মক্কা শরিফের জুমার খুতবা

আল্লাহর মাস মহররমের মর্যাদা

মহররমের রোজা শ্রেষ্ঠ নেকি ও সেরা আমল। ইমাম মুসলিম তার সহিহ গ্রন্থে সংকলন করেন : নবী (সা.) কে জিজ্ঞেস করা হলো, ফরজ নামাজের পর কোন নামাজ শ্রেষ্ঠ এবং রমজানের পর কোন রোজা উত্তম? তিনি উত্তর দিলেন, ‘ফরজ নামাজের পর শ্রেষ্ঠ নামাজ হচ্ছে রাতের (তাহাজ্জুদ) নামাজ এবং রমজানের রোজার পর শ্রেষ্ঠ রোজা হচ্ছে আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।’ ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, ‘মহররমের রোজা শ্রেষ্ঠ হওয়ার কারণ এটি বছরের সূচনা মাস। আর এর মাধ্যমে রোজার মতো সেরা আমল দিয়ে বছরের 
সূচনা হয়।’

আল্লাহ তায়ালা তাঁর কিছু সৃষ্টিকে কিছু সৃষ্টির চেয়ে মর্যাদাবান বানিয়েছেন। এটা তাঁর চয়ন ও নির্বাচন। তাঁর পক্ষ থেকে মর্যাদা প্রদান ও সম্মানিতকরণ। ‘তোমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং যাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন, এতে ওদের কোনো এখতিয়ার নেই।’ (সূরা কাসাস : ৬৮)। স্থানগুলো থেকে আল্লাহ তায়ালা মনোনীত করেছেন মক্কা ও মদিনাকে। আর বরকত দিয়েছেন বাইতুল মুকাদ্দাসের আশপাশে। কালের মধ্যে নির্বাচন করেছেন কিছু সময়, কিছু দিবস ও মাসকে। নিজ দয়া ও বদান্যতায় যে সময়গুলোতে তিনি অন্য সময়ের তুলনায় বেশি কল্যাণের প্রবাহ ঘটান। ভাগ্যবান সে ব্যক্তি, যে সময়গুলোকে নেকি ও নৈকট্য অর্জনে কাজে লাগায় এবং তার বরকত ও কল্যাণের প্রবাহে শামিল হয়।
আল্লাহ তায়ালা যে সময়গুলোকে সবিশেষ মনোনীত করেছেন, তার মধ্যে রয়েছে সম্মানিত মাসগুলো। যে বিষয়ে তিনি নিজ গ্রন্থে বাণী দিয়েছেন। সম্মানিত ঘোষণা করেছেন সেগুলোকে আসমান-জমিন সৃষ্টির দিন থেকে। তিনি বলেন, ‘আকাশম-লী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর বিধানে আল্লাহর কাছে নিশ্চয়ই মাসগুলোর সংখ্যা বারো মাস। এর মধ্যে চারটি মাস নিষিদ্ধ (পবিত্র)। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান; অতএব তোমরা এ মাসগুলোতে নিজেদের প্রতি জুলুম করো না।’ (সূরা তওবা : ৩৬)। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘আল্লাহ মাসগুলো থেকে চারটি মাসকে বাছাই করেছেন। সেগুলোকে বানিয়েছেন নিষিদ্ধ। বাড়িয়ে দিয়েছেন সেগুলোর মর্যাদা। সেগুলোতে গোনাহকে বানিয়েছেন বড়। নেক আমল ও প্রতিদানকেও করেছেন বড়।’ 
রাসুলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজে তাঁর মহান খুতবায় সেই মাসগুলো বলে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘কালচক্র আপনরূপে আবর্তিত হয়েছে, যেদিন থেকে আল্লাহ তায়ালা আসমান-জমিন সৃষ্টি করেছেন। বছর হয় বারো মাসে। এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিতÑ জিলকদ, জিলহজ ও মহররম এবং ‘রজব মুদার’, যা জুমাদাল উখরা ও শাবানের মধ্যবর্তী।’ (বোখারি ও মুসলিম)। আল্লাহর মাস মহররমকে আল্লাহ সম্মানিত ও মর্যাদাবান করেছেন। একে সম্পর্কযুক্ত করেছেন নিজের সঙ্গে। জাহেলি যুগে আরবরাও এ মাসটিকে সম্মান করত। অতি সম্মান ও মর্যাদাবশত একে বলত আল্লাহর ‘বধির’ মাস। 
হারাম মাসগুলোকে সম্মান প্রদান যখন জাহেলি যুগেও ঐতিহ্য ছিল, তাহলে মুসলিমের কাছে এর সম্মান প্রদান কি আরও বেশি কাম্য নয়? আল্লাহ তায়ালা যাকে হেদায়েত দিয়েছেন। যে আল্লাহকে রব হিসেবে, ইসলামকে দ্বীন হিসেবে এবং মুহাম্মদ (সা.) কে নবী ও রাসুল হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট। তার জন্য কি আরও বেশি সমীচীন নয় আল্লাহ কর্তৃক সম্মানিত বিষয়কে সম্মান করা? এ মাসগুলোতে নিজেকে গোনাহ ও পাপাচার থেকে নিবৃত্ত রাখা? প্রবৃত্তিকে অন্যায় ও অবাধ্যতা থেকে দূরে রাখা? প্রবৃত্তির তাড়না ও শয়তানের প্রবঞ্চনা থেকে নিজেকে ঊর্ধ্বে রাখা?
নিজের ওপর জুলুম তথা পাপকর্ম সর্বদা নিষিদ্ধ হলেও সম্মানিত মাসে এ নিষিদ্ধতা আরও গুরুতর। কেননা এটি একদিকে যেমন গোনাহ সম্পাদনের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালাকে দুঃসাহস দেখানো, অন্যদিকে আল্লাহ যাকে নিষিদ্ধ ও সম্মানিত করেছেন তার অসম্মানের নামান্তর। আর সবচেয়ে বড় জুলুম আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে শরিক করা। যেমনটি লোকমান (আ.) বলেছেন তার ছেলের উদ্দেশে : ‘হে বৎস, আল্লাহর সঙ্গে শরিক করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা সবচেয়ে বড় জুলুম।’ (সূরা লোকমান : ১৩)। আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক স্থির করা সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ। এটিই সে পাপ, যা করে (তওবা ছাড়া) কেউ মারা গেলে তাকে আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করবেন না। ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে লোক তাঁর সঙ্গে শরিক করে। এর অধস্তন যে-কোনো পাপই তিনি চাইলে ক্ষমা করেন।’ (সূরা নিসা : ৪৮)। 
শিরক সংঘটনের অপরাধ আরও গুরুতর হয় যখন শিরককারী জানে ও স্বীকার করে যে, পবিত্র নামগুলোর অধিকারী আল্লাহ তায়ালাই তাকে সৃষ্টি করেছেন। বোখারি ও মুসলিমে আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসুল (সা.) কে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোন গোনাহ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে গুরুতর?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর সঙ্গে তোমার কাউকে শরিক করা অথচ তিনিই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।’ নিজের ওপর জুলুমের আরেকটি প্রকার আল্লাহর অত্যাবশ্যক আদেশ অমান্য করা কিংবা হারাম কাজ সম্পাদন করা যাতে মানুষ নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয় এবং নিজের স্রষ্টার হক লঙ্ঘন করে। ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করে, সে নিজের ওপরই জুলুম করে।’ (সূরা তালাক : ১)। 
বান্দার ওপর আল্লাহ তায়ালার এক বিশাল দয়া হলো, তিনি বছরের শেষ মাসটিকে বানিয়েছেন ইবাদত ও আনুগত্যের (সম্মানিত জিলহজ মাস), প্রথম মাসটিকেও (সম্মানিত মহররম) বানিয়েছেন আনুগত্য ও ইবাদতের। এতে মোমিন ব্যক্তি তার বছর শুরু করে আল্লাহর ইবাদত দিয়ে, শেষও করে আল্লাহর আনুগত্য দিয়ে। 
আল্লাহর মাস মহররমে একজন মুসলিমের সবচেয়ে বড় যে আমলটির প্রতি বেশি আগ্রহ হওয়া উচিত, তা হলো আপন প্রভুর একনিষ্ঠ ও নির্ভেজাল তাওহিদ বাস্তবায়ন, শরিক না করে একমাত্র তাঁকেই ইবাদতের জন্য বিশিষ্ট করা এবং ফরজ আদায় ও অধিক নফল আমলের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য অর্জন করা। যে তা করতে পারবে, সে আল্লাহ তায়ালার ভালোবাসা লাভে ধন্য হবে। হাদিসে কুদসিতে রয়েছে : ‘আমার বান্দা যা কিছু দিয়ে আমার নৈকট্য লাভ করে, তার মধ্যে আমার কাছে প্রিয়তম জিনিস হলো তা, যা আমি তার ওপর ফরজ করেছি। আর আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকে, পরিশেষে আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি। অতঃপর যখন আমি তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার ওই কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শোনে; তার ওই চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে; তার ওই হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে এবং তার ওই পা হয়ে যাই, যা দিয়ে সে চলে। আর সে যদি আমার কাছে কিছু চায়, আমি তাকে দিই এবং সে যদি আমার আশ্রয় চায়, আমি অবশ্যই তাকে আশ্রয় দিই।’ (বোখারি)।
নেকির দিক থেকে সেরা নফল ইবাদত নফল রোজা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে একদিন রোজা রাখবে আল্লাহপাক তার চেহারাকে জাহান্নাম থেকে ৭০ বছর দূরে রাখবেন।’ (বোখারি ও মুসলিম)। আল্লাহর মাস মহররমকে নবী (সা.) তাই রোজা দ্বারা বিশিষ্ট করেছেন। সেহেতু মহররমের রোজা শ্রেষ্ঠ নেকি ও সেরা আমল। ইমাম মুসলিম তার সহিহ গ্রন্থে সংকলন করেন : নবী (সা.) কে জিজ্ঞেস করা হলো, ফরজ নামাজের পর কোন নামাজ শ্রেষ্ঠ এবং রমজানের পর কোন রোজা উত্তম? তিনি উত্তর দিলেন, ‘ফরজ নামাজের পর শ্রেষ্ঠ নামাজ হচ্ছে রাতের (তাহাজ্জুদ) নামাজ এবং রমজানের রোজার পর শ্রেষ্ঠ রোজা হচ্ছে আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।’ ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, ‘মহররমের রোজা শ্রেষ্ঠ হওয়ার কারণ এটি বছরের সূচনা মাস। আর এর মাধ্যমে রোজার মতো সেরা আমল দিয়ে বছরের সূচনা হয়।’
এ মহররম মাসের মধ্যে আবার দশম দিন তথা আশুরার রয়েছে বিশাল স্বতন্ত্র মর্যাদা ও আদি সম্মান। এ দিন আল্লাহ তায়ালা মুসা (আ.) কে ফেরাউন ও তার বাহিনী থেকে মুক্তি দিয়েছেন। তাই আল্লাহর নবী মুসা (আ.) আশুরায় আল্লাহর শুকরিয়াস্বরূপ রোজা রাখতেন। সহিহ মুসলিমে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় এসে ইহুদিদের দেখতে পেলেন আশুরায় রোজা রাখতে। তিনি তাদের কাছে জানতে চাইলেন, ‘এ কোন দিন তোমরা যাতে রোজা রাখো?’ তারা বলল, এ এক মহান দিবস। আল্লাহ এতে মুসা ও তার জাতিকে মুক্তি দিয়েছেন আর ফেরাউনকে তার জাতিসহ ডুবিয়ে মেরেছেন। মুসা (আ.) শুকরিয়াস্বরূপ এ দিন রোজা রাখতেন। আমরাও তাই এ দিন রোজা রাখি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আমরা মুসার আনুগত্যে তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার।’ তারপর থেকে তিনি এ দিন রোজা রাখেন এবং অন্যদের রোজা রাখতে বলেন। 
সহিহ বোখারিতে ইবনে আব্বাস (রা.) সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, আমি এ দিন তথা আশুরা দিবসের মতো বছরের অন্য কোনোদিন নবী (সা.) কে রোজার ফজিলত খুঁজতে দেখিনি। এক্ষেত্রে সুন্নত হলো আগের দিনও রোজা রাখা। ইমাম মুসলিম ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমি যদি আগামী বছর বেঁচে থাকি, তাহলে নবম তারিখও রোজা রাখব।’ 
নবী (সা.) কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল আশুরা দিবসের রোজার ফজিলত সম্পর্কে। জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা করি এর দ্বারা পূর্ববর্তী এক বছরের গোনাহ মাফ করে দেবেন।’ (মুসলিম)। আমাদের ওপর আল্লাহর এ এক বিশাল দয়া যে, তিনি একদিনের রোজার বিনিময়ে পুরো এক বছরের গোনাহ ক্ষমা করে দেবেন। ‘আর আল্লাহ মহাঅনুগ্রহশীল।’ (সূরা আলে ইমরান : ৭৪)। 
অতএব পবিত্র এ মৌসুমের সদ্ব্যবহার করুন, যাতে প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতা করে এবং চেষ্টাকারীরা অগ্রসর হয়। কেননা প্রকৃত বুদ্ধিমান সেই, যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং মৃত্যুপরবর্তী জীবনের জন্য কাজ করে। আর যে ব্যক্তি নিজেকে কুপ্রবৃত্তির গোলাম বানায় অথচ আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা করে (জান্নাত), সে-ই অক্ষম নির্বোধ। 


৪ মহররম ১৪৪০ হি. মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবার ভাষান্তর 
আলী হাসান তৈয়ব


ইসলামে জবাবদিহিতা
জবাবদিহিতা ইসলামের একটি অন্যতম মৌলিক বিষয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা
বিস্তারিত
আলোর পরশ
কোরআনের বাণী তিনিই তো আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক; তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ
বিস্তারিত
ভালো নাম মন্দ নাম
নাম একজন ব্যক্তির পরিচয় বহন করে। চাই সে পুরুষ হোক
বিস্তারিত
র‌্যাগিং : শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিকৃষ্ট
মফস্বল থেকে ছেলেটি এসেছে। চোখমুখ ভরা তার মায়া। জড়তা এখনও
বিস্তারিত
উপার্জনের কিছু অংশ সঞ্চয় করুন
কাজেই আজকের দিনের জীবনমানের বিবেচনায় উপার্জন ও সঞ্চয় করা দোষণীয়
বিস্তারিত
আলোর পরশ
কোরআনের বাণী আল্লাহ, তিনি ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই; তিনি তোমাদের
বিস্তারিত