আশুরায় করণীয় বর্জনীয়

‘রাসুল (সা.) মদিনায় হিজরত করে ইহুদিদের আশুরার রোজা রাখতে দেখে কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা বলে, এটা মহান দিন। এদিনে আল্লাহ মুসা (আ.) ও তার কওমকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউন ও তার লোককে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। এর শুকরিয়াস্বরূপ মুসা (আ.) এ দিনে রোজা রাখেন। অতএব আমরাও রোজা পালন করি। তখন নবীজি বললেন, তোমাদের চেয়ে আমরাই মুসার (আ.) (আদর্শের) অধিক হকদার। এরপর তিনি রোজা রাখেন এবং রোজা রাখতে বলেন।’

আরবি ১২ মাসের মধ্যে ৪ মাস অতি সম্মানিত। এসব হলোÑ মহররম, রজব, জিলকদ ও জিলহজ । এসব মাসে ঝগড়া-বিবাদ, খুন-খারাবি, যুদ্ধ-বিগ্রহ ইত্যাদি অন্যায় থেকে দূরে থাকা সব মুসলিমের ধর্মীয় কর্তব্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘এ মাসগুলোতে তোমরা পরস্পরের ওপর অত্যাচার করো না।’ (সূরা তওবা : ৩৬)। 

আশুরা অর্থ দশম। আশুরায়ে মহররম দ্বারা আরবি প্রথম মাস মহররমের ১০ তারিখ বোঝানো হয়। এ আশুরার মূল ইবাদত হলো রোজা। এটা সওমে মুসার নিয়তে। এর শিক্ষা হলো, আল্লাহর অনুগত থেকে অন্যায় ও মিথ্যার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা। 
কারবালার ঘটনা নবীজি (সা.) এর মৃত্যু-পরবর্তী ঘটনা। এটি গুরুত্বপূর্ণ তবে, এর সঙ্গে ইবাদতের কোনো সম্পর্ক নেই। ইবাদত হওয়ার জন্য আল্লাহর নির্দেশনা ও নবীর পথনির্দেশ থাকতে হয়। তবে কারবালার ঘটনা নিঃসন্দেহে আমাদের অন্যায়ের কাছে মাথানত না করার শিক্ষা দেয়, ত্যাগের মন্ত্রে উজ্জীবিত করে থাকে। এটা খুঁজে পেয়েছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামÑ 
‘ফিরে এল আজ সেই মহররম মাহিনা
ত্যাগ চাই মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না।’ 
নবীজি মহররম মাসকে আল্লাহর সঙ্গে সম্বন্ধ করে ‘শাহরুল্লাহিল মুহাররম’ বলেছেন, যা এ মাসের মর্যাদা বহন করে। (মুসলিম : ১৯৮২)। রাসুল (সা.) বলেন, ‘রমাজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো মহররমের রোজা (আশুরার রোজা) এবং ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম নামাজ হলো নফল নামাজ (তাহাজ্জুদ নামাজ)।’ (মুসলিম : ২০৩৯)। 
‘১০ মহররমের রোজা আমি আশা করি আল্লাহর কাছে বিগত এক বছরের (ছোট) গোনাহের কাফফারা হিসেবে গণ্য হবে।’ (মুসলিম : ২০৪৪)। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘জাহেলি যুগে কোরাইশরা আশুরার রোজা রাখত, নবীজিও রাখতেন। মদিনায় হিজরতের পরও নবীজি রোজা রেখেছেন এবং লোকদের রোজা রাখার জন্য বলেছেন। কিন্তু যখন রমাজানের রোজা (দ্বিতীয় হিজরিতে) ফরজ হলো তখন তিনি বলেন, যে ব্যক্তি ইচ্ছা আশুরার রোজা করতে পার এবং যে ব্যক্তি ইচ্ছা কর আশুরার রোজা ত্যাগ করতে পার।’ (বোখারি : ২০০২)। 
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) মদিনায় হিজরত করে ইহুদিদের আশুরার রোজা রাখতে দেখে কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা বলে, এটা মহান দিন। এদিনে আল্লাহ মুসা (আ.) ও তার কওমকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউন ও তার লোককে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। এর শুকরিয়াস্বরূপ মুসা (আ.) এ দিনে রোজা রাখেন। অতএব আমরাও রোজা পালন করি। তখন নবীজি বললেন, তোমাদের চেয়ে আমরাই মুসার (আ.) (আদর্শের) অধিক হকদার। এরপর তিনি রোজা রাখেন এবং রোজা রাখতে বলেন।’ (মুসলিম : ১১৩০)। 
ইবনে আব্বাস (রা.) এর অন্য বর্ণনায় রয়েছে, ‘লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসুল! ইহুদি ও নাসারারা ১০ মহররমকে সম্মান করে। তখন নবীজি বললেন, আগামী বছর বেঁচে থাকলে ইনশাআল্লাহ আমরা ৯ মহররমসহ রোজা রাখব।’ রাবী বলেন, আগামী বছর আসার আগেই নবীজির মৃত্যু হয়। (মুসলিম : ১১৩৪)। নবীজি বলেন, ‘তোমরা আশুরার দিন রোজা রাখ এবং ইহুদিদের বিপরীত করো। তোমরা আশুরার সঙ্গে তার আগে বা তার পরে একদিন রোজা রাখবে।’ (বায়হাকি)। মহররমের ৯ ও ১০ তারিখ রোজা রাখা উত্তম। 
এ মাসে প্রচলিত কিছু কুসংস্কার 
* এ মাসকে শোক, মাতম, দুশ্চিন্তা ও দুঃখের মাস বলা হয়। * নারীর সৌন্দর্য চর্চা থেকে বিরত থাকা। * এ মাসে জন্মগ্রহণকারী সন্তানকে দুর্ভাগা মনে করা। * এ মাসের প্রথম দিন থেকে বাড়ি পরিষ্কার করা এবং বানোয়াট নতুন নতুন ইবাদত করা। * কারবালার কারণে আশুরার মর্যাদা মনে করা। 
এ দিনে সংঘটিত কিছু গর্হিত কাজ 
* হুসাইনের নামে ভুয়া কবর বানিয়ে তাজিয়া বা শোক মিছিল বের করা * ওই কবরে হুসাইনের রুহ আসে বলে বিশ্বাস করা, সেখানে মাথানত করা, সিজদা করা এবং তার কাছে কিছু চাওয়া * মিথ্যা শোক প্রদর্শন করে বুক চাপড়ানো হয়, বুকের কাপড় ছিঁড়ে ফেলা * হায় হোসেন! হায় হোসেন! বলে মাতম করা * রক্তের নামে লাল রং ছিটানো * লাঠি, তির-বল্লম নিয়ে যুদ্ধের মহড়া দেওয়া * হোসাইনের নামে কেক বানিয়ে বরকতের কেক বলে চালান * হোসাইনের নামে মোরগ ছেড়ে দিয়ে বরকতের মোরগ বলে চালান * কালো ব্যাজ ধারণ করা * এদিনে পানি পান ও শিশুদের দুধ পান অন্যায় মনে করা * ইমামবাড়ায় আয়েশা (রা.) এর নামে বকরি বেঁধে লাঠিপেটা করে আনন্দ করা * আয়েশাসহ (রা.) আরও বড় বড় সাহাবিকে গালি দেওয়া * অনেক সেমিনারে আশুরা মানে কারবালা মনে করা ও হোসাইনকে মাসুম এবং ইয়াজিদকে মালাউন প্রমাণ করা, যা সত্য থেকে বহু দূরে * বুকে ব্লেড মেরে রক্ত বের করা * এদিনে কবর জিয়ারত করা ইত্যাদি। ভুয়া কবর জিয়ারাত করা শিরক, শোক করা, শোক মিছিল করা ইসলামে হারাম এবং সাহাবিদের গালি দেওয়া কবিরা গোনাহ। 
৩৫২ হিজরিতে শিয়া মুইযউদদৌলা ১০ মহররমকে শোক দিবস ঘোষণা করেন। ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত, দোকানপাট ইত্যাদি সব বন্ধ করে। মহিলাদের চুল ছিঁড়তে, চেহারা কালো করতে বাধ্য করে। সর্বত্র শোক মিছিল করতে বাধ্য করে। 
পরিশেষে অনুরোধ, আমাদের কারবালার ঘটনা সম্পর্কে সব ধরনের বাড়াবাড়ি থেকে বিরত থাকতে হবে এবং প্রচলিত শিরক, বিদাত, রসম, রেওয়াজ ইত্যাদি থেকে বিরত থাকতে হবে। সওমে মুসার (আ.) নিয়তে মহররমের ৯ ও ১০ তারিখ রোজা রাখতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে কারবালার নির্মম ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। আর যাতে মুসলিমদের মাঝে এ ধরনের নির্মম ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে সে দিকে খুবই খেয়াল রাখতে হবে। 

লেখক : প্রভাষক, শাহ মখদুম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ও রেডিও আরজে


ইসলামে জবাবদিহিতা
জবাবদিহিতা ইসলামের একটি অন্যতম মৌলিক বিষয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা
বিস্তারিত
আলোর পরশ
কোরআনের বাণী তিনিই তো আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক; তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ
বিস্তারিত
ভালো নাম মন্দ নাম
নাম একজন ব্যক্তির পরিচয় বহন করে। চাই সে পুরুষ হোক
বিস্তারিত
র‌্যাগিং : শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিকৃষ্ট
মফস্বল থেকে ছেলেটি এসেছে। চোখমুখ ভরা তার মায়া। জড়তা এখনও
বিস্তারিত
উপার্জনের কিছু অংশ সঞ্চয় করুন
কাজেই আজকের দিনের জীবনমানের বিবেচনায় উপার্জন ও সঞ্চয় করা দোষণীয়
বিস্তারিত
আলোর পরশ
কোরআনের বাণী আল্লাহ, তিনি ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই; তিনি তোমাদের
বিস্তারিত