পশু কোরবানিতে দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ

ইসলামি জীবনবিধানের প্রত্যেক দিকনির্দেশনা পালনে দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ লাভ করা যায়। এজন্যই আল্লাহ তায়ালা কোরআনে তাঁর বান্দাকে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ লাভের শিক্ষা দিয়েছেন। ইসলামি বাহ্যিক বিধিবিধানের মধ্যে পশু কোরবানি অন্যতম। হিজরি বছরের জিলহজের ১০ তারিখ ঈদুল আজহা পালিত হয়। ঈদ অর্থ বারবার ফিরে আসা। আজহা শব্দের অর্থ কোরবানি করা। ঈদুল আজহা হচ্ছে, যে দিনে আল্লাহর উদ্দেশ্যে ও নৈকট্য লাভের আশায় নির্দিষ্ট পশু কোরবানি করা হয়। ঈদুল আজহার প্রধান কাজ হচ্ছে ঈদের নামাজ আদায়ের পর আল্লাহর উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি করা। ১০ জিলহজ ও পরবর্তী দুই দিনও আল্লাহর উদ্দেশ্যে এ পশু কোরবানি করা যায়। এ কোরবানির উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য সম্পর্কে আয়েশা (রা.) থেকে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কোরবানির দিন মানুষ যে কাজ করে তার মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় হচ্ছে রক্ত প্রবাহিত করা তথা কোরবানি করা। কেয়ামতের দিন তা নিজের শিং, পশম, ও ক্ষুরসহ হাজির হবে। তার (কোরবানির পশুর) রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদায় পৌঁছে যায়। অতএব তোমরা অনন্দচিত্তে কোরবানি করো।’ (তিরমিজি)। এ কোরবানির মাধ্যমে আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা করা হয় ও মনের পশুত্বকে দমন করে তাঁর নৈকট্য লাভ করা যায়। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোরবানি নির্ধারণ করেছি, যাতে তারা আল্লাহর দেওয়া চতুষ্পদ জন্তু জবাই করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। তোমাদের ইলাহ একমাত্র আল্লাহ, সুতরাং তারই আজ্ঞাধীন থাক এবং বিনয়ীদের সুসংবাদ দাও।’ (সূরা হজ : ৩৪)। এ দিনে একমাত্র আল্লাহর জন্যই তাঁর বান্দা পশু কোরবানি করে থাকে; কিন্তু এর মাধ্যমে তারা পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দিক দিয়ে লাভবান হয়ে থাকে। কোরবানিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হয়ে থাকে। কেননা এ সময় এ দেশে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়ে থাকে। এর মাধ্যমে রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয় ও রিজার্ভ বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। যার কারণে জিডিপিতে প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পায়। প্রতি বছর দেশে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ পশু জবাই হয়ে থাকে, যার ৬০ শতাংশ হয় কোরবানির সময়। আর এ পশুর ৭০ শতাংশ দেশের বিভিন্ন পশু লালনপালন কেন্দ্রে থেকে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। আর ৩০ শতাংশ ভারত থেকে আমদানি করা হয়। প্রতিটি পশুর শুল্ক ৫০০ টাকা হলে, শুল্ক আদায় হয় প্রায় ২০০ কোটি টাকা। এ পশুগুলো কোরবানি হওয়ার আগ পর্যন্ত কয়েকবার হাতবদল হয়ে থাকে, যার প্রতিটি ধাপেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আর্থিকভাবে লাভবান হয়ে থাকেন। প্রতি বছর কোরবানিকে কেন্দ্র করে দেশে প্রায় ১ হাজার পশুর হাট বসে থাকে। যার থেকে ইজারাদার, পশুখাদ্য সরবরাহকারী ও জবাইয়ের সরঞ্জামের আঞ্জামদানকারীরাও আর্থিকভাবে লাভবান হন। কোরবানির দিন পশু জবাইয়ের সহায়তাকারী কসাইরাও তাদের পারিশ্রমিক হিসেবে আর্থিকভাবে লাভবান হয়ে থাকেন। আল্লাহর বান্দারা তাঁর নির্দেশে কোরবানির পশুর গোশত নিজেরা খাওয়ার পাশাপাশি আত্মীয় ও গরিবদের মাঝে বিতরণ করে থাকে। যার মাধ্যমে তাদের খাদ্য ও আমিষের চাহিদা পূরণ হয়ে থাকে। কোরবানির জবাইকৃত পশুর গোশত খাদ্য হিসেবে গ্রহণ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেনÑ ‘অতঃপর যখন তারা কাত হয়ে পড়ে যায়, তখন তা থেকে তোমরা আহার করো এবং আহার করাও যে কিছু যাঞ্চা করে না তাকে এবং যে যাঞ্চা করে তাকে। এভাবে আমি এগুলোকে তোমাদের জন্য বশীভূত করে দিয়েছি, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।’ (সূরা হজ : ৩৬)। এ পশুর গোশত রান্নার জন্য এ সময় মশলা বাবদ দেশে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়ে থাকে। কোরবানির পশুর গোশত সংরক্ষণ করার জন্য প্রচুর রেফ্রিজারেটর বিক্রি হয়ে থাকে, যার মাধ্যমে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানসহ গ্রাহক পর্যন্ত প্রত্যেক শ্রেণিই আর্থিকভাবে লাভবান হয়ে থাকে। আল্লাহর বিধান অনুযায়ী কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রয়লব্ধ টাকা ফকির-মিসকিনদের মাঝে বিতরণ করা হয়। কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করণে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ও ব্যবসা হয়ে থাকে। পশুর চামড়া বিভিন্নভাবে ব্যবহার হয়ে থাকে। আর এ চামড়া ব্যবহারোপযোগী হওয়ার আগ পর্যন্ত তা দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে, যার প্রতিটি ধাপেই আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, বছরে চামড়া রপ্তানি করে প্রায় ৭৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। যার ৬০ শতাংশ কোরবানির পশুর মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। এভাবে কোরবানির মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে দুনিয়া ও আখেরাত কল্যাণ লাভ কারা যায়। আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেকের কোরবানি কবুল করুন। 

লেখক : সিনিয়র লেকচারার, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, উত্তরা ইউনিভার্সিটি


পরস্পর দয়া প্রদর্শনে উপদেশ দিন
উসামা বিন জায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবীজির মেয়ে
বিস্তারিত
যিনি ধনীদের মধ্যে সর্বপ্রথম জান্নাতে
আবদুর রহমান বিন আউফ (রা.) এর স্মৃতি জর্দানের রাজধানী আম্মানের উত্তরের
বিস্তারিত
কীভাবে বুঝবেন আল্লাহ আপনার প্রতি
আল্লাহর সন্তুষ্টি প্রতিটি বিশ্বাসী হৃদয়ের একান্ত চাওয়া। কিন্তু কীভাবে বুঝবেন
বিস্তারিত
আল্লাহর অন্যতম নেয়ামত মাছ
প্রকৃতিজুড়ে এখন চলছে হেমন্তের রাজত্ব। নতুন ধানের নবান্ন উৎসবের পাশাপাশি
বিস্তারিত
রূপে ভরা হেমন্ত
প্রকৃতিতে শীতের আগমনী বার্তা বয়ে নিয়ে এসেছে হেমন্ত। শিশির বিন্দু
বিস্তারিত
প্রাণীবন্ধু গাসসান রিফায়ি
টানা ৩০ বছর বাইতুল মুকাদ্দাস চত্বরের বিড়াল ও পাখিদের খাবার
বিস্তারিত