পাঠ পাঠাভ্যাস ও পাঠাগার

যথেষ্ট সুযোগ থাকার পরও আমাদের দেশে কেন যে গ্রন্থাগার-পাঠাগার আন্দোলন তেমনভাবে গড়ে উঠল না এটা আমার এখনও বোধগম্য হয়নি। এখন পর্যন্ত একাডেমিক গ্রন্থ প্রকাশ করে আসছে বাংলা একাডেমি। এশিয়াটিক সোসাইটি আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ইংরেজিতে লেখা কিছু গবেষণা গ্রন্থ ও রেফারেন্স বই প্রকাশের ক্ষেত্রে হাতেগোনা কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থাই শুধু এগিয়ে এসেছে। এসব গ্রন্থের ক্রেতা সৃজনশীল গ্রন্থের চেয়ে 
তুলনামূলকভাবে কম হলেও পাঠাগার আন্দোলন গড়ে উঠলে দেশেও বাজার সৃষ্টি হতো
পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি বই পড়ে কোন দেশের মানুষ? কবুল করছি, আমিও জানতাম না। ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় যাওয়ার কারণেই জানতে পারি কোন দেশে পাঠকের সংখ্যা বেশি। সে বছরই ‘রেগানগর্বাচভের শীর্ষ সম্মেলন’ শেষবারের মতো রেইকাভিকে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ফলে আমি আয়ারল্যান্ডের প্যাভিলিয়নে ঢুকে পড়ি। আমার জন্য বিস্ময়ের ডালি নিয়ে অপেক্ষা করছিল এই সংবাদটি।  যে দেশ বেশিরভাগ সময় বরফ আর তুষারের মধ্যে থাকে, ঠান্ডা হিমাঙ্কের অনেক অনেক নিচে, সেই দেশের মানুষই নাকি সবচেয়ে বেশি বই পড়ে। ভাবা যায়?
জার্মানির কোলোন শহরে ছিলাম, ট্রামের সামান্য পথ মাটির নিচে। যাত্রীদের বেশ কিছু অংশ ঘুমাচ্ছেন বা ঝিমাচ্ছেন, কেউ খবরের কাগজ মেলে ধরেছেন চোখের ওপর আর কেউ বই পড়ছেন। পেপারব্যাক এডিশনই বেশিরভাগ। তাও গল্প-উপন্যাস। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, ক্রাইম সেক্স, জ্ঞান-বিজ্ঞানের পপুলার সিরিজের বইও চোখে পড়েছে। না, আমি পড়িনি। আমি যাত্রীদের মুখ পড়তে অধিক আগ্রহী ছিলাম বলে সারাক্ষণই চোখ-কান খোলা রাখার চেষ্টা করতাম। তবে অস্বীকার করব না, মাঝেমধ্যে আমারও ঝিমুনি রোগে পেয়ে বসত। তবে এ রকম ঘটনা খুব কমই ঘটেছে।
ঢাকা বইমেলা হয়Ñ অমর একুশে বইমেলা। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে চলে মাসব্যাপী। প্রতিটি দৈনিক কাগজ, বিভিন্ন টিভি চ্যানেল বইমেলার খবর, নতুন বইয়ের খবর, লেখকদের সাক্ষাৎকার, ক্রেতাদের উপচানো ভিড় (ছেলেরাই বেশি আসে, তবু মেয়েদেরই ছবি ছাপা হয় সাধারণত), এসবের প্রতিবেদন পাঠক এবং শ্রোতাদের চোখে পড়তে বাধ্য। মেলা উপলক্ষে প্রকাশকরাও বড় আগ্রহ নিয়ে নতুন নতুন বই প্রকাশ করার উদ্যোগ নেন। এ সময় সাধারণত বিয়ে-শাদিও বেশ হয়। ফলে বিয়ে, বউভাতই নয়, বিবাহবার্ষিকীরও ঘটা পড়ে। নিমন্ত্রণপত্রের এই দুরবস্থা কেন? সোজাসাপ্টা উত্তরÑ ঈদের ছুটি, আর একুশের জন্য ছাপাখানাগুলো রাতদিন ব্যস্ত, কী আর করা। বাহ, এরকমই তো চাই। নামি শিল্পীরা ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকতে রাজি হন না, রাজি হলেও সেই বই অন্তত বইমেলায় বেরুচ্ছে না, এসব অবশ্যই আনন্দের সংবাদ। সরকার স্কুল-কলেজের জন্য বই কিনছে, বিদেশি সংস্থা বই কেনার জন্য টাকা দিচ্ছে, এসব আগে কল্পনাও করা যেত না। বইয়ের প্রচার-প্রসার এবং গ্রন্থ প্রকাশনা শিল্পের বিকাশের জন্য এর চেয়ে খুশির আর কী থাকতে পারে?
এরপরও বলতে রীতিমতো লজ্জাই লাগছে, বই পড়ার অভ্যাস আমাদের দেশে এতসবের পরেও নাকি একদম কমে গেছে। নিজের অভিজ্ঞতার কথা রুচির সমর্থন না থাকার পরেও বলছি, আমারও তাই ধারণা। প্রত্যেক মাসে অন্তত চার-পাঁচশ টাকার বই তো কিনতামই, বইমেলায় কম করেও হাজার দুয়েক টাকার বই। লেখক-বন্ধুদের কাছ থেকে পাওয়া উপহার। আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহটি এতবার বাসাবদলের পর, এত খোয়া যাওয়ার পরও নিতান্ত কম নয়। তবে পড়ার চেয়ে দেখাশোনার প্রবণতা আমাদের ঘরে অনেক বেশি। হিন্দি সিরিয়াল, কার্টুন, মারপিট মার্কা ছায়াছবি, বিজ্ঞানের কল্পকাহিনী এসব তো টিভির ব্যাপার। ছোট ছেলে পাঠ্যবইয়ের বাইরে কম্পিউটার মাউস নিয়ে ব্যস্ত। আমিও রাত জেগে বেশিরভাগ সময় টিভি সেটের সামনেই বসে বসে ঝিমুই। এক সময় ঠিক উল্টোটা ঘটত, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বা হুমায়ূন আহমেদের বই আনলে কে আগে পড়বে এ নিয়ে বেশ মাতামাতি হতো। আমার ফুপুকে দেখতাম দুপুরের খাওয়া শেষ করে একটা উপন্যাসের পাতায় চোখ বোলাতে বোলাতে ঘুমিয়ে পড়তেন। ফুপার হাতে থাকত আজাদ পত্রিকা। মেজদা মাঝেমধ্যে আনতেন ইত্তেফাক, সে সময় আমরাও হুমড়ি খেয়ে পড়তাম। আমার প্রিয় পাতা ছিল সাহিত্যের পাতা আর রূপবাণী।
ছোটবেলায় পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরি দেখতাম। কলতাবাজারে, সেই সাতচল্লিশের ঢাকায় একটি লাইব্রেরি ছিল। সেখানে বিকালের দিকে বেশ ভিড় হতো। বিয়ে, জন্মদিন এসব উৎসবে বই উপহার দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। ভ- প্রাচুর্যের সমাজে বই উপহার দেওয়াটা একেবারেই উঠে গেছে। বিদেশি পণ্য উপহার পাওয়া এবং দেওয়া এখন রেওয়াজ। আঙ্কেল-আন্টি কালচারের যুগে, ফাস্টফুড কালচারের দাপটে ও আকাশ সংস্কৃতির প্রতাপে আমাদের সমাজের বেশ কিছু ভালো ভালো রেওয়াজ-রসম উঠে যাচ্ছে তা বোঝাই যাচ্ছে। যতটা মনে পড়ে আমাদের গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে এবং পরে আরমানিটোলা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে আমরা পাঠাগার ব্যবহার করতে পারতাম। গ্রামের হাইস্কুলে এই সুযোগটা না পেলেও ব্রজমোহন কলেজের পাঠাগার ছিল একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার এবং গ্রন্থাগারিক ছিলেন পাঠকবৃদ্ধিতে যথেষ্ট উৎসাহী। ত্রিশের যুগের উপন্যাস, ছোটগল্প এবং কবিতা পড়ার সুযোগ পেয়েছিলাম পঞ্চাশের সেই শেষের দিকের বছরগুলোতে। শান্ত এবং বাকসংযমী শিক্ষানুরাগী এই মানুষটিকে কৃতজ্ঞতা জানানোর সুযোগ আমার হয়নি।
যথেষ্ট সুযোগ থাকার পরও আমাদের দেশে কেন যে গ্রন্থাগার-পাঠাগার আন্দোলন তেমনভাবে গড়ে উঠল না এটা আমার এখনও বোধগম্য হয়নি। এখন পর্যন্ত একাডেমিক গ্রন্থ প্রকাশ করে আসছে বাংলা একাডেমি। এশিয়াটিক সোসাইটি আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ইংরেজিতে লেখা কিছু গবেষণা গ্রন্থ ও রেফারেন্স বই প্রকাশের ক্ষেত্রে হাতেগোনা কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থাই শুধু এগিয়ে এসেছে। এসব গ্রন্থের ক্রেতা সৃজনশীল গ্রন্থের চেয়ে তুলনামূলকভাবে কম হলেও পাঠাগার আন্দোলন গড়ে উঠলে দেশেও বাজার সৃষ্টি হতো। রফতানির ক্ষেত্রে আমাদের আগ্রহ বোধ হয় আরও কম। নইলে আমাদের দেশের কিছু কিছু ভালো বই দেশের বাইরের যার চাহিদা আছে পেশাদার ভিত্তিতে এগিয়ে এলে বিলক্ষণ সুবিধা পাওয়া যেত।
কলকাতা বা দিল্লির বইমেলায় যাওয়ার সুযোগ আমার না হলেও ভারতের নামিদামি প্রকাশকদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছে দু-একবার। পেশাদারি মনোভাব, অভিজ্ঞতা বিনিময়ে আগ্রহ এবং সমৃদ্ধ তথ্যভা-ার নিয়ে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ভারতের প্রকাশনী ব্যবসা শক্ত পায়ের ওপর দাঁড়াতে পেরেছে। আমাদের সম্ভাবনাও কম নয়। কিন্তু অদৃশ্য কারণে কোনো কোনো প্রকাশনা সংস্থা ব্যবসা পরিবর্তনে ডাইভার্সিটিতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এটা কোনো ভালো অবস্থার পরিচয় বহন করছে না। আজিজ সুপার মার্কেট, নিউমার্কেট, বাংলাবাজার এসব এলাকায় একটু ঘোরাফেরা করলেই টের পাওয়া যায় পুস্তক প্রকাশনা শিল্পের হাল-হাকিকত। গালে হাত দিয়ে বসে থাকা দোকান-কর্মচারীর চেহারাটিই বর্তমান অবস্থার একটি ফ্লাশ মানচিত্র। আমাদের ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে গর্ব করার নিশ্চয় অনেক কিছু আছে। এর কৃতিত্ব বিভিন্ন ঔপনিবেশিক পরিবেশে অগ্রজ লেখক ও পাঠকদের পৃষ্ঠপোষকতা। বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির এই অগ্রগতির যুগে প্রিন্ট মিডিয়া অনুন্নত দেশে একটু-আধটু হুমকির মুখে পড়লেও আমরা আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হলে মেঘের আড়ালের সূর্যের অস্তিত্ব অনায়াসে অনুভব করা যাবে। 


সংরক্ষিত বনের কাঠমৌর, কুচকুচি ও
বাংলাদেশে প্রাকৃতিক বন বলে প্রায় কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। ফোকলা
বিস্তারিত
প্রকাশ পেয়েছে ‘জীবনানন্দ’
জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে চর্চার পত্রিকা ‘জীবনানন্দ’ প্রকাশিত হয়েছে। এর সম্পাদক
বিস্তারিত
স্ট্যাটাস
ধর্মও উঠে এসেছে ফেসবুকের নীল পর্দায় হায় সেলুকাস! এতে সওয়াব
বিস্তারিত
হানযালা হান যাদুর বাক্স
  মাঝেমধ্যে হতাশ হয়ে পড়ি, শিল্প খুব ধীর গতির মাধ্যম, ধরা
বিস্তারিত
মনে নেই
আসাদ চৌধুরী মনে নেই আছাড়-পিছাড় খেতে-খেতে হাঁটু তুষার মাড়িয়ে যখন ছুটছি,
বিস্তারিত
এজমালি শরৎ
হাবীবুল্লাহ সিরাজী এজমালি শরৎ পুরানো ঘাসে নতুন মেঘ ওড়ে বৃষ্টি হাঁচে
বিস্তারিত