মাজহাব বিষয়ে হাফিজ ইবনুল কায়্যিম (রহ.) এর দৃষ্টিভঙ্গি

অনেক দ্বীনদার মানুষই ইবনুল কায়্যিম (রহ.) এর নাম শুনেছেন। তার নাম মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর। উপাধি শামসুদ্দীন। সংক্ষেপে ইবনুল কায়্যিম নামেই তিনি প্রসিদ্ধ। ৬৯১ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৭৫১ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন। তিনি হাফিজ ইবনে তাইমিয়া (রহ.) এর একজন শাগরেদই ছিলেন না, উপরন্তু তার জ্ঞান ও প্রজ্ঞার একজন সফল ধারক-বাহক ও প্রচারক ছিলেন। ইবনে তাইমিয়া (রহ.) এর মতো তার এ সুযোগ্য ছাত্রকেও কিছু কিছু বন্ধু ভুল বোঝেন। অথচ কোরআন ও সুন্নাহর অনুসরণের ক্ষেত্রে ইবনুল কায়্যিমও তার শায়খ ও শিক্ষকের মতো ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) এর ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ বা মাজহাবকে অগ্রাধিকার দিতেন। তাছাড়া অন্যান্য অনুসৃত ইমামদের প্রতিও যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতেন। ইবনুল কায়্যিম (রহ.) এর নিজ হাতে লেখা গ্রন্থ এসবের জ্বলন্ত প্রমাণ। উম্মাহর এ ক্রান্তিকালে আমাদের বিভক্তি নয়; বরং ঐকমত্য বিষয়গুলো নিয়েই বেশি আলোচনা করা উচিত এবং এসবের ভিত্তিতে বৈচিত্র্যের মাঝেও ঐক্যবদ্ধ থাকা একান্ত জরুরি। সুতরাং এখানে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ইবনুল কায়্যিম (রহ.) এর কিছু উদ্ধৃতি পেশ করা হলো।

এক. তাকলিদ বা বিজ্ঞ ইমামের অনুসরণ সম্পর্কে ইবনুল কায়্যিম (রহ.) কতইনা চমৎকার বলেছেন, কারও কাছে হাদিসের গ্রন্থ থাকলে সে নিজে পড়েই তার ওপর আমল করতে পারে। তবে তা তখনই, যখন ব্যক্তির মধ্যে এ বিষয়ের যোগ্যতা থাকবে। আর যদি তার মাঝে যোগ্যতাই না থাকে, তাহলে তার ওপর তা-ই ফরজ, যা আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন, ‘যদি তোমরা না জানো তবে জ্ঞানী লোকদের জিজ্ঞেস করো।’ (সূরা নাহল : ৪৩)। রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘তারা না জানলে কেন প্রশ্ন করে না, প্রশ্নই তো হলো অজ্ঞতা ও অক্ষমতার মহৌষধ।’ (ইলামুল মুয়াক্কিয়িন : ৪/২৯৮)। অন্যত্র তিনি লিখেন, ‘প্রয়োজনবশত মুজতাহিদ আলিমের অবর্তমানে তাকলিদ করা এবং তাকলিদের ভিত্তিতে ফতোয়া প্রদান করা জায়েজ আছে। এটাই বিশুদ্ধ অভিমত এবং মুসলিম উম্মাহ এর ওপরই আমল করে চলছে।’ (প্রাগুক্ত : ১/৪৮)। নাজাতপ্রাপ্ত দলের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি লিখেছেনÑ “এবং তারা কোরআন ও সুন্নাহ আঁকড়ে ধরে, যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর যদি তোমরা কোনো বিষয়ে মতবিরোধ করো তাহলে বিষয়টি আল্লাহ ও রাসুলের দিকে সোপর্দ করো।’ এবং তারা পূর্ববর্তী ইমামদের অনুসরণ করাকে বৈধ মনে করে।” (হাদিল আরওয়াহ ইলা বিলাদিল আফরাহ, পৃ. ৪২)।
দুই. ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর হাদিস অনুসরণের বিষয়ে ইবনুল কায়্যিম সপ্রশংস আলোচনা করে বলেন, ‘ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর শিষ্যরা এ বিষয়ে একমত যে, ইমাম জয়িফ হাদিসকেও কেয়াস ও ইজতিহাদি রায়ের ওপর প্রাধান্য দিতেন এবং এ নীতির ওপরই হানাফি মাজহাবের বুনিয়াদ প্রতিষ্ঠিত। এটা হলো ইমাম আবু হানিফার অনুসৃত মাজহাব। ইমাম আহমাদ (রহ.)ও এ নীতি অনুসরণ করেছেন। আর সালাফ তথা পূর্ববর্তী মনীষীদের পরিভাষার জয়িফ হাদিস পরবর্তীদের পরিভাষার জয়িফ হাদিস উদ্দেশ্য নয়; বরং পরবর্তীরা যে হাদিসকে হাসান বলে থাকেন সেটাকেই সালাফ কখনও জয়িফ বলে অভিহিত করতেন।’ (ইলামুল মুয়াক্কিয়িন : ১/৮১-৮২)।
তিন. ইবনুল কায়্যিম বলেন, ‘মুহাক্কিক ইমামুল জারহ যিনি হন, তিনি কোনো রাবি বা বর্ণনাকারীকে জারহ করেন তথা কারও বর্ণনা গ্রহণযোগ্য না হওয়ার হুকুম প্রদান করেন, সেটা তার ইজতিহাদ বা গবেষণার ভিত্তিতেই করেন, অন্য কারও থেকে বর্ণনাসূত্রে নয়।’ (বাদায়িউল ফাওয়াইদ : ১/৬, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত)। এ উদ্ধৃতি থেকে পরিষ্কার যে, তাসহিহ ও তাজয়িফ তথা হাদিস সহিহ বা জয়িফ নির্ধারণ করা একটি ইজতিহাদি বিষয়। তো হাদিসের মধ্যে সহিহ-জয়িফ পরিচয়ের জন্য যদি শায়খ আলবানি (রহ.) প্রমুখের মন্তব্য চোখ বুঝে মেনে নেওয়া জায়েজ হয়, যা তার ইজতিহাদ, তবে কেন নববি যুগের নিকটতম সময়ের ইমাম আবু হানিফা প্রমুখের ইজতিহাদের অনুসরণ জায়েজ হবে না, এমন প্রশ্ন আসাটা খুবই স্বাভাবিক!
চার. একস্থানে তিনি বলেন, ‘ইসলামের ইমামদের সম্মিলিত কর্মপদ্ধতি এই যে, কিতাবুল্লাহকে সুন্নাহর আগে এবং সুন্নাহকে ইজমার আগে স্থান দেওয়া হবে। আর ইজমার স্থান হবে তৃতীয়।’ (ইলামুল মুয়াক্কিয়িন : ২/২৩৯)। তিনি আরও বলেন, ‘সাহাবায়ে কেরাম নবউদ্ভাবিত মাসআলার ক্ষেত্রে ইজতিহাদ করতেন, এক হুকুমকে অন্য হুকুমের ওপর কিয়াস করতেন এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ দুই বিষয়ের একটিকে অন্যটির দ্বারা তুলনা করতেন। সুতরাং সাহাবায়ে কেরাম সমশ্রেণির বিষয়গুলোর বিধান অনুরূপ বিষয় থেকে আহরণ করে আলেমদের জন্য ইজতিহাদের দ্বার উন্মুক্ত করেছেন। তাদের কর্মপদ্ধতি থেকে কিয়াসের নিয়ম-পদ্ধতি নির্ধারিত হয়েছে।’ (প্রাগুক্ত : ১/২২ ও ২৩৮)। এটা সর্বজনস্বীকৃত যে, ইজমা ও কিয়াস ইসলামি শরিয়তের দলিল চতুষ্টয়ের উল্লেখযোগ্য দুটি দলিল। সেই কালের আহলে জাওয়াহির আলেমরা আর এই কালের সালাফি বন্ধুরাই শুধু এ দুটির প্রামাণ্যতা নিয়ে অযথা প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। অথচ ওই সালাফি ভাইদের বরণীয় ব্যক্তিত্ব, হাফিজ ইবনুল কায়্যিম (রহ.) ইজমা ও কিয়াসের প্রামাণ্যতা খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে তিনি মুসলিম উম্মাহর সর্বপ্রথম ইজতিহাদ ও কিয়াসকারী বলে অভিহিত করেছেন।
পাঁচ. শাখাগত বিষয়গুলোর বিশ্লষণেও তিনি উদারতার পরিচয় দিয়েছেন। যেমনÑ
ক. “হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত ‘সুন্নত হলো, নামাজে এক হাত অপর হাতের ওপর নাভির নিচে রাখা।’ ইবনুল কায়্যিম বলেন, এ হাদিসটি সহিহ। তিনি বলেন, উভয় হাত বুকের ওপর রাখা মাকরুহ। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) ‘তাকফির’ থেকে নিষেধ করেছেন। আর তাকফির হলো, বুকের ওপর হাত রাখা।” (বাদায়িউল ফাওয়াইদ : ৩/৬১)।
খ. “ইনসাফের কথা যা একজন ন্যায়নিষ্ঠ আলেম পছন্দ করবেন তা এই যে, নবী (সা.) কখনও ‘আমিন’ জোরে পড়তেন, কখনও আস্তে। তবে তাঁর আস্তে পড়া ছিল জোরে পড়ার চেয়ে বেশি।” (যাদুল মাআদ : ১/২২৩)।
গ. “এ বিষয়ে মুজতাহিদ ইমামদের মাঝে যে ইখতিলাফ হয়েছে, তা ইখতিলাফে মুবাহের অন্তর্ভুক্ত। যেখানে কোনো পক্ষেরই নিন্দা করা যায় না। যে কাজটি করছে তারও না, যে করছে না তারও না। এটা নামাজে রাফয়ে ইয়াদাইন করা ও না করার মতো একটি গৌণ বিষয়।” (প্রাগুক্ত : পৃ. ২২৫)।
কিন্তু আফসোসের বিষয় এই যে, অন্য অনেক কিছুর মতো এসব ছোট্ট বিষয়কেও আমরা জায়েজ-নাজায়েজ ও সুন্নত-বেদাতের পর্যায়ে নিয়ে গেছি। এমনকি একে কেন্দ্র করে কেউ কেউ বিবাদবিসংবাদেও লিপ্ত হয়ে যাচ্ছেন!


আশুরা ও কারবালার চেতনা
আশুরার দিন তিনি সেনাপতির মতো শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যূহ রচনা করেন।
বিস্তারিত
মেঘ নেমেছে কাশবনে
মুগ্ধ হয়ে দেখি শরতের মনকাড়া এসব রূপের বাহার। আশ্চর্য হয়ে
বিস্তারিত
মোবাইলে বিয়ের সঠিক পদ্ধতি!
পাত্র বা পাত্রী তার আপনজন বা পরিচিত যে কাউকে চিঠি,
বিস্তারিত
কাছের টিকিটে দূরে ভ্রমণ
প্রশ্ন : অনেক সময় বাসের লোকজন সীমাতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে থাকে।
বিস্তারিত
তুরস্কে শিশুদের জামাতে ফজর আদায়ে
মসজিদের প্রতি শিশুদের ভালোবাসা গড়ে তোলার জন্য তুরস্কের কাওনিয়া রাজ্যের
বিস্তারিত
আফগানিস্তানে কি আবার ফিরছে তালেবান
আফগানিস্তানে একসময় হতাহতের ঘটনা সংবাদের শিরোনামে উঠে এলেও এখন সেগুলো
বিস্তারিত