কোরবানির বিধিবিধান

‘কোরবানি’ অর্থÑ নৈকট্য, সান্নিধ্য, উৎসর্গ। ঈদুল আজহার দিনগুলোতে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট পশু জবাই করাকে ‘কোরবানি’ বলা হয়। কোরবানির বিধান আদম (আ.) এর যুগ থেকেই চলে এসেছে। তবে বর্তমানে প্রচলিত কোরবানির গোড়াপত্তন করেন ইবরাহিম (আ.)। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি তার (ইসমাইলের) পরিবর্তে জবাই করার জন্য দিলাম এক মহান জন্তু। আর আমি এ বিষয়টি পরবর্তীদের মধ্যে রেখে দিয়েছি। (সূরা সাফফাত : ১০৭-১০৮)।

কোরবানি করা ওয়াজিব। মহান রাব্বুল আলামিন তাঁর রাসুলকে কোরবানি করার নির্দেশ দিয়েছেন। এরশাদ হয়েছে, ‘তুমি তোমার রবের উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ো ও কোরবানি করো।’ (সূরা কাউসার : ২)। রাসুল (সা.) বলেন, ‘সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।’ (ইবনে মাজাহ : ৩১২৩)। 
কোরবানির ফজিলত সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেন, ‘কোরবানির দিন কোরবানি করাই সবচেয়ে বড় ইবাদত।’ (তিরমিজি : ১৪৯৩)। অন্যত্রে এরশাদ করেন, ‘কোরবানির পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে এক একটি করে নেকি দেওয়া হয়।’ (মুসনাদে আহমাদ : ১৯২৮৩)।
যার ওপর কোরবানি ওয়াজিব : প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্কসম্পন্ন, মুকিম, মুসলিম নারী-পুরুষ ১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের ভেতরে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব। (আল মুহিতুল বুরহানি : ৬/৮৫, আলমগিরি : ৫/২৯২)।
দরিদ্র ব্যক্তির কোরবানি : দরিদ্র ব্যক্তি কোরবানির নিয়তে কোনো পশু ক্রয় করলে তার ওপর তা কোরবানি করা ওয়াজিব হয়ে যায়। (বাদায়েউস সানায়ে : ৪/১৯২)।
কোরবানির সময় : ১০ জিলহজ ঈদের নামাজের পর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত মোট তিন দিন ও দুই রাত কোরবানি করা যায়। তবে ১০ জিলহজ ও দিনে কোরবানি করা উত্তম। আর কোরবানির দিনগুলোতে কোরবানি করা সম্ভব না হলে ক্রয়কৃত পশু বা কোরবানির মূল্য সদকা করে দিতে হবে। (বোখারি : ৫৫৪৫, আলমগিরি : ৫/২৯৫-২৯৭, আদ্দুররুল মুখতার : ৬/৩২০-৩২১)। 
কোরবানির পশু : চান্দ্রমাস হিসাবে পূর্ণ পাঁচ বছর বয়সের উট, দুই বছরের গরু ও মহিষ এবং এক বছরের ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা দ্বারা কোরবানি করা যায়। তবে ভেড়া ও দুম্বা যদি সর্বনিম্ন ছয় মাস বয়সের হয়েও এক বছরের মতো হৃষ্টপুষ্ট মনে হয়, তাহলে তা দ্বারাও কোরবানি করা জায়েজ। (কাজিখান : ৩/৩৪৮, আলমগিরি : ৫/২৯৭)।
শরিকের মাসায়েল : ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দ্বারা কোরবানি দিলে একা দিতে হবে; কেউ শরিক হতে পারবে না। আর উট, গরু ও মহিষে সর্বোচ্চ সাতজন শরিক হতে পারবে। সাতের কম যে-কোনো সংখ্যায় কোরবানি করা জায়েজ। কোরবানির পশুতে আকিকার অংশ নেওয়া জায়েজ আছে। (মুসলিম : ১৩১৮; কাজিখান : ৩/৩৪৯; বাদায়েউ সানায়ে : ৪/২০৯)।
কোনো শরিকের নিয়ত গোশত খাওয়া, লোকদেখানো বা অধিকাংশ উপার্জন হারাম হলে কারও কোরবানি হবে না। (শামি : ৬/৩২৬)।
কোরবানির পশু ক্রয়ের সময় শরিক রাখার নিয়ত ছিল না, পরে শরিক গ্রহণ করতে চাইলে ক্রেতা ধনী হলে শরিক করতে পারবে, অন্যথায় পারবে না। (কাজিখান : ৩/৩৫০-৩৫১; বাদায়েউস সানায়ে : ৪/২১০)।
কোরবানির উত্তম পশু : কোরবানির পশু হৃষ্টপুষ্ট হওয়া উত্তম। (মুসনাদে আহমাদ : ৬/১৩৬; আলমগিরি : ৫/৩০০; বাদায়েউস সানায়ে : ৪/২২৩)।
কোরবানির পশুর স্বাস্থ্যগত অবস্থা : অন্ধ, কানা, এক চোখ নষ্ট, ল্যাংড়া বা এমন রগ্ণ ও দুর্বল পশু, যা জবাইয়ের স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না এবং পাগল পশু, যা ঘাস-পানি খায় না, অনুরূপভাবে যে পশুর কোনো অঙ্গ এক-তৃতীয়াংশ বা তার বেশি কেটে গেছে এবং যার এত বেশি দাঁত পড়ে গেছে যে, ঘাস বা খাদ্য চিবাতে পারে না, যে পশুর শিং একেবারে গোড়া থেকে ভেঙে গেছেÑ এগুলো দ্বারা কোরবানি সহিহ হবে না। (তিরমিজি : ১৪৯৭-১৪৯৮; বাদায়েউস সানায়ে : ৪/২১৪-২১৬; আলমগিরি : ৫/২৯৭-২৯৯)। 
কোরবানির পশুর বয়স পূর্ণ হয়েছে বলে বিক্রেতা স্বীকার করে এবং পশুর শরীরের অবস্থা দেখেও তাই মনে হয়, তাহলে তার কথা ওপর নির্ভর করে পশু কেনা ও তা দ্বারা কোরবানি করা যাবে। (আহকামে ঈদুল আজহা, মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) : ৫)।
কোরবানির পশু কেনার পর তা থেকে উপকৃত হওয়া জায়েজ নয়। উপকৃত হলে তার মূল্য সদকা করে দিতে হবে। (ফাতাওয়া আলমগিরি : ৫/৩০০)।
গর্ভবতী পশুর কোরবানি : গর্ভবতী পশু কোরবানি করা জায়েজ। জবাইয়ের পর বাচ্চা জীবিত পাওয়া গেলে তাকেও জবাই করে দিতে হবে। তবে প্রসবের সময় আসন্ন হলে সে পশু কোরবানি করা মাকরুহ। আর কোরবানির পশু বাচ্চা দিলে জীবিত সদকা করে দেওয়া উত্তম। বাচ্চাকে জবাই করলে তার গোশত সদকা করে দেবে। (কাজিখান : ৩/৩৪৯-৩৫০; রদ্দুল মুহতার : ৬/৩২৩; আলমগিরি : ৫/৩০১)। 
পশু জবাই : কোরবানির পশু ধারালো অস্ত্র দ্বারা নিজে জবাই করা উত্তম। (মুসলিম : ১৯৬৭)। জবাইয়ের পর পশু নিস্তেজ হওয়ার আগে চামড়া খসানো বা অন্য কোনো অঙ্গ কাটা মাকরুহ। 
কোরবানির গোশত বণ্টন : কোরবানি শরিকানা হলে ওজন করে গোশত বণ্টন করতে হবে। (আদ্দুররুল মুখতার : ৬/৩১৭)।
ঈদুল আজহার প্রথম দিন সর্বপ্রথম নিজ কোরবানির গোশত দিয়ে খানা শুরু করা সুন্নত। কোরবানির গোশত তিন ভাগ করে এক ভাগ নিজের জন্য, এক ভাগ গরিবদের জন্য আর এক ভাগ আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীকে দেওয়া উত্তম। তবে মান্নত কোরবানির গোশত নিজে এবং কোনো ধনী খেতে পারবে না। (মুসলিম : ৪৯৯৮; তিরমিজি : ১/১২০; আলমগিরি : ৫/২৯৫, ৩০০)।
কোরবানির গোশত, চর্বি, হাড় ইত্যাদি বিক্রি করা বা পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া জায়েজ নয়। অবশ্য ঘরের অন্যান্য সদস্যদের মতো কাজের লোকদেরও গোশত খাওয়ানো যাবে। কোরবানির গোশত ভিন্ন ধর্মাবলম্বীকে দেওয়া জায়েজ। (আহকামুল কুরআন জাসসাস : ৩/২৩৭; আলমগিরি : ৫/৩০০)।
কোরবানির চামড়া : কোরবানির চামড়া পরিশোধন করে নিজে ব্যবহার করবে বা কাউকে দান করে দেবে। অবশ্য বিক্রি করলে বিক্রীত মূল্য সদকা করে দেওয়া ওয়াজিব। (হিদায়া : ৪/৪৫০; আলমগিরি : ৫/৩০১)।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আম্বরশাহ আল ইসলামিয়া, কারওয়ানবাজার, তেজগাঁও, ঢাকা


ইসলামে নারীর অর্থনৈতিক অধিকার
ইসলামের আগমনের আগে গোটা পৃথিবী নারী জাতিকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে
বিস্তারিত
বাইয়ে ঈনা ও প্রচলিত সমিতি
‘বাইয়ে ঈনা’ শব্দটির অর্থ হলো বাকি। বাইয়ে ঈনা মূলত দুই
বিস্তারিত
দেনমোহর নারীর অধিকার
দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) এর শাসনকাল। বিয়ের দেনমোহর নিয়ে
বিস্তারিত
আল্লাহর মাস মহররমের মর্যাদা
মহররমের রোজা শ্রেষ্ঠ নেকি ও সেরা আমল। ইমাম মুসলিম তার
বিস্তারিত
আশুরায় করণীয় বর্জনীয়
‘রাসুল (সা.) মদিনায় হিজরত করে ইহুদিদের আশুরার রোজা রাখতে দেখে
বিস্তারিত
আলেম বিদ্বেষের ভয়াবহ পরিণাম
উম্মাহর ক্রান্তিলগ্নে ঝড়ের রাতে মাঝ নদীতে একজন দক্ষ নাবিকের ভূমিকা
বিস্তারিত