মওলানা রুমির মসনবি শরিফ

সুলায়মান (আ.) এর দাওয়াতে ‘সাবা’য় প্রাণের জোয়ার

মসনবি শরিফের পা-ুলিপি, ওয়াল্টার আর্ট মিউজিয়াম, যুক্তরাষ্ট্র, ১৬০০ শতক

মওলানা বলেন, আল্লাহর নবী, রাসুল ও তাদের অনুসারীদের দাওয়াত ও হেদায়েত মানুষের মর্মমূলে প্রবেশ করার মূল কারণ ছিল, তাদের আহ্বান ছিল হৃদয় নিঃসৃত। ভালোবাসায় আকীর্ণ ছিল তাদের প্রতিটি আবেদন। তারা কথা বলেছেন হৃদয় দিয়ে প্রত্যেকের বোধগম্য ভাষায়। তিনি বলেন, বনের পাখি শিকারির জালে আটকাতে হলে সেই পাখির একই সুরে ডাকতে হবে। সুলায়ামন (আ.) এর আহ্বানও ছিল সে ধরনের ভাষায়

আল্লাহর নবী, দুনিয়ার বাদশাহ হজরত সুলায়মান (আ.) সাবার রানি বিলকিসের কাছে পত্র পাঠিয়েছিলেন কাঠঠোকরার ঠোঁটে করে। চিঠি পেয়ে বিচলিত রানি সুলায়মান (আ.) এর কাছে দু-খানা স্বর্ণের ইট, সঙ্গে ১০০ গোলাম উপহার পাঠান। তার উদ্দেশ্য ছিল, দুনিয়ার বাদশাহ হলে এই উপহারে তিনি বেজায় খুশি হবেন। আর যদি আল্লাহর নবী হন, তার ব্যবহার হবে অন্যরকম। রানির উপহার পেয়ে সুলায়মান (আ.) দূতদের পরিষ্কার বলে দিলেন, এসব উপঢৌকনের জন্য আমি লালায়িত নই। এগুলো তোমরা নিয়ে যাও। বলবে, অনতিবিলম্বে যেন আল্লাহর আনুগত্য গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে যায়, যেন চলে আসে ইসলামি শাসনের আওতায়। কোরআন মজিদের একটি ভাষ্য এরূপÑ ‘দূত সুলায়মানের কাছে এলে সুলায়মান বললেন, ‘তোমরা কি আমাকে ধন-সম্পদ দিয়ে সাহায্য করছ? আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন, তা তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তার চেয়ে উৎকৃষ্ট; অথচ তোমরা তোমাদের উপঢৌকন নিয়ে উৎফুল্ল বোধ করছ। তোমরা ওদের কাছে ফিরে যাও, আমি অবশ্যই ওদের বিরুদ্ধে এমন এক সৈন্যবাহিনী নিয়ে আসব যার মোকাবিলা করার শক্তি ওদের নেই। আমি অবশ্যই ওদেরকে সেখান থেকে বহিষ্কার করব লাঞ্ছিতভাবে এবং তারা হবে অবনমিত।’ (সূরা নামল : ৩৬, ৩৭)।

আগের পত্র আর এই বার্তার পর কালবিলম্ব না করে রানি বিলকিস সাবার রাজত্ব ত্যাগ করে চলে আসেন হজরত সুলায়মান (আ.) এর কাছে। একজন প্রতাপশালী সম্রাজ্ঞী এত সহজে কীভাবে আত্মসমর্পণ করতে পারে, এটি এক বিস্ময়। মওলানা রুমি মসনবি শরিফে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন সাবায় সুলায়মান (আ.) এর  পত্র ও বার্তা ছিল একটি দাওয়াতি মিশন, নতুন জীবন দর্শন। এর ফলে জনগণের মাঝে, রাষ্ট্রের প্রতিটি পর্যায়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তন দেখা দেয়। তার দাওয়াতের মাঝে লুক্কায়িত ছিল অপ্রতিরোধ্য আধ্যাত্মিক শক্তি। 

সুলায়মান (আ.) রানি বিলকিসকে বুঝিয়ে বললেন, আমি যে জিহাদ করছি তা একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যেÑ লিওয়াজহিল্লাহ। আমার লক্ষ, তুমি যেন ঈমান আন। তোমাকে পাওয়া, তোমার রূপসুধা বা তোমার রাজ্য ভোগদখলের প্রতি আমার বিন্দুমাত্র লোভ নেই। তোমার অন্তর্চক্ষু যখন খুলে যাবে আল্লাহর নূরের তেজ দিয়ে তুমি নিজেই আমার কথার সত্যতা দেখতে পাবে। 

তিনি বললেন, আমি দাওয়াতি মিশন নিয়ে এসেছি। আমি আল্লাহর প্রেরিত নবী। আমি মানুষকে আহ্বান করি আল্লাহর দিকে। মনের কামনা-বাসনা আমি মৃত্যুদূতের মতো বধ করে চলি। তবে আমার মধ্যে কামনা-বাসনা নেই, একথা বলছি না। থাকলেও তা আমার অধীন, আমার কৃতদাস। কামনার দাস আমি নই। রূপের, ভোগের মূর্তির প্রতি আমার আকর্ষণ নেই। শুরু থেকেই আমি মূর্তি বিনাশী। আমার পূর্বপুরুষ ইবরাহিম খলিল ও অন্যান্য পয়গাম্বর (আ.) মূর্তি নিধন অভিযান চালিয়েছেন যুগে যুগে। তুমি প্রশ্ন করতে পার, তাহলে আপনিও কেন রাজত্ব চালাচ্ছেন, দেশ শাসন করছেন? মানব দানব পশুপাখির ওপর আপনার হুকুম চলছে এর ব্যাখ্যা কী দেবেন? সুলায়মান (আ.) জবাব দেন :

গর দর আ’য়ম আই রহী দর বুতকাদাহ

বুত সুজুদ আ’রদ ন মা দর মা’বদাহ

ওহে কামনার দাস! আমি যদি ঢুকি ঐ মূর্তিশালায়

মূর্তিকে প্রণাম করি না, মূর্তিই লুটায় আমাদের পায়।

আহমদো বু জাহল দর বুতখা’নে রফত

যিন শোদন তা’ অ’ন শোদান ফরকীস্ত যাফত

হজরত আহমদ ও আবু জাহেল উভয়ে গেলেন মূর্তিশালায়

তার যাওয়া, ওর যাওয়ার মাঝে ব্যবধান আকাশ পাতাল।

আরব দেশের মক্কায় অবস্থিত কাবাঘর। জাহেলি যুগে পৌত্তলিক কোরাইশরা তাতে স্থাপন করেছিল ৩৬০টি মূর্তি। আল্লাহর একত্বের ঘরে পূজিত হতো মূর্তি। আবু জাহেল ছিল কোরাইশ সর্দার, মুশরিকদের নেতা, মূর্তির পূজারি। অন্যদিকে কোরাইশ বংশের সন্তান ছিলেন আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তার অপর নাম আহমদ। তিনি দুনিয়ায় আগমন করেন তাওহিদের বাণী নিয়ে। মক্কা বিজয়ের পর তিনি কাবাঘরে প্রবেশ করে মূর্তিগুলো ছুঁড়ে দূরে নিক্ষেপ করেন। মওলানা রুমি বলেন, আবু জাহেল কাবাঘরে প্রবেশ করত মূর্তি পূজার নিমিত্তে। আর হজরত আহমদ মুজতবা (সা.) প্রবেশ করেন মূর্তি ধ্বংসের জন্য। কাজেই নবীজি ও আবু জাহেল, উভয়ের প্রবেশের মধ্যে ব্যবধান ছিল আকাশ পাতাল। 

ইন দরায়াদ সর নাহাদ ই রা’ বুতান

আ’ন দরা’য়দ সর নাহাদ চোন উম্মতান

ইনি প্রবেশ করেন তো মূর্তিরা সিজদায় লুটায়

সে প্রবেশ করে তো পূজারি হয়ে লুটায় সিজদায়।

হজরত মুহাম্মদ (সা.) প্রবেশ করলে মূর্তিরা তার সম্মুখে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে। আর আবু জাহেল প্রবেশ করলে নিজেই মূর্তির সামনে প্রণতি জানায়, মাথা ঠেকায়। মূর্তিমন্দিরের বাইরে বৃহত্তর পরিসরে এই পৃথিবীও মূর্তিশালার মতো। এখানে সৎ-অসৎ সবার একত্রে বসবাস। 

ইন জা’হা’নে শাহওয়াতী বুতখা’নেয়ীস্ত

আম্বিয়া’ ও কা’ফেরা’ন রা’ লা’নেয়ীস্ত

কামনার এই পার্থিব জগত মূর্তিশালার মতন

নবী-রাসুল কাফেরদের এখানে বাসভবন।

মাটির এই পৃথিবীতে সৎ-অসৎ, ঈমানদার-বেঈমান, নবী রাসুল-কাফের সবাই একত্রে বসবাস করে। মানব সত্তায় গচ্ছিত জৈবিক চাহিদার টানে সবাই সংসার জীবন চালাতে বাধ্য। খাদ্য-পানীয় ইত্যাকার চাহিদার ঊর্ধ্বে কেউ নয়। জৈবিক চাহিদা না থাকলে মানব জীবন বিপন্ন হয়ে যেত। সংসার সভ্যতা টিকতে পারত না। কিন্তু দুনিয়ার জীবনের উদ্দীপক এই কামনার ভূমিকা এখানে সবার ক্ষেত্রে একরকম নয়। 

লে-কে শাহওয়াত বন্দায়ে পা’কা’ন বুওয়াদ

যর নসূযদ যাঁকে নকদে কা’ন বুয়াদ

কিন্তু কামনা পবিত্রজন বান্দাদের একান্ত অনুগত

স্বর্ণ আগুনে পোড়ে না, কারণ খনি থেকে উত্তোলিত।

এই পৃথিবীতে জৈবিক কামনা-বাসনা পবিত্রাত্মা মানুষের একান্ত অনুগত হয়ে থাকে। মাটির সঙ্গে গড়াগড়ি দিলেও মাটির আঁচড় তাদের গায়ে লাগে না। বাইম মাছের বসবাস কাদামাটির ভেতরে। কিন্তু বেরিয়ে এলে কাদার ছোঁয়া থাকে না তার গায়ে। আরেক উদাহরণ স্বর্ণ। আগুনে পোড়ালে স্বর্ণের কোনো ক্ষতি হয় না। কাজেই এই দুনিয়ার অভিন্ন বাসিন্দা মোমিন ও কাফেরের ফারাকটুকু বুঝে নাও। 

কা’ফেরা’ন কলবান্দ ও পা’কা’ন হামচো যর

আন্দরীন বূতে দর অন্দ ইন দো নফর

কাফেররা ভেজাল আর পবিত্রজনরা নিখাদ স্বর্ণ

সংসারের পরীক্ষাগারে উভয়ের বসবাস একত্র।

পার্থিব জীবনের স্বর্ণকারের আগুনের ভাটিতে যখন ভেজাল স্বর্ণ ফেলা হয় মুহূর্তে তা কালো হয়ে যায়। আর খাটি স্বর্ণ ফেললে জ¦লজ¦ল করে ওঠে। 

দস্তো পা’ আন্দাখত যর দর বূতে খা’শ

দর রোখে আ’তাশ হামী খন্দদ রাগাশ

খাঁটি স্বর্ণ হাতপা ছুঁড়ে দেখ ভাটিতে আনন্দিত সে

আগুনের কোলে খেলা করে হাসে আগুনের সাথে।

মওলানা রুমি হজরত সুলায়মান (আ.) এর ভাষায় বলেন, এই জগতে আমরা যে দেহধারী, আমাদের দেহ আমাদের রূহের ওপর আচ্ছাদন মাত্র। আমরা এখানে রুহের চর্চা করি। দেহটা আমাদের খোলস, ভাসমান খড়কুটোর মতো। ভালো করে দেখ, এই খড়কুটোর নিচে প্রবহমান বিশাল সাগর। এটিই আমাদের আসল জগৎ। কাজেই যিনি দ্বীনের বাদশাহ, তাকে মনে করো না নিছক কাদামাটির মানুষ। কেননা, অভিশপ্ত ইবলিস হজরত আদম (আ.) কে এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছিল। তার ফলে সে চির অভিশপ্ত ও বিতাড়িত হয়েছে। আমাদের ওপর দুনিয়ার ব্যস্ততার হাজারো আচ্ছাদন থাকলেও তা আমাদের সূর্যরূপী আধ্যাত্মিক, নৈতিক শক্তিকে ঢাকতে পারে না। তুমিই বল, কয়েক মুষ্টি মাটি নিক্ষেপ করে তুমি কি সূর্যের চেহারা আড়াল করতে পারবে? অথবা কয়েক গাদা খড়কুটো চাপা দিয়ে কি সাগরের মুখ ঢাকতে পারবে? 

মওলানা বলেন, আল্লাহর নবী, রাসুল ও তাদের অনুসারীদের দাওয়াত ও হেদায়েত মানুষের মর্মমূলে প্রবেশ করার মূল কারণ ছিল, তাদের আহ্বান ছিল হৃদয় নিঃসৃত। ভালোবাসায় আকীর্ণ ছিল তাদের প্রতিটি আবেদন। তারা কথা বলেছেন হৃদয় দিয়ে প্রত্যেকের বোধগম্য ভাষায়। তিনি বলেন, বনের পাখি শিকারির জালে আটকাতে হলে সেই পাখির একই সুরে ডাকতে হবে। সুলায়ামন (আ.) এর আহ্বানও ছিল সে ধরনের ভাষায়। এর ফলে সাবার রানি আর জনগণের মাঝে কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তার বর্ণনা মওলানা আরবিতে এভাবে দিয়েছেন :

লাকাতিল আশবাহু ইয়াওমা ওয়াসলিহা’

আদতিল আওলাদু সাউবা আসলিহা’

দেহরা রুহে যুক্ত হওয়ার দিবস আনন্দে বিভোর

সন্তানদের মাঝে মা-বাবার কোলে ফেরার হিল্লোল।

সুলায়মান (আ.) এর হেদায়তের ডাক, ঈমানের আহ্বান পেয়ে সাবাজুড়ে প্রাণের জোয়ার আসে। এর দুটি উপমা দেওয়া যায়। একটি হলো দেহ প্রাণের সঙ্গে প্রযুক্ত হওয়ার দিবসের আনন্দ। আরেকটি হলো, হারানো সন্তান মা-বাবার কোলে ফিরে আসার দিগন্তপ্লাবী আনন্দ হিল্লোল। 

 

(মওলানা রুমির মসনবি শরিফ

৪খ. বয়েত, ৮১২-৮৪৬)


ইসলামে নারীর অর্থনৈতিক অধিকার
ইসলামের আগমনের আগে গোটা পৃথিবী নারী জাতিকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে
বিস্তারিত
বাইয়ে ঈনা ও প্রচলিত সমিতি
‘বাইয়ে ঈনা’ শব্দটির অর্থ হলো বাকি। বাইয়ে ঈনা মূলত দুই
বিস্তারিত
দেনমোহর নারীর অধিকার
দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) এর শাসনকাল। বিয়ের দেনমোহর নিয়ে
বিস্তারিত
আল্লাহর মাস মহররমের মর্যাদা
মহররমের রোজা শ্রেষ্ঠ নেকি ও সেরা আমল। ইমাম মুসলিম তার
বিস্তারিত
আশুরায় করণীয় বর্জনীয়
‘রাসুল (সা.) মদিনায় হিজরত করে ইহুদিদের আশুরার রোজা রাখতে দেখে
বিস্তারিত
আলেম বিদ্বেষের ভয়াবহ পরিণাম
উম্মাহর ক্রান্তিলগ্নে ঝড়ের রাতে মাঝ নদীতে একজন দক্ষ নাবিকের ভূমিকা
বিস্তারিত