মদিনা শরিফের জুমার খুতবা

ইবাদতে বৈচিত্র্যের তাৎপর্য

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ কেয়ামতের দিন নিজের ছায়ায় আশ্রয় দেবেন, যেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না।’ তাদের মধ্যে তিনি উল্লেখ করেন, ‘এবং সে ব্যক্তি যে-কোনো দান করল ও তা গোপন রাখল, এমনকি তার বাম হাত টের পায় না তার ডান হাত যা করেছে।’

 

নিজের বান্দার ওপর আল্লাহর অনুগ্রহরাজি অনেক। কোনো বান্দা যদি তা হিসাব করতে যায় তবে তার পরিসংখ্যান বের করতে সে অক্ষম হবে। আর ইসলাম হলো আল্লাহর সবচেয়ে বড় নেয়ামত ও অনুগ্রহ। নবজাতক এখানে স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মগ্রহণ করে এবং এমন পরিবেশে লালিত হয়, যেখানে আল্লাহর ইবাদত করা হয়, আজানের শব্দ উচ্চকিত হয় এবং কোরআন পাঠ করা হয়। তাই সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাদের এ পথপ্রদর্শন করেছেন।
ইসলামের নেয়ামতের অন্যতম মহান অনুষঙ্গ ও শাখা হলো ইবাদতগুলোর বৈচিত্র্য ও বিভিন্নতা। এগুলো এমন নেয়ামত, যা আল্লাহর প্রজ্ঞা ও হেকমত ধারণ করে। এগুলো আল্লাহর পথ। ইবাদত এমন পূর্ণাঙ্গ একক, যা আল্লাহর সন্তোষজনক সবকিছুকে অন্তর্ভুক্ত করে। আর আল্লাহর সন্তুষ্টি সৃষ্টিকারী বিষয়গুলো স্থান, কাল ও ব্যক্তির অবস্থাভেদে বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। কেননা বান্দার প্রস্তুতি ও যোগ্যতা এক রকম নয়। তাদের ইবাদত সহজ ও কষ্ট লাঘবের উদ্দেশ্যও এখানে লক্ষণীয়, যেন প্রিয় ও অপ্রিয় বিষয়ে তাদের সক্ষমতার সঙ্গে তা মানানসই হতে পারে। ফরজ ও ওয়াজিব ইবাদতগুলোর বৈচিত্র্যের মাঝে মোমিনের জন্য তার প্রবৃত্তির ওপর জয়ী হওয়ার যাচাই ও পরীক্ষা রয়েছে। কারণ সময় অনুসারে এক ইবাদত থেকে অন্য ইবাদতে যোগদান করলে তার প্রত্যেকটাই প্রমাণ করে সে আল্লাহর প্রকৃত বান্দা। ইবাদতের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অনুযায়ী তা বিভিন্ন হয়। বাস্তবায়িত প্রত্যেক ইবাদতেই থাকে আল্লাহর বিশেষ হেকমত ও শিক্ষণীয় উদ্দেশ্য। যেমন নামাজের ক্ষেত্রে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীলতা ও অপকর্ম থেকে বাধা প্রদান করে।’ (সূরা আনকাবুত : ৪৫)। জাকাতের ক্ষেত্রে আল্লাহ বলেন, ‘তাদের সম্পদ থেকে জাকাত গ্রহণ করুন, এর দ্বারা আপনি তাদের পবিত্র করবেন এবং পরিশুদ্ধ করবেন।’ (সূরা তওবা : ১০৩)। রোজা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘যেন তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করতে পার।’ (সূরা বাকারা : ১৮৩)। হজের ক্ষেত্রে আল্লাহ বলেন, ‘যেন তারা তাদের উপকারী ক্ষেত্রগুলো প্রত্যক্ষ করে এবং নির্দিষ্ট দিবসগুলোয় আল্লাহর নাম স্মরণ করে।’ (সূরা হজ : ২৮)।
ইবাদতের নির্ধারিত পালনীয় বিধান ও তা আদায়ের পন্থার কারণে ইবাদত ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। তাই যে ব্যক্তি কোনো রোগ, সফর, দারিদ্র্য কিংবা দুর্বলতার কারণে কোনো ইবাদত করতে অক্ষম হয় সে অন্য ইবাদতে ও শিথিল প্রক্রিয়ায় তার প্রতিদান পেয়ে যায়। দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিভিন্ন পরিস্থিতির প্রতি লক্ষ রেখে তাদের সমস্যা দূরীকরণ, কষ্ট লাঘব ও সহজকরণের জন্য এ সুবিধা দেওয়া হয়। আল্লাহ বলেছেন, ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজটা চান এবং তোমাদের জন্য কঠিনটা চান না।’ (সূরা বাকারা : ১৮৫)।
ইসলাম ওইসব দরিদ্র লোকের অবস্থার প্রতি লক্ষ রেখেছে, যারা ধারণা করেছিল ধনী লোকরা তাদের সেসব সম্পদের কল্যাণে তাদের চেয়ে এগিয়ে যাবে, যেগুলো তারা দান করে। দরিদ্র লোকরা বলেছিল, ‘হে আল্লাহর রাসুল, সম্পদশালীরা বিভিন্ন পুণ্য ও প্রতিদান নিয়ে গেল, তারা নামাজ পড়ে যেমন আমরা নামাজ পড়ি, তারা রোজা রাখে যেমন আমরা রোজা রাখি এবং তারা তাদের অতিরিক্ত সম্পদ দান করে। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের বললেন, ‘আল্লাহ কি তোমাদের জন্য এমন সুযোগ তৈরি করে দেননি, যার দ্বারা তোমরা সদকা আদায় করতে পার? নিশ্চয়ই প্রতিটি তাসবিহ পাঠে সদকা হয়, প্রতিটি তাকবির পাঠে সদকা হয়, প্রতিটি তাহমিদ বা আল্লাহর প্রশংসা পাঠে সদকা হয়, সৎকাজের আদেশ করলে সদকা হয়, অন্যায় কাজে নিষেধ করলে সদকা হয় এবং তোমাদের স্ত্রী সহবাসেও সদকা হয়।’
প্রাপ্তবয়স্ক দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকদের পরিস্থিতির প্রতি লক্ষ রেখে ইসলাম সহজনীতিকে মূলনীতি বানিয়েছে। খুসআম গোত্রের এক নারী এসে বলেছিল, ‘হে আল্লাহর রাসুল, বান্দার ওপর আল্লাহর ফরজ বিধান হজ পালনের ক্ষেত্রে আমার বাবাকে আমি অনেক বৃদ্ধ হিসেবে পেয়েছি, তিনি বাহনের ওপর স্থির হয়ে থাকতে পারেন না, আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ করতে পারব? তিনি বললেন, হ্যাঁ।’
যেসব মহত্ত্বপূর্ণ হাদিস বান্দার অবস্থার প্রতি লক্ষ রেখে আল্লাহর দয়া, রহমত ও অনুগ্রহের বিশালতা প্রমাণ করে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হাদিস হলো রাসুলুল্লাহ (সা.) এর এ বাণীÑ ‘বান্দা অসুস্থ হলে বা সফরে বের হলে তার জন্য তেমন প্রতিদানই লেখা হয় যেমনটি সে সুস্থ ও মুকিম অবস্থায় আমল করলে লেখা হয়।’
ইসলাম দায়িত্বপ্রাপ্ত নারীদের অবস্থা ও পরিস্থিতির প্রতিও লক্ষ রেখেছে। যেসব ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষদের কিছু আমল করতে অক্ষম হয়, সেখানে ইসলাম তাদের আমলের জন্য বিশাল প্রতিদানের ব্যবস্থা করেছে, তাদের অবদান ও আমলের মূল্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নারী নিজের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়লে, রমজান মাসের রোজা রাখলে, নিজের লজ্জাস্থান হেফাজত করলে এবং তার স্বামীর আনুগত্য করলে তাকে বলা হবে, জান্নাতের যে দরজা দিয়ে ইচ্ছে তুমি প্রবেশ করো।’
ইবাদতের ফজিলত ও মর্যাদার কারণে ইবাদত বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়। প্রতিটি ইবাদত মুসলিম ব্যক্তির আমলনামায় কল্যাণের খাতা বৃদ্ধি করে, বিরাট সওয়াব, প্রতিদান ও পুণ্যের সমাহার ঘটায়। কিছু কিছু ইবাদত তার গোনাহ ও পাপ মোচন করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে-কোনো মুসলিম ফরজ নামাজ আদায় করতে এসে সুন্দর করে অজু করলে, সুন্দর করে বিনয় ও নম্রতা প্রকাশ করলে, সেটি তার আগের গোনাহের কাফফারা হবে, যতক্ষণ সে কবিরা গোনাহ না করবে, আর এটা সবসময় প্রযোজ্য।’ আর কিছু ইবাদত সমৃদ্ধি বয়ে আনে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সদকার দ্বারা সম্পদ হ্রাস পায় না।’
কোনো কোনো ইবাদত জান্নাতে যাওয়ার কারণ হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যথাযথভাবে আদায়কৃত হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়।’
কিছু ইবাদত আছে, যা মুসলিমকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর ভয়ে কেউ কাঁদলে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না, যেমন স্তনে দুধ ফিরে যেতে পারে না। আল্লাহর রাস্তায় খরচ করা ধুলো ও জাহান্নামের ধোঁয়া একত্র হতে পারে না।’
কিছু আমলের ফজিলত ও শ্রেষ্ঠত্বের বৈচিত্র্য মুসলিমকে এমন উচ্চস্থানে নিয়ে যায় যার সমকক্ষ থাকে না। রাসুসুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় ও কাছের হলো সে-ই, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর চরিত্রের অধিকারী।’
ইবাদতের সময় ও ফজিলতের বৈচিত্র্য মুসলিম ব্যক্তিকে গোটা জীবন ইবাদতের বিভিন্ন উদ্যানে বিচরণ করতে প্রেরণা জোগায়। আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন তাকে শ্রেষ্ঠ সময়ে শ্রেষ্ঠ আমলে লাগিয়ে দেন, আর তিনি তাকে অপছন্দ করলে তাকে শ্রেষ্ঠ সময়ে মন্দকাজে লাগিয়ে দেন।
ইবাদতের বিভিন্ন বৈচিত্র্যের মাঝে বিরক্তি ও ক্লান্তির অপসারণ হয়, যা মনকে উদ্যমী রাখে এবং ইবাদতে স্বাদ ও আনন্দের অনুভূতি জাগায়। কিছু কিছু ইবাদত ব্যক্তিগত, যাতে বিভিন্ন হেকমত ও ফজিলত রয়েছে, সেগুলো আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করে, একনিষ্ঠতার দীক্ষা দেয়, লোকদেখানো মনোভাব থেকে দূরে রাখে, আত্মার স্বচ্ছতা ও আল্লাহর প্রতি ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি করে। হাসান বসরি (রহ.) বলেছিলেন, যখন তাকে প্রশ্ন করা হয়, ‘রাত জেগে ইবাদতকারীদের চেহারায় আলো ফুটে ওঠে, তাদের কী অবস্থা? তিনি বলেন, কারণ তারা তাদের রবের সঙ্গে একান্তে মিলিত হয়েছে, তাই তিনি তাদের তাঁর নূরের পোশাক পরিয়েছেন।’
দোয়ার মাধ্যমে ভয়ে ও মিনতি করে আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করা ব্যক্তিগত ইবাদতের অন্যতম সুন্দর চিত্র। আল্লাহ বলেন, ‘মিনতি করে ও ভয়ে আপনি মনে মনে আপনার রবকে স্মরণ করুন।’ (সূরা আরাফ : ২০৫)। রোজা আল্লাহর সন্তুষ্টিকল্পে একটি ব্যক্তিগত ইবাদত। আদম সন্তানের সব ইবাদত তার জন্য; কিন্তু রোজা ছাড়া, কেননা তা আল্লাহর জন্য।
গোপনে দানখয়রাত ব্যক্তিগত ইবাদত, মুসলিমের ডান হাত তা খরচ করে আর তার বাম হাত তা জানে না, যা তার ডান হাত ব্যয় করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ কেয়ামতের দিন নিজের ছায়ায় আশ্রয় দেবেন, যেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না।’ তাদের মধ্যে তিনি উল্লেখ করেন, ‘এবং সে ব্যক্তি যে-কোনো দান করল ও তা গোপন রাখল, এমনকি তার বাম হাত টের পায় না তার ডান হাত যা করেছে।’

২৭ জিলহজ ১৪৩৯ হিজরি মসজিদে নববির জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর করেছেন মাহমুদুল হাসান জুনাইদ


আল্লাহর অন্যতম নেয়ামত মাছ
প্রকৃতিজুড়ে এখন চলছে হেমন্তের রাজত্ব। নতুন ধানের নবান্ন উৎসবের পাশাপাশি
বিস্তারিত
রূপে ভরা হেমন্ত
প্রকৃতিতে শীতের আগমনী বার্তা বয়ে নিয়ে এসেছে হেমন্ত। শিশির বিন্দু
বিস্তারিত
প্রাণীবন্ধু গাসসান রিফায়ি
টানা ৩০ বছর বাইতুল মুকাদ্দাস চত্বরের বিড়াল ও পাখিদের খাবার
বিস্তারিত
পাপী থেকে ওলি
হে নবী! আমি ওই পাপী যুবককেই ওলি হিসেবে কবুল করে
বিস্তারিত
আমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে দুই মুসলিম নারীর ইতিহাস
ওমর ইলহান ১৪ বছর বয়সে সোমালিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় সে দেশে
বিস্তারিত
একটি জানাজার সাক্ষ্য
‘তাহরিকে তালেবানের’ মুখপাত্র এহসানুল্লাহ এহসান আমার বিরুদ্ধে কুফরের ফতোয়া ঘোষণা
বিস্তারিত