ঈদুল আজহা ও কোরবানি

কোরবানি আল্লাহ প্রদত্ত বিধানাবলির মধ্যে একটি ওয়াজিব বিধান। এটি হজরত ইবরাহিম (আ.) এর সুন্নত। তার ত্যাগের বিনিময়ে মুসলিম উম্মাহ এই সুন্নতটি পেয়েছে। প্রতি বছর জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখে পশু জবাই করে কোরবানি আদায় করা হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আপনার প্রতিপালকের জন্য নামাজ ও কোরবানি আদায় করুন।’ (সূরা কাউছার)।

কোরবানির গুরুত্ব সম্পর্কে হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর হাদিস রয়েছে। হজরত জাইদ বিন আরকাম (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘একদা সাহাবারা রাসুল (সা.) কে প্রশ্ন করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! কোরবানি কী? উত্তরে রাসুল (সা.) বললেন, এটা তোমাদের পিতা হজরত ইবরাহিম (আ.) এর সুন্নত। তারা ফের প্রশ্ন করলেন, এতে আমাদের জন্য কী প্রতিদান আছে? প্রতি উত্তরে রাসুল (সা.) বললেন, কোরবানির পশুর প্রতিটি লোমের বিনিময়ে এক একটি সওয়াব পাবে। ফের সাহাবারা প্রশ্ন করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা.)! উট বা দুম্বার পশমের কী হুকুম? তদুত্তরে নবীজি (সা.) বললেন, এ সবেরও প্রতিটি পশমের পরিবর্তে নেকি পাবে।’ (ইবনে মাজাহ : ৩২৪৭)।

রাসুল (সা.) আরও বলেন, ‘কোরবানির দিন কোরবানির রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে প্রিয় অন্য কোনো আমল আল্লাহর কাছে নেই। ওই ব্যক্তি কেয়ামতের দিন জবাইকৃত পশুর লোম, শিং, খুর, পশম ইত্যাদি নিয়ে আল্লাহ তায়ালার কাছে উপস্থিত হবে। কোরবানির রক্ত মাটিতে পতিত হওয়ার আগেই তা আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায়। অতএব তোমরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে পবিত্র মনে কোরবানি আদায় করো।’ (ইবনে মাজাহ : ৩১২৬)।

 

তাকবিরে তাশরিকের আমল

জিলহজ মাসের ৯ তারিখের সকাল থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর পুরুষরা উচ্চ স্বরে এবং মেয়েরা মৃদুস্বরে নিম্নোক্ত তাকবির একবার বলা ওয়াজিব। চাই নামাজ জামাতে পড়া হোক কিংবা একাকি পড়া হোক। তাকবির হলোÑ ‘আল্লাহু আকবর আল্লাহু আকবর লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবর আল্লাহু আকবর ওয়া লিল্লাহিল হামদ।’ (ফাতাওয়া শামি : ২/১৭৮)।

 

ঈদুল আজহার সুন্নত

ঈদুল আজহার দিন বিশেষভাবে নিম্নোক্ত সুন্নতগুলো পালনীয়Ñ ১. পবিত্র ও উত্তম পোশাক পরিধান করা। ২. শরিয়তসম্মত সুসজ্জিত হওয়া। ৩. গোসল করা। ৪. মেসওয়াক করা। ৫. সুগন্ধি ব্যবহার করা। ৬. খুব ভোরে ঘুম থেকে জাগা। ৭. ঈদের নামাজের আগে কিছু না খাওয়া, বরং নিজের কোরবানির গোশত থেকে প্রথমে খাওয়া। ৮. ঈদগাহে যাওয়ার সময় উচ্চ স্বরে তাকবিরে তাশরিক বলা। ৯. ঈদের নামাজ ঈদগাহে পড়া। ১০. যথাসম্ভব ঈদগাহে এক পথে যাওয়া, অন্য পথে ফিরে আসা। ১১. ঈদের নামাজের আগে ঘরে বা ঈদগাহে নফল নামাজ না পড়া এবং ঈদের নামাজের পর ঈদগাহে নফল নামাজ না পড়া। (ফাতাওয়া আলমগিরি : ১/১৪৯)।

 

গোশত বণ্টন

কোরবানির গোশত তিনভাগ করে এক ভাগ নিজের জন্য রাখা, এক ভাগ আত্মীয়স্বজনকে দেওয়া এবং এক ভাগ গরিব-মিসকিনকে দান করা মুস্তাহাব। তবে কোনো কারণে এর ব্যতিক্রম করা জায়েজ আছে। (আদদুররুল মুখতার : ৬/৩২৮)। 

 

চামড়ার হুকুম

কোরবানির চামড়া নিজের কোনো কাজে ব্যবহার করা জায়েজ আছে। অথবা কাউকে হাদিয়া দেওয়া যায়। কিন্তু বিক্রি করলে, তার মূল্য সদকা করে দেওয়া ওয়াজিব। (হেদায়া : ৪/৪৫০)। কোরবানির চামড়া দ্বারা পারিশ্রমিক দেওয়া যাবে না। তেমনিভাবে যারা গোশত তৈরি করে, তাদের বেতন হিসেবে চামড়া বা গোশত দেওয়া যাবে না। বেতন দেওয়ার পর তাদের আলাদাভাবে চামড়া বা গোশত দেওয়া ভিন্ন কথা। (হেদায়া : ১/২৩২)।

 

কোরবানির পশু

সাধারণত ভেড়া, দুম্বা, ছাগল, গরু, মহিষ, উট ইত্যাদি দ্বারা কোরবানি করা হয়। কোরবানির পশু সুন্দর, সুঠাম ও নিখুঁত হওয়া চাই। এক-তৃতীয়াংশ বা তার চেয়ে বেশি কান বা লেজ কাটা, খোঁড়া, চলতে অক্ষম, রোগা, মূল থেকে শিং ভাঙা প্রভৃতি ত্রুটিযুক্ত পশু দ্বারা কোরবানি করা বৈধ নয়। এছাড়াও কোরবানি শুদ্ধ হওয়ার জন্য ইসলামি শরিয়ত পশুর বয়স নির্ধারিত করে দিয়েছে। যেমনÑ উট-উটনির বয়স পূর্ণ পাঁচ বছর, গরু-মহিষের বয়স দুই বছর এবং দুম্বা, ভেড়া ও ছাগলের বয়স এক বছর পূর্ণ হতে হবে। তবে ছয় মাসের দুম্বা-ভেড়া মোটাতাজা হওয়ায় এক বছরের দুম্বা-ভেড়ার মতো মনে হলে তখন তা দ্বারা কোরবানি করা জায়েজ। 

আর কিছু কিছু এলাকায় পশু জবাই করার পর মোনাজাত করতে দেখা যায়। এটি ভিত্তিহীন। ইসলামি শরিয়তে এর কোনো বিধান নেই। (ফাতাওয়া শামি : ৬/৩২২-৩২৫)।

 

যৌথ কোরবানি 

গরু, মহিষ ও উটÑ এই তিন প্রকার পশুর মধ্যে যৌথভাবে কোরবানি করা জায়েজ। তবে এক পশুর মধ্যে সাতজনের বেশি শরিক হতে পারবে না। যৌথ কোরবানির ক্ষেত্রে সবার নিয়ত পরিশুদ্ধ হতে হবে। কারও নিছক গোশত খাওয়ার নিয়ত থাকলে কোরবানি হবে না। 

এক্ষেত্রে একজনের নিয়তে ত্রুটি থাকলে, সবার কোরবানি হবে না। যৌথ কোরবানিতে গোশত পাল্লা দিয়ে মেপে সমানভাবে ভাগ করে নিতে হবে। যাতে কারও অংশে কম-বেশি না হয়। (ফাতাওয়া শামি : ৬/৩২৬, হেদায়া : ৪/৪২৮)।

 

লেখক : শিক্ষক, নাজিরহাট বড় মাদ্রাসা

ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম


নবীপ্রেমের অনুসরণীয় উপমা
চুনতির শাহ হাফেজ আহমদ (রহ.) কখনও স্বাভাবিক মানুষের  মতো কথাবার্তা
বিস্তারিত
নামাজে বসার সুন্নতগুলো
নামাজের অন্যতম আমল বৈঠক বা বসা। দুই রাকাত বিশিষ্ট নামাজে
বিস্তারিত
প্রাত্যহিক কোরআন তেলাওয়াত
আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা.) এর ওপর সর্বশেষ, সর্বশ্রেষ্ঠ
বিস্তারিত
গোসল করার ইসলামি পদ্ধতি
গোসলের নিয়ত করে নিন। নিয়তের স্থান অন্তর। মনে মনে নিয়ত
বিস্তারিত
পরস্পর দয়া প্রদর্শনে উপদেশ দিন
উসামা বিন জায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবীজির মেয়ে
বিস্তারিত
যিনি ধনীদের মধ্যে সর্বপ্রথম জান্নাতে
আবদুর রহমান বিন আউফ (রা.) এর স্মৃতি জর্দানের রাজধানী আম্মানের উত্তরের
বিস্তারিত