মওলানা রুমির মসনবি শরিফ

রাজত্বের চেয়ে প্রিয়তম যে সিজদা

হজরত সোলাইমান (আ.) এর রাজত্ব ছিল মানব-দানব, পশুপক্ষীর ওপর। একদা সফরে সেনাদলের নিয়মিত হাজিরায় দেখেন পক্ষী বাহিনীর সদস্য হুদহুদ নেই। হুদহুদ বাংলায় হলুদবরণ কাঠঠোকরা। তিনি বললেন, কী ব্যাপার হুদহুদকে দেখছি না যে, নাকি সে গরহাজির? এই অপরাধের জন্য উপযুক্ত কারণ দর্শাতে হবে, নচেৎ আমি তাকে কঠিন শাস্তি দেব কিংবা সর্বোচ্চ শাস্তিতে জবাই করে ফেলব। হুদহুদ এসে কৈফিয়তের সুরে বলল, হে আল্লাহর নবী! আমি আকাশ থেকে মাটির গভীরে পানির উৎস সন্ধান করতে গিয়ে ‘সাবা’ নামক এক জনপদে উপনীত হলাম। যেখানকার শাসক একজন নারী এবং তারা সূর্য পূজা করে। সোলাইমান (আ.) হুদহুদ মারফত একটি পত্র পাঠালেন সাবার রানি বিলকিসের কাছে। বিলকিস চিঠি পেয়ে সভাসদদের পরামর্শ চাইলেন। তারা রানির নির্দেশে যুদ্ধক্ষেত্রে জান বাজি রাখার প্রত্যয় ঘোষণা করল। বিচক্ষণ রানি বললেন, আগে আমাকে যাচাই করতে দাও চিঠির প্রেরক বাদশাহ সোলাইমান কী দুনিয়াদার সাধারণ বাদশাহ? তাহলে তার মোকাবিলা করে আমরা বিজয়ী হতে পারব। আর যদি অন্যরকম হয়, তাহলে সেই অনুসারে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। 
বিলকিস স্বর্ণের কয়েকটি ইট ও একশ দাসদাসীসহ একটি প্রতিনিধি দল পাঠালেন। বিলকিসের দূতরা খুশিতে টগবগ, অমূল্য উপঢৌকন নিয়ে তারা যাচ্ছে সোলাইমান বাদশাহর দরবারে। সোলাইমান (আ.) তাদের আগমনের সংবাদ জানতে পেরে জিনদের আদেশ দেন, শহরের অলিগলি, মাঠপ্রান্তর, বাড়িঘর স্বর্ণের আস্তরণে ছেয়ে দাও। বিলকিসের দূতরা সোলাইমান (আ.) এর রাজ্যের সীমানায় পা রেখেই হতবাক। শীতের দেশে বরফের আস্তরণের মতো স্বর্ণ আর স্বর্ণের আলোক সজ্জায় জ্বলমল করছে সারা দেশ। পরিস্থিতি দেখে তারা কয়েকখানি স্বর্ণের ইট নিয়ে সোলাইমান বাদশাহর দরবারে যেতে লজ্জায় জড়োসড়ো হলো। অনেক ভেবেচিন্তে অবশেষে রাজদরবারে হাজির হলো।  
অনাড়ম্বর আনুষ্ঠানিকতার পর হজরত সোলাইমান (আ.) রানি বিলকিসের দূতদের বললেন, তোমরা তোমাদের আনীত উপহার নিয়ে বিলকিসের কাছে যাও। কারণ এই উপঢৌকন ফিরিয়ে নেওয়া তোমাদের জন্য রেখে যাওয়ার চেয়ে উত্তম। আসার পথে স্বর্ণের প্রান্তর, রাস্তাঘাট আরও যাকিছু দেখেছ ফিরে গিয়ে বিলকিসকে বল। যাতে বিলকিস বুঝতে পারে আমি স্বর্ণ-রৌপ্যের জন্য লালায়িত বাদশাহ নই। কারণ স্বর্ণের যিনি স্রষ্টা সরাসরি তার কাছ থেকেই স্বর্ণ লাভ করেছি।  
আঁকে গর খা’হাদ হামে খা’কে যমীন 
সরবসর যর গর্দদ ও দুররে সমীন
তিনি যদি চান তাহলে মাটির এই জমিন
সর্বত্র স্বর্ণে রূপান্তর হবে মূল্যবান রতœমণি। 
আমার প্রয়োজন নেই স্বর্ণের। স্বর্ণ বানানোর শিল্প আমার আয়ত্তে। আমি তো পরশপাথর দিয়ে মাটির মানুষকে স্বর্ণে পরিণত করি। আমি কি তোমাদের কাছে স্বর্ণের জন্য লালায়িত হতে পারি? কখনও না। আমি তোমাকেও স্বর্ণনির্মাতা রসায়নবিদ বানাতে পারি। তোমাকে এমন স্তরে পৌঁছাতে পারি, যেখান থেকে কারও স্বর্ণ-রৌপ্যের প্রতি তোমার মুখাপেক্ষী হতে হবে না। বরং নিজেই হবে স্বর্ণের নির্মাতা। তাকে আরও বলবে, এর জন্য শর্ত হচ্ছে, সাবার রাজত্ব তাকে ত্যাগ করতে হবে। তাহলে অন্যজগতের রাজত্ব তাকে হাতছানি দেবে। তাকে বলবে, মাটি ও পানির গড়া দুনিয়ার এই জগতের বাইরে আরও জগৎ আছে। বস্তুগত রাজত্বের ওপারে আছে আধ্যাত্মিক রাজত্বের সালতানাত।
তখত বন্দাস্ত আনকে তখতশ খা’ন্দেয়ী
সদর পিন্দা’রি ওয়া বর দর মা’ন্দেয়ী
তুমি যাকে ভেবেছ সিংহাসন কারাগারের চেয়ে নয় বেশি
নিজেকে ভাবো সভাপতি, জায়গা তোমার পেছনে সারি।
বাদশা’হী নীস্তাত বর রীশে খাওয়দ
পা’দশা’হী চোন কুনি বর নেক ও বদ
তোমার রাজত্ব চলে না তোমার দাড়ির ওপর
কীভাবে রাজত্ব করবে ভালো-মন্দ লোকের ওপর?
বী মুরাদে তো শওয়াদ রীশে তো সফীদ
শর্ম দা’র আয রীশে খোদ আই কয উমীদ
তোমার অনিচ্ছায় তোমার দাড়ি সাদা হয়ে যায়
তোমার দাড়ির কাছেই দেখ তুমি লজ্জায় অসহায়।
বস্তুজগতের যিনি মালিক, তিনি এমন প্রভু, তাঁর আদেশ-নিষেধের সামনে যে-কেউ মাথা নত করবে তাকে তিনি এই জগতের বাইরের শত শত জগতের সালতানাত দান করবেন। এই সালতানাত কোথায় পাওয়া যায়। নিশ্চয়ই নামাজে সিজদার ভুবনে।
লে কে যওকে সাজদেয়ী পীশে খোদা’
খোশতর আ’য়দ আয দো সদ দওলত তোরা
কিন্তু আল্লাহর সমীপে একটি সিজদার প্রেরণার স্বাদ পেলে
দুইশ রাজত্ব সালতানাতের চেয়ে প্রিয়তর হবে তোমার কাছে।
নিষ্কলুষ মনে গভীর নিষ্ঠায় যদি আল্লাহর সমীপে একটি সিজদা দিতে পার, তাহলে তা তোমার জন্য দুইশ রাজত্বের চেয়ে উত্তম ও সুপ্রিয় হবে। যখন তুমি সত্যিকার সিজদা করার স্বাদ অনুভব করবে,
পস বেনালী কে নখা’হাম মুলকহা’
মুলকে আ’ন সাজদা মুসল্লম কুন মেরা’
তখন কেঁদে কেঁদে বলবে, প্রভু হে আমি চাই না রাজত্ব
সিজদায় তোমার সমীপে লুটানোর সৌভাগ্য করো নিশ্চিত। 
শহুরে জীবনে বাড়ির ছাদে উঠে পূর্ণিমার চাঁদের জ্যোৎস্নায় স্নাত হওয়ার ফুরসত অনেকের নেই। দুনিয়ার বাদশাহরাও শুধু রাজ্যের পেছনে, বস্তুর সন্ধানে দৌড়ায়। অন্তরে কালিমার প্রভাবে আল্লাহর ইবাদত ও বন্দেগির স্বাদ থেকে তারা বঞ্চিত। তারা যদি আল্লাহর ইবাদত ও বন্দেগির মর্ম বুঝতে পারত, তাহলে ইবরাহিম আদহামের মতো বলখের রাজত্বের মোহমায়া পদদলিত করত। তবে জগৎ ও জীবনের ব্যবস্থাপনার স্বার্থে আল্লাহ তাদের চোখে ও মুখে মোহর লাগিয়ে দিয়েছেন। ফলে আধ্যত্মিকতার ঐশ্বর্য তারা চোখে দেখে না, তার স্বাদ অনুভব করতে পারে না।  
হয়তো কারও মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, দুনিয়ার রাজত্বের চেয়ে পূর্ণ নিষ্ঠায় সমর্পিত সিজদার স্বাদ উত্তম কীভাবে হতে পারে? মওলানা রুমি বলেন, তুমি যদি মানুষের কাছ থেকে নানা কৌশলে অঢেল সম্পদের মালিক হও, তোমার সম্পদ যদি রাশি রাশি বালুর চেয়েও অধিক হয়, অবশেষে সেই সম্পদ রাজত্ব তোমাকে ছেড়ে যেতে হবে। অন্যের  মালিকানায় স্থানান্তরিত হবে। তোমার সম্পদ ও রাজত্ব সবসময় তোমার সঙ্গী হয়ে থাকবে না। মৃত্যুর পরও যা তোমার সঙ্গে থাকবে, তাহলো নিষ্কলুষ ইবাদত, আল্লাহর সমীপে সিজদার মহিমা। কাজেই দুনিয়ার সম্পদ দান কর, আখেরাতের সম্পদ গড়। দানের মাধ্যমে চোখের জন্য সুরমা জোগাড় কর, যাতে তোমার আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রখর হয়। 
সেই দৃষ্টিভঙ্গি লাভ করতে পারলেই বুঝতে পারবে, এই দুনিয়া হলো একটি সংকীর্ণ কুয়া। সেই কুয়ায় তুমি নিক্ষিপ্ত হয়েছ। এখানে হজরত ইউসুফের মতো শক্ত হাতে রশি ধরার চেষ্টা কর। দুনিয়ার বস্তুতন্ত্রের মোহের কূপ থেকে বেরিয়ে আসার পর রুহের জগৎ থেকে তোমাকে বলা হবে, ‘ইয়া বুশরা হাজা গোলামুন’ কি চমৎকার এই যে বালক। যতদিন দুনিয়ার কূপে থাকবে তোমার দৃষ্টিবিভ্রম ঘটবেই। বস্তুকে তার প্রকৃত স্বরূপে দেখতে পাবে না। এর ন্যূনতম একটি দৃষ্টান্ত হলো, পাথরকে মনে হবে মূল্যবান স্বর্ণখ-। শিশুদের খেলনার মতো। শিশুরা মাটির পাত্রের ভাঙা টুকরা হলুদবরণ হলে বলে স্বর্ণমুদ্রা। খাকি রঙের হলে  রুপার মুদ্রা। তা নিয়ে মিছামিছি খেলার আসরে লেনদেন করে, আরও  আরও জোগাড় করে। যারা দুনিয়ার সন্তান, বস্তুর পূজারি তারাও শিশুদের খেলনারূপে দুনিয়ার ধনসম্পদ নিয়ে মত্ত থাকে। সম্পদ জোগাড়ের প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে। এর পেছনে মূল্যবান হায়াত উজাড় করে দেয়। কিন্তু যারা আরেফ, আল্লাহর পরিচয় লাভে ধন্য, জগৎ ও জীবনের রহস্যজ্ঞানী তারা স্বর্ণ-রৌপ্যের পেছনে জীবন উজাড় করে না। তারা রসায়নবিদ, তুচ্ছ অবহেলিত জীবনকে পরশপাথরের ছোঁয়ায় স্বর্ণ ও রৌপ্যে সজ্জিত, সমুন্নত মানবীয় মূল্যবোধে রূপান্তরিত করতে পারেন। এ কারণেই স্বর্ণ ও রুপার খনি তাদের কাছে তুচ্ছ ও মূল্যহীন। 

(মওলানা রুমির মসনবি শরিফের গল্প, 
৪খ. বয়েত-৬৫৩-৬৭৭)


আদর্শ শিক্ষকের দায়িত্ব ও মর্যাদা
শিক্ষকতা পেশা হলো পৃথিবীর সমুদয় পেশার মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট ও শ্রেষ্ঠ।
বিস্তারিত
আত্মহত্যা প্রতিরোধে ইসলাম
জাতীয় পর্যায়ে আত্মহত্যা রোধ করতে হলে অবশ্যই জাতীয় পর্যায়ে প্রত্যেকটি
বিস্তারিত
ব্রয়লার মুরগিতে সচেতনতা জরুরি
মুরগির ফার্ম এখন সারা দুনিয়ায়। এর সংখ্যা এতই বিপুল যে,
বিস্তারিত
পারিবারিক বন্ধন অটুট রাখুন
স্ত্রীর কোনো কিছু অপছন্দ হলে স্বামী ধৈর্য ধরবে। একে অপরকে
বিস্তারিত
উম্মতের শ্রেষ্ঠ আমানতদার আবু উবাইদা (রা.)
রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘প্রত্যেক জাতির আমানতদার ব্যক্তি আছে। এই
বিস্তারিত
ঈমান ও আমলের পুরস্কার
মোমিনমাত্রই বিশ্বাস করে পরকালকে। পরকাল মানে পার্থিব জীবনান্তে যেখানে মানুষ
বিস্তারিত