ছোটগল্প ও রবীন্দ্রনাথ

বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতম শাখা ছোটগল্প, যার সূচনা হয়েছিলো বড়জোর দুইশত বছর আগে। ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্য যদি হয় বিন্দুতে সিন্ধু ধারণ করা, রবীন্দ্রনাথ তবে এমন শতাধিক সিন্ধু মন্থন করে পাঠককে দিয়েছেন অমৃতের সন্ধান। ছোটগল্প যদি হয় স্বল্প বিস্তারে ভাবের ব্যাপক সমাবেশ, রবীন্দ্রনাথ তবে ভাবের জগতে সৃষ্টি করেছেন বহু অতলস্পর্শী মহাসাগর।
সাহিত্যের যে কোন ধারা-ই তার শৈশব থেকে বিভিন্ন কালে, বিভিন্ন লেখকের হাত ধরে ক্রমশ পূর্ণ যৌবনে পদার্পন করে। বঙ্কিমের 'যুগলাঙ্গরীয়', 'রাধারানী' প্রভৃতিকে বলা যায় বাংলা ছোটগল্পের প্রাথমিক আভাস। পরবর্তীতে পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়, স্বর্ণকুমারী দেবী, নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত প্রমুখের হাত ধরে বাংলা ছোটগল্প বড় হবার চেষ্টা করে গেছে। তবে বাংলা ছোটগল্পের যাকে বলে Maturity, সেটা স্বার্থক রূপ লাভ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক রচিত 'দেনা-পাওনা' ছোটগল্পে, যদিও রবীন্দ্রনাথের প্রথম গল্প ছিল 'ভিখারিনী'।
রবীন্দ্রনাথ ছোটগল্প রচনা করা শুরু করেন ত্রিশ বছর বয়সে। অর্থাৎ ছোটগল্প তার বাল্যকালের আকস্মিক আবেগের কোন বহিঃপ্রকাশ নয়। তার বেশিরভাগ গল্পই বাংলা ১২৯৮ সাল থেকে ১৩১০ সনের মধ্যে রচিত। ১২৯৮ সালাই রচিত হয় তার বিখ্যাত ছোটগল্প 'পোস্টমাস্টার', যার কিছুকাল পূর্বেই তিনি তাদের পূর্ব বঙ্গের জমিদারী দেখাশোনা করার ভার পেয়েছিলেন। এ কথা বললে ভুল হবে না যে, পূর্ব বঙ্গের প্রকৃতি-পরিবেশ-মানুষ-ই তাঁর ছোটগল্পের মূল রসদ যোগান দিয়েছিলো। বিশাল পদ্মার উদ্দামতা, বোট হাউজের অপূর্ব, অনন্য অভিজ্ঞতা, গ্রাম-বাংলার সবুজ-শ্যামল-নীরব প্রকৃতি, মানুষের সহজ অনাড়ম্বর জীবন গল্পকার রবীন্দ্রনাথের সামনে জীবনের নতুন রূপ ও দর্শন তুলে ধরেছে।
রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের চরিত্রগুলো পুরোটাই কাল্পনিক নয়, এরা বাস্তবতার সাথে কল্পনার মিশেল। রবীন্দ্রনাথ যতই পল্লীবাংলার মানুষের জীবনের ঘনিষ্ঠ পরিচয় পেতে থাকলেন, ততই তাঁর ছোটগল্পের রস দানা বাঁধতে শুরু করলো। জীবনের অনেক আপাত তুচ্ছ ঘটনাকে তিনি ভিন্ন চোখে দেখতে লাগলেন, অনেক বৃহদার্থে। জমিদারীর গুরুদায়িত্ব নিয়ে আত্মীয়-পরিজন ছেড়ে পূর্ববঙ্গে নিঃসঙ্গপ্রায় রবীন্দ্রনাথের কাছে তাঁর ছোটগল্পগুলোই যেন ছিল পরম সঙ্গী, নির্জনতার বন্ধু। তাঁর বেশিরভাগ ছোটগল্পের প্রধান চরিত্রগুলো, লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, অনেক চরিত্রের ভীড়েও, এক ধরণের নিঃসঙ্গতাবোধে আক্রান্ত। রবীন্দ্রনাথ কি গল্পের চরিত্রগুলোর মাঝে নিজের নিঃসঙ্গ অনুভূতিই ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন? প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। 'পোস্টমাস্টার' গল্পের নায়ক যেমন চাকুরী উপলক্ষ্যে পল্লীগ্রামে একাকী, নিঃসঙ্গ, তেমনি 'ছুটি' গল্পের দুরন্ত গ্রাম্য বালক ফটিক ও ইট-কাঠ-পাথরের নগরে একান্ত অসহায়। 'সমাপ্তি' গল্পের মৃণ্ময়ী বা 'মেঘ ও রৌদ্র' গল্পের গিরিবালার দুঃখ পাঠকমাত্রেরই মর্ম স্পর্শ করলেও নিজ নিজ জগতে এরা প্রত্যেকেই সমকালের পার্শ্ব চরিত্রগুলো থেকে অনেক দূরে, অসমানুভূতিজনিত অবোধগম্যতায় ক্ষত-বিক্ষত। এই সব গল্পে রবীন্দ্রনাথ কি কেবল জীবনের আপাত তুচ্ছ বিষয়কেই ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন? নাকি নিজের অবস্থানগত কারণে সৃষ্ট বলয়ের মাঝে নিজের একাকীত্বকেই অতিক্রম করতে চেয়েছেন? আভাস পাই শিলাইদহ থেকে রবীন্দ্রনাথের লেখা একটি চিঠি থেকে, '....আজকাল মনে হচ্ছে, যদি আমি আর কিছুই না করে ছোট ছোট গল্প লিখতে বসি তাহলে কতটা মনের সুখে থাকি এবং কৃতকার্য হতে পারলে পাঁচজন পাঠকেরও মনের সুখের কারণ হওয়া যায়। গল্প লিখবার একটা সুখ এই, যাদের কথা লিখব তারা আমার দিনরাত্রির অবসর একেবারে ভরে রেখে দেবে, আবার একলা মনের সঙ্গী হবে, বর্ষার সময় আমার বদ্ধ ঘরের সংকীর্ণতা দূর করবে........।' অর্থাৎ,  রবীন্দ্রনাথ যেমন নিজের মনের সুখের জন্য গল্প লিখতেন, তেমনি পাঠকের মনের সুখের জন্যও গল্প লিখতেন, একই সাথে আশা করতেন এই গল্পগুলো তার একলা মনের সঙ্গীও হবে।
সচেতন পাঠকমাত্রই কবি রবীন্দ্রনাথকে সহজেই খুঁজে পাবেন তাঁর ছোটগল্পসমূহে। রবীন্দ্রনাথের কবিতার বেশিরভাগই গীতিময়তায় পূর্ণ, লিরিকধর্মী। এই গীতিময়তার দেখা পাওয়া যায় তাঁর ছোটগল্পেও। সেই সাথে দর্শন তো আছেই। 'পোস্টমাস্টার' গল্পে পোস্টমাস্টারের বিদায়বেলার মনোভাব লেখক প্রকাশ করছেন এই ভাবে, ‘যখন নৌকায় উঠিলেন এবং নৌকা ছাড়িয়া দিল, বর্ষা বিস্ফোরিত নদী ধরণীর উচ্ছলিত অশ্রুরাশির মতো চারিদিকে ছলছল করিতে লাগল, তখন হৃদয়ের মধ্যে অত্যন্ত একটা বেদনা অনুভব করিতে লাগিলেন, একটা সামান্য বালিকার করুণ মুখচ্ছবি যেন এক বিশ্বব্যাপী বৃহৎ অব্যক্ত মর্মব্যথা প্রকাশ করিতে লাগিল। একবার নিতান্ত ইচ্ছা হইল ফিরিয়া যাই, জগতের ক্রোড়বিচ্যুত সেই অনাথিনীকে সঙ্গে করিয়া লইয়া আসি। কিন্তু তখন পালে বাতাস পাইয়াছে, বর্ষার স্রোত খরবেগে বহিতেছে, গ্রাম অতিক্রম করিয়া নদীকূলের শ্মশান দেখা দিয়াছে এবং নদী প্রবাহে ভাসমান পথিকের উদাস হৃদয়ে এই তত্ত্বের উদয় হইল, জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া ফল কী? পৃথিবীতে কে কাহার?’
কী অপূর্ব কাব্যময়তা! আবেগাকুল হৃদয়ের আর্দ্র ছবি কত সুন্দর উপমাতেই না তিনি এঁকেছেন! এভাবেই গল্পকার রবীন্দ্রনাথ কবি রবীন্দ্রনাথকে বার বার ডেকে এনেছেন তাঁর গল্পগুলোয়। আর শেষ করেছেন এক অমোঘ সত্য উচ্চারণ করে, 'ফিরিয়া ফল কী? পৃথিবীতে কে কাহার?’ সত্যিই তো। এখানেই রবীন্দ্রনাথ ছোটগল্পে দর্শনকে মুকুটের শীর্ষে হীরকের মত স্থাপন করেছেন।
শেষ করার আগে বলতে চাই, এত স্বল্প পরিসরে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করা অর্বাচীনতারই নামান্তর। অনেক সাহিত্যবোদ্ধার মতে রবীন্দ্রনাথ যদি কেবল ছোটগল্পগুলোই লিখতেন, তবু বিশ্বসাহিত্যের আসরে তাঁর নাম স্বমহিমায় ভাস্বর হয়ে থাকতো। রবীন্দ্রনাথ কেবল স্বার্থক বাংলা ছোটগল্পের জনক-ই নন, তিনি যে স্বপ্নের জানালা বাংলা সাহিত্যের জগতে উন্মোচন করে গেছেন, সেই জানালা দিয়ে উঁকি মারতে মারতেই আধুনিক ও উত্তরাধুনিক যুগের কৌতূহলী লেখকগণ এগিয়ে যাচ্ছেন সাহিত্যের অমরলোকের সন্ধানে। সেই জয়যাত্রা অব্যাহত থাকুক, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৫-তম জন্মবার্ষিকীতে এই শুভ কামনাই করি।

সানোয়ার রাসেল, কবি, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক


কথাশিল্পী হুমায়ুন আহমেদের জন্মদিন পালিত
বাংলা সাহিত্যের নন্দিত কথাশিল্পী ও চলচ্চিত্রকার হুমায়ুন আহমেদের ৭১তম জন্মদিন
বিস্তারিত
কথাশিল্পী হুমায়ুন আহমেদের ৭১তম জন্মদিন
বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির অন্যতম পথিকৃৎ ,খ্যাতিমান কথাশিল্পী, চলচ্চিত্র-নাটক নির্মাতা হুমায়ুন আহমেদের
বিস্তারিত
শিল্পকলা একাডেমিতে কবিতায় বঙ্গবন্ধু
দেশের বিশিষ্ট বাচিক শিল্পীরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে
বিস্তারিত
কবি শামসুর রাহমানের মৃত্যুবার্ষিকী পালিত
আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, লেখক ও সাংবাদিক শামসুর
বিস্তারিত
হুমায়ূন আহমেদের শেষ দিনগুলো
আমেরিকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০১২ সালের ১৯শে জুলাই মারা যান বাংলাদেশের
বিস্তারিত
কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী
বাংলা সাহিত্যের বরেণ্য ব্যক্তিত্ব, খ্যাতিমান কথাশিল্পী, চলচ্চিত্র-নাটক নির্মাতা হুমায়ুন আহমেদের
বিস্তারিত