দেনমোহর নারীর অধিকার

দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) এর শাসনকাল। বিয়ের দেনমোহর নিয়ে মানুষের মধ্যে বাড়াবাড়ি দেখা গেল। ফলে দরিদ্রদের অনেকে বিয়ের সাহস করতে পারছিল না। সৃষ্টি হলো পেরেসানি ও সংকটের। তাই তিনি ভাবলেন, বিয়ের মোহরের পরিমাণটি নির্দিষ্ট করে দেওয়া যেতে পারে, যেন কেউ এর চেয়ে বেশি  দেনমোহর ধার্য করতে না পারে। মিম্বরে উঠলেন তিনি। বক্তৃতা করলেন। বললেন, এখন থেকে আর কাউকে যেন আমি ৪০০ দিরহামের বেশি  দেনমোহর ধার্য করতে না শুনি।
বক্তৃতা শেষ করে মিম্বর থেকে নামতেই কুরাইশ বংশীয় এক নারী এসে আরজ করলÑ ‘আমিরুল মুমিনীন! আপনি কি ৪০০ দিরহামের বেশি দেনমোহর ধার্য করতে নিষেধ করেছেন?’ হজরত ওমর বললেন, হ্যাঁ, করেছি। সে নারী প্রতিবাদী কণ্ঠে বলল, কোরআনে পাকে আল্লাহ তায়ালা এ সংক্রান্ত কী বিধান অবতীর্ণ করেছেন তা কি আপনি শোনেননি? খলিফা ওমর একটু থমকে গেলেনÑ ফয়সালা কি তাহলে কোরআনের বিধানের বিপরীত হয়ে গেল! তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কোন আয়াতটির কথা বলছ? সে উত্তর দিলÑ ‘কেন, আপনি কি এ আয়াতটি কখনও শোনেননিÑ (অর্থ) ‘তোমরা যদি এক স্ত্রীর স্থলে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করতে চাও এবং তাদের কাউকে রাশি রাশি অর্থও দিয়ে থাক তবুও তার কাছ থেকে কিছুই প্রতিগ্রহণ করো না। তোমরা কি অপবাদ ও সুস্পষ্ট পাপে জড়িয়ে তা গ্রহণ করবে?’ (নিসা : ২০)। এ আয়াতে দেনমোহর হিসেবে অগাধ অর্থ প্রদানের কথা বলা হয়েছে। হজরত ওমর  (রা.)  নারীটির বক্তব্যে নিজ মত প্রত্যাহার করলেন। আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন এবং পুনরায় মিম্বরে উঠে ঘোষণা করলেন, আমি তোমাদের ৪০০ দিরহামের বেশি দেনমোহর ধার্য করতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু এখন তোমাদের কেউ চাইলে এর চেয়ে বেশিও দেনমোহর নির্ধারণ করতে পার। (আবু ইয়ালার সূত্রে তাফসিরে ইবনে কাসির, সূরা নিসা, আয়াত : ২০)।
এই তো ইসলাম! যে নারী সমাজে মানুষ হিসেবেই বিবেচিত হতো না, নারী বা মেয়ে হওয়ার কারণে শিশুসন্তানকে জীবন্ত দাফন করত বাবা, পুরুষের মৃত্যুর পর যে নারী পুরুষের রেখে যাওয়া অন্যান্য স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মতোই উত্তরসূরিদের অধিকারে চলে যেত, সে নারীকেই ইসলাম বসিয়ে দিয়েছে মর্যাদা ও অধিকারের এক উচ্চাসনে। বিয়েতে প্রাপ্ত দেনমোহর তেমনই একটি অধিকার। বিয়ের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই জীবনে এক রকমের পূর্ণতা আসে। কিন্তু দেনমোহরÑ সে কেবলই স্ত্রীর অধিকার! স্বামীর কাঁধে স্ত্রীর পাওনা। স্বামীর জন্য এ এক অনস্বীকার্য দায়।
হজরত  ওমর  (রা.)  সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় চেয়েছিলেন এ দেনমোহরকে একটি নির্দিষ্ট সীমায় বেঁধে দিতে। কিন্তু কোরআনে কিংবা হাদিসে কোথাও এ নির্ধারণের বিষয়টি উল্লেখিত হয়নি। ফলে প্রতিবাদ করলেন সে কুরাইশী নারী। আর এর মধ্য দিয়েই ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই করে নিলেন তিনি। নামধাম কিছুই জানা নেই। তবুও অমর হয়ে আছেন আজও। কোরআন থেকে পাওয়া একটি অধিকারের পক্ষে কথা বললেন স্বয়ং হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাবের বিরুদ্ধে! কঠোরপ্রাণ হিসেবে খ্যাত হজরত ওমরও এ অধিকারটি উপেক্ষা করেননি। বরং মেনে নিলেন সে নারীর যুক্তি ও দাবি। ইসলামে নারীদের একটি অধিকার যেন আবার নতুনরূপে প্রতিষ্ঠিত হলো। 
আমাদের সমাজে দেনমোহর নির্ধারণ নিয়ে দুই রকম প্রান্তিকতা দেখা যায়। এক. লাখ লাখ টাকা দেনমোহর নির্ধারণ কিংবা দুই. কয়েকশ’ টাকা দেনমোহর নির্ধারণ। মোটা অংকের দেনমোহর ধার্য করার পেছনে প্রধানত দুটি বিষয় কাজ করে। এক. মেয়ের অভিভাবকেরা এ দেনমোহরকে বিয়ে টিকে থাকার হাতিয়ার মনে করে থাকেন। কারণ, যদি বিয়ে ভেঙে যায়, তাহলে স্বামীকে এ দেনমোহর আদায় করতে হবে। ফলে দেনমোহর আদায়ের দায় সামনে রেখে স্বামী বিয়েবিচ্ছেদের পথে অগ্রসর হবে না। দুই. বড়াই ও অহংকার এবং বেশি দেনমোহর নিয়ে প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা। 
অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, ইসলাম নারীর জন্য যে মোহরের অধিকার সাব্যস্ত করেছে, সেটা বিয়ে টিকে থাকার হাতিয়ারস্বরূপ নয়, নয় বড়াই ও প্রতিযোগিতার বিষয় হিসেবেও। বরং এ দেনমোহর নারীর জন্য নিরেট সম্মান প্রদর্শন। মোহরের অর্থের সম্মানীটুকু দিয়ে একজন পুরুষ তার জীবনসঙ্গিনীকে খুঁজে নেয়। সামাজিকভাবে মনে করা হয়, বিয়ের সময় পরিশোধকৃত অংশটুকু বাদ দিয়ে মোহরের যতটুকু অবশিষ্ট থকে, স্বামীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কিংবা তালাকের মাধ্যমে বিয়েবন্ধন ছিন্ন হলেই কেবল সে দেনমোহরটুকু আদায় করতে হয়। স্বামী-স্ত্রীর জীবদ্দশায় বিয়ে যতদিন টিকে থাকে, ততদিন সে দেনমোহর আদায় করতে হয় না। পক্ষান্তরে ইসলামের বিধান হলো, বিয়ের সময় যতটুকু দেনমোহর ধার্য করা হয়, এর সবটুকুই পরিশোধ করতে স্বামী দায়বদ্ধÑ সেটা বিয়ের মজলিশেই হোক, কিংবা পরবর্তী কোনো সময়ে হোক। বিয়েবিচ্ছেদের সঙ্গে এ দেনমোহর পরিশোধের সম্পর্ক নেই। হ্যাঁ, যদি মোহরের অর্থ পরিশোধের পূর্বেই কোনো বিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাহলে তখন সে দেনমোহর পরিশোধ করে দিতে হবে। অবশ্য বিষয়টি একটু ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। যদি স্বামী-স্ত্রীর নির্জনবাস বা একান্তে মিলিত হওয়ার পূর্বেই তালাকের মাধ্যমে বিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাহলে স্ত্রী অর্ধেক মোহরের অধিকারী হবে। আর যদি একান্তে মিলিত হওয়ার পর তালাক দেওয়া হয় তাহলে সে পূর্ণ দেনমোহরই প্রাপ্ত হবে। কিন্তু তাই বলে তালাক না দিলে দেনমোহর দিতে হবে নাÑ এমন কোনো কথা নেই। তালাক হোক আর নাই হোক, এ দেনমোহর স্ত্রীর অনস্বীকার্য অধিকার।
দ্বিতীয় প্রান্তিকতাটি খোলাসা করার জন্য ছোট আরেকটি কথাÑ আমাদের হানাফি মাজহাবের অনুসৃত মাসয়ালা অনুসারে, মোহরের সর্বনি¤œ পরিমাণ ১০ দিরহাম। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জমানায় দুই ধরনের মুদ্রার প্রচলন ছিলÑ দিনার বা স্বর্ণমুদ্রা, দিরহাম বা রৌপ্যমুদ্রা। তখনকার ১০ দিরহাম বর্তমানে পৌনে তিন তোলা রোপার কাছাকাছি। মোহরের সর্বনি¤œ পরিমাণ নির্ধারণ করতে চাইলে এ পরিমাণ রোপার মূল্য দিয়েই করতে হবে। আমাদের বর্তমান বাজারদর হিসেবে তা আড়াই-তিন হাজার টাকার মতো হতে পারে। কেউ কেউ এ মাসয়ালা জেনে ১০ দিরহাম সমপরিমাণ টাকা দেনমোহর হিসেবে ধার্য করে, আবার কেউ কেউ এ মাসয়ালা না জেনে কয়েকশ টাকা দেনমোহর ধার্য করে। মোটা অংকের দেনমোহর ধার্য করার প্রান্তিকতা থেকে বের হতে গিয়ে তারা জড়িয়ে পড়েন আরেক প্রান্তিকতায়। 
সহজ কথা, ইসলাম এ দুই প্রান্তিকতার কোনোটিই উৎসাহিত করে না। কেউ যদি পনের-বিশ লাখ কিংবা আরও বেশি টাকা দেনমোহর হিসেবে ধার্য করে, কিংবা আড়াই-তিন হাজার টাকা ধার্য করে, তাহলেও বিয়ে শুদ্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু ইসলাম আমাদের যে আদর্শ শিক্ষা দেয় তা এ দুইয়ের মাঝামাঝি। দেনমোহর স্ত্রীকে দেওয়া স্বামীর পক্ষ থেকে একটি আবশ্যকীয় সম্মানী। এটি নির্ধারণের সময় স্বামীর সামর্থ্য এবং স্ত্রীর বংশীয় ও পারিবারিক অবস্থার প্রতি লক্ষ রাখতে হবে। স্বামীর স্বাভাবিক সক্ষমতার বাইরে মোটা অংকের দেনমোহর চাপিয়ে দেওয়া যেমন অনুচিত, তেমনি স্ত্রীর পরিবারের সামাজিক অবস্থার প্রতি লক্ষ না রেখে ‘যতটুকু না হলেই নয়’ পরিমাণ অর্থাৎ সর্বনি¤œ পরিমাণ দেনমোহর নির্ধারণ করাও অনুচিত। এ উভয়ের মাঝে সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে দেনমোহর নির্ধারণ করাটাই প্রান্তিকতামুক্ত মধ্যমপন্থা। লক্ষ করার মতো বিষয়, সম্মানী হিসেবে আদায়যোগ্য এ মোহরের ক্ষেত্রে শরিয়ত সর্বনি¤œ একটি পরিমাণ নির্ধারণ করে দিয়েছে। আমাদের হানাফি মাযহাব মতে, এ পরিমাণ ১০ দিরহাম। কিন্তু সর্বোচ্চ কোনো পরিমাণ নির্ধারিত হয়নি। আবার এ সর্বনি¤œ পরিমাণ দেনমোহর নির্ধারণের প্রতি কোথাও উৎসাহিতও করা হয়নি। হ্যাঁ, যদি কারও সংগতি না থাকে, আর্থিক সংকটে যদি কেউ থাকে, তাহলে প্রয়োজনে এ ১০ দিরহাম দেনমোহর আদায় করেও কেউ বিয়ে করতে পারে। এর অর্থ এই নয়, এ ১০ দিরহামই দেনমোহর হতে হবে। 
কমবেশি যা-ই নির্ধারণ করা হোক, এ দেনমোহর স্ত্রীর অনস্বীকার্য অধিকার। কোনো ধরনের কৌশল চাতুর্য কিংবা ধোঁকার আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ এখানে নেই। মোটা অংকের দেনমোহর ধার্য করে বড়াই করে বেড়ানো আর তা আদায় না করে মৃত্যুর সময় মাফ চেয়ে নেওয়াÑ এটা ইসলামের শিক্ষাপরিপন্থি। অবশ্য স্ত্রী যদি নিজের পক্ষ থেকেই দেনমোহরের একটি অংশ ছেড়ে দেয়, কিংবা পরিশোধের পর স্বামীকে দিয়ে দেয় এবং এজন্য স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীর ওপর কোনো ধরনের চাপ না থাকে, তাহলে স্বামীর জন্য তা গ্রহণ করতে কোনো সমস্যা নেই। পবিত্র কোরআনের দিকে লক্ষ করুনÑ (অর্থ) স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তোমরা স্ত্রীদের দেনমোহর আদায় করে দাও; হ্যাঁ, যদি তারা স্বেচ্ছায় তা থেকে কোনো অংশ ছেড়ে দেয় তাহলে তা তোমরা সানন্দে খেতে পার। (নিসা : ৪)।
সবশেষে দেনমোহর নির্ধারণের বিষয়ে খলিফায়ে রাশেদ হজরত ওমর  (রা.) এর একটি উপদেশ উল্লেখ করছি, ‘তোমরা স্ত্রীদের দেনমোহর নির্ধারণে বাড়াবাড়ি করো না। এটা যদি দুনিয়াতে কোনো সম্মানের বিষয় হতো কিংবা হতো আল্লাহর নিকট তাকওয়া হাসিলের কোনো মাধ্যম, তাহলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই এক্ষেত্রে সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি ছিলেন। অথচ তিনি তাঁর কোনো স্ত্রীকে ১২ উকিয়া (অর্থাৎ ৪৮০ দিরহাম) এর বেশি দেনমোহর দেননি এবং তাঁর কোনো কন্যাকেও এর বেশি দেনমোহর দেওয়া হয়নি। (আবু দাউদ, হাদিস : ২১০৮)। আরেক বর্ণনায় অবশ্য সাড়ে ১২ উকিয়া বা ৫০০ দিরহামের কথাও বর্ণিত হয়েছে। আর ৫০০ দিরহাম সমান ১৩১.২৫ তোলা রোপা।


বুদ্ধির হেরফেরে তিন মাছের পরিণতি
সাগরকূলে পরিত্যক্ত ঘেরে তিনটি বড় মাছ আশ্রয় নিয়েছিল। পড়ন্ত বিকেলে
বিস্তারিত
মিথ্যা সব গোনাহের মূল
ঘড়ির কাঁটা দুপুর ১২টা ছুঁই ছুঁই। আমি সাতরাস্তার মোড় থেকে
বিস্তারিত
সুফিকোষ
  ‘গাঊছ’ শব্দটি আরবি, বাংলায় গাওছ, গওছ বা গাউস ও গওস
বিস্তারিত
সত্যবাদী ও সত্যবাদিতা
মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। মানুষের অঙ্গগুলো সুন্দরভাবে সঠিক পথে চলতে
বিস্তারিত
আদর্শ শিক্ষকের দায়িত্ব ও মর্যাদা
শিক্ষকতা পেশা হলো পৃথিবীর সমুদয় পেশার মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট ও শ্রেষ্ঠ।
বিস্তারিত
আত্মহত্যা প্রতিরোধে ইসলাম
জাতীয় পর্যায়ে আত্মহত্যা রোধ করতে হলে অবশ্যই জাতীয় পর্যায়ে প্রত্যেকটি
বিস্তারিত