হজ-পরবর্তী জীবন কেন পাপমুক্ত হয় না

হজ ইসলামি শরিয়তের একটি অন্যতম ভিত্তিমূল। বিচিত্র বিষয় হলোÑ হজ সবার ওপর ফরজ নয়, শুধু শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত সামর্থ্যবানদের ওপরই এটি ফরজ। যারা হজব্রত পালনের তৌফিক পান, এটি তাদের জন্য এক অনন্য সৌভাগ্য; মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অপার দান। কারণ এ তৌফিক সবার হয় না। মহান আল্লাহর দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে, তিনি হজের মতো একটি কল্যাণকর ইবাদত সামর্থ্যবানদের ওপর ফরজ করেছেন; যা হাজীকে ধারাবাহিক পুণ্যবান হতে সাহায্য করে। প্রকৃতপক্ষে পুরো বছরের মধ্যে রমাজানুল মোবারকে মাসব্যাপী সিয়াম সাধনাকে ফরজ করে আল্লাহ তায়ালা যেমনিভাবে মানবজাতিকে ধৈর্য, সংযম ও খোদাভীতির এক অনন্য সবক দিয়েছেন, তেমনিভাবে সামর্থ্যবানদের ওপর জীবনে একবার হজ ফরজ করে দয়মায় তাঁর বান্দাদের প্রভুপ্রেমের এক মহান প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন।

মুসলিমদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, সম্মিলন, সেতুবন্ধন ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠায় হজ একটি অনন্য মাধ্যম; বেনজির ইবাদত। হজের মাধ্যমে হাজীদের একদিকে সুযোগ হয় রবের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার মাহেন্দ্রক্ষণ, অন্যদিকে হজ মৌসুমের পুরো সময়কালে ভ্রাতৃত্ব ও আত্মত্যাগের এক সুমহান সবক পায় প্রত্যেক হাজী। এছাড়া মসজিদুল হারামে হাজরে আসওয়াদ, মুলতাজাম, জমজম কূপ ও মাতাফসহ কাবার প্রতিটি স্থানই হাজীকে আল্লাহর নৈকট্যলাভের দিকে টানতে থাকে । আরাফা, মুজদালিফা, মিনা, জাবালে রহমত ও হেরা গুহাসহ আল্লাহকে চিনিয়ে দেওয়ার এসব পবিত্র স্থানগুলো হাজীর কলবে এনে দেয় এক আধ্যাত্মিক চেতনা। আল্লাহকে চেনার এসব নিদর্শনাবলিকে যে কেউ পরিপূর্ণ শ্রদ্ধাভরে অবলোকন ও প্রদক্ষিণ করবে, আল্লাহ তার হৃদয়কে খোদাভীতি দিয়ে প্রাচুর্যপূর্ণ করে দেবেন। (সূরা হজ : ৩২)। 
অন্যদিকে আমাদের সমাজে একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, হাজী সাহেব মানেই সাচ্ছা-পাক্কা ইমানদারÑ নিষ্কলুষ খাঁটি মানুষ। হাজী সাহেব মানেই গোনাহমুক্ত, নির্ভেজাল ও নিরেট একজন কামেল ইনসান। এই সুধারণা আর প্রত্যাশার কারণেই হাজী সাহেব কোনো অসংগত বা গর্হিত কাজকর্মে জড়িয়ে পড়লে মানুষ তাকে একহাত নেয়, নেহাত বাজে রকমের ভর্ৎসনা দেয়Ñ এমনকি ইসলামের অন্যতম ভিত্তিমূল হজকেই দোষারোপ করতে শুরু করে কেউ কেউ।
এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, হাজী সাহেবকে যে মানুষ নিষ্পাপ ভাবে, এই ভাবনাটা এমনি এমনি আসেনি মানুষের ভেতর, বরং এটি হাদিস থেকে আহরিত ধারণা। এরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি হজ করল আর যৌনতা বা নিষিদ্ধ (হজ মৌসুমে) কোনো গোনাহের কাজে জড়িত হলো না, সে হজ থেকে নবজাতক শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে বাড়ি ফেরে।’ (বোখারি : ১৫২১, মুসলিম : ১৩৫০)।
এছাড়া সূরা বাকারার ১৯৭নং আয়াতেও একই কথা বলা হয়েছে, রাব্বুল আলামিন ঘোষণা করেছেনÑ ‘যে ব্যক্তি হজের মৌসুমে হজ করার নিয়ত করে অর্থাৎ ইহরাম বেঁধে ফেলে, তার জন্য যৌনকার্য, অশোভন কাজ ও ঝগড়াবিবাদ জায়েজ নেই।’ এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, হাজী সাহেবের হজ পরিপূর্ণ ত্রুটিমুক্ত হলেই তিনি পাপমুক্ত হবেন বলে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং যেমনিভাবে সব হাজী সাহেবের হজ ত্রুটিমুক্ত নয়, তেমনিভাবে সব হাজী সাহেবের হজ-পরবর্তী জীবনও ত্রুটিমুক্ত হয় না।
দ্বিতীয়ত, প্রত্যক মানুষ তার আমলের ইহকালীন ও পরকালীন ফায়দা তখনই পাবে, যখন সংশ্লিষ্ট আমলের জন্য তার নিয়ত বিশুদ্ধ হবে। সুতরাং শুধু আল্লাহর হুকুম পালন ও তাকে সন্তুষ্ট করার নিয়ত ছাড়া যে হজ হবে, সে হজ নিয়তে গলদ থাকার কারণে হাজীকে ধারাবাহিক পুণ্যবান হতে সাহায্য করবে না। এরশাদ হয়েছে, ‘প্রত্যেক আমলই নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (বোখারি, খ- : ১, পৃ: ১)। শুধু হজই নয়, সব আমলকে আল্লাহ তায়ালা বিশুদ্ধ নিয়তে সম্পাদন করার নির্দেশ দিয়েছেন। এরশাদ হয়েছে, ‘মানুষকে শুধু খালেছ আল্লাহর জন্যই বিশুদ্ধ নিয়তে ইবাদত করার হুকুম দেওয়া হয়েছে।’ (সূরা বাইয়িনাহ : ৫)। 
তৃতীয়ত, অনেকেই হাজীদের দোষারোপ করতে গিয়ে পুরো হজের বিধানটাকেই খাটো করা শুরু করে দেয়, এটা নিছক অজ্ঞতা থেকেই মানুষ করে। কারণ কোনো একজন মানুষের ব্যক্তিগত কাজকর্ম বা নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষের কর্মকা-ের কারণে একটা খোদায়ি বিধানকে খাটো করা অযৌক্তিক। বিষয়টা বোঝানোর জন্য সহজ একটা উদাহরণ দেয়া যাকÑ ধরুন আপনি আপনার শারীরিক কোনো সমস্যার কারণে ‘হেলথকেয়ার’ কোম্পানির ওষুধ সেবন করলেন, সেটা আপনার রোগ কমাতে ব্যর্থ হলো। অথচ একই ওষুধ একই রোগের জন্য হাজারো রোগীকে সুস্থ করে তুলতে সহায়ক হচ্ছে। সুতরাং আপনি একটি ট্যাবলেট কাজ না করার কারণে পুরো কোম্পানিকেই দোষ দিতে পারেন না। কারণ, হতে পারে আপনার রোগের ধরন আলাদা, আপনাকে ওই ওষুধের সঙ্গে আরও কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তদ্রƒপ সব হাজীর রিপুর গতি ও অবস্থা একইরকম থাকে না। হজ ছাড়া আরও কিছু বিশেষ আমলের প্র্যাকটিস নিয়মিত করলে, কিছু নিষিদ্ধ কাজ বর্জন করলে হাজী সাহেব পাপমুক্ত জীবনযাপনে অভ্যস্ত হতে পারবেন বলে আশা রাখি। 
চতুর্থত, নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাতÑ সবগুলো ইবাদতই ফরজ। আর সব ফরজ ইবাদত পালন করারই দাবি হলো গোনাহমুক্ত হয়ে যাওয়া। শুধু হজের পরে গোনাহমুক্ত হতে হবে, বিষয়টা এমন নয়। নামাজের ব্যাপারে তো সরাসরি কোরআনেই ঘোষণা আছে যেÑ ‘নামাজ যাবতীয় মন্দ ও গর্হিত কাজ থেকে নামাজিকে বাঁচিয়ে রাখে।’ (সূরা আনকাবুত : ৪৪)। 
তারপরও তো আমরা অনেক পাক্কা নামাজিকে পাপকর্মে লিপ্ত দেখি। এখানেও ওই একই কারণ, নামাজিকে তার নামাজ তখনই যাবতীয় নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত রাখবে, যখন তার নামাজ ইসলামি শরিয়ত কর্তৃক আরোপিত সব শর্তাবলি ঠিক রেখে, খালেছ নিয়তে পড়া হবে। কেউ অসম্পূর্ণ নামাজ পড়ে যদি অবৈধ কাজকর্ম থেকে বিরত থাকতে না পারে, আর নামাজকে দোষ দেয়, তাহলে সে অযৌক্তিক ও অবাস্তব বিষয়ের চর্চা করে। তেমনিভাবে কেউ হারাম মাল দ্বারা বা পাপযুক্ত অথবা লোকদেখানোর নিয়তে হজ করলে সে ধারাবাহিক পুণ্যবান হবে না, এটাই স্বাভাবিক। 
সবশেষ কথা হলো, আল্লাহর হুকুম মানার সম্পর্ক হলো ঈমানের সঙ্গে। যেমন আমি হজ করেছি, এ জন্যই আমাকে ভালো থাকতে হবে, আর অন্যরা যা খুশি তাই করে বেড়াবে, বিষয়টা কখনোই এমন নয়। আমি মুসলমান, আমি ঈমানদারÑ এই মুসলিম হওয়া আর ঈমানদার হওয়ার দাবিই হলো পাপমুক্ত জীবনযাপন করা। হজ করার তৌফিক হলেও আমাকে গোনাহ থেকে বেঁচে থাকতে হবে আর হজ করার তৌফিক না হলেও আমাকে আল্লাহর হুকুম মেনে চলতে হবে। আল্লাহ এরশাদ করেছেন, ‘হে ঈমানদাররা তোমরা আল্লাহকে যথার্থরূপে ভয় করো এবং পরিপূর্ণ মুসলিম না হয়ে কবরে এসো না।’ (সূরা আলে ইমরান : ১০২)।


মনের জমিনের বিষাক্ত চারাগাছ
ফিলিস্তিনে মসজিদুল আকসা নির্মাণ করেন আল্লাহর নবী দুনিয়ার বাদশাহ হজরত
বিস্তারিত
ইসলামে মানবজীবনের দায়িত্ব
দায়িত্ব ও দায়িত্ববোধ ইসলামের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। এখানে প্রত্যেকেই তার
বিস্তারিত
মোজেজার তাৎপর্য
  মোজেজা চিরন্তন রীতিবহির্ভূত হতে হবে। অতএব কোনো ব্যক্তি যদি রাতের
বিস্তারিত
ঘোরতর অসুস্থ ব্যক্তির কালেমা পাঠের
  কালেমা অর্থ হলো ঈমান বা বিশ্বাস। যিনি আসমান, জমিন, জিন
বিস্তারিত
নবীপ্রেমের অনুসরণীয় উপমা
চুনতির শাহ হাফেজ আহমদ (রহ.) কখনও স্বাভাবিক মানুষের  মতো কথাবার্তা
বিস্তারিত
নামাজে বসার সুন্নতগুলো
নামাজের অন্যতম আমল বৈঠক বা বসা। দুই রাকাত বিশিষ্ট নামাজে
বিস্তারিত