বাইতুল্লাহর পথিকদের সমীপে

শুরু হলো পবিত্র হজের মৌসুম। প্রতি বছরের মতো এ বছরও হজ পালনকারীদের বিশাল একটি দল মক্কা মোকাররমায় হজ পালনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছেন। দুনিয়ার নানা প্রান্ত থেকে এরা জমা হবেন আল্লাহর মেহমানদারির ডাকে সাড়া দিয়ে। বহু বর্ণের আর বিভিন্ন জাতীয়তা ও ভাষার অধিকারী লাখো কোটি মানুষ কাবা চত্বরে এক পরিচয়ে মিশে যাবেন। লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক স্বর এবং বিগলিত হৃদয় নিংড়ানো অশ্রুগুলো সব ভিন্নতার ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে এক কাতারে নিয়ে আসবে। এই কাতার আশেকদের, এই কাতার আল্লাহর জন্য পাগলপারা সমবেত বান্দাদের। 
ইসলামের উল্লেখযোগ্য রুকন হজ অন্যান্য রুকনের তুলনায় অনেক দিক দিয়েই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। দীর্ঘ সময় নিয়ে সম্পন্ন করতে হয় হজের বিধানগুলো। তাছাড়া বিশেষ পদ্ধতিতে ইহরামের কাপড় পরিধান করা, দৈহিক সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সামর্থ্য থাকা ইত্যাদি ব্যাপারগুলো হজের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাই হজের ইবাদত পূর্ণ করার জন্য অন্যান্য প্রায় সব ইবাদতের চেয়েই বেশি প্রস্তুতি নিতে হয়। এমনিতেই হজের অর্থ জোগাড় আর ভিসা ও ছাড়পত্র ইত্যাদি লাভ এবং সেখানে গিয়ে কোথায় থাকা হবে, কী খাওয়া হবে, এসব প্রস্তুতিতে আমাদের দীর্ঘ সময় ও পরিশ্রম ব্যয় হয়। কিন্তু হজে যাওয়ার ব্যবস্থা হওয়ার পর হজ সুচারুরূপে সম্পন্ন করার জন্য এবং নিজের হজকে প্রকৃত হজে পরিণত করার জন্য আরও কিছু ব্যাপার খেয়াল রাখা উচিতÑ যেগুলো হয়তো সচরাচর খেয়াল করা হয় না।
হজের বিশেষ প্রস্তুতির কথা বলতে গেলে দৈহিক-মানসিক-আত্মিকÑ এই তিন রকমের প্রস্তুতিই নেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি প্রস্তুতি হলো হজের আমলগুলো কোনটা কীভাবে করতে হবেÑ সেসব ভালো করে জেনে আত্মস্থ করে নেওয়া। সম্ভব হলে কিছুটা প্র্যাকটিস করে নেওয়া। হজের আমলগুলোর বিস্তারিত বিবরণ মাসআলা-মাসায়েলের কিতাবগুলোতে সুন্দরভাবে বর্ণিত আছে। এই বিষয়ের কিতাবগুলো আমাদের জন্য বেশ সহজলভ্য। গ্রহণযোগ্য আলেমদের রচিত কিতাব থেকে হজের পালনীয় আমলগুলোর প্রয়োজনীয় বিবরণ খুব সহজেই পড়ে জেনে নেওয়া যায়। 
হজের বিধান সম্পর্কে জানার আরেকটা সুন্দর মাধ্যম হতে পারে অতীতে হজ করেছেন, এমন ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা শোনা। পরিচিতদের মধ্যে হজের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন অনেকেই থাকবেন, তাদের মধ্যে নিজের মুনাসেব কারও কাছ থেকে হজের পূর্ণ সময়ের আমলগুলোর বিবরণ শুনে শিখেও নেওয়া যাবে হয়তো। সবচেয়ে সুন্দর মাধ্যম হলো হজ প্রশিক্ষণ কর্মশালাগুলো। বর্তমানে হজ প্রশিক্ষণ বিভিন্ন জায়গাতেই হচ্ছে। নির্ভরযোগ্য আলেমদের তত্ত্বাবধানে হজ প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশ নেওয়াটা হজ সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ধারণা লাভ করা এবং হজের করণীয়গুলো শিখে নেওয়ার জন্য সুন্দর মাধ্যম। যারা প্রযুক্তির সাহায্য নিতে অভ্যস্ত তারা বিভিন্ন ভিডিও ইত্যাদিও খুঁজে পাবেন। যেখানে হজের করণীয়গুলো স্ক্রিনে ধারাবিবরণীসহ দেখে নিতে পারবেন। পাশাপাশি হজে কোথায় কোথায় যেতে হবে, সে জায়গাগুলোর চিত্র ম্যাপ ভিডিওসহ সম্ভাব্য সবধরনের পরিচয় পাওয়া যাবে। এমনিতে হজে তো নিজেদের দলের মুয়াল্লিম সঙ্গে থাকবেনই হজের সবকিছুতে সাহায্য করার জন্য, তবে নিজে আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়া ভালো। ক্ষেত্রবিশেষে নিজের প্রস্তুতি আবশ্যকও হয়ে যেতে পারে। 
এ তো গেল হজের বাহ্যিক প্রস্তুতি, আর হজের ফারায়েজ আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করা। হজ যেহেতু একটি ইবাদত এবং যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, একেবারে ইসলামের পাঁচ রুকনের একটিÑ তাই হজের জন্য মানানসই হলো বাহ্যিক প্রস্তুতির পাশাপাশি আত্মিক বা আধ্যাত্মিক প্রস্তুতিও গ্রহণ করা। হজের জন্য নিজের অন্তরাত্মাকে সর্বান্তকরণে প্রস্তুত করে নেওয়ার বেশ কয়েকটি মাধ্যম হতে পারে। 
হজের সফর মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠতম সফরগুলোর একটি। ইসলামের রুকন, ফরজ ইবাদত, আল্লাহর ঘরের সাক্ষাৎ, রবের মেহমানদারির ডাকে সাড়া দেওয়ার সুযোগ, মোটকথা সৌভাগ্যের অনেকগুলো বড় বড় উপকরণ একাকার হয়ে হজকে বাড়তি মাত্রা দান করে। এই সফরের মুসাফির সব সৌভাগ্য ধারণের পিপাসা নিয়ে নিজেকে রবের সামনে তুলে ধরার বাসনায় ছুটে চলে কাক্সিক্ষত গন্তব্যে। প্রভুর ঘরের মেহমানদারি গ্রহণের প্রতীক্ষা নিয়ে ছুটে চলা পথিক মেজবানের গৃহে অবতরণের জন্য নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করবে? স্বাভাবিকভাবেই ন্যায়সংগত হবে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট পন্থায় নিজেকে পেশ করা। রবের সামনে নিজেকে উৎকৃষ্ট পন্থায় পেশ করার জন্য আবশ্যক হলো নিজের অন্তর কলুষমুক্ত করে পেশ করা। গোনাহ ও সব অকল্যাণ থেকে নিজের অন্তরকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে নিষ্কলুষ অন্তরের অধিকারী হয়ে বাইতুল্লাহর জিয়ারতের বিশেষ পোশাক পরিধান করা। নিজেকে পরিচ্ছন্ন করে প্রভুর দরবারে উপস্থাপনের জন্য আবশ্যক হলো নিজের অন্তর পরিশুদ্ধ করা। গোনাহ ও অন্তরের ব্যাধি থেকে নিজেকে পবিত্র করার যথাসাধ্য চেষ্টা করা। গোনাহমুক্ত অন্তরে আল্লাহর দরবারে হাজিরা দেওয়ার জন্য তওবা করতে হবে খাঁটি দিলে। পাপে পূর্ণ অন্তর পরিষ্কার করার একটাই মাত্র রাস্তাÑ তওবা। তওবা করে হজের প্রস্তুতি নিতে হবে গোনাহমুক্ত অন্তরে হজ করার জন্য।
তওবা করলে তো নিজের অতীতের গোনাহগুলো মাফ হবে ঠিকই, পাশাপাশি তওবার অন্যতম একটা উপাদান হলো ভবিষ্যতে গোনাহ না করারও প্রতিজ্ঞা করা। নিজের আত্মাকে এমনভাবে পরিশুদ্ধ করে নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে, যাতে পাপের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। সম্পূর্ণ পাপমুক্তি হয়তো মানুষের জন্য সম্ভব নয়, তবে চেষ্টা করতে তো অসুবিধা নেই। বরং চেষ্টা করলে এবং তওবা করতে থাকলে পরিমাণ কমে আসবেই। তাই নিজের বাতেনকেও উন্নত থেকে উন্নত করার ব্যবস্থা নেওয়া হজের উল্লেখযোগ্য একটা প্রস্তুতি হয়ে থাকবে। 
হজের পূর্ণ সময়টাই ইবাদতে পরিপূর্ণ। এই পুরো সময়টাতে অজস্র দোয়া রয়েছে ভিন্ন পরিবেশ পরিস্থিতিতে পড়ার জন্য। এই দোয়াগুলো যতটুকু পারা যায় গুরুত্ব দিয়ে শিখে যাওয়া উচিত। সঙ্গে সঙ্গে দোয়াগুলোর অর্থও জেনে নিতে পারলে তো সোনায় সোহাগা। হজকে বর্ণিল করে তোলার জন্য সহজ মাধ্যম এই দোয়ার সমৃদ্ধ ভা-ার। 
হজ আদায়ের জন্য এই যে বহুমুখী প্রস্তুতির কথা বলা হলোÑ এই সবই অর্থহীন হয়ে যেতে পারে একটা জিনিসের অভাবে। আল্লাহ তায়ালার কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা! আল্লাহ তায়ালার কাছে তৌফিক এবং সাহায্য চাওয়াটা হবে সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি। আর কোনো প্রস্তুতি যদি না-ও নেওয়া সম্ভব হয়, শুধু দোয়া দ্বারা সব প্রস্তুতি সেরে নেওয়া সম্ভবÑ যদি দোয়াটা প্রকৃত অর্থে দোয়া হয়। দোয়াকে হাদিসে ইবাদতের মগজ বলা হয়েছে। ইবাদতের প্রস্তুতি, ইবাদত করার সক্ষমতা, ইবাদতের সওয়াব, ইবাদতের বরকত লাভÑ সবকিছুতেই রয়েছে দোয়ার বিশাল প্রভাব। তাই জীবনের আর সবকিছুর মতো হজের ক্ষেত্রেও দোয়ার সামান সংগ্রহের কোনো বিকল্প নেই। 
মোমিনদের বিশাল একটা সংখ্যা এ বছর হজের জন্য মনোনীত হয়েছেন। প্রভুর ঘরের মোবারক ডাকে সাড়া দেওয়ার প্রাথমিক আয়োজন সম্পন্ন করে ফেলেছেন সৌভাগ্যবান বান্দাদের বিশাল বহর। কেউ হয়তো জীবনে প্রথমবারের মতো, কেউ আবার পুনর্বার রবের ঘরের সাক্ষাতে ধন্য হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন। সশ্রদ্ধ এবং ঈর্ষাপূর্ণ শুভকামনা করছি বাইতুল্লাহর পথিকদের জন্য, রবের দেওয়া সৌভাগ্যে নিজেদের ডালি পূর্ণ করে আপন ঠিকানায় পূতঃপবিত্র হয়ে ফিরবেনÑ এই কামনা রইল।

লেখক : শিক্ষক, জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মোহাম্মদপুর, ঢাকা


পবিত্র শবে মেরাজ কবে, জানা
১৪৪১ হিজরি সনের পবিত্র শবে মেরাজের তারিখ নির্ধারণ এবং রজব
বিস্তারিত
মাতৃভাষার নেয়ামত ছড়িয়ে পড়ুক
ভাষা আল্লাহ তায়ালার বিরাট একটি দান। ভাষার রয়েছে প্রচ- শক্তি;
বিস্তারিত
ন তু ন প্র
বই : আল-কুরআনে শিল্পায়নের ধারণা লেখক : ইসমাঈল হোসাইন মুফিজী প্রচ্ছদ :
বিস্তারিত
উম্মতে মুহাম্মদির মর্যাদা
আল্লাহ তায়ালা যে বিষয়কে আমাদের জন্য পূর্ণতা দিয়েছেন, যে বিষয়টিকে
বিস্তারিত
যেভাবে সন্তানকে নামাজি বানাবেন
হাদিসে এরশাদ হয়েছে ‘তোমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ অধীনদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। আর
বিস্তারিত
আবু বাকরা (রা.)
নোফায় বিন হারেস বিন কালাদা সাকাফি (রা.)। তার উপনাম আবু
বিস্তারিত