সফল নারী উদ্যোক্তা সোনিয়া সোবহান

নারীরা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছেন। সমাজের সব ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান পাকাপোক্ত হচ্ছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ নারীই স্বনির্ভরতার জন্য চাকরিতে যাচ্ছেন। আর কিছু নারী এগিয়ে আসছেন ঝুঁকিপূর্ণ পেশা ব্যবসায়। তারা নানা প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। নিজেদের পাশাপাশি অন্য নারীদেরও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে সহযোগিতা করছেন।

রংপুর নগরীর ধাপ এলাকার সোনিয়া সোবহান এমনই একজন নারী যিনি একজন সফল উদ্যোক্তা। এই ‘সফল উদ্যোক্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পেছনে রয়েছে তার নিজের পরিশ্রম এবং এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়। পথে পথে নানা প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করতে হয়েছে সোনিয়া সোবহানকে, তবে কখনোই দমে যাননি তিনি।

নিজের মেধা, মননশীলতা, কর্মনিষ্ঠা এবং একাগ্র প্রচেষ্টার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। মাত্র সাড়ে চার হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে হস্তশিল্পের ব্যবসা শুরু করেছিলেন। সেই ব্যবসার পুঁজি এখন প্রায় ১৫ লাখ টাকা। তার প্রতিষ্ঠানে তৈরি বাটিক থ্রি-পিচ, ব্লক থ্রি-পিচ, হ্যান্ডপ্রিন্ট, ওড়না, ওয়ান পিচ, বিভিন্ন শিশু পোশাক, বেডশিট, কুশন কাভার, নেট কভার, ব্যাগ শো-পিচ, এক্সক্লুসিভ শাড়ি ও উপহার সামগ্রীসহ বিভিন্ন পাটের তৈরি পণ্য বিক্রি হচ্ছে দেশ-বিদেশে। এছাড়াও তার প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন ১৭০ জন গ্রামীণ নারী।

১৯৮৮ সালে নগরীর ধাপ এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন সোনিয়া সোবহান। তার পিতা মৃত আ.খ.ম সোবহান পেশায় ছিলেন প্রকৌশলী এবং মাতা মৃত. মকসুদা বেগম ছিলেন গৃহিনী। তিনি ছিলেন পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান। শিক্ষাগত জীবনে তিনি রংপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ঢাকার স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

কর্মজীবনের শুরুতে তিনি ঢাকার ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ (ইউডা) এর আইন বিষয়ের লেকচারার ছিলেন। পরে একটি বে-সরকারি রেডিও সেন্টারে কাজ শুরু করেন তিনি এবং বর্তমানেও করছেন। পরবর্তীতে মায়ের শারীরিক অসুস্থার কারণে রংপুরে চলে আসেন এবং হস্তশিল্পের কাজ শুরু করেন। ২০১৭ সালে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও ব্যবসায়ী জিন্নাত হোসেন লাভলুর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি।

সোনিয়া সোবহান বলেন, শুরুটা আসলে শখের বসেই হয়েছিল। আমার মা কাপড়ের হাতের কাজ অনেক ভালো পারতেন। মায়ের কাছ থেকেই হাতের কাজ করা শিখি। অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা থাকলেও আমার মনে হয় যে, ঘরে বসে থাকার চেয়ে কিছু করলে ভালো হয়। তাই হাতের কাজ করার জন্য প্রথমে সাড়ে চার হাজার টাকা দিয়ে বাজার থেকে কিছু থ্রি-পিচ ও সুতা কিনে আনি। পরে সেগুলোতে নিজেই কাজ করি এবং আশপাশে বিক্রি করে দিই। দেখা যায় যে, ক্রেতাদের চাহিদা বেশ ভালো এবং তারা পোশাক পরার পর অনেক প্রশংসাও করতেন। 

তিনি বলেন, ক্রেতাদের চাহিদা ও প্রশংসা দেখে আমার মনোবল এবং কাজ করার আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। পরে আমি হাতের কাজ ছাড়াও বিভিন্ন কাপড় তৈরির উপর প্রশিক্ষণ নিই এবং কাপড় তৈরির কাজ করতে থাকি। এভাবে কাজ করে সামান্য আয় হতে থাকে। এই আয়ের থেকে টাকা জমিয়ে পাইকারিতে ওয়ান পিচসহ বিভিন্ন কাপড় কিনে এনে হাতের কাজ করতে থাকি। পরে কয়েকজন কর্মী নিয়োগ দিই। চুক্তিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অর্ডার নিয়ে তা তৈরি করে দিতাম। অর্ডারের মালামাল নিখুঁতভাবে এবং সঠিক সময়ে ডেলিভারি দিতাম। এতে আমার পরিচিতি বাড়তে থাকে পাশাপাশি বেশ অর্ডারও পেতে শুরু করি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অর্ডার এবং ব্যবসার প্রসার আরও বাড়তে থাকে। 

সোনিয়া সোবহান আরও বলেন, ২০১৬ সালের পহেলা জানুয়ারি থেকে আমি ব্যবসার কার্যক্রম শুরু করি। বর্তমানে ব্যবসার পরিসর খুব বেশি না হলেও অল্প সময়ের মধ্যে অনেক ভালো পর্যায়ে যেতে পেরেছি। দিন দিন ব্যবসার পরিসর বাড়ছে। বর্তমানে আমি অর্থনৈতিকভাবে বেশ স্বাবলম্বী। তাছাড়া অনেকজনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পেরেছি। এখন আমার প্রতিষ্ঠানে ১৭০ জন নারী কর্মী কাজ করছেন। বর্তমানে ব্যবসায় প্রায় ১৫ লাখ টাকার মতো বিনিয়োগ আছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় এবং বিদেশে পণ্য সরবরাহ করি। ‘সপ্তধা পল্লী’ নামে রংপুর নগরীর ধাপে ও নীলফামারীর ডিমলায় আমার নিজস্ব দুটি শোরুম আছে। এছাড়া পণ্যের প্রচার ও প্রসার এবং বিক্রির জন্য বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠিত মেলায় অংশগ্রহণ করি।

তিনি জানান, সাধারণত বাটিক থ্রি-পিচ, ব্লক থ্রি-পিচ, হ্যান্ডপ্রিন্ট, ওড়না, ওয়ান পিচ, বিভিন্ন শিশু পোশাক, বেডশিট, কুশন কাভার, নেট কভার, ব্যাগ শো-পিচ, এক্সক্লুসিভ শাড়ি ও উপহার সামগ্রীসহ বিভিন্ন পাটের তৈরি পণ্য তৈরি করছি। সব পণ্যেরই গুণগত মান রয়েছে। 

সোনিয়া সোবহান বলেন, ‘আমরাই পারি চাওয়া-পাওয়ার সব ব্যবধান ঘোচাতে’ এই স্লোগানকে সামনে রেখেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা হয়। মূলত গ্রামীণ নারীদের নিয়ে কাজ করাই আমার মূল উদ্দেশ্য। অসহায় গ্রামীণ নারীরা যেন স্বাবলম্বী হতে পারেন সেজন্য চেষ্টা করছি। তাদের স্বার্থেই এ ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে। এছাড়া অনেক প্রতিবন্ধী নারী আমার সঙ্গে কাজ করছেন। ভবিষ্যতে আমি হিজরাদের নিয়েও কাজ করতে চাই। তাছাড়া বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের যে লাভ আসে তার পাঁচ শতাংশ দিয়ে গরিব দুঃখিদের সাহায্য করা হয়।

তিনি বলেন, আমি চাই ব্যবসার আরো প্রসার হোক। দেশের প্রতিটি জেলায় যেন আমি শোরুম দিতে পারি এবং আরো বেশি নারীর কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারি।  

সোনিয়া সোবহান বলেন, স্বাবলম্বী হয়ে বেঁচে থাকার স্বার্থকতাটাই আলাদা। তাই বলবো, একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে মাঠে নেমে পড়তে হবে। প্রতিবন্ধকতা থাকবেই, তবে ইচ্ছা থাকলে তা ওভারকাম করা সম্ভব। আপনি যে কাজ ভালো পারেন এবং আপনার কাছে যত কম টাকাই থাক না কেন, সেটা দিয়েই শুরু করুন। কারণ কাজ শুরু না করলে কেউ জানবে না যে আপনি কাজ করতে পারেন বা কাজ করতে চান। 

সোনিয়া সোবহান বলেন, একজন নারীকে ঘরের বাইরে কাজ করতে হলে অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়। প্রথমেই বাধা আসে পরিবার থেকে। এরপর সমাজ আর রাষ্ট্র তো আছেই। আমার বেলাতেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। নানা ধরনের বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে আমাকে। শুরুতে আমাকে বলা হতো তুমি পারবা না, এসব করে কোনো লাভ নেই। অনেকে জীবন এভাবে নষ্ট হয়েছে। আরও অনেক কিছু। কিন্তু আমি কখনো আত্মবিশ্বাস হারাইনি। লক্ষ্য থেকে সরে যাইনি। আত্মবিশ্বাসী ছিলাম যে, আমি কাজে সফল হবোই। 

তিনি বলেন, আমি নিজেই ব্যবসাতে বসতাম। কাঁচামাল কিনতাম। নিজেই ব্যাংক করতাম। নিজেই পাইকারি অর্ডার নিতাম। একজন নারী হয়ে দোকানে বসে ক্রেতা সামলাতাম। কিন্তু এ বিষয়গুলো কেউ ভালো চোখে দেখেনি। লোকে নানা ধরণের কথা বলতো।

তিনি আরও বলেন, প্রতিটি কাজে আমার স্বামী আমাকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছেন। সব সময় তিনি আমার পাশে থেকে সাহস জুগিয়েছেন। তার সহযোগিতায় আজ আমি এই জায়গায় আসতে পেরেছি।


জীবনযুদ্ধে থেমে নেই জয় মালা
নাম জয়মালা বেগম স্বামী মৃত হালু মিয়া। সংসারে চার মেয়ে
বিস্তারিত
সফল উদ্যোক্তা আলিয়াহ ফেরদৌসি
চেনা গণ্ডির সীমানা ভেঙে বেরিয়ে আসছেন নারীরা। কৃষিকাজ থেকে শুরু
বিস্তারিত
রংপুর তাজহাট জমিদার বাড়ি ইতিহাস-ঐতিহ্যের
রংপুর মহানগরীর  দক্ষিণ পূর্বে অবস্থিত তাজহাট জমিদার বাড়ি। রংপুর মূল
বিস্তারিত
ডায়াবেটিক প্রতিরোধে স্টেভিয়া: চিনির চেয়ে
বিরল উদ্ভিদ স্টেভিয়া এখন বাংলাদেশে পাওয়া যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায়
বিস্তারিত
কাউনিয়ায় বালু জমিতে বস্তায় বিষ
বালু জমিতে বস্তায় বিষ মুক্ত লাউ চাষ করে এলাকাবাসীকে তাক
বিস্তারিত
গফরগাঁওয়ে কেঁচো সার উৎপাদনে ভাগ্য
ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের সাবেক মেম্বার আবুল হাশেম নিজেই কেঁচো সার (ভার্মি
বিস্তারিত