ফিলিস্তিনিদের ঈদ

ইংরেজিতে প্রবাদ আছে, ‘ম্যান ইজ বর্ন টু বি ফ্রি’। অর্থাৎ মানুষমাত্রই স্বাধীন হয়ে জন্মে। প্রবাদটি নিজ অর্থে বহাল থাকলেও এটির বাস্তবতা এখন নেই বললেই চলে। বরং প্রবাদটি মুছে দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে একদল আগ্রাসী হায়েনা। সুতরাং স্বাধীন হয়ে জন্ম নেওয়া দূরে থাক, পৃথীবিতে কিছু নবজাতক ভূমিষ্ঠ হচ্ছে যুদ্ধের কালো মেঘের ছায়া মাথায় নিয়ে। আগ্রাসনের হিংস্রতায় মাতৃগর্ভেই খুন হচ্ছে অসংখ্য মানবশিশু। জায়নবাদী ইসরাইলের সীমাহীন নির্মমতার শিকার ফিলিস্তিনি শিশুদের বেলায় কথাটি শতভাগ সত্য। সেখানে মায়ের কোলো দুধপানের বদলায় বিস্ফোরকচূর্ণ খেতে হচ্ছে বহু সন্তানকে। এমনকি মাতৃগর্ভেও অনিরাপদ বহু মানবশিশু। গর্ভবতী মায়েদের ওপরও নির্যাতনের বিভীষিকা নেমে আসে যে-কোনো সময়। এভাবে পৈশাচিক আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে বহু মুসলিম দেশের অজস্র নিরীহ জনগণ। তন্মধ্যে ফিলিস্তিনিদের ভাগ্য সবচেয়ে বিড়ম্বিত। তারা নিজ দেশেই পরবাসী। নিজেদের বাসভবনে ক্রীতদাস। 

প্রসঙ্গত উল্লেখ করছি, মুসলমানদের দ্বিতীয় প্রধান উৎসব ঈদুল আজহা। ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই ফিলিস্তিনের মুসলমানরা ঈদ উদযাপন করে আসছে। ফিলিস্তিনের গাজা ও পশ্চিমতীরের মানুষের ঈদ উৎসব ছিল বেশ জাঁকজমকপূর্ণ। জায়নবাদী ইসরাইল প্রতিষ্ঠার আগে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল যথেষ্ট সচ্ছল। ঈদে গাজা ও পশ্চিমতীরের শিশুরা রাস্তাঘাট ও অলিগলিতে গেয়ে বেড়াত আনন্দ-সংগীত। নতুন জামাকাপড় পরে বেড়াতে বের হতো পাড়ামহল্লায়। ঈদের খুশি প্রকাশ করতে রাস্তায় রাস্তায় আনন্দ শোভাযাত্রাও বের করত। ‘মামুল’ নামক পিঠা তৈরি করা হতো ঘরে ঘরে। কুকি ও মিষ্টান্নের বাহারি আয়োজন হতো সবার ঘরে। কোরবানির ঈদে উট, মহিষ, গরু, ছাগল ও ভেড়া জবাই করত সামর্থ্যবান মুসলমানরা। ঘরে ঘরে তৈরি হতো গোশতের বিভিন্ন রেসিপি। পরম্পরা ও ধর্মীয় উৎসবের রেওয়াজ অনুযায়ী এবারও ফিলিস্তিনে ঈদুল আজহা পালিত হওয়ার কথা। কিন্তু এবার তাদের ঈদ পালন হবে কি না, তা শুধুই অনিশ্চয়তার বিষয়। কারণ গেল কয়েক বছর তাদের ঈদের খুশি পরিণত হয়েছে মহাদুর্যোগে। গত বছরও দেখা গেছে, ফিলিস্তিনিদের ওপর ঈদের দিনেও হামলা করেছে জালেম নেতানিয়াহুর দল। 

মূলত ১৯৪৮ সালের ১৫ মে জায়নবাদী ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর থেকে তাদের অভিধান থেকে হাসিখুশি ও ঈদ-আনন্দের মতো শব্দগুলো বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সেখানে এখন বিনোদনের সব অনুষঙ্গ বিদায় নিয়ে আগমন করেছে আন-নাকবা। ‘নাকবা’ মানে মহাদুর্যোগ। ফিলিস্তিনের ভাগ্যকাশে এখন যে সূর্য উদিত হয়, তার গায়েই যেন খচিত থাকে ‘আন-নাকবা’ নিশান। ফিলিস্তিনিদের প্রতিটি প্রহরই নাকবার প্রহর। তাদের উৎসব মানেই নাকবার আগমন। তাদের আকাশে এখন একটিই সূর্য : ‘আন-নাকবা’র সূর্য। 

গত কোরবানির ঈদে ইসরাইল যুদ্ধবিরতির চুক্তি করেও শেষ পর্যন্ত কথা রাখেনি। ঈদের দিনেও তারা আক্রমণ করেছে নিরীহ-নিরস্ত্র ফিলিস্তিনি মুসলমানদের ওপর। ঈদের আনন্দের জায়গায় ফিলিস্তিনিরা উপহার পেয়েছে লাশের স্তূপ। পশু জবাইয়ের বদলায় সন্তানের কর্তিত-বিচূর্ণ শরীরকে কবরস্থ করতে হয়েছে হতভাগা মা-বাবার। 

খবরের কাগজে প্রকাশিত রিপোর্ট বলছে, ‘৭ জুন ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে নিহত হয়েছে ফিলিস্তিনি কিশোর হিতাম আল-জামাল। ছেলের জামা-জুতো আগলেই ঈদ কেটেছে তার মায়ের।’

সে দিনই ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছে ১৫ বছর বয়সি হাইতাম। এক সপ্তাহের ব্যবধানে আসা ঈদ তাই তার মা ওরুদ আল-জামালের কাছে ‘আন-নাকবা’রই নামান্তর। রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘এটা আমার জীবনের কঠিনতম ঈদ।’

ঈদ সামনে রেখে মৃত্যুর দুই দিন আগে এক জোড়া জিন্স প্যান্ট, জুতো ও একটি টি-শার্ট কিনেছিল হাইতাম। সেগুলো হাতে নিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে বসে থাকেন তার মা। রয়টার্সের প্রতিবেদককে সেগুলো দেখিয়ে মুখে আর কিছু বলতে পারেননি তিনি।

এ শুধু হাইতামের পরিবারের গল্প নয়। গাজার বহু পরিবারেরই ঈদের দিনের চিত্র ছিল এটি। শোক ও নৈরাশ্য তাদের ভুলিয়ে দিয়েছে ঈদ; ভুলিয়ে দিয়েছে নিত্য-দারিদ্র্যকেও।

শুধুই মৃত্যু নয়, গাজাবাসীর মাঝে দারিদ্র্যও নেমে এসেছে খুব! প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে, দারিদ্র্যকে বুঝতে হলে তাকাতে হবে ওমর আল-বায়ুকের দোকানের দিকে। পুরো মাস নানারকম পোশাকের পসরা সাজিয়ে বসে ছিলেন তিনি। কিন্তু কোনো ক্রেতা ছিল না। ফলে তার ঈদও এসেছে নিরানন্দ হয়ে। রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি খুবই খারাপ। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা একেবারে দুর্বল। অন্য যে-কোনো বছরের তুলনায় এবার বিক্রি অনেক কম হয়েছে।’

তারপরও ঈদ আসে। ফিলিস্তিনের মানুষ ঈদের জামাতে ঠিকই যোগ দেন। কেউ কেউ নতুন কাপড়ও কেনেন। যেহেতু মৃত্যুর কালো থাবাকে ভ্রুকুটি দেখিয়ে উৎসব আসে তার নিজ শক্তি নিয়ে। শোকের জীবনে আসে শুভাকাক্সক্ষীদের সমবেদনা। আসে অনির্বাণ হাসি। 

যেমনটি আসে গাজার নুসিরাত শরণার্থী শিবিরের আবদেল রহমান নফেলের মুখে। ১৫ বছরের এই শিশুকে ঈদে নতুন পোশাক কিনে দিয়েছিল তার বাবা। সঙ্গে এক জোড়া জুতোও। কিন্তু সে এবার একটি জুতাই পরবে। আরেকটি তবে কী করবে সে?

নফেলের ভাষায়, ‘এক জোড়া জুতা কিনেছিলাম আমি, ঈদে পরব বলে। কিন্তু আমি শুধু একটিই পরতে পারব। আরেকটি রেখে দেব ঘরে।’

কারণ গাজা সীমান্তে বিক্ষোভ করতে গিয়ে বাঁ পায়ে লেগেছিল ইসরাইলি সেনাদের ছোড়া গুলি। কেটে ফেলতে হয়েছে তার ওই পা।

গত ঈদে গাজার মানুষের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে ফিলিস্তিনের বহু পরিবার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন মামুল তৈরি করেনি। ঈদের দিন পশ্চিমতীরের রাস্তায় রাস্তায় ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মিছিল হয়েছে। বিক্রি হয়েছে সেøাগানে ভরা কালো টি-শার্ট।’

তথ্যসূত্র : এফএফপি, রয়টার্স ও প্রথম আলো


ফুলে ফুলে সুরভিত দেশ
ফুল ভালোবাসার প্রতীক। সৌন্দর্যের আলয়। স্নিগ্ধতার পেলব স্পর্শ। মানুষমাত্রই ফুলের
বিস্তারিত
প্রকৃতির বিশালতায় জীবনের উপকরণ
পাখির সুমধুর মিষ্টি গান শুনে সত্যের জয়গান গাওয়া শিখতে পারি।
বিস্তারিত
দোয়া করলে আল্লাহ খুশি হন
আল্লাহ তায়ালা মোমিন বান্দার সবচেয়ে আপনজন। তাঁর আপনজন কোনো কিছু
বিস্তারিত
রাস্তার পাশের গাছ কাটা
প্রশ্ন : আমাদের এলাকার কিছু লোককে দেখেছি, তারা এলাকার নেতাদের
বিস্তারিত
রক্তনেশার আক্রোশে ইদলিব : তারপর
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আভাস জোরেশোরেই দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। বিশ্বযুদ্ধের অবয়ব কী? সিরিয়ায়
বিস্তারিত
ইমাম বোখারির আসনে যুগের বোখারির দরস
আলোচনায় তিনি বলেন, ‘ইমাম বোখারি এ ভূমিতেই বেড়ে উঠেছেন। এখানেই
বিস্তারিত