হৃদয়ের আয়নায় নবীজি (সা.)

মসজিদে নববির মেহরাব

গম্বুজের নিচে মৃত্যুর পারাপার পার হয়ে জীবিত হায়াতুন্নবী (সা.)। দূর দেশ থেকে সালাম দিই, দরুদ পড়ি, সাংবাদিক ফেরেশতারা বয়ে নিয়ে যায় নবীজির রওজায়Ñ যেভাবে বাতাসের ইথারে ধ্বনি ও ছবি ভেসে ভেসে যায় রেডিও, টিভির পর্দায়। তিনি তখন আদুরে ওষ্ঠ দুখানা নেড়ে জবাব দেন গোনাহগার উম্মতের সালামের

এক প্রাজ্ঞ পর্যটককে জিজ্ঞেস করা হয়, এ জীবনে বহু দেশ, শহর-নগর তো ঘুরলেন, বলুন তো কোনটি সবচেয়ে সুন্দর নগরী? বললেন, যেখানে আমার প্রিয়জনের বাড়ি। হ্যাঁ, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দুটি শহরের নাম মক্কা ও মদিনা। মক্কায় আছে পবিত্র কাবাঘর। আল্লাহপাক বলেছেন, ‘এটি আমার ঘর।’ (বাকারা : ১২৫)। মক্কার সাড়ে ৩০০ মাইল (৪৩৬.৬ কিলোমিটার) উত্তরে অবস্থিত সোনার মদিনা, প্রতিটি মোমিনের প্রাণের ঠিকানা। হৃদয়ের সবচেয়ে কাছের অতি আপনজন শুয়ে আছেন মদিনায়। তিনি আল্লাহর নবী হজরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি  মোমিনের কাছে তার নিজের চেয়েও আপন। আল্লাহপাক বলেন, ‘নবী মোমিনদের কাছে তাদের নিজেদের চেয়েও আপনজন এবং তার পতœীরা তাদের মা।’ (আহজাব : ৬)।
দুনিয়ায় মানুষের সবচেয়ে আপন ভাবা হয় মাকে। নবীজির বিবিরা মোমিনদের সেই মা। আর তিনি তাকে পিতা বলতে নিষেধ আছে কোরআন মজিদে। তিনি পিতার চেয়েও দরদি। মোমিনরা কোথাও সামান্য কষ্ট পেলে তিনি বড় ব্যথিত হন। তিনি মোমিনদের বড় হিতাকাক্সক্ষী, মঙ্গলকামী। এমনকি তাদের প্রতি বড় অনুগ্রহশীল ও করুণাপরায়ণ। এ কথা স্বয়ং আল্লাহ তায়ালারÑ ‘অবশ্যই তোমাদের কাছে তোমাদের মধ্য থেকে একজন রাসুল এসেছেন (যিনি তোমাদের প্রতি এতই স্নেহশীল যে) তোমাদের জন্য ক্ষতিকর যে কোনো বিষয় তার কাছে কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের বড় হিতাকাক্সক্ষী। মোমিনদের প্রতি তিনি পরম স্নেহশীল, অতিশয় করুণাপরায়ণ। (তাওবা : ১২৮)।
সেই পেয়ারা নবীকে পাওয়ার ঠিকানা মদিনা। মদিনার আগের নাম ইয়াসরিব। জাহেলি যুগে একটি মূর্তির নামে ছিল এই নাম। হিজরতের পর রাসুলে পাকের আগমনে বদলে যায় এ নাম। মদিনায় শুয়ে আছেন আল্লাহর অফুরন্ত রহমতের প্রতীক রাহমাতুল লিল আলামিন। তাই মদিনা চিরপবিত্র ‘তাইয়্যেবা’, চির আলোকিত ‘মুনওয়ারা’। এখানে আছেন নবীজির কবর শরিফ ‘রওজা মোবারক’। রওজার ওপরে শোভিত গম্বুজ দূর থেকে হৃদয়ে তরঙ্গ জাগায়। মহান আল্লাহর অনন্ত রহমতের নমুনা প্রসারিত আসমান। আকাশের নীল রঙে লোকোচুরি খেলে অগণন রহমত, অনুগ্রহরাজি। সেই রহমতের অজস্র সওগাত নিয়ে নীল আসমান ছোট হয়ে নুয়ে এসেছে মদিনার আকাশে। ওসমানী আমলে আশেকে রাসুল তুর্কি শিল্পীর কল্পনায় সেই আসমান হজরতের পায়ে আদবের চুম্বন এঁকে বসে আছে সবুজ গম্বুজ হয়ে। মোমিনের হৃদয়তন্ত্রীতে সুর তোলে ‘মদিনা মদিনা’ উচ্চারণের ধনি-ব্যঞ্জনা। প্রাণেরা তখন পাখি হয়ে উড়ে উড়ে আশ্রয় নেয় গম্বুজের খোপে খোপে। 
গম্বুজের নিচে মৃত্যুর পারাপার পার হয়ে জীবিত হায়াতুন্নবী (সা.)। দূর দেশ থেকে সালাম দিই, দরুদ পড়ি, সাংবাদিক ফেরেশতারা বয়ে নিয়ে যায় নবীজির রওজায়Ñ যেভাবে বাতাসের ইথারে ধ্বনি ও ছবি ভেসে ভেসে যায় রেডিও, টিভির পর্দায়। তিনি তখন আদুরে ওষ্ঠ দুখানা নেড়ে জবাব দেন গোনাহগার উম্মতের সালামের। নামাজে দু-রাকাত পরপর বৈঠকে ‘আত্তাহিয়্যাতু’তে বলিÑ ‘আসসালামু আলাইকা আইয়ুহানাবিয়্যু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহুÑ আপনার প্রতি সালাম হে নবীজি! আরও বর্ষিত হোক আল্লাহর অফুরান রহমত ও বরকত।’ শেষ বৈঠকে দরুদ পাঠাই তার ও তার বংশের প্রতি। তাতে আল্লাহর দরবারে কবুল হয় আমাদের নামাজ-ইবাদত। মদিনায় আজ সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর কদমে সালাম নিবেদনের সৌভাগ্যে বিনীত সমর্পিত আমার হৃদয়। 
আল্লাহর কোরআনের ঘোষণাÑ শহীদান মরেন না। আল্লাহর তরফ থেকে পান রিজিক, খানাপিনা। শহীদের চেয়ে লাখো কোটিগুণ মর্যাদা আমার নবীজির। তিনি রওজা মোবারকে শায়িত, আমার সালাম শোনেন, সালামের জবাব দেন। রওজা মানে বাগান। হজরত (সা.) বলেছেন, ‘আমার ঘর আর (মসজিদের) মিম্বরের মাঝখানের টুকরো ভূমি বেহেশতের বাগানগুলোর একটি বাগান।’ হজরতের শয়নকক্ষ আমাদের আম্মাজান আয়েশা (রা.) এর ঘরে তিনি শায়িত চিরনিদ্রায়। সেই সূত্রে হজরতের ঘর তথা রওজা আর রওজা সংলগ্ন মসজিদের মিম্বর পর্যন্ত অংশটির নাম বেহেশতের বাগান ‘রিয়াজুল জান্নাহ’। তবে বেহেশতের বনবীথি, নহর ঝরনা এখন দেখা যায় না। দেখা যাবে যখন ইহকালের রূপ বদলে পরকাল হবে। অধুনা প্রায় প্রত্যেকের ঘরে ছোট্ট একটি বাক্স আছে, সামনে আয়না। সে আয়নায় চেহারা দেখা যায় না। কিন্তু যখন বিদ্যুৎ আর নেট এর সংযোগ দিয়ে ক্লিক করা হয়, সমগ্র দুনিয়া যেন হাজির হয় কম্পিউটারের আয়নায়। 
বেহেশতের টুকরা রিয়াজুল জান্নায় রাসুলকে (সা.) দেখা যায় মনের আয়নায়। যেখানে দাঁড়িয়ে তিনি নামাজের ইমামতি করতেন, যে মিম্বরে দাঁড়িয়ে খুতবা দিতেন সেই মেহরাব ও মিম্বরের স্থান চিহ্নিত, সংরক্ষিত। ইতিহাস বলে, হজরত রাসুল (সা.) নামাজে ইমামতি করতেন একটি খুঁটির সম্মুখে। পঞ্চম খলিফায়ে রাশেদা খ্যাত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের (রা.) সময় অর্ধবৃত্ত তোরণ আকৃতির মেহরাব বানানোর উদ্যোগ নেওয়া হয় সেই খুঁটি সামনে রেখে। কিন্তু খুঁটি মাঝখানে নিয়ে মেহরাবের দেয়াল তোলা সম্ভব হচ্ছিল না মাপজোক ঠিক রাখতে গিয়ে। তাই মেহরাবের একগজ পরিমাণ দক্ষিণ-পশ্চিমে বা সামনে ও ডানে রাখা হয় এই খুঁটি। তাতে  ইমাম দাঁড়ানোর জায়গা বাঁয়ে ও পেছনে সরে যায় এবং ঠিক যে স্থানে রাসুলে পাক (সা.) সিজদা দিতেন, তা চলে যায় মেহরাবের দেয়ালের নিচে। ফলে রাসুলে খোদার সিজদার স্থানে কারও পায়ের পাড়া পড়বে না কেয়ামত পর্যন্ত। বর্তমানে যে কেউ মেহরাবের ডান দেয়াল বরাবর নামাজ পড়বে, তার সিজদা পড়বে এমন জায়গায়, যেখানে কদম মোবারক রেখে হুজুর (সা.) নামাজে দাঁড়াতেন। তার পাশে হজরত (সা.) এর মিম্বরের নিচে দাফন হয়েছে সেই শুকনো খুঁটি ‘উস্তুনে হান্নানা’, যা কেঁদে সারা হয়েছিল নবীজির (সা.) বিচ্ছেদে। মসজিদের ভেতরের স্তম্ভগুলোর নিচের অংশ সাদা রং মেখে আলাদা দেখানো হয়েছে রিয়াজুল জান্নাহর চৌহদ্দি। নিচে সাদা কার্পেটের বিছানায় বেহেশতের পরশ পাওয়া যাবে সিজদায় গিয়ে। তুর্কি শিল্পীরা স্তম্ভগুলোর গায়ে মনের সবটুকু আবেগ ঢেলে লিখে দিয়েছেন আলাদা আলাদা নাম। 
ফারসি উস্তুন বা সতুন এর আরবি উচ্চারণ উস্তুয়ানা। রওজা মোবারক সংলগ্ন স্তম্ভটির গায়ে লেখা ‘উস্তুয়ানায়ে আয়েশা’। এখানে হজরত (সা.) রমজানে ইতেকাফ নিতেন। আছে ‘উস্তুয়ানাতুল উফুদ’Ñ বাইরে থেকে আসা প্রতিনিধি দলকে সাক্ষাৎ দিতেন আল্লাহর নবী এখানে বসে। আরও আছে বনি কুরাইজার বিরুদ্ধে অভিযানে নবীজির আদেশ পালনে সামান্য বিচ্যুতির অনুশোচনায় দগ্ধ সাহাবি আবু লুবাবা (রা.) নিজেকে মসজিদের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখার স্থান। আল্লাহর পক্ষ থেকে তার তওবা কবুল হওয়ার ঘোষণা এলে নবীজি নিজ হাতে খুলে দেন তার বাঁধন। সেই খুঁটির নাম ‘উস্তুয়ানায়ে তওবা’। মসজিদের ভেতরে উঁচু ভিটিতে চিহ্নিত আছে ইসলামের জন্য ঘর-সংসার ত্যাগী গরিব সাহাবিদের অবস্থানস্থল ‘সুফফা’। রিয়াজুল জান্নায় মিম্বরের পেছনে বর্ধিত মসজিদ আগে ছিল আমাদের মায়েদের বসতবাড়ি। 
রওজা আকদাসে নবীজির (সা.) পাশে শায়িত তার চিরসাথী ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। তবে কবরস্থ করতে আদবের খাতিরে তার মাথা রাখা হয়েছে হজরত (সা.) এর কাঁধ বরাবর। দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) আততায়ীর হাতে শহীদ হলে আদবের লেহাজ করে তাকেও দাফন করা হয় প্রথম খলিফার কাঁধ বরাবর মাথা রেখে। রওজা শরিফের জালিতে পরপর সোনায় মোড়া তিনটি ছিদ্রের সামনে এলে সরাসরি তাদের মুখোমুখি হওয়ার সৌভাগ্যে তরঙ্গায়িত হবে আপনার হৃদয়-মন। বেরিয়ে যেতে সামনের দরজাটি বাবে জিবরাইল, যেখান দিয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহি নিয়ে দরবারে রেসালতে হাজির হতেন ফেরেশতা জিবরাইল (আ.)। মসজিদ থেকে বের হলে সামনে পড়বে ‘জান্নাতুল বাকি’ যে কবরস্থানে শায়িত অগণিত সাহাবি, তাবেয়ি, ইমাম ও মুত্তাকিন (রহ.)।  
মদিনার বাতাসে খুশবু ভাসে প্রিয় নবীজির। মদিনায় গেলে পরিচয় মেলে সমগ্র ইসলামের। অদূরে উহুদ প্রান্তর, খন্দকের যুদ্ধের পরিখা, আরও দূরে বদরের রণাঙ্গন, প্রতি শনিবার আল্লাহর নবী নামাজ পড়তে যেতেন যেখানে, সেই মসজিদে কুবা, হজরতের প্রিয় আজওয়া খেজুরের বনবীথি এবং  আরও অনেক স্মৃতি। যদিও ছোট মনের বিদ্বেষীদের হিংসার শিকার হয়ে মদিনার ইতিহাসের অনেক অমূল্য নিদর্শন হারিয়ে গেছে। তারপরও মদিনা ইসলামের জীবন্ত ইতিহাস। ইতিহাসের এই পীঠস্থানে দাঁড়িয়ে রাসুলে পাকের কদমে যে সালাম নিবেদন করবে আর বাকি জীবন সেই অঙ্গীকার পালন করবে, তার জন্য রয়েছে রাসুলে পাক (সা.) এর শাফায়াত (সুপারিশ) এর ওয়াদা, আছে বেহেশতের সুসংবাদ।


ফুলে ফুলে সুরভিত দেশ
ফুল ভালোবাসার প্রতীক। সৌন্দর্যের আলয়। স্নিগ্ধতার পেলব স্পর্শ। মানুষমাত্রই ফুলের
বিস্তারিত
প্রকৃতির বিশালতায় জীবনের উপকরণ
পাখির সুমধুর মিষ্টি গান শুনে সত্যের জয়গান গাওয়া শিখতে পারি।
বিস্তারিত
দোয়া করলে আল্লাহ খুশি হন
আল্লাহ তায়ালা মোমিন বান্দার সবচেয়ে আপনজন। তাঁর আপনজন কোনো কিছু
বিস্তারিত
রাস্তার পাশের গাছ কাটা
প্রশ্ন : আমাদের এলাকার কিছু লোককে দেখেছি, তারা এলাকার নেতাদের
বিস্তারিত
রক্তনেশার আক্রোশে ইদলিব : তারপর
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আভাস জোরেশোরেই দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। বিশ্বযুদ্ধের অবয়ব কী? সিরিয়ায়
বিস্তারিত
ইমাম বোখারির আসনে যুগের বোখারির দরস
আলোচনায় তিনি বলেন, ‘ইমাম বোখারি এ ভূমিতেই বেড়ে উঠেছেন। এখানেই
বিস্তারিত