অস্বচ্ছ লেনদেন এবং কোরবানি প্রসঙ্গ

বাবার হাতে ছেলে তার উপার্জনের টাকা তুলে দেবেÑ এতে আর দোষের কী আছে! এটাকে বরং ভাবা হয় ছেলের আদব-শিষ্টাচার ও পারিবারিক সম্প্রীতির লক্ষণ হিসেবে। কিন্তু সংকটের কথা হলো, এ ছেলে যখন বাবার হাতে টাকা তুলে দিচ্ছে, তখন তা কী হিসেবে দিচ্ছেÑ এ বিষয়ে কারোরই কোনো স্বচ্ছ ধারণা নেই
 

কোরবানির মতো আর্থিক ইবাদতের বিষয় যখন সামনে আসে, তখন স্বাভাবিকভাবেই আমাদের সমাজের কিছু অসংগতি ও অস্বচ্ছতার বিষয়টিও চলে আসে। আর মাত্র দুই দিন পরই কোরবানির ঈদ। নিসাব পরিমাণ সম্পদ যদি কারও মালিকানায় থাকে তাহলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয়। এটাও স্বীকৃত কথাÑ কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার জন্য নিজের হাতে নগদ টাকা থাকা যেমন কোনো শর্ত নয়, তেমনি প্রয়োজন-অতিরিক্ত সম্পত্তি স্থাবর না অস্থাবরÑ তা-ও এক্ষেত্রে কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। কারও হাতে নগদ টাকা নেই; কিন্তু অন্য কারও কাছে তার অনেক টাকা পাওনা আছে, এ পাওনা টাকাও তার নিসাবের হিসাবের ক্ষেত্রে বিবেচনা করতে হবে। কারও কাছে ব্যবসার জন্য টাকা দেওয়া আছে; কিন্তু ব্যবসায়ী এই মুহূর্তে তাকে মূলধন বা লাভ কিছুই দিচ্ছে না, তবু সম্পত্তির পরিমাণ যদি নিসাব পরিমাণ হয় তাহলে তার ওপরও কোরবানি ওয়াজিব হবে। একইভাবে অনেকের অপ্রয়োজনীয় কিংবা প্রয়োজনের অতিরিক্ত স্থাবর সম্পত্তি থাকে। ধরুন, এক ব্যক্তি শুধুই সম্পত্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটু পতিত জমি কিনে রাখল। জমিটি চাষাবাদ কিংবা অন্য কোনো কাজে ব্যবহারের উপযুক্ত নয়। এমনিতেই পড়ে আছে। এমন জমিও কোরবানির নিসাবের ক্ষেত্রে হিসাব করতে হবে। বাবা মারা যাওয়ার পর তার সব সম্পত্তিতেই তার ওয়ারিশদের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। এক ছেলে যতটুকু সম্পদের মালিক হবে, এক মেয়ে তার অর্ধেক সম্পদের মালিক হবে। এক্ষেত্রে সম্পত্তি হাতে পাওয়া কিংবা ভাগবাটোয়ারা করে নেওয়ার কোনো শর্ত নেই। অর্থাৎ মৃত বাবার সম্পত্তি ভাগ করা হোক আর না-ই হোক, ছেলেমেয়ে সবাই এখন সেই সম্পদের মালিক। এই মেয়ে বাবার যতটুকু সম্পত্তির মালিক, এর মূল্য যদি সাড়ে বায়ান্ন ভরি রোপার সমান হয় তাহলে তার ওপরও কোরবানি ওয়াজিব হবে। সম্পত্তি এখনও হাতে পাইনিÑ এ কথা বলে দায়মুক্তির কোনো সুযোগ এক্ষেত্রে নেই। 
এটা আমাদের সমাজের একটা বড় অস্বচ্ছতা। বাবা যখন মারা যায়, তখন ছেলেরা তাদের বোনদের অংশ দিতে গড়িমসি করে। মেয়েরাও জোর দিয়ে তাদের অংশ চায় না। একটা অজানা আশঙ্কা তাদের মনে থাকেÑ সম্পত্তি চাইতে গেলে আবার ভাইদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায় কি না। আবার ভাইদের তারা তাদের অংশ দিয়েও দেয় না। যদি না দেয়, তাহলে তো তারাই এর মালিক। এ মালিকানা আমাদের দেশীয় আইনেও স্বীকৃত। বাবার মৃত্যুর পর ছেলেরা ইচ্ছা করলেই তাদের বোনদের না জানিয়ে কিংবা তাদের অনুমতি না নিয়ে বাবার পুরো সম্পত্তি বিক্রি করে দিতে পারবে না। তারা যতটুকুর মালিক শুধু ততটুকুর ওপরই তাদের হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য। এটা শরিয়তের আইনেও, দেশের আইনেও। তাই সম্পত্তির মালিক যখন মেয়েরা হয়েই গেল, তখন স্বাভাবিকভাবেই আর্থিক ইবাদতগুলোর বিধানও তার ওপর আরোপিত হবে। এ সম্পদের মধ্যে যদি টাকাপয়সা, স্বর্ণ-রৌপ্য কিংবা জাকাত ফরজ হয় এমন কোনো কিছু থাকে, আর তা নিসাব পরিমাণ হয়, তাহলে তার ওপর জাকাত ফরজ হবে। যদি সেখানে শুধু স্থাবর সম্পত্তিই থাকে, তাহলে এতে জাকাত ফরজ হবে না ঠিক; কিন্তু একজন মেয়ে যতটুকু পায়, এর মূল্য যদি নিসাব পরিমাণ হয়, তাহলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে, সদকাতুল ফিতর বা ফিতরা ওয়াজিব হবে। এমনকি তার সম্পত্তির মূল্য যদি এ পরিমাণ হয়, যা দিয়ে সে হজ আদায় করতে পারবে, তাহলে তো তার ওপর হজও ফরজ হয়ে যাবে। তাই প্রথমেই এ অস্বচ্ছতাটুকু ভাঙতে হবে। যদি মেয়েরা তাদের প্রাপ্য সম্পত্তি ভাইদের দিয়ে দিতে চায়, তাহলে ভালো কথা, পরিষ্কারভাবে তা দিয়ে দেবে। এখনকার সময়ে তা লিখিত দলিলের মাধ্যমে দিয়ে দিতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে এ নিয়ে আবার দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পথ খুলে যেতে পারে। তা না হলে তারা ভাইদের কাছ থেকে সম্পত্তি বুঝে নেবে। এজন্য চেষ্টা করবে। ভাইয়েরা যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বোনদের অংশ না দেয়, তাহলে তো একসময় অবশ্যই সংকট সৃষ্টি হবে। এক-দুই প্রজন্ম পরে হলেও হবেই। কিন্তু এ সম্পত্তি বুঝে না পেলেও পরিমাণ যদি নিসাব পরিমাণ হয়, তাহলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে। হাতে টাকা থাকলেও হবে, না থাকলেও হবে। সমাধান একটাইÑ এ অস্বচ্ছতা নির্মূল করা। স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠিত করা। 
আরেকটি উদাহরণ দিই। উপার্জনক্ষম ছেলে প্রতি মাসে যা কিছু উপার্জন করে, সনেই, বাবার মনেও নেই। একজন দিচ্ছে, একজন নিচ্ছে এবং খরচ করছে। সংকট হবে, যখন বাবার মৃত্যু হবে, তখন এ টাকা থেকে বেঁচে যাওয়া টাকার ভাগবণ্টন নিয়ে। মৃত বাবার যদি আরও ছেলে থেকে থাকে তাহলে বাবার টাকা হিসেবে এ সম্পদের ভাগ তারাও দাবি করতে পারে। আর এই ছেলে, এই টাকাগুলো মূলত যার উপার্জন, সে এগুলোকে নিজের বলে দাবি করতে পারে। ভাইয়ে-ভাইয়ে সংঘাত তখন অপরিহার্য। সমস্যা শুধু এতটুকুই নয়। বাবার হাতে ছেলে যে টাকা দিচ্ছে, তা যদি বাবাকে সে মালিক বানিয়ে দিয়ে থাকে, তাহলে এ টাকা তো বাবারই হয়ে যাবে। ছেলের কাছে যদি অন্য কোনো টাকা না থাকে, তাহলে তো তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে না। তার ওপর জাকাত ফরজ হবে না। হজ ফরজ হবে না। আর যদি বাবাকে মালিক বানিয়ে না দেয়, তার চিন্তা যদি এমন থাকেÑ খরচ করার পর যা থাকে তা তার নিজের, তাহলে তো এ টাকার মালিক বাবা নয়, সে নিজেই। এ টাকার জাকাত তাকেই আদায় করতে হবে। এ টাকা নিসাব পরিমাণ হলে তাকে কোরবানিও আদায় করতে হবে। এক্ষেত্রেও সমাধানের পথ একটাইÑ লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। বাবার পক্ষ থেকেও, ছেলের পক্ষ থেকেও।


মনের জমিনের বিষাক্ত চারাগাছ
ফিলিস্তিনে মসজিদুল আকসা নির্মাণ করেন আল্লাহর নবী দুনিয়ার বাদশাহ হজরত
বিস্তারিত
ইসলামে মানবজীবনের দায়িত্ব
দায়িত্ব ও দায়িত্ববোধ ইসলামের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। এখানে প্রত্যেকেই তার
বিস্তারিত
মোজেজার তাৎপর্য
  মোজেজা চিরন্তন রীতিবহির্ভূত হতে হবে। অতএব কোনো ব্যক্তি যদি রাতের
বিস্তারিত
ঘোরতর অসুস্থ ব্যক্তির কালেমা পাঠের
  কালেমা অর্থ হলো ঈমান বা বিশ্বাস। যিনি আসমান, জমিন, জিন
বিস্তারিত
নবীপ্রেমের অনুসরণীয় উপমা
চুনতির শাহ হাফেজ আহমদ (রহ.) কখনও স্বাভাবিক মানুষের  মতো কথাবার্তা
বিস্তারিত
নামাজে বসার সুন্নতগুলো
নামাজের অন্যতম আমল বৈঠক বা বসা। দুই রাকাত বিশিষ্ট নামাজে
বিস্তারিত