সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্প পাক যথাযথ গুরুত্ব

বাংলাদেশে কাঁচা চামড়ার বার্ষিক চাহিদার প্রায় শতকরা ৪৫ ভাগ আসে কোরবানির পশু থেকে। কিন্তু সরকার কর্তৃক বাড়তি সুযোগসুবিধা গ্রহণ করা সত্ত্বেও ট্যানারি ব্যবসায়ীরা চলতি বছরের কোরবানির চামড়া নিয়ে অবহেলা ও অপেশাদার আচরণ করছে। দুই সপ্তাহ অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরও এবারের কোরবানির পশুর চামড়া এখনও সংগ্রহ করা শুরু করেনি। এটি তাদের চরম অসাধুতার প্রমাণ

অর্থনীতিতে সম্ভাবনাময় বড় একটি খাত হলো চামড়া শিল্প। চামড়া, চামড়ার জুতা ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে কোটি কোটি ডলার আয় করছে বাংলাদেশ। চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্যের বিশ্ব রপ্তানি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। বাংলাদেশ থেকে প্রধানত ইতালি, নিউজিল্যান্ড, পোল্যান্ড, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, জার্মানি, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়। আরও বেশকিছু দেশে বাংলাদেশ থেকে চামড়াজাত পণ্য রপ্তানির সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে।

মানুষ আদিকাল থেকেই চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ব্যবহার করে আসছে। পূর্বযুগে মানুষ চামড়া দিয়ে তাঁবু, খিমা ও ছাউনি তৈরির কাজ করত। বসার পাটি ও ফ্লোর মেট্রেসের জোগান মিটত এ চামড়া দিয়েই। ওয়েলক্লথ, টেবিলক্লথ, দস্তরখান, জায়নামাজ, পানির মশক ও বালিশের কাভার ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ দ্রব্যও চামড়া দিয়েই বানানো হতো। এদিকে ইঙ্গিত করেই কোরআনুল কারিমে দয়াময় রব এরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য পশু-চামড়ার তাঁবুর ব্যবস্থা করেন, তোমরা ভ্রমণকালে এবং অবস্থানকালে তাকে সহজ মনে করো। আর তিনি তোমাদের জন্য ব্যবস্থা করেন এগুলোর পশম, লোম ও কেশ থেকে ক্ষণস্থায়ী গৃহসামগ্রী ও ব্যবহার্য উপকরণ।’ (সূরা নাহল : ৮০)।

শীতের পোশাক হিসেবে চামড়ার জ্যাকেট, টুপি ও মোজার প্রচলন আদিম যুগ থেকেই শুরু হয়েছে। এগুলো আজকের অধুনাবিশ্বেও হটকেকের আসন দখল করে আছে। শীতপ্রধান দেশগুলোয় চামড়ার জ্যাকেট, টুপি ও মোজার কদর বেশ তুঙ্গে। যেসব দেশে অতিরিক্ত বরফ পড়ে, সেসব দেশের মানুষ চামড়ার তৈরি শীতবস্ত্রের মাধ্যমেই উষ্মতা গ্রহণ করেন। তদুপরি বরফের মধ্যে চলাফেরার ক্ষেত্রে চামড়ার তৈরি পোশাক ওয়াটারপ্রুফ পোশাকের কাজ দেয়। অথচ বরফে আচ্ছাদিত অঞ্চলে অন্য যে-কোনো পোশাক নিয়ে চলাফেরা করা নিতান্তই দুরূহ ব্যাপার। এ মর্মে কোরআনের সূরা নাহলের ৬নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন, ‘তিনিই সৃষ্টি করেছেন চতুষ্পদজন্তু, এতে তোমাদের জন্য শীতবস্ত্রের উপকরণ রয়েছে; অন্যান্য উপকারও রয়েছে।’ 

সঠিক প্রক্রিয়ায় চামড়া সংরক্ষণ, সরকারি মনিটরিং ও ট্যানারি ব্যবসায়ীদের যথার্থ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে চামড়া শিল্পে বাংলাদেশ আরও এগিয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। এটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হলেও চামড়া শিল্প অনেকটা অবহেলা-অযতœ ও অপরিকল্পিতভাবে এগিয়ে চলেছে। যথাযথ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও তদারকি পেলে গার্মেন্ট শিল্পের মতো এটিও হতে পারে আরেকটি শক্তিশালী রপ্তানি খাত। জানা যায়, ১৯৪০ সালে নারায়ণগঞ্জে প্রথম ট্যানারি স্থাপন

করে চামড়া প্রক্রিয়াকরণ ব্যবসা শুরু হয়। এরপর আরও বেশ কয়েকটি ট্যানারি গড়ে উঠেছিল সেখানে। ১৯৫১ সালে সরকারি গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ভূমি অধিগ্রহণ করে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকার হাজারীবাগে স্থানান্তর করা হয় ট্যানারি। বর্তমানে দেশে ট্যানারির সংখ্যা ২৭০টি। ৬৭ বছর ধরে চামড়া শিল্পের কার্যক্রম চলছে। এ সময়ে চামড়া শিল্পের যে প্রসার হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। বিদেশি ক্রেতাদের দাবি, চামড়া শিল্পের পরিবেশের উন্নতি করতে হবে, তা না হলে তারা বাংলাদেশ থেকে চামড়া কিনবেন না। যার পরিপ্রেক্ষিতে হাজারীবাগ থেকে সাভারের হরিণধারায় ট্যানারি শিল্পকারখানা স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার। এরই মধ্যে সাভারে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরের কাজের যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমানে দ্রুততার সঙ্গে কাজ চলছে।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১৯৯০-এর দশকে এ শিল্পে বার্ষিক গড় রপ্তানি আয় ছিল ২২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১০-১১ অর্থবছরে চামড়া রপ্তানি থেকে আয় হয় ২৯৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং চামড়াজাত পণ্য থেকে আয় হয় ৫৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১১-১২ সালে এ খাতে মোট রপ্তানি আয় দাঁড়ায় ৭৬৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১২-১৩ অর্থবছরে এ শিল্পের রপ্তানি আয় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি

হয়েছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এ খাতে আয় হয় ১১২ কোটি ৪১ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ১১৩ কোটি ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করা হয়। তারপর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে আয় হয় ১১৬ কোটি ৯ লাখ ৫০ হাজার ডলার এবং সদ্যসমাপ্ত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ দশমিক ১৫ শতাংশ বেশি। এতে দেখা যায়, প্রতি বছরই এ খাতে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে রপ্তানি আয় ও পণ্যের পরিমাণ। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে চামড়ার পাশাপাশি জুতা, ট্রাভেল ব্যাগ, বেল্ট ও মানিব্যাগ বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। এছাড়া চামড়ার তৈরি নানা ফ্যান্সি পণ্যের চাহিদাও রয়েছে। বাংলাদেশে প্রচুর হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠান আছে, যারা এসব পণ্য তৈরি করে বিশ্ব বাজারে রপ্তানি করছে।

বিশেষভাবে উল্লেখ্য, সরকার রপ্তানি নীতিতে ২০১২-১৫ সালে এ খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত হিসেবে ঘোষণা দিয়ে বাস্তবধর্মী নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছ। ফলে এ খাত যেসব সুবিধা পাবে, তা হলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কম সুদহারে প্রকল্প ঋণ দেওয়া, আয়কর রেয়াত, বিদ্যুৎ, পানি-গ্যাস ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার নিয়মের সঙ্গে সংগতি রেখে সম্ভাব্য আর্থিক সুবিধা বা ভর্তুকি দেওয়া, সহজ শর্তে রপ্তানি ঋণ দেওয়া, বন্ড সুবিধা অবকাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক ও করিগরি সুবিধা সম্প্রসারণ বহির্বিশ্বে বাজার খুঁজতে সহায়তা দেওয়া, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা ইত্যাদি।

অন্যদিকে বাংলাদেশে কাঁচা চামড়ার বার্ষিক চাহিদার প্রায় শতকরা ৪৫ ভাগ আসে কোরবানির পশু থেকে। কিন্তু সরকার কর্তৃক বাড়তি সুযোগসুবিধা গ্রহণ করা সত্ত্বেও ট্যানারি ব্যবসায়ীরা চলতি বছরের কোরবানির চামড়া নিয়ে অবহেলা ও অপেশাদার আচরণ করছে। দুই সপ্তাহ অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরও এবারের কোরবানির পশুর চামড়া এখনও সংগ্রহ করা শুরু করেনি। এটি তাদের চরম অসাধুতার প্রমাণ। এভাবে একটি রাষ্ট্রীয় বড় সম্ভাবনাময় শিল্প খাতের কাঁচামালকে দ্রুত সংরক্ষণ না করা নিম্নরুচির অপেশাদারিতা। 

অথচ সঠিক ব্যবস্থাপনা, বাজার মনিটরিং, দ্রুত সংরক্ষণ, পরিবহন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে এ খাতের বিভিন্ন স্তরে ব্যবসায়ীরা লাভবান হতে পারেন এবং উন্নতমানের চামড়া প্রস্তুত করা সম্ভব। শুধু চামড়া উৎপাদন নয়, বহুমুখী চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনে উদ্যোক্তাদের আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে।


রহমতের নবী (সা.) ও হিলফুল
‘আমি তো আপনাকে বিশ^জগতের প্রতি শুধু রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি।’ (সূরা
বিস্তারিত
বিশ্বনবী : আঁধারে আলোর পরশ
পৃথিবী। মানব সৃষ্টির আগে যার সৃষ্টি। সৃষ্টিকর্তা মানুষকে পাঠানোর আগে
বিস্তারিত
সেই ফুলেরই খুশবুতে
ভালোবাসা পবিত্র জিনিস। ফুল পবিত্রতার প্রতীক। ফুল দিয়ে ভালোবাসা বিনিময়
বিস্তারিত
নবীজির ১০টি বিশেষ উপদেশ
নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন বিশ্ববাসীর রহমতস্বরূপ। আজীবন মানুষের
বিস্তারিত
সৃষ্টির সেরা আদর্শ
সূর্যের আলো থেকে মানুষ বেঁচে থাকার উপাদান পেলেও মানুষ হওয়ার
বিস্তারিত
ইরাকিদের তাড়িয়ে ফিরছে দারিদ্র্য
  ইরাকের জনগণের একটি বড় অংশ সুস্পষ্ট জাতীয় অর্থনৈতিক নীতির অভাবে
বিস্তারিত