ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ব্যাপক সমালোচিত ৫৭সহ কয়েকটি ধারা বাতিল করে নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল-২০১৮ সংসদে পাস হয়েছে। তবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের বাতিল হওয়া ধারাগুলো নতুন আইনের বিভিন্ন ধারায় রয়ে গেছে বলে তা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে আগের মতোই।

বুধবার ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার বিলটি পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করলে কণ্ঠ ভোটে তা পাস হয়।

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে শুরু হওয়া অধিবেশনে বিলটি পাসের আগে জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব দেন বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরা। কিন্ত তাদের সেই প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়।

জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দেন জাতীয় পার্টির নুরুল ইসরাম ওমর, সেলিম উদ্দিন, মোহাম্মদ আব্দুল মুনিম চৌধুরী, মো. ফখরুল ইমাম, নুরুল ইসলাম মিলন, বেগম নূর-ই-হাসনা লিলি চৌধুরী, বেগম মাহজাবীন মোরশেদ, কাজী ফিরোজ রশীদ, বেগম রওশন আরা মান্নান, শামীম হায়দার পাটোয়ারী ও মোহাম্মদ নোমান এবং স্বতন্ত্র সদস্য ডা. মো. রুস্তম আলী ফরাজী। তারা ৩০ অক্টোবরের মধ্যে জনমত যাচাইয়ের জন্য বিলটি প্রচারের দাবি জানান।

এছাড়া বিরোধী দলীয় সদস্যরা বিলের ১৩টি ধারায় সংশোধনী প্রস্তাব দিলেও প্রস্তাবগুলো গৃহীত হয়নি।

বিলটি পাসের আগে জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব উত্থাপনকালে মো. ফখরুল ইমাম বলেন, বিলে স্টেকহোল্ডারদের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে। বাক স্বাধীনতার জন্য এটা উদ্বেগজনক। এটা একটি প্রশ্নবিদ্ধ বিল। সাংবাদিকতায় বাধার সৃষ্টি করবে। দেশে সুশাসনের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিলো এই বিলের কারণে তা বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

জাতীয় পার্টির আরেক সদস্য নুরুল ইসলাম মিলন বলেন, বিলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিলে গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা হয়নি।

নূরে হাসনা লিলি চৌধুরী বলেন, বিলটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় যাচাই-বাছাই হওয়া প্রয়োজন।

কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, আমি এই কমিটির একজন সদস্য। বিলটি নিয়ে যাচাই বাছাইয়ের আবেদন করেছিলাম। কিন্তু এটা নিয়ে অনেক যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। তাই আমি আমার প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নিচ্ছি।

একইসঙ্গে বিলটি পাস করা যেতে পারে বলে আমি মনে করি। প্রস্তাব দেওয়া অন্যান্য এমপিরা তাদের স্বপক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।

জনমত যাচাই-বাছাই প্রসঙ্গে ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, এই বিলটি পাসের জন্য নিজেকে সৌভাগ্যবান বলে মনে হচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ রক্ষার জন্য ডিজিটাল আইন আমরা সবার আগে তৈরি করছি। পৃথিবীর বহু দেশকে এই আইনটি অনুসরণ করতে হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে এটা ঐতিহাসিক আইন। ভবিষ্যতে অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ হবে না। যুদ্ধ হবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে। তাই কোনভাবে আমরা রাষ্ট্রকে বিপন্ন হতে দিতে পারি না।

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণের জন্য এই আইন নয়। মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে কোন ধরনের বাধা যেনো না থাকে তাই এই আইনে নিশ্চিত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, বিলটি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কি পরিমাণ আলোচনা করেছি, তাদের কথা শুনেছি তা এই বিলের রিপোর্ট দেখলেই বোঝা যাবে। আমরা তাদের মতামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি। তারা যেসব জায়গায় যে ধরণের সংশোধনী দেওয়া দরকার সেই অনুসারে সবকিছু আমরা করেছি। সাংবাদিকরা আইনমন্ত্রী ও সংসদীয় কমিটির কাছে যেসব কথা বলেছেন তা হয়তো তারা ভুলে গেছেন। যদি তারা ভুলে না গিয়ে থাকেন তাহলে তাদের সমালোচনার অবস্থা থাকে না। আইনটিকে বিতর্কিত করার কোন সুযোগ নেই বলে তিনি দাবি করেন।

বিভিন্ন মহলের আপত্তি সত্ত্বেও গত ৯ এপ্রিল বহুল আলোচিত ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল-২০১৮’ জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়। এরপর বিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। সংসদীয় কমিটি কয়েক দফা বৈঠক করে সংশ্লিষ্টদের মতামত গ্রহণের পর বিলটি চূড়ান্ত করে গত ১৭ সেপ্টেম্বর বিলটি পাসের সুপারিশ সংসদে প্রতিবেদন জমা দেয়।

কমিটির বৈঠকে উপস্থিত হয়ে সংবাদপত্রগুলোর সম্পাদকদের সংগঠন এডিটরস কাউন্সিল, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) এবং বেসরকারি টেলিভিশন মালিকদের সংগঠন-অ্যাটকোরসহ সংশ্লিষ্ট অনেকেই উপস্থিত হয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু সংশোধনী প্রস্তাব দিলেও সংসদীয় কমিটির চূড়ান্ত সুপারিশে তা রাখা হয়।

বিশেষ করে ব্যাপক সমালোচিত তথ্য-প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারাসহ কয়েকটি ধারা আরও বিশদ আকারে যুক্ত করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব বাতিলের দাবি জানানো হয় তাদের পক্ষ থেকে। তারা দাবি করেন, প্রস্তাবিত ওই আইনের ২১, ২৫, ২৮, ৩১, ৩২ ও ৪৩ ধারা বিদ্যমান থাকলে স্বাধীন সাংবাদিকতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। কিন্তু পাস হওয়া বিলের কয়েকটি ধারায় কিছু পরিবর্তন আনা হলেও ৩২ ধারাসহ অধিকাংশ ধারা বহাল রয়েছে।

বিলের ৩২ (১) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোন ব্যক্তি অফিশিয়াল সিক্রেসি এ্যাক্টের আওতাভূক্ত অপরাধ কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওযার্ক বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে সংঘটন করেন বা করিতে সহায়তা করেন তাহা হইলে তিনি অনধিক ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

৩২ (২) ধরায় বলা হয়েছে, যদি কোন ব্যক্তি উপধারা-১ এ উল্লিখিত অপরাধ দ্বিতীয়বার বা পুনঃপুনঃ সংঘটন করেন, তাহা হইলেম যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

বিলের ২৫ ধারার (ক) উপধারায় বলা হয়েছে, যদি কোন ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত ভাবে বা জ্ঞাতসারে, এমন কোন তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ করেন, যাহা আক্রমণাত্মক বা ভীতি প্রদর্শক অথবা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও, কোনো ব্যক্তিকে বিরক্ত, অপমান, অপদস্ত বা হেয় প্রতিপন্ন করিবার অভিপ্রায়ে কোন তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ বা প্রচার করেন, বা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুন্ন করিবার, বা বিভ্রান্তি ছড়াইবার, বা তদুদ্দেশ্যে অপপ্রচার বা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও, কোনো তথ্য সম্পুর্ণ আ আংশিক বিকৃত আকারে প্রকাশ বা প্রচার করেন বা করিতে সহায়তা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরুপ কার্য হইবে একটি অপরাধ। এই অপরাধের শাস্তি অনধিক ৩ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৩ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয়দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। দ্বিতীয়বার বা পুনঃপুন অপরাধের জন্য ৫ বছরের কারাদণ্ড ও ৫ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

বিলের ২১ ধারায় নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যদি কোন ব্যক্তি ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোন প্রকার প্রপাগন্ডা ও প্রচার চালানো বা উহাতে মদদ প্রদান করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনুরুপ কার্য ইইবে একটি অপরাধ।’

এই অপরাধের শাস্তি অনধিক ১০ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৩ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয়দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। দ্বিতীয়বার বা পুনঃপুনঃ অপরাধের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও এক কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত রুপকল্প ২০২১ ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মিাণের লক্ষ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ও নিরাপদ ব্যবহার আবশ্যক বর্তমান বিশ্বে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যপক ব্যবহারের মাধ্যমে এর সুফল ভোগের পাশাপাশি অপপ্রয়োগও উল্ল্যেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যার ফলে সাইবার অপরাদের মাত্রাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এতে বলা হয়েছে, জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও ডিজিটাল অপরাধসমূহের প্রতিকার, প্রতিরোধ, দমন, সনাক্তকরণ, তদন্ত এবং বিচারের উদ্দেশ্যে এ আইন প্রণয়ন অপরিহার্য। সাইবার তথা ডিজিটাল অপরাধের কবল থেকে রাষ্ট্র এবং জনগণের জানমাল ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধান এ আইনের অন্যতম লক্ষ্য।

আরও বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নকে প্রকারান্তরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলার পুনর্জাগরণ বলা যেতে পারে। এই মহান স্বপ্নদ্রষ্টার সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়নে তারই যোগ্য উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রুপকল্প ২০২১ ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ অন্যতম সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।


‘লেভেল প্লেইং ফিল্ড নিশ্চিত’
জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, নিরপেক্ষ নির্বাচন
বিস্তারিত
পঞ্চম ও অষ্টমের সমাপনীর ফল
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক শিক্ষা ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার
বিস্তারিত
‘উত্তাপ ছড়াক, পরিস্থিতি উত্তপ্ত যেন
নির্বাচনী প্রচারের শুরুর দিনেই উত্তাপ দেখে সন্তুষ্ট সিইসি কে এম
বিস্তারিত
নির্বাচনে সহিংসতা এড়িয়ে চলার আহ্বান
আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সবাইকে সহিংসতা এড়িয়ে
বিস্তারিত
খালেদার প্রার্থিতার রিটে হাইকোর্টের বিভক্ত
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে তিন আসনে মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে করা
বিস্তারিত
উন্নয়ন ও শান্তির পক্ষে তরুণদের
উন্নয়ন ও শান্তির পক্ষে নেতৃত্ব কার হাতে থাকলে বাংলাদেশ এগিয়ে
বিস্তারিত