ঋণের গ্যারান্টি : শরয়ি বিশ্লেষণ

পণ্য ক্রেতার হস্তগত হওয়ার পর বিক্রেতাকে একই পণ্য বন্ধক হিসেবে দিতে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। এ বিষয়ে অনেক দলিল রয়েছে। ফাতাওয়া হিন্দিয়াতে রয়েছে, ‘আমাদের ফুকাহায়ে কেরামের অভিমত হলোÑ মূল্য আদায়ের লক্ষ্যে বিক্রেতার জন্য বিক্রীত পণ্য আটকে রাখা জায়ে

ন্যাশনাল ব্যাংক, ইরান

মানবতার ধর্ম ইসলামে একদিকে যেমন সুদভিত্তিক ঋণকে হারাম করা হয়েছে, অন্যদিকে মানুষের হিত সাধনের লক্ষ্যে বিনিময়হীন ঋণ দেওয়ার প্রতিও উৎসাহিত করা হয়েছে। এরশাদ হচ্ছে, ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য সুদ হারাম করেছেন।’ (সূরা বাকারা : ২৭৫)। সুদভিত্তিক ঋণের বিকল্প হিসেবে করজে হাসানার বিধান প্রবর্তন করে এরশাদ হয়েছে, ‘কে আছে আল্লাহকে দেবে উত্তম ঋণ? তাহলে তিনি বহুগুণে একে বৃদ্ধি করবেন এবং তার জন্য রয়েছে সম্মানজনক পুরস্কার।’ (সূরা হাদিদ : ১১)।
কিন্তু মানুষের মধ্যে দ্বীনদারি কমে যাওয়ার কারণেই ঋণ নিয়ে সময়মতো পরিশোধ করে না অনেকে। তাই বাধ্য হয়ে ঋণের গ্যারান্টি নিতে হয়। ইসলামি ফিকহের দৃষ্টিতে ঋণের গ্যারান্টির দুটি সুরত বা পদ্ধতি হতে পারে। এক. বন্ধক রাখা। দুই. কোনো ব্যক্তিকে গ্যারান্টার বা জিম্মাদার পেশ করা। আমরা বাকিতে বা কিস্তিতে কোনো কিছু খরিদ করলে বিক্রেতার কাছে ঋণী হয়ে যাই। বিক্রেতা ইচ্ছা করলে আমাদের কাছ থেকে ঋণের গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তাস্বরূপ বন্ধক রাখা বা কোনো ব্যক্তিকে জিম্মাদার পেশ করার দাবি করতে পারেন। বিশেষ করে শহরের জীবনে যারা ভাড়া বাসায় বসবাস করেন, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্ব বহন করে। কারণ দেখা যায়, বাকিতে দোকান থেকে পণ্য নিয়ে কিংবা কিস্তিতে কোনো পণ্য খরিদ করে বাসা পরিবর্তন করে ফেলে অনেকে ঋণ থেকে বাঁচতে চান। সেক্ষেত্রে ঋণের গ্যারান্টি দাবি করাটা বিক্রেতার জন্য এক ধরনের অধিকারে পরিণত হয়ে যায়। 
ঋণের গ্যারান্টি প্রদান দুইভাবে হতে পারে। এক. নিজের মালিকানাধীন কোনো বস্তুকে পাওনাদার তথা বিক্রেতার কাছে বন্ধক রাখা। দুই. তৃতীয় কোনো ব্যক্তিকে জিম্মাদার হিসেবে উপস্থিত করা। যিনি হতে পারেন তার বাড়িওয়ালা, সমাজের গণ্যমান্য কোনো ব্যক্তি কিংবা পরিচিত কেউ। 
গ্যারান্টি হিসেবে আমরা যখন নিজের মালিকানাধীন কোনো জিনিস বন্ধক রাখব, তখন বন্ধকের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিছু শরয়ি হুকুম জানা একান্ত অপরিহার্য। 
বন্ধকের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি হলো, বন্ধকি জিনিস দ্বারা উপকৃত হওয়া জায়েজ নয়। কারণ তা সুদের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং বন্ধকি জিনিস বিক্রেতা তথা পাওনাদারের জন্য ব্যবহার করা বা কোনোভাবে উপকৃত হওয়া জায়েজ হবে না। বন্ধক রাখা হয় মূলত ক্রেতা তথা দেনাদারের ওপর নির্দিষ্ট সময়ে ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে মানসিক চাপ সৃষ্টি করার জন্য। 
নির্দিষ্ট সময়ে যদি দেনাদার ঋণ পরিশোধ না করে পাওনাদারের জন্য তখন বন্ধকি জিনিস বিক্রি করে নিজের পাওনা উসুল করে নেওয়া বৈধ। তবে বিক্রীত মূল্য যদি নিজের পাওনার চেয়ে বেশি হয়ে যায়, অতিরিক্ত অংশ দেনাদারকে ফেরত দিতে হবে। 
এখানে একটি প্রশ্ন দাঁড়ায়, বিক্রেতার জন্য ঋণের গ্যারান্টিস্বরূপ ক্রেতার কাছ থেকে অন্য কিছু বন্ধক না নিয়ে স্বয়ং বিক্রীত পণ্যটিকে নিজের কাছে আটকে রাখা জায়েজ হবে কি না? 
মনে রাখা প্রয়োজন, বিক্রীত পণ্য বিক্রেতার কাছে আটকে রাখার দুটি সুরত হতে পারে। এক. মূল্য আদায়ের জন্য আটকে রাখা। দুই. বিক্রীত পণ্যটিই বিক্রেতার কাছে বন্ধক হিসেবে রেখে দেওয়া। 
মূল্য আদায়ের জন্য আটকে রাখা আর বন্ধক হিসেবে আটকে রাখার মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য হলোÑ মূল্য আদায়ের জন্য আটকে রাখলে তা বিক্রেতার হাতে বিক্রীত মূল্যে দায়বদ্ধ থাকে। সুতরাং বিক্রেতার কাছে পণ্যটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা ধ্বংস হলে তার জন্য বিক্রেতার ক্রেতাকে কোনো ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না। সেক্ষেত্রে বিক্রয় চুক্তি বাতিল বলে গণ্য হবে। 
আর বন্ধক হিসেবে আটকে রাখলে তা দুইভাবে হতে পারে। এক. ক্রেতা পণ্যটি হস্তগত করার পর আবার বিক্রেতার কাছেই তা বন্ধক হিসেবে প্রদান করবেন। দুই. পণ্যটি ক্রেতার হস্তগত করা ছাড়াই বিক্রেতা নিজের কাছে রেখে দেবেন। এই পদ্ধতি জায়েজ নেই। কারণ বাকিতে বেচাকেনায় বিক্রেতার জন্য পণ্য আটকে রাখা জায়েজ নয়। কারণ বাকি বেচাকেনা মানেই হলো পণ্য অগ্রিম দেবে আর মূল্য পরে নেবে। তাই বাকিতে বেচাকেনায় পণ্য আটকে রাখার বিষয়টি আসে না। তবে কোনো ক্ষেত্রে এমন হতে পারে, কোনো বিশেষ পণ্যের প্রতি ক্রেতার বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে। ক্রেতা তা হারানোর ভয়ে তা কিনে মূল্য পরিশোধ করা পর্যন্ত বিক্রেতার কাছেই রেখে দিতে চায়। ক্রেতা পণ্যটি কিনে হস্তগত করার পর যদি বিক্রেতার কাছে বন্ধক হিসেবে রেখে দিতে চায় তবে তাতে কোনো সমস্যা নেই। আর এমনিতেই যদি বিক্রেতার কাছে রেখে দেয় তবে তা জায়েজ হবে না। 
পণ্য ক্রেতার হস্তগত হওয়ার পর বিক্রেতাকে একই পণ্য বন্ধক হিসেবে দিতে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। এ বিষয়ে অনেক দলিল রয়েছে। ফাতাওয়া হিন্দিয়াতে রয়েছে, ‘আমাদের ফুকাহায়ে কেরামের অভিমত হলোÑ মূল্য আদায়ের লক্ষ্যে বিক্রেতার জন্য বিক্রীত পণ্য আটকে রাখা জায়েজ আছে। কিন্তু বাকিতে বেচাকেনায় জায়েজ নয়। মূল্য আদায়ের আগেও নয়; মূল্য আদায়ের পরেও নয়।’ (ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ৩/১৫)।
তবে এজাতীয় বন্ধক জায়েজ হওয়ার জন্য শর্ত হলোÑ বিক্রয় চুক্তির সময় বন্ধক রাখার শর্ত থাকতে পারবে না। বরং বিক্রয় চুক্তিটা তার স্বাভাবিক গতিতেই সম্পন্ন হবে। এরপর বন্ধক চুক্তি আলাদা হবে। তবে বিক্রয় চুক্তির সময় যদি বন্ধক রাখার শর্ত থাকে, তাহলে সেই চুক্তি জায়েজ হওয়ার ব্যাপারে আল্লামা ইবনে কুদামা (রহ.) ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তিনি তার লিখিত কিতাব আল-মুগনিতে বলেছেনÑ ‘বিক্রেতা আর ক্রেতা যদি এই শর্তে বিক্রয় চুক্তি সম্পাদন করে যে, বিক্রীত পণ্য বিক্রেতার কাছেই মূল্যের বিনিময়ে বন্ধক থাকবে, তাহলে এই চুক্তি জায়েজ হবে না। আল্লামা ইবনে হামেদ (রহ.) এই মত উল্লেখ করেছেন। আর এটিই হলো ইমাম শাফি (রহ.) এর অভিমত। কেননা যখন বিক্রীত পণ্য বিক্রেতার কাছে রাখার শর্ত করা হয়েছে, তখন এই পণ্য ক্রেতার নিয়ন্ত্রণে আসেনি।’ তবে জাহিরুর রিওয়ায়াহ অনুযায়ী এজাতীয় বন্ধকও জায়েজ হবে বলে ফতোয়া রয়েছে। তাই পরবর্তীকালের ওলামায়ে কেরাম জায়েজ হওয়ার পক্ষে ফতোয়া দিয়ে থাকেন। (বুহুস ফি কাদায়া ফিকহিয়্যাহ মুআসিরাহ : ১/১২)।


সম্পাদক, মাসিক আলহেরা (আরবি ম্যাগাজিন)


মনের জমিনের বিষাক্ত চারাগাছ
ফিলিস্তিনে মসজিদুল আকসা নির্মাণ করেন আল্লাহর নবী দুনিয়ার বাদশাহ হজরত
বিস্তারিত
ইসলামে মানবজীবনের দায়িত্ব
দায়িত্ব ও দায়িত্ববোধ ইসলামের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। এখানে প্রত্যেকেই তার
বিস্তারিত
মোজেজার তাৎপর্য
  মোজেজা চিরন্তন রীতিবহির্ভূত হতে হবে। অতএব কোনো ব্যক্তি যদি রাতের
বিস্তারিত
ঘোরতর অসুস্থ ব্যক্তির কালেমা পাঠের
  কালেমা অর্থ হলো ঈমান বা বিশ্বাস। যিনি আসমান, জমিন, জিন
বিস্তারিত
নবীপ্রেমের অনুসরণীয় উপমা
চুনতির শাহ হাফেজ আহমদ (রহ.) কখনও স্বাভাবিক মানুষের  মতো কথাবার্তা
বিস্তারিত
নামাজে বসার সুন্নতগুলো
নামাজের অন্যতম আমল বৈঠক বা বসা। দুই রাকাত বিশিষ্ট নামাজে
বিস্তারিত