের কথা ভুলে যায়। মহামহিম আল্লাহ বলেন, আমি তোমাকে মন্দকাজ করার যেমন যোগ্যতা দিয়েছি, তেমনি ভালোকাজ করার ক্ষমতাও দিয়েছি। চাইলে মাটি খেয়ে জীবনটা বরবাদ করতে পার। অথবা কান্দ নিয়ে জীবনকে মধুময় করতে পার। উভয় পথ তোমার জন্য খোলা। যে-কোনো একটি গ্রহণ করতে পার।
‘আমি তাকে পথের নির্দেশনা দিয়েছি; হয় সে কৃতজ্ঞ হবে, না হয় সে অকৃতজ্ঞ হবে।’ (সূরা দাহর : ৩)।
মনে কর, তোমার চালাকি দোকানি দেখে না। কিন্তু তোমার চোখের চোরাই চাহনি, তোমার মনের না বলা কথাও আমি জানি।
‘আড়চোখের চাহনি আর অন্তরে যা গোপন আছে, সে সম্পর্কে তিনি অবহিত।’ (সূরা মোমিন : ১৯)। 
দুনিয়াকে লুটেপুটে খেয়ে নিজেকে বড় লাভবান ভাবছ। আসলে তুমি নিজের পায়ে কুড়াল মারছ। অথচ খবর নেই। তুমি মনে করছ অনেক ধনদৌলতের মালিক। চারদিকে তোমার খ্যাতি প্রতিপত্তি। প্রকৃত অবস্থা হচ্ছে তুমি ধনদৌলতের গোলাম, প্রতিপত্তির দাস। তাই সকাল-সন্ধ্যা এসবের চিন্তা ছাড়া তোমার মাথায় আর কিছুই থাকে না। মালিক তো তাকেই বলা হবে, যে নিজেকে এসবের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করতে পেরেছে। অথচ তোমার অবস্থা তার সম্পূর্ণ উল্টা। 
বা’যগূনে আই আসীরে ইন জাহা’ন 
না’মে খোদ কর্দী আমীরে ঈন জাহা’ন
ওহে দুনিয়ার হাতে বন্দি! উল্টা বুঝেছ তুমি
নিজের নাম রেখেছ জগতের নেতা-নেত্রী।
তোমার পা যেখানে দুনিয়ার শিকলে বন্দি, সেখানে তুমি কীভবে দাবি কর, জগতের নেতৃত্ব কর্তৃত্ব তোমার হাতে।
আই তো বান্দায়ে ইন জাহা’ন মাহবূসে জা’ন 
চন্দ গূয়ী খে শ রা’ খা’জায়ে জাহা’ন 
ওহে তুমি এ জগতের দাস! বন্দিদশায় তোমার প্রাণ
আর কতকাল বলবে, জগতে আমার এত সুনাম। (৪খ. ব-৬৫২)।
আমি আর আমিকে নিয়ে আমিত্বের অলীক কল্পনার পেছনে আর কতকাল তোমার মূল্যবান জীবন উজাড় করবে?
(মওলানা রুমির মসনবি শরিফের গল্প, ৪খ. বয়েত-৬২৫-৬৫২)


প্রাণীর প্রতি নবীজির মমতা
‘আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আম্বিয়া :
বিস্তারিত
স্রষ্টাকে খুঁজি সাগরের বিশালতায়
বিশাল জলরাশির উত্তাল তরঙ্গমালায় প্রবাহিত সমুদ্র আল্লাহর এক অপূর্ব সৃষ্টি।
বিস্তারিত
দুধপানের উপকারিতা
দুধের পুষ্টিগুণ বিচারে এটি মহান আল্লাহ তায়ালার বড় একটি নেয়ামত।
বিস্তারিত
পবিত্র শবে মেরাজ ২২ মার্চ
বাংলাদেশের আকাশে সোমবার রজব মাসের চাঁদ দেখা যায়নি। বুধবার থেকে
বিস্তারিত
পবিত্র শবে মেরাজ কবে, জানা
১৪৪১ হিজরি সনের পবিত্র শবে মেরাজের তারিখ নির্ধারণ এবং রজব
বিস্তারিত
মাতৃভাষার নেয়ামত ছড়িয়ে পড়ুক
ভাষা আল্লাহ তায়ালার বিরাট একটি দান। ভাষার রয়েছে প্রচ- শক্তি;
বিস্তারিত