উশর : শরয়ি দৃষ্টিকোণ

জমির ফসলের জাকাতকে উশর বলে। উশর শব্দের আভিধানিক অর্থ দশ। শরয়ি অর্থে জমি থেকে উৎপন্ন ফসল নির্দিষ্ট নিয়মে যে অংশ জাকাত হিসেবে দেওয়া হয় তাকে উশর বলে। জাকাতের সঙ্গে উশরের কিছু পার্থক্য রয়েছে। জাকাত দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট মাল এক বছর নিজের আয়ত্তে থাকতে হবে। কিন্তু উশর দিতে হবে জমি থেকে ফসল কেটে বাড়িতে আনার পর। ঝাড়াই-মাড়াই শেষে তা নির্দিষ্ট লোকদের মধ্যে তা বিলিবণ্টন করে দিতে হবে। জাকাতের ক্ষেত্রে ঋণ পরিশোধের একটি প্রসঙ্গ থাকে; কিন্তু উশরের সময় ফসল উৎপাদন খরচ কিংবা ঋণ কোনো কিছুই হিসাব করা যাবে না। নিজস্ব জমি, বর্গাচাষের জমি সবধরনের জমি থেকে উৎপদিত ফসল থেকে উশর আদায় করতে হবে। এর ব্যতিক্রম হলে সব ফসল হারাম হয়ে যাবে। নিসাব পরিমাণ ফসল থাকলে অবশ্যই উশর দিতে হবে। এ সময় সম্পদের মালিকানা নিজের আয়ত্তাধীন থাকা আবশ্যক। বোখারিতে আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত,  নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘পাঁচ ওয়াসেক খেজুরের কমে জাকাত নেই। পাঁচ উকিয়ার কমে রৌপ্যের জাকাত নেই এবং পাঁচটি উটের কমে জাকাত নেই।’ বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, ৭১৭ কেজির মতো হয়। মণের হিসাবে প্রায় ২০ মণ ধান হলে ফসলের জাকাত দিতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই লতা ও বৃক্ষ-উদ্যানগুলো সৃষ্টি করেছেন এবং খেজুর বৃক্ষ ও বিভিন্ন স্বাদবিশিষ্ট খাদ্যশস্য, জয়তুন ও আনার সৃষ্টি করেছেন। এগুলো একে অন্যের সদৃশ এবং বিসদৃশ্যও। যখন তা ফলবান হয়, তখন তার ফল আহার করবে এবং ফসল তোলার দিনে তার হক প্রদান করবে। অপব্যয় করো না, নিশ্চয়ই তিনি অপব্যয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ (সূরা আনআম : ১৪১)।  
সব মুসলিম সমাজে ফসলের জাকাত বাধ্যতামূলক। তবে যে জায়গায় নতুন করে ইসলামের প্রসার ঘটেছে, সেখানে জাকাত ব্যবস্থা চালু করায় দেরি করা যেতে পারে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) মুআজ ইবনে জাবালকে ইয়ামেনের শাসনকর্তা করে পাঠালেন এবং বললেন, তুমি আহলে কিতাবদের কাছে যাচ্ছ। প্রথমে তাদের এই কালেমার প্রতি আহ্বান করবে, ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল, যদি তারা তোমার এ কথা মেনে নেয়, তাহলে তাদের নামাজ ও জাকাতের নির্দেশ দেবে।’ (বোখারি ও মুসলিম)। অন্য এক হাদিসে জাকাত আদায়ে কঠোরতা প্রদর্শন করতে নির্দেশ করা হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, জাকাত উসুলে সীমা লঙ্ঘনকারী জাকাতে বাধাদানকারীর সমান। আল্লাহ যাকে মাল দান করেছেন, তাদের জাকাত দিতে হবে। এর ব্যতিক্রম হলে তাকে পরকালে শাস্তি ভোগ করতে হবে। কেয়ামতের দিন তার মালকে তার জন্য একটি টাক মাথা সাপস্বরূপ করা হবে, যার চোখের ওপর দুটি দাগ থাকবে, তাকে তার গলার বেড়িস্বরূপ করা হবে। এই সাপ আপন মুখের দুই দিক দিয়ে তাকে দংশন করতে থাকবে এবং বলবে আমি তোমার মাল, আমি তোমার সংরক্ষিত অর্থ। আল্লাহ বলেছেন, ‘নামাজ কায়েম করো, জাকাত দাও এবং যারা আমার সামনে রুকু করছে তাদের সঙ্গে রুকু করো।’ (সূরা বাকারা : ২৪৩)। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, নামাজ ও জাকাত প্রতি যুগে দ্বীন ইসলামের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃত হয়ে এসেছে। অন্যান্য সব নবীর মতো বনি ইসরাইলদের নবীরাও এর প্রতি কঠোর তাগিদ দিয়েছিলেন। কিন্তু ইহুদিরা এ ব্যাপারে গাফেল হয়ে পড়েছিল, তাদের সমাজে জামাতের সঙ্গে নামাজ পড়ার ব্যবস্থাপনা প্রায় ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। বেশিরভাগ লোক ব্যক্তিগত পর্যায়েও নামাজ ছেড়ে দিয়েছিল, আর জাকাত দেওয়ার পরিবর্তে তারা সুদ খেত।
বর্গাকৃত জমির ফসলের ওপর জমির মালিক তার অংশের এবং বর্গাদার তার অংশের নিসাব পূর্ণ হলে নির্দিষ্ট হারে উশর আদায় করবে। জমির চাষাবাদ করতে যে খরচ হয়, সে খরচ বাদ দিয়ে কি আদায় করতে হবে নাকি জমি থেকে উৎপাদিত সমুদয় ফসলের উশর বের করতে হবে? এ নিয়ে কেউ কেউ সমস্যায় পড়েন। এক্ষেত্রে একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যেমন ধরুনÑ কেউ ৭২০ কেজি ধান পেয়ে তার থেকে ৫০ কেজি খরচ বাবদ বাদ দিয়ে ৬৭০ কেজি ধানের উশর বের করলে তা হবে না, বরং তাকে ৭২০ কেজি ধানের উশর বের করতে হবে। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওয়াফককৃত জমির উৎপাদিত ফসলের উশর বের করতে হবে না। কারণ উশর ফরজ হওয়ার শর্ত ফসলের মালিক হওয়া। এজন্য ব্যক্তিমালিকানা না থাকায় উশর দিতে হবে না। যেসব দ্রব্যের ওজন ও স্থায়িত্ব আছে; তথা ওজন ও জমা করে রাখা যায়, সেগুলোরই উশর (জাকাত) আদায় করতে হবে। এ ধরনের পণ্যের মধ্যে রয়েছে যব, গম, ভুট্টা, ধান, কলাই, বুট সরিষা, চা, কফি ইত্যাদি সব দানাজাতীয় শস্য। বোখারি শরিফে, বার্লি, গম, কিশমিশ ও খেজুর-জাতীয় ফসলের জাকাত নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। ধানের মৌসুমে বিভিন্ন জমির বিভিন্ন সময়ে কাটা ও ঝাড়াই-মাড়াই করা ফসলের পরিমাপ ঠিকমতো হিসাব রেখে প্রতি কেজির উশর বের করতে হবে। টাকার বিনিময়ে জমি ভাড়া নিয়ে চাষ করলে উশর দেবে চাষি, জমির মালিক নয়। ভাগচাষের জমির উশর মালিক ও চাষি উভয়কেই দিতে হবে। জাকাত দিতে হয় বছরে একবার; কিন্তু উশর দিতে হয় প্রতি মৌসুমে। অর্থাৎ যতবার ফসল উঠবে, ততবারই উশর আদায় করতে হবে। অর্থাৎ কোনো কৃষক যদি বছরে একবার ফসল ফলান, তাহলে তিনি একবার আবার কেউ যদি তিনবার ফসল ফলান তিনি তিনবার উশর দেবেন। কোন কোন পণ্যে জাকাত দিতে হবে, কোন কোন পণ্যে দেওয়া লাগবে না, সে সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। বোখারি শরিফে বর্ণিত হয়েছে, আবদুুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যাতে আকাশ অথবা প্রবহমান কূপ থেকে পানি দান অথবা যা নালা দিয়ে সিক্ত হয়, তাতে ‘উশর’ অর্থাৎ ১০ ভাগের এক ভাগ, আর যা সেচ দ্বারা সিক্ত হয় তাতে অর্ধ উশর অর্থাৎ ২০ ভাগের এক ভাগ। যেসব ফসলে জাকাত দিতে হবে তার মধ্যে ধান, যব, গম অন্যতম। এছাড়া আঙুর ও খেজুরে থেকে জাকাত আদায় করতেও হাদিসে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ বলেন, যে জমির খাজনা দেওয়া হয় তার কোনো উশর নেই। এ ব্যাপারে ইবনে হিব্বান (রহ.) বলেন, খারাজি জমিতে উৎপন্ন ফসলের উশর নেই; এটি একটি বাতিল হাদিস। এর কোনো ভিত্তি নেই। এটি রাসুলুল্লাহ (সা.) এর বাণী নয়। 
কার কত টাকা জাকাত আসে, তা সুনির্দিষ্টভাবে হিসাব করে তা সন্তুষ্টচিত্তে আদায় করতে হবে। মুসলিম শরিফে জারির ইবনে আবদুল্লাহ বাজালি (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কাছে জাকাত উসুলকারী আসবে, তখন সে যেন তোমাদের কাছ থেকে তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যায়।’  যেহেতু জাকাতের অপর নামই উশর; তাই কোরআন নির্দেশিত জাকাত ব্যয়ের আটটি খাতই উশর ব্যয়ের খাত। মহান আল্লাহ এরশাদ করেন, ‘সদকা তো শুধু নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত ও তৎসংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জন্য, যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা হয় তাদের জন্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণ ভারাক্রান্তদের জন্য, আল্লাহরপথে ও মুসাফিরের জন্য। এটা আল্লাহর বিধান, আল্লাহ সর্বজ্ঞ।’ (সূরা তওবা : ৬০)। বহু  মুসলমান আছেন, যারা নামাজের ব্যাপারে গাফেল নন; কিন্তু জাকাত প্রদানের ব্যাপারে তারা ততটা মনোযোগী নন। বোখারি শরিফে বর্ণিত হয়েছে, আবু বকর (রা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর শপথ! যে ব্যক্তি নামাজ ও জাকাতের মধ্যে পার্থক্য করবে, তার বিরুদ্ধে আমি লড়াই করব, কারণ জাকাত মালের ওপর আরোপিত হক। আল্লাহর শপথ, আল্লাহর রাসুল (সা.) কে যে রশি আদায় করত, তা যদি আমাকে না দেয় তাহলে তা না দেওয়ার জন্য তাদের বিরুদ্ধে আমি জিহাদ করবই।’ ওমর (রা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর শপথ! অচিরেই আমি দেখলাম যে, নিঃসন্দেহে আল্লাহ আবু বকর (রা.) এর হৃদয়কে যুদ্ধের জন্য প্রশস্ত করেছেন। সুতরাং আমি বুঝতে পারলাম যে, তার সিদ্ধান্তই যথার্থ।’ (বোখারি)। উশর ফরজ হওয়ার জন্য খাদ্যশস্যের মালিক হওয়া শর্ত, জমির মালিক হওয়া শর্ত নয়। খাজনা প্রদানকৃত জমিরও উশর আদায় করতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! যে অর্থ তোমরা উপার্জন করেছ এবং যা কিছু আমি জমি থেকে তোমাদের জন্য বের করে দিয়েছি, তা থেকে উৎকৃষ্ট অংশ আল্লাহরপথে ব্যয় করো। তার পথে ব্যয় করার জন্য তোমরা যেন সবচেয়ে খারাপ জিনিস বাছাই করার চেষ্টা না করো।’ (সূরা বাকারা : ২৬৭)।
আমরা জানি, নিজের উৎকৃষ্ট গুণাবলির অধিকারী কখনও নিকৃষ্ট গুণের অধিকারীদের পছন্দ করতে পারেন না। মহান আল্লাহ নিজেই পরম দাতা এবং সর্বক্ষণ নিজের সৃষ্টির ওপর দানদাক্ষিণ্যের ধারা প্রবাহিত করেছেন। কাজেই তাঁর পক্ষে কেমন করে সংকীর্ণ দৃষ্টি, স্বল্প সাহস ও নিম্নমানের নৈতিক চারিত্রিক গুণাবলির অধিকারী লোকদের ভালোবাসা সম্ভব? যারা জাকাত আদায় করবে তাদের সদাচারী হতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) মুআজ (রা.) কে জাকাত আদায়ে কঠোরতা করতে নিষেধ করেন। এ ব্যাপারে তিনি বলেছেন, ‘জাকাতে তুমি বেছে বেছে তাদের উত্তম জিনিসগুলো নেবে না এবং বেঁচে থাকবে উৎপীড়তদের বদদোয়া থেকে। কেননা উৎপীড়তদের বদদোয়া এবং আল্লাহর মধ্যে কোনো আড়াল নেই।’ তাই কঠোরতা করা যাবে না, বরং তার জন্য দোয়া করতে হবে। জাকাত আদায়কারীর মর্যাদা অনেক। রাফে ইবনে খাদিজ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ন্যায়নিষ্ঠতার সঙ্গে জাকাত উসুলকারী কর্মী বাড়িতে ফিরে আসা পর্যন্ত আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী গাজির মতো।’ (আবু দাউদ)। জাকাত তাদের বাড়িতে ছাড়া উসুল করা যাবে না। নবী করিম (সা.) এর ওফাতের পর কিছু লোক কোরআনের অপব্যাখ্যা করে জাকাত দিতে অস্বীকার করে। সূরা তওবার ১০৩নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তুমি তাদের মালের জাকাত উসুল করো। এটা তাদের পূতঃপবিত্র করবে।’ জাকাত দানে অস্বীকারকারীরা বলতে শুরু করে, ইমামের জাকাত নেওয়ার অধিকার নেই। এটা শুধু রাসুলুল্লাহ (সা.) এর জন্যই নির্দিষ্ট ছিল। কিন্তু আবু বকর ও অন্য সব সাহাবি তাদের ভুল ব্যাখ্যা খ-ন করে এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। পরবর্তী সময়ে তারা জাকাত দিয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে ইসলামে প্রবেশ করে। ন্যায়সংগতভাবে সঠিক দ্বীনে দাখিল থাকতে হলে অবশ্যই জাকাত আদায় করতে হবে। এ ব্যাপারে আল্লাহ বলেন,  ‘তাদের তো এছাড়া আর কোনো হুকুম দেওয়া হয়নি যে, তারা নিজেদের  দ্বীনকে একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত করবে, নামাজ কায়েম করবে ও জাকাত দেবেÑ এটিই যথার্থ সত্য ও সঠিক দ্বীন।’ (সূরা বাইয়েনা : ৫)।


সালাত মোমিনের আশ্রয় ও অবলম্বন
কতই না মহান এর মর্যাদা। কি সমুচ্চ এর অবস্থান। এটি
বিস্তারিত
বিশুদ্ধ মাতৃভাষায় বেড়ে উঠুক আমাদের
ভাষার মাস শেষ হওয়ার পথে। এ মাসে আমাদের মাতৃভাষার প্রতি
বিস্তারিত
হায় আওরঙ্গজেবের ভারত!
মুসলিম শাসনামলে ভারতের সাধারণ হিন্দু, পুরোহিত, ধর্মনেতা ও ধর্মালয়গুলো “বিশেষ
বিস্তারিত
টঙ্গীর আন-নূর মসজিদে অনুষ্ঠিত হলো
গত জুমায় টঙ্গীর দত্তপাড়া হাসান লেনের আন-নূর জামে মসজিদের উদ্যোগে
বিস্তারিত
মহামারি-রোগব্যাধি থেকে শিক্ষা
জীবন-মৃত্যু আল্লাহর সৃষ্টি। তিনি বান্দাকে পরীক্ষাস্বরূপ সুুস্থতা-অসুস্থতা, আনন্দ-বেদনা ও সুখ-দুঃখ
বিস্তারিত
মুফতি সাহাবি মুয়াজ বিন জাবাল
মুয়াজ বিন জাবাল (রা.) একজন আনসারি সাহাবি। উপনাম আবু আবদুর
বিস্তারিত