রক্তনেশার আক্রোশে ইদলিব : তারপর কে?

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আভাস জোরেশোরেই দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। বিশ্বযুদ্ধের অবয়ব কী? সিরিয়ায় তো পুরো বিশ্ব যুদ্ধে জড়িয়ে গেছে। সেটিকে কেন বিশ্বযুদ্ধ বিবেচনা করা হচ্ছে না? বৃহৎ ও শক্তিমান সব দেশই এই যুদ্ধে সম্পৃক্ত। অন্যরা সহায়ক। এর বাইরে ইরাক, আফগান যুদ্ধের তো দুই দশক পুরো হতে চলেছে। ছয় দশক থেকে ইসরাইলের মোকাবেলা করছেন ফিলিস্তিনিরা। সৌদিরা যুদ্ধ করছে ইয়েমেনে। কাশ্মীরে যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে ভারত। এসব যুদ্ধ কি একক দেশের? প্রত্যেক অঞ্চলের রক্তের সঙ্গে পুরো বিশ্বের সংযোগ রয়েছে। কারও সংযোগ রক্ত ঝরানোয়। কারও সংযোগ রক্ত ঝরায়। এসব রক্তপাতকে খ-ভাবে দেখা হচ্ছে বলে কোথাও রক্তপাত থামছে না। দানবের হাত কুণ্ঠিত হচ্ছে না।

ইদলিব : কেমন তার অবয়ব
আলেপ্পোর পরে উত্তর সিরিয়ার সবচেয়ে বড় শহর ইদলিব। এটি সুন্নিপ্রধান প্রদেশ, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক খ্রিস্টানের বসবাসও রয়েছে। ২০০৪ সালে জনসংখ্যা ছিল ৯৮ হাজার ৭৯১ জন। ২০১০ সালে এই সংখ্যা পৌঁছে ১ লাখ ৬৫ হাজারে। এখন জনসংখ্যা ৩০ লাখ ছাড়িয়েছে! আট বছরে ২৮ লাখ মানুষ বেড়ে গেছে। এই জনবিস্ফোরণ কীভাবে হলো ইদলিবে? 
২০১১ সালে অস্থিরতা শুরুর পর থেকে আমেরিকা ও রাশিয়ার প্রচ- বিমান হামলা, স্থলভাগে ইরান হিজবুল্লাহর মদদপুষ্ট সিরিয়ার সরকারি সেনাবাহিনীর আক্রমণ, আইএসের উত্থান, বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর লড়াইয়ে সিরিয়া এখন পৃথিবীর বৃহত্তম কবরে পরিণত হয়েছে। নিজেদের আত্মকলহ এবং বৃহৎ শক্তির আক্রমণে প্রাণ হারাতে থাকে সাধারণ মানুষ। কখনও আইএস, কখনও কুর্দি, কখনও আসাদ বাহিনীর হাতে প্রাণ যায় মানুষের। একেকটি শহরের পতনের পর পার্শ্ববর্তী শহরে বাড়তে থাকে আশ্রিতের সংখ্যা। এভাবেই পুরো সিরিয়া থেকে তাড়া খাওয়া মানুষের ঠিকানা হয়েছে ইদলিব।

ইদলিব : সবুজ ভূমি, গেরিলা ঘাঁটি
সিরিয়ানরা বলেন ‘ইদলিব আল খাদরা’ (সবুজ ইদলিব)। এটা সিরিয়ার কৃষিপ্রধান অঞ্চল। এখানে বনজঙ্গল, পাহাড়-পর্বত ও সবুজের সমারোহ বেশি। গেরিলা যুদ্ধের জন্য সবচেয়ে উপযোগী বিবেচনা করা হয় ইদলিবকে। সমুদ্রতল থেকে প্রায় ৫০০ মিটার উঁচুতে তার অবস্থান। জলপাই এর প্রধান শস্য। এই জলপাই থেকে তৈরি সাবান ওসমানীয় আমলে তুরস্কের বাজারে বেশ জনপ্রিয় ছিল। ২০১১ সালে ‘আরব বসন্তের’ শুরুর দিকেই বিপ্লবীদের হাতে চলে যায় ইদলিব। এখনও এককভাবে ৬০ ভাগ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে ‘হাইয়াতু তাহরির আশ শাম’। (তাদের পূর্ব নাম জাবহাতুন নুসরা)। 

সিরিয়া সংকট : উত্তরণ প্রচেষ্টার সাত বছর
সিরিয়া সংকট উত্তরণে বেশ কিছু পদক্ষেপ-প্রচেষ্টা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে ধরা হয় আস্তানা সম্মেলনকে। ২০১৫-২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত ১০টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়াও সিরিয়া সংকট কাটাতে আরব লীগ পিস প্ল্যানস (২০১১-২০১২), রাশিয়ান পিস ইনিশিয়েটিভ ফর সিরিয়া, ইনফরমাল টকস প্রপোজাল (২০১২), অফারিং দ্য ফল অব আসাদ (ফেব্রুয়ারি ২০১২), ফ্রেন্ডস অব সিরিয়া গ্রুপ (ফেব্রুয়ারি ২০১২), কফি আনান পিস প্ল্যানস (মার্চ ২০১২), জেনেভা ওয়ান (জুন ২০১২), সিক্সটিনথ সামিট অব দ্য নন-এলাইন্ড মুভমেন্ট (আগস্ট ২০১২), ঈদুল আজহা সিজফায়ার অ্যাট্যাম্পট (সেপ্টেম্বর ২০১২), ব্রোকারেজ প্রপোজাল (২০১৩), জেনেভা টু (২০১৪), আস্তানা অপজিশন কনফারেন্স (২০১৫), ফোর কমিটিজ ইনিশিয়েভিট (জুলাই ২০১৫), জাবাদানি সিজফায়ার অ্যাগ্রিম্যান্ট (সেপ্টেম্বর ২০১৫), ভিয়েনা প্রসেস (অক্টোবর ২০১৫), রিয়াদ কনফারেন্স অব সিরিয়ান অপজিশন গ্রুপস (ডিসেম্বর ২০১৫), জেনেভা থ্রি (জানুয়ারি ২০১৬), দ্য সিরিয়ান ওমেন্স এডভাইজারি বোর্ড (ফেব্রুয়ারি ২০১৬), সেসেশন অব হস্টিলিটিজ (ফেব্রুয়ারি ২০১৬), সিজফায়ার ডিল, (সেপ্টেম্বর ২০১৬), লোজান টকস (অক্টোবর ২০১৬), ইনিশিয়েশন অব আস্তানা টকস অ্যান্ড সিজফায়ার (ডিসেম্বর ২০১৬), ফার্স্ট রাউন্ড অব আস্তানা টকস (জানুয়ারি ২০১৭), জেনেভা ফোর (মার্চ ২০১৭), আস্তানা টকস : ‘ডি-এস্কেলেশন জোন্স’ (মার্চ ও মে ২০১৭), আস্তানা টকস (জুলাই ২০১৭), আস্তানা টকস (সেপ্টেম্বর ২০১৭), আস্তানা টকস (অক্টোবর ২০১৭), আস্তানা টকস (ডিসেম্বর ২০১৭), সোচি টকস (জানুয়ারি ২০১৮), আস্তানা টকস (মার্চ ২০১৮), তেহরান টকস (সেপ্টেম্বর ২০১৮) হয়েছে। কোনো প্রচেষ্টাই রক্তপাত থামাতে পারেনি। ভাগ্য বদলায়নি সাধারণ মানুষের। এরই মধ্যে প্রায় সাত লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। তুরস্ক-ইউরোপে আশ্রয় নিয়েছেন লাখো মানুষ। এখন জীবিতরা প্রতিনিয়ত ভুগছেন মরণযন্ত্রণায়। মৃত্যুর চেয়ে জীবন সেখানে কঠিন।

সিরিয়া যুদ্ধ : পক্ষ-বিপক্ষ
সিরিয়া যুদ্ধ পৃথিবীর জটিল সংকটগুলোর একটি। এখানে এক বা দুই পক্ষের লড়াই চলছে না। নানা পক্ষ সম্পৃক্ত। শত্রু-মিত্র হিসাব হয় লাশ দেখে। গুলি বিচার করে। প্রধান পক্ষের মধ্যে আমেরিকার বড় স্বার্থ রয়েছে। তারা নিজেদের প্ল্যান বাস্তবায়নে আসাদ সরকারের পতন চেয়েছিল। সেটি থামিয়ে দেয় রাশিয়া ও ইরান। সংকটের শুরুতে তুরস্ক আমেরিকা বলয়ে ছিল। পরে রাশিয়ার সঙ্গে হাত মেলায়। বিরোধী ব্লক ছাড়াই এরদোগানকে স্বাগত জানান পুতিন। রাশিয়া আসাদ সরকারের পক্ষে হলেও তুরস্কের হিসেবে ভিন্ন জায়গায়। সেই ভিন্নতাতেই তার স্বার্থ ও সম্পৃক্ততা।
সিরিয়া যুদ্ধ এখন এক অর্থে শেষের পথে। ইদলিবকে কেন্দ্র করে সব পক্ষ এখন নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত। কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় তৎপর। কৃতিত্ব নিতে মরিয়া। কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়। সবাই নিজের ক্ষমতা ও শক্তির প্রকাশ করতে উদ্যত। কিন্তু ইদলিবের দখল এক মুহূর্তের জন্যও ছাড়তে রাজি নয় বিদ্রোহীরা।

উত্তরণ প্রচেষ্টায় তুরস্ক : স্বার্থ ও সম্পৃক্ততা
সিরিয়ার স্থিতিশীলতার সঙ্গে তুরস্কের সম্পৃক্ততা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সিরিয়ায় অস্থির হলে সেই প্রভাব পড়ে তুরস্কেও। চলমান যুদ্ধ শুরুর পর শরণার্থীদের বড় অংশের ঢল নামে তুরস্কে। আগামীতে এই বহর থামাতে, আশ্রয় নেওয়াদের ফেরত পাঠাতে এবং কুর্দিদের বাড়বাড়ন্ত অবস্থার লাগাম টানতেই রাশিয়ার সঙ্গে হাত মেলায় তুরস্ক। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো যুদ্ধমুক্ত রাখতে প্রাণপ্রণ চেষ্টায় রয়েছে দেশটি। এর জন্য বিদ্রোহীদের সঙ্গে যৌক্তিক সমঝোতায় কাজ করতেও আপত্তি করেনি তারা। আন্তর্জাতিক ফোরামে যতগুলো বৈঠক হয়েছে তুরস্ক বিদ্রোহীদের ছায়া অভিভাবকের ভূমিকায় থেকেছে বলেও মনে করা হয়। তুরস্কের প্রচেষ্টায় ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে শহরটি সংঘাতমুক্ত এলাকার অন্তর্ভুক্ত হয়। আস্তানা সম্মেলনের সিদ্ধান্ত মতে ইদলিবসহ আশপাশের অঞ্চল তুরস্কের পর্যবেক্ষণে দেওয়া হয়। আয়তনের বিচারে সেটা লেবাননের সমান। এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ আল মুয়াল্লিম বলেছিলেন, ‘এবার তুরস্কের পরীক্ষা হবে। তারা সন্ত্রাসীদের সহযোগী, নাকি সন্ত্রাসবিরোধী শক্তির অংশ?’
ইদলিবকে তুরস্কের জন্য ‘লেলিনগ্রাদ’ বানানোর স্বপ্ন ছিল আসাদের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানরা যেমন লেলিনগ্রাদ থেকে উঠে দাঁড়াতে পারেনি, তুরস্ককে তারা ইদলিবে তেমিন আটকে ফেলার জাল বুনেছিল। তাদের ধারণা ছিল, বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে অনিবার্য লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়বে তুরস্ক। তখন আসাদের কাজটি করে দেবেন এরদোগান। কিন্তু তুরস্ক হাঁটে নিজেদের প্ল্যানে। বিদ্রোহীদের সঙ্গে সংঘাতে না গিয়ে ম্যানেজ করার নীতি গ্রহণ করে। এর ফলে এখনও বড় সংঘাত ছাড়াই ইদলিবের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে বিদ্রোহীরা। তুরস্কের এই পলিসি কতটা কাজে দেবে। ইদলিবকে কি শেষ পর্যন্ত রক্ষা করা যাবে? এসব প্রশ্নের উত্তর একবুক দীর্ঘশ্বাস। শঙ্কার পাল্লা ভারী। শেষ পর্যন্ত রাশিয়া-ইরানের হামলা ও সহায়তায় ইদলিবকে কব্জায় নেবেন আসাদ। সেই ট্রায়ালও শুরু হয়ে গেছে। আসন্ন বিপর্যয় ঠেকাতে গেল ১৪ সেপ্টেম্বর জুমার পর ইদলিবে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। হামলা বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন।

ঝুলি ভরার পালা : ঘুঁটি যেভাবে চালানো হচ্ছে
সিরিয়া সংকট যতই পরিণতির দিকে যাবে, ভাগ-বাটোয়ারা ও স্বার্থরক্ষায় সব পক্ষ মরণকামড় বসাবে। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চক্রান্তে মেতে উঠবে। হিসাবটা হবে আমেরিকা-ইসরাইল, রাশিয়া-ইরান ও তুরস্কের মধ্যে। এখানে জয় কার হবে? কারও জয় নয়, পরাজয় হবে মানবতার। ইদলিবের পরিণতিই পরবর্তী সিরিয়ার রূপরেখা নির্ধারণ করবে। সিরিয়ার ভবিষ্যৎ পটপরিবর্তনের সঙ্গে তুরস্কের জাতীয় নিরাপত্তা জড়িত রয়েছে। উত্তর সিরিয়ায় প্রচুর তুর্কি উপজাতির বসবাস। উপজাতিদের স্বার্থ নিশ্চিত, আশ্রিত তিন মিলিয়ন শরণার্থীর পুনর্বাসন, দামেস্কের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়গুলো তুরস্কের জন্য অনেক বড় চ্যালাঞ্জ।
আমরা এখন ইদলিবের রক্তপাত নিয়ে কথা বলেছি। আগে বলেছি, রাক্কা, হোমস, আলেপ্পো নিয়ে। কিন্তু রক্তখেকোরা থামছে না। তারা থামবার নয়। রক্তনেশার বলি করা হচ্ছে ইদলিবকে। প্রশ্ন হলো, তারপর কার পালা? কার ঘরে আগুন জ্বলবে? কার দেহের রক্ত ঝরানো হবে। একটি শান্তির আবাস, নিরাপদ পৃথিবী কি মানুষের পাওয়ার কথা ছিল না?


ইসলামে জবাবদিহিতা
জবাবদিহিতা ইসলামের একটি অন্যতম মৌলিক বিষয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা
বিস্তারিত
আলোর পরশ
কোরআনের বাণী তিনিই তো আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক; তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ
বিস্তারিত
ভালো নাম মন্দ নাম
নাম একজন ব্যক্তির পরিচয় বহন করে। চাই সে পুরুষ হোক
বিস্তারিত
র‌্যাগিং : শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিকৃষ্ট
মফস্বল থেকে ছেলেটি এসেছে। চোখমুখ ভরা তার মায়া। জড়তা এখনও
বিস্তারিত
উপার্জনের কিছু অংশ সঞ্চয় করুন
কাজেই আজকের দিনের জীবনমানের বিবেচনায় উপার্জন ও সঞ্চয় করা দোষণীয়
বিস্তারিত
আলোর পরশ
কোরআনের বাণী আল্লাহ, তিনি ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই; তিনি তোমাদের
বিস্তারিত